• December 4, 2021

অমিতদ্যুতি ঘোষের কবিতা

 অমিতদ্যুতি ঘোষের কবিতা

অন্য বসন্ত
আমি এক বসন্তকামী মানুষ৷

বসন্ত এসে গেছে জেনেও আজ

রঙ ছুঁতে পারিনা, হাত বাড়ালে

অশোক শিমূল নয়—উঠে আসে

রক্ত ঘিলু মজ্জা, পুড়ে যাওয়া শরীরের ত্বক৷

আকাশে রক্তমাখা চাঁদ, বনে বনে নয়

আগুন লেগেছে বস্তিতে মহল্লায়৷

ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাঙাচোরা ঘরকন্না,

মৃত্যুপুরীর বাতাসে দগ্ধ শবের গন্ধ৷


আমি এক বসন্তকামী মানুষ,

তবু কেন যে হেঁটে যাচ্ছি রক্তনদীর ধূসর পাড় বেয়ে একাকী,

দু-কানের পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই উড়ে যাচ্ছে ছুরি, ত্রিশূল, মশালেরা৷

মাটিতে মিশেছে গৃহের প্রাচীর, কোন্ গৃহবাসী বসন্তকে খুলে দেবে দ্বার?


রক্তে ভিজে, সারা অঙ্গে ছাই মেখে ধুঁকছে মস্ত একটা ক্লান্ত শহর,

জনহীন অর্ধদগ্ধ ভবনের পাহারায় 

উদ্বৃত্ত পেট্রলবোমার পাশে কেরোসিনের জার৷

বসন্ত এসে থমকে দাঁড়িয়ে আছে

সারি সারি কফিনের শোকস্তব্ধ বিষন্ন ছায়ায়৷


শুধু কি “জয় শ্রীরাম”, শুধু কি “আল্লা হো আকবর” ছিল?

ভোরের পাখির কলতান,

শিশুর হাসি ছিল না?

শুধু কি মন্দির আর মসজিদ ছিল?

পাঠশালা ছিল না বইয়ের গন্ধে ভরপুর?

আরোগ্যের অমৃতময় হাতছানি দেওয়া হাসপাতাল ছিল না কোনো?

নিষ্ঠুর ধর্মমুখোশের আড়ালে থাকা চোখে বুঝি

ধরা পড়ে না এসব!


আমি এক বসন্তকামী মানুষ৷

বসন্তের প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে আমারই অজান্তে

কখন এক ভয়ংকর নিশিপাখি

তার ধর্মীয় ডানা দিয়ে

দেশ জুড়ে এঁকে গেছে বীভৎস অগ্নিবলয়৷

সমস্ত রাত্রির বহ্নিপাত বুকে নিয়ে 

সেই বলয়ের চারপাশে নিঃসাড় শুয়ে আছে ঝলসানো পলাশের প্রান্তর৷


তবু ভুলে যেও না ,

আমি এক বসন্তকামী মানুষ৷

‘পরাজয়’ শব্দে আমার তীব্র ঘৃণা,

তাই অন্য এক বসন্তের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম পথে৷

আমার এক হাত ধরল প্রেমকান্ত বাঘেল

আমার অন্য হাতে সপুত্র মহীন্দর সিং৷

অনেক ফুল ফোটাব আমরা এবার,

শহরে, গ্রামে, নদীতে, পাহাড়ে 

হোলির খুন-খারাবি রঙে রাঙিয়ে দেব আকাশ৷

দোল পূর্ণিমায় দাওয়াত দেব কবি আমীর আজিজকে

ওর গালে ছোঁয়াব সোহাগের সুগন্ধী আবীর৷

আমীরের কন্ঠে আবার শোনা যাবে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ—

“তুম জমিন্ পে জুলম্ লিখ দো

আশমান পে ইনকিলাব লিখা যায়েগা

সব ইয়াদ রাখা যায়েগা

সব কুছ ইয়াদ রাখা যায়েগা৷”

ভোকাট্টা

তোর কাছে আর চাইবো নাকো

মেঘ, বৃষ্টি , উতল হাওয়া

 কনে দেখা আলোয় রাঙা

আকাশ – পথে বাসায় ফেরা পাখি ।


তিন সত্যি, চাইবো না আর

সবুজ পাহাড় , পাকদণ্ডি

শিশির ভেজা পথের বাঁকে

দেদার ফুলে রঙের মাখামাখি।


তোকেই বরং দিলেম আমি 

ভোকাট্টা ঘুড়ির সুতো

রাত্রি শেষে একলা জাগা

ক্লান্ত তারা, ছলাৎ ছলাৎ নদী।


তোকেই দিলেম যত্ন করে

সাগরতীরে শঙ্খচিলের

ডানার পালক খোঁপায় গুঁজে

 যা উড়ে যা উড়তে পারিস যদি ।

ইচ্ছে করে

ইচ্ছে করে নিরিবিলি নদীর ধারে

শেষ বিকেলে বসব দুজন পাশাপাশি

নদী তীরের গাছের ছায়া তোমায় ছুঁলে

জাগবে হঠাৎ চমকে নদীর জলরাশি৷


বৃষ্টি এসে হঠাৎ তোমায় ভিজিয়ে দিলে

চিবুক ছুঁয়ে পড়বে নীচে আদরকণা

ফোঁটায় ফোঁটায় শরীর জুড়ে তারার আলো 

নদীর বুকে বাতাস করুক দস্যিপনা৷


মেঘ ভাঙ্গলে দু-কূল ভাসে রুপোর জলে

এলাচ-গন্ধ নারীর ঠোঁটে আকুল শ্রাবণ

নদীর আকাশ তাকিয়ে দেখে বন্দী ভ্রমর

ডানায় এসে ঝাপটা মারে দারুণ প্লাবন ৷


ইচ্ছেপুরীর নক্সিকাঁথা ত্রিসীমানায়

কেই  বা কখন তুলতে গেছে নীতির দেয়াল

সজিসভ চুমোয় ভরিয়ে দেবো পাকদন্ডী 

বাদল হাওয়ায় উড়বে দূরে আপন খেয়াল৷


  এসো,আবার স্বপ্ন সাজাই

 আবার একটা একটা করে পাপড়ি মেলছে অনাদৃত বাগানের লাল গোলাপ৷

আষাঢ়ের মেঘ থম মেরে আছে পল্লীর প্রান্তে৷

ছিন্নভিন্ন ঘর-গেরস্থালির ওপরে ঝড়ের আগের মতো স্তব্ধ আকাশ৷

আবার একটা প্রলয় এলো বলে৷


আবার স্পন্দমান হয়ে উঠছে ত্রস্ত মানুষ৷

রোদের ভেলায় চেপে প্রিয় রঙের আঙিনায় ফিরছে প্রতারিত কিষাণ-কিষাণী,

গোধূলির আবীর গায়ে মেখে গাঁয়ে ফিরেছে ক্ষুধাজর্জর প্রবাসী শ্রমিক৷

ওরা মাথা তুলছে,খিদে ভুলছে,ফেটে পড়ছে ক্ষোভে৷

জীবন তাদের শিখিয়েছে বন্ধু-শত্রুর নব ধারাপাত৷


এসো,আবার আমরা পাহাড়ের চূড়ায় উঠবো৷

নীচে বইবে দুরন্ত নদী,

অরণ্যপুষ্পে আবার সেই যৌবনের সম্মোহন৷

ধানের গন্ধ, নারীর কোমল ভালোবাসা!

গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টির মতো আমরা ছড়িয়ে পড়বো অলিতে-গলিতে,বস্তিতে, মহল্লায়৷

ভুলচুক শুধরে নিয়ে স্বপ্ন সাজাবো আবার

কারখানার সাইরেনে,শস্যনিবিড় সবুজ মাঠে,

শঙ্খচিলের ডানায় ডানায়৷


রঙীন শামিয়ানা টাঙিয়ে আবার আমরা গানের আসর বসাবোঃ

“অব মচল্ উঠা হ্যায় দরিয়া

শির পর ঘিরি বাদরিয়া….”৷

গণকন্ঠের উত্তাপে আবার গর্ভিণী হবে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি ৷

বসন্তের দিনলিপি

আমার উঠোনের ঝরাপাতাগু

লিদিনান্তের জলরেখা ছুঁয়ে পাড়ি দেয় পশ্চিম আকাশে।

চোখের দুই কোণে মধ্যবয়সের বাসা!

হাতে আর তেমন সময় কই?

এবার দুঃখের নদীর মতো নীল অন্ধকার নেমে আসার পালা ৷


বড় অদ্ভুত এ সময়!

কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক পংক্তিতে দাঁড়িয়ে আছে

উষ্ণীষশোভিত রাজা, নামাবলী গায়ে ধর্মগুরু, শাণিত খড়্গ হাতে জল্লাদ৷

উপাসনাগৃহের চূড়া থেকে নেমে আসছে রক্তের স্রোত

হাততালির মুখরিত শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে

কুয়াশা ছড়ানো বসতির আকাশ৷


দাউ দাউ আগুনে যারা ছুঁড়ে দিয়েছিল নিজেদের হৃৎপিণ্ড

যাদের সমস্ত রাস্তার ঠিকানায় লেখা ছিল

এক কুসুমিত ভোরের সুগন্ধি বাগিচা,

ধান আর গান দিয়ে যারা বেঁধেছিল

ঘরে ফেরার মসৃণ আলপথ,

এখনো তারাই দেওয়ালে দেওয়ালে 

কস্তুরিগন্ধ তুলি দিয়ে লিখছে দ্যাখো-

আমরা যা চেয়েছি, আজ নয়,

হয়তো কালও নয়, কিন্তু একদিন পাবই ৷


গোধূলির ছায়াপথ পেরিয়ে তোমার চুলের মতো অন্ধকার সন্ধ্যেয়

মুখ ডুবিয়ে ঘুমিয়ে যাব নিশ্চিন্তে,

আমরা চলে গেলেও আমাদের সন্ততিদের

 জন্য রেখে যাব

আলোর রেণুমাখা পীড়িতের মুখ,

শেষ রাতে চাঁদের আলোয় ভেজা রক্তকরবী,

আর চেনা বন্দরে নোঙর করাবসন্তের দিনলিপি ৷

কবি অমিতদ্যুতি ঘোষঃ অমিতদ্যুতি ঘোষ পেশায় শিক্ষক, বামপন্থী গণআন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী। কবিতা তার যাপন,দিনশেষে কবিতাই তার আশ্রয়।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • ইচ্ছে করে কবিতাটা আগে পড়েছি।বাকি গুলো পড়লাম। যেমন লাগে সবসময় অসাধারণ ঠিক তেমনই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *