• December 2, 2022

কন্যাসম

 কন্যাসম

স্মৃতিকণা সরকার

সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে, মর্নিং ওয়াক্ সেরে, বাজার করে, রান্না করে, পেটপুজা করে থানায় যাওয়াটা আমার ২২ বছরের অবিবাহিত জীবনের একলা সংসারে সত্যিই খুব যন্ত্রণাদায়ক। আজও ব্রেকফাস্ট সেরে তড়িঘড়ি রেডি হয়ে থানায় যাওয়ার জন্য বেরোতে যাচ্ছি, ঠিক তখনি হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। থানা থেকে এসেছে দেখে একটু বিরক্তই হলাম। ফোনটা ধরে বলতে যাব “আরে বেরোচ্ছি… ” ওপার থেকে শান্তনুর গলায় ভেসে এলো “স্যার আপনাকে এখন থানায় আসতে হবে না আমরা ডাইরেক্ট সন্তোষপুর যাব, ওখানে একটা কেস্ ষ্টাডি ব্যাপার আছে”।
“ও.কে., তোমরা মোড়টায় চলে এসো ..আমি ওখানে পৌঁছে যাচ্ছি” কথাটা বলেই ফোনটা রেখে দিলাম।
কেসটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় শান্তনু বলল, ” গত ৫ দিন ধরে নিখোঁজ ছিলেন সন্তোষপুরের বাসিন্দা শৈলেন বিশ্বাস। আজ ওনারই ছেলে থানায় এসে জানায় সকালে তার বাবার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে৷” আমার ভাবলেশহীন মুখ দেখে আবার সে বলতে শুরু করলো “কোথা থেকে জানেন স্যার!” যতটা উত্তেজনা নিয়ে ও প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করেছিল আমি তার বিন্দুমাত্র ভাবপ্রকাশ না করেই শুধু বললাম “কোথা থেকে!” পূর্বের ন্যায় উত্তেজিত হয়েই শান্তনু বলল “ওদের বাড়ি থেকে স্যার।” আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম “মানে!” শান্তনু বলল ,”হ্যাঁ স্যার, ওদের বাড়ির একটা ঘর থেকে। “
আমি আর কোন কথা বাড়ালাম না। কিন্তু মনে মনে খুবই অবাক হলাম ..পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ! অথচ বডি পাওয়া যাচ্ছে নিজেদের বাড়ি থেকে ! ষ্ট্রেইন্জ্! আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছালাম বাড়িটায় … তিনতলা বাড়ি, তবে উপর তলার কাজ এখনও অনেকটাই বাকি । দেখে মনে হচ্ছে কাজটা কয়েকদিন আগেই শুরু হয়েছে , আর দ্বিতীয় তলার পার্টটা বেশ কয়েক বছরের পুরনো। নতুন আর পুরনোর বিভেদরেখাটা স্পষ্টতই তা প্রমাণ করে দেয়। ইতিমধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পাড়ায়। লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে ঘিরে রয়েছে পুরো বাড়িটাই। ঘরে ঢুকতে ভেসে আসছে প্রিয়জন বিয়োগের কান্নার রোল। আমাদের দেখতে পেয়ে বছর ১৭-১৮ এর একটা ছিপছিপে চেহারার ছেলে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল দোতলায় উঠতে সিঁড়িটার পাশে একটা ঘরের সামনে। ঘরটা মাটির নিচে অবস্থিত৷ বাইরে থেকে দেখে কারও বোঝার উপায় নেই যে এই বাড়িতে ভূগর্ভস্থ ঘর থাকতে পারে৷দরজা খুলে মুখ বাড়াতেই একটা উৎকট গন্ধে সকালের করা ব্রেকফাস্ট যেন প্রচন্ড বিপ্লবে বাইরে বেরোতে চাইল। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে সরু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে দেখলাম আলো বাতাস হীন ঘরটায় ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির কমপক্ষে ১০০ কেজি ওজনের একটা লোক চোখ খুলে মৃত অবস্থায় চিত হয়ে পড়ে আছে। পরনে আছে হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি | মুখের চারপাশে গুচ্ছখানিক মাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে খাবারের আশায়। লোকটিকে দেখে মনে হয় বয়স আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে হবে৷ হাতে গ্লাভস পরে মৃতের ঘাড়টা ঘোরাতে মাথার কাছে শুকনো রক্তের জমাট চোখে পড়ল। ভালো করে লোকটিকে পর্যবেক্ষণ করে কন্সটেবলদের বললাম বডিটা বাইরে বের করে নিয়ে যেতে। হঠাৎ কান্নার দ্বিগুন জোর মৃতদেহ বাইরে বের করার সংবাদ দিল। মৃতদেহ থেকে নির্গত গন্ধের সাথে একটা সোঁদা সোঁদা ভিজে গুমোট গন্ধ মিশ্রিত হয়ে যেন ঘরের বাতাসটাকে দুর্বোধ্য করে তুলেছে৷ ঘরের সব আলো জ্বালানোর পর দেখা গেল একটিমাত্র হলঘর সেখানে৷ পুরো বাড়িটা ঠিক যতটা ভিতের উপর তৈরি ঠিক ততটাই জায়গা জুড়ে বানানো ঘরটায় পুরোনো বাদ পড়া জিনিসপত্রের সারি দেওয়া । শান্তনু বললো, “স্যার,মাথার পিছনে আঘাত লেগেছে, মানে সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে যদি পা পিছলে পড়ে যান ..” ওর কথা শেষ না হতেই আমি বললাম ,”যদি সামনে থেকে কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দেন, তাহলে !”শান্তনু মাথা নাড়িয়ে বললো,”হ্যাঁ, ওটাও তো হতে পারে স্যার।” “এ যা বুঝতে পারছি শান্তনু ৪-৫ দিন আগে মারা গেছে” এই বলে ঘরটার চারদিক একবার ভাল করে তত্ত্বানুসন্ধান করে ফিরে আসছিলাম ঠিক তখনই সিঁড়িতে রক্তের দাগের পাশে চোখে পড়ল একটা কাঁচের শিশি৷ হাতে তুলে নিয়ে নামটা দেখলাম ‘Melatonin’ ।
বাড়ির মালিক ৭০-৭৫ বছরের বৃদ্ধ শশধর সেনের ছেলে অখিল সেন ও মেয়ে নমিতা বিশ্বাস সপরিবারে থাকেন এই বাড়িতে। শৈলেন বিশ্বাস ছিলেন সম্পর্কে এ বাড়ির জামাই৷ তিনি নমিতা দেবীর স্বামী এবং তাদের একমাত্র ছেলে দ্বৈপায়ন বিশ্বাস। বডিটা পোস্টমর্টেমে পাঠিয়ে বাড়ির লোককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করলাম।
“কে প্রথম বডিটা দেখতে পেয়েছিলেন? আর সেই সময়ে আপনারা সবাই কে কি করছিলেন ?”
১৭-১৮ বছরের দ্বৈপায়ন ভয়ের সাথে কান্না মিশিয়ে ধরা গলায় বলল,” আমি প্রথম বাবাকে দেখেছি৷”
আমি বললাম ,”আচ্ছা, প্রথম থেকে বলো ঠিক কী কী হয়েছিল ?”
“সকালবেলা ব্রাশ করতে করতে স্কুলের প্রজেক্ট এর মডেল বানানোর জন্য কিছু বাদ দেওয়া জিনিসের খোঁজে আমি স্টোররুমে গিয়েছিলাম৷ সেখানে ওই অবস্থায় বাবাকে পড়ে থাকতে দেখি ৷দু-তিন দিন ধরে বাড়িতে একটা পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম, কিন্তু কোথা থেকে গন্ধটা আসছিল বুঝতে পারছিলামনা | এভাবে বাবাকে দেখব কোনদিনও ভাবিনি” পিতৃহারা দ্বৈপায়ন বলতে বলতে প্রচন্ড বেদনায় কাঁদতে লাগলো।
“কটার সময় দেখেছিলে?”
একই স্বরে দ্বৈপায়ন উত্তর দিলো” সাড়ে আটটার দিকে হবে।”
“দরজায় নিশ্চয়ই তালা দেওয়া ছিল?”
নমিতা দেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন ,”হ্যাঁ, ওটা সবসময় তালা দেওয়াই থাকে”।
আমি আবার প্রশ্ন করলাম,”আজও কি তালা দেওয়া ছিল?”
দ্বৈপায়ন উত্তর দিল, “হ্যাঁ ,আমি চাবি খুলে ঘরে ঢুকেছিলাম ৷
” আমি একটু ভেবে বললাম ,” তাহলে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া ছিল তাই তো!” সবাই নিঃশব্দে উপর নীচে মাথা নাড়াতে লাগলো।
“শান্তনু ,ওই দরজার তালা-চাবিগুলো ফরেনসিকে পাঠাও আর সাথে এটাও” বলে হাতের কালো শিশিটা শান্তনুকে দিয়ে দিলাম এবং বাড়ির লোকের উদ্দেশ্যে বললাম “লাস্ট কে তালাটা দিয়েছিলেন এবং কবে ?” ।
শশধর বাবু বললেন “আমি দিয়েছিলাম রবিবার রাত্রে” ।
“তারপর দরজাটা কেউ খোলেননি এতদিনে!” এবার অখিল সেনের স্ত্রী আহেলী সেন ভারাক্রান্ত স্বরে বললেন ,”না, প্রয়োজন না হলে দরজাটা খোলা হয় না৷”
“আচ্ছা, উনি তো ৫ দিন আগে থেকে নিখোঁজ৷ তাহলে আপনারা কেন উনার খোঁজ করেননি এতদিনে! বা থানায় ডায়েরি করেননি একবারও!” কথাটি শশধর সেনের উদ্দেশ্যে বললাম।
অখিল সেন উওরে জানান,”ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টএ কাজ করার সুবাদে জামাই বাবুকে মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো, তো আমরা ভেবেছিলাম যে কাজের সূত্রে হয়তো কোথাও গেছেন।”
“না জানিয়ে চলে যেতেন ?”
আহেলী সেন জবাব দিলেন “হ্যাঁ ,মাঝে মাঝে না বলেও চলে যেতেন ৷”
“সাম্প্রতিক কি অন্য কারো সাথে ঝামেলা করেছিলেন বা ওনার সাথে কারো ঝগড়া হয়েছিল? টাকা-পয়সা নিয়ে বচসা এরকম কিছু কি হয়েছিল ?”
নমিতা দেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন৷ ওনার সাথে কখনো কারো …” কথা শেষ না হতেই আহেলি দেবী বললেন ,”কয়েকদিন আগে আমাদের এখানে যে মিস্ত্রিরা কাজ করছিল তাদের সাথে ঝামেলা হয়েছিল।”
“ওউ, আই সী!” কিছুক্ষণ পর আবার বললাম,” আপনারা কি করে বুঝলেন যে ওনার বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কথা ছিল?”
নমিতা দেবী বললেন,” না,ওনার কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না কিন্তু সোমবার সকাল বেলা যখন ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ওনার বাইকটা নেই, তখন বুঝলাম যে উনি বেরিয়েছেন আর তাছাড়া বাড়ির গেটটা সেদিন খোলাই ছিল এবং উনি বাদে আর সবাই বাড়িতেই ছিলেন। যদিও মিস্ত্রিদেরও ওইদিন যাওয়ার কথাছিল।”
“মিস্ত্রিরা বাইক চালাতে পারতো?”অখিল বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলাতে উনি বলেন,”না, কোনোদিনও উৎসাহ দেখিনি।”
“ওরা কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছে আপনারা জানেন না?”আহেলী দেবী বললেন,”না, ওনারা বরাবরই ভোরে যান আমরা কেউ উঠিনা তখন।”
” বাইকটা ছাড়া আর কি কোন জিনিস বাড়ি থেকে মিসিং হয়েছে?”
কেউ কিছু উত্তর দিচ্ছে না দেখে বললাম,”দেখুন ,আপনারা তো বুঝতেই পারছেন এটা কোন স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, সুতরাং সত্যি কথা বলবেন। আপনারা যত তাড়াতাড়ি সত্যি কথা বলবেন ওনার কেসটার ততো তাড়াতাড়ি মিমাংসা হবে”।
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে না সূচক ইঙ্গিত করল ।
মিস্ত্রিদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে ওনারা বলেন যে ওদের বাড়িতে থেকে ৩ জন মুর্শিদাবাদের মিস্ত্রি কাজ করতেন। আগেও ওনারা এখানে থেকে কাজ করেছেন, খুবই বিশ্বস্ত। সামনে ঈদ আসছে বলে সবাই মুর্শিদাবাদ গেছেন ৫ দিন আগে। দেওয়ালে প্যারিস করা নিয়ে ওনাদের ঝামেলা হয় শৈলেন বিশ্বাসের সাথে ।আরো জানা যায়, যে দিন রাতে ঝগড়া হয়েছিল তার পরের দিন সকাল থেকেই শৈলেন বিশ্বাস নিখোঁজ । ঘরজামাই থাকা শৈলেন বিশ্বাস এই বাড়ির কোনো বিষয়ে মাথা ঘামালে যদি সেটা গুরুত্ব দেওয়া না হয় তখন তিনি রেগে যেতেন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন কাউকে কিছু না বলে। সেদিনও তার অন্যথা হয়নি । আর বাড়ির লোক তাকে নিয়ে অত খোঁজখবরও করেনি । আমি ওনাদের কাছ থেকে তিন জন মিস্ত্রির ঠিকানা যোগাড় করে মুর্শিদাবাদে লোক পাঠালাম তাদেরকে ট্র্যাক করতে। এরপর বাড়িটা পুরো সার্চ করা হলো৷ একতলায় তিনটি ঘর একটা বাথরুম আর একটি রান্নাঘর, দোতলায় তিনটে ঘর একটা বাথরুম অর্থাৎ দেখে বোঝা যাচ্ছে বাড়িতে রান্নাটা একসাথেই করা হয়। দোতলার একটা ঘরে গিয়ে সত্যিই খুব অবাক হলাম৷ পুরো ঘরটা জুড়ে বই , লাইব্রেরী বললে ভুল হবে না। বেশ ভালো লাগলো দেখে যে আজকাল কেউ বইটাও পড়ে।তিন তলায় ঠাকুর ঘর এবং আরো তিনটি ঘর অসম্পূর্ণ অবস্থায় আছে৷ সেখানে থাকেন মিস্ত্রিরা। এক তলায় থাকেন শশধর বাবু এবং শৈলেন বাবু ও তার পরিবার| দোতালায় থাকেন অখিল বাবু আর তার স্ত্রী এবং দুই সন্তান।
” আজ সকালে আপনারা কে কি করছিলেন বলুন তো?” বয়ান অনুযায়ী, শশধর বাবু ঘুম থেকে উঠে পেপার পড়ছিলেন, অখিল বাবু অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলেন অন্যদিকে নমিতা দেবী এবং আহেলী দেবী রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন । “আচ্ছা ,আপনারা শেষ ওনাকে কখন দেখেছিলেন?”নামিতাদেবী বললেন ,”রাতে উনি ঘরে ঘুমিয়েছিলেন”
আমি আবার বললাম ,”ঘরটা সচরাচার খোলা হয়না বললেন,তাহলে ওইদিন উনি ওখানে কেনো গিয়েছিলেন বলতে পারবেন ?”
সবাই চুপ করে মাথা নাড়ালো। আপাতদৃষ্টিতে মৃত্যুটা সুইসাইড বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু খুন হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয় ৷ তাই কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না সবাই সন্দেহের তালিকায় উপস্থিত |
ক্ষনিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “অখিল বাবু আপনার তো দুটো ছেলে-মেয়ে, তারা সকালে তখন কি করছিলো ?”আহেলী দেবী বললেন,” আমার মেয়ে পড়তে গিয়েছিল আর ছেলে তখন ঘুমাচ্ছিল৷ “
“ মানে,এখন তো ফিরে আসার কথা, এখনো আসেনি সে?” আহেলী দেবী বললেন, “সরাসরি ওখান থেকে স্কুলে যাবে তারপর বাড়ি ফিরবে৷ ও মাঝে মাঝে এরকম করে৷”
এতক্ষণে বাড়ির চারপাশের লোকজন অনেক পাতলা হয়ে গিয়েছে কিন্তু মিডিয়া এখনো যায়নি৷ তাদের কাছে নিঃসন্দেহে এটা একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা। যতটা সম্ভব মিডিয়া এড়িয়ে প্রাথমিক তদন্তে যা জানা গিয়েছে তা বলতে বলতে তাড়াতাড়ি বেরোতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই হঠাৎ দেখলাম স্কুলের পোশাকে বছর ষোলোর মেয়েটা ধীরগতিতে স্থির দৃষ্টিতে বাড়ির দিকে আসছে। সে হতভম্ব হয়ে আহেলি দেবীকে গিয়ে বলল ,”কি হয়েছে মা?”
এইবাড়ির ছোট্ট সদস্য এসে বলল,” জানিস দিদি! পিসু আর বেঁচে নেই!”
স্বাভাবিকভাবেই বুঝলাম উক্ত ব্যক্তি অখিল বাবুর মেয়ে।
মেয়েটিকে ডেকে বললাম, “ কি ব্যাপার আজ এতো তাড়াতাড়ি স্কুল শেষ হয়ে গেল!”
দেখলাম মেয়েটার শ্যামলা গাল বেয়ে নিঃশব্দে চোখের জলের কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে ৷ তাও একটু মুচকি হেসেই বললো,” আপনি বোধহয় ভুলে গিয়েছেন আজ শনিবার |” তারপর নিজের হাতের ঘড়িটা দেখে বলল, “আর এখন বাজে আড়াইটা ৷” কথা বলার সময় মেয়েটার থুতনিতে কালো তিলটা আমার চোখ এড়ালো না। নিজের বোকামি বুঝতে পেরে নিজেরই খুব হাসি পেল ৷ সত্যি আমি ওই মুহূর্তে ভুলে গিয়েছিলাম যে আজ শনিবার| তবে মেয়েটার অ্যাটিটিউড সত্যিই প্রশংসনীয় ৷
জিজ্ঞাসা করলাম “তোমার নাম?”
উত্তর এলো” হোমাগ্নি…হোমাগ্নি সেন” ৷
প্রাথমিক তদন্ত সেরে আমরা থানায় চলে এলাম বিকেল পাঁচটায় ৷ সঙ্গে আনলাম শৈলেন বাবুর ডায়েরী আর ফোনটা। প্রথমে কেসটা যতটা সাধারন ভেবেছিলাম এখন দেখছি ততটা সাধারণ নয় ৷ অনেক জটিলতা আছে এর মধ্যে৷ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়শয় ঝগড়া লেগে থাকতো৷ এমনকি মাঝে মাঝে শৈলেন বাবু তার স্ত্রীকে মারধর করতেন বলেও জানা যাচ্ছে ৷ তাছাড়াও এই কেসটার মধ্যে আছে পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের মধ্যে নানান জটিলতা| যেমন সম্পত্তি নিয়ে জামাইবাবু ও শ্যালকের মধ্যে ঝগড়া| অন্যদিকে অখিল বাবুর সন্তানদের বেশি ভালবাসার জন্য শৈলেন বাবু ও তার ছেলের মধ্যে মন কষাকষি৷ কিন্তু এগুলো কোন জোরালো মোটিভ নয় ৷ পাড়ার লোক জানিয়েছেন উনি খুব ভালো মানুষ ৷ দেখে ওনাকে রাগী মনে হলেও মজা করতে ভালোবাসতেন। তবে ওনার শত্রু তো ছিল অবশ্যই ।পরদিন সকালে রবিবার সত্বেও থানায় গিয়ে দেখি মুর্শিদাবাদের গোকর্ণ তে থাকা মিস্ত্রিরা সশরীরে থানায় উপস্থিত । তারা কিছুই জানেনা এ ব্যাপারে৷ শৈলেন বিশ্বাসের সাথে তাদের ঝগড়া হয়েছিল এই কথাটি ঠিকই যেটা তারা অস্বীকার করেননি, কিন্তু সেই ঝগড়ার জের বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। রাগ হওয়াতে সেদিন রাতে তারা ওই বাড়িতে ভাত খায়নি। তবে রাতের দিকে হালকা একটা চিৎকারের আওয়াজ শুনেছিল তারা৷ সেদিন ওই বাড়িতে ঝামেলা হচ্ছিল তাই তারা আর বেশি গুরুত্ব দেয়নি ব্যাপারটাকে | তবে আড়াইটা নাগাদ শৈলেন বাবু বাইকে করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তারা ওনাকে দেখেননি কিন্তু বাইকের আওয়াজ শুনে বুঝেছিলেন উনি।
“তোমরা গিয়ে দেখোনি কারা চিৎকার করছিল?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
তাদের মধ্যে একজন বললেন, “ যদিও আমরা একবার দেখার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকায় কিছু দেখতে পাইনি৷”
“ তাহলে তোমরা পরে বের হলে কি করে?”
অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করা সত্ত্বেও কেউ দরজা খুলে দেয়নি৷ এরই মধ্যে হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে যায় ৷ যখন আলো এলো তখন দেখি দরজাটি খোলা৷” সেই সোমবার সকালে তারা ৬:৪৯ এর চিতপুর লালগোলা ধরে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিল। তার মানে কাল সকালের ঘটনাটা ট্রেলারমাত্র, সিনেমাটি হয়েছে রবিবার রাতে । ফোনের কল লিস্ট আর ডায়েরি ঘেঁটে বিশেষ কিছুই উদ্ধার করা যায়নি৷ তবে লক করা অবস্থায় বাইকটা পাওয়া গেছে ওই বাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে একটা রাস্তার পাশে, যার চাবিটা এখনও পাওয়া যায়নি। এখন ওটা থানায় আছে। ফরেনসিক রিপোর্টে জানা গেছে ওই তালায় দুই জনের হাতের ছাপ আছে। একটা দ্বৈপায়নের আর একটা নমিতা দেবীর। আরও জানা গেছে কাঁচের শিশিটায় ঘুমের ওষুধের সাথে মেশানো ছিল ‘Nerium indicum’ অর্থাৎ রক্তকরবী।
পরদিন সকালে উঠে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নিয়ে ওই বাড়িতে গেলাম আবার। পৌঁছে দেখি শ্রাদ্ধশান্তির কাজ হচ্ছে। সেখানে বাড়ির সকলেই উপস্থিত আছে । আমাকে দেখে শশধর বাবু ও তার ছেলে উঠে আসতে চাইছিল কিন্তু আমি ওনাদেরকে ইশারায় বললাম কাজটা সেরে নিতে। তারপর বাড়ির চারপাশটা একটু ঘুরে দেখলাম। বাড়ির পিছন দিকটায় গিয়ে দেখলাম যা সন্দেহ করেছিলাম তাই- রক্ত করবী ফুলের বাগান। শশধর বাবুর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আমি আর শান্তনু নিচের তলার গুদাম ঘরটায় গেলাম। কিছু প্রশ্নের সমাধান করতে পারলাম আর কিছু প্রশ্ন রয়ে গেল অমিমাংসীত অবস্থায়। হঠাৎ একটা বাক্সের কর্নারে সরূ সোনার চেন দেখতে পেলাম ঝুলন্ত অবস্থায়। ওপরে উঠে শ্রাদ্ধশান্তির কাজ হয়ে গেছে দেখে সবাইকে রিপোর্টটা বর্ননা করলাম। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি এবং অত্যাধিক বিষক্রিয়ার ফলে মৃত্যু ঘটেছে।
“আপনাদের মধ্যে ঘুমের ওষুধ কে খান ?”
শশধর বাবু উত্তর দিলেন “আমি, রোজ রাতেই আমাকে খেতে হয়। না হলে ঘুম আসেনা।”
“নামিতা দেবী, আপনি এই পাঁচ দিনের মধ্যে কবে দরজাটা খুলেছিলেন?”শান্তনু জিজ্ঞাসা করলো। আমি ওর ভুলটা ধরিয়ে দিয়ে বললাম,”অথবা বন্ধ করেছিলেন?”
উনি চমকে বলেন “আমি! আমিতো হাতই দেইনি এর মাঝে!”
“আপনার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে লকএ” “আচ্ছা, এই চেনটা কার বলুনতো?” বলে স্টোররুমে খুঁজে পাওয়া চেনটা দেখালাম।
নামিতা দেবী মাথা নিচু করে বললেন “আমার।”
জিজ্ঞাসা করলাম” আপনি কি জানতেন যে আপনার চেনটা হারিয়ে গেছে?”
উনি কিছু না বলে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
এবার রেগে বললাম “আপনাদের সেদিন এতবার করে জিজ্ঞেস করলাম যে কিছু হারিয়ে গেছে কী না ..আপনারা কোনো জবাব দিলেন না কেন?”
হঠাৎ সেদিনের মেয়েটি আহেলি দেবীকে বলল “মা, হিমু ভয় পাচ্ছে ওকে নিয়ে আমি ঘরে যেতে পারি?”
আহেলী দেবী আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে আমি রাগটা কোনো মতে সামলে নিয়ে চোখ বন্ধ করে বললাম” যাও”। মেয়েটা চলে যেতেই নমিতা দেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন,” কি করে বলতাম বলুন তো স্যার ,যে আমার স্বামী হার চুরি করেছে! আগেও একটা আংটি নিয়ে গেছে এইভাবে ,পরে সেটা আমি জানতে পেরেছিলাম।”
“সোনার গয়না গুলো নিয়ে কী করতেন আপনার স্বামী?” উত্তর এলো,”বেচে দিতেন!” “মানে!সরকারি চাকরি করেন অথচ টাকা পয়সার এত অভাব যে বৌ এর গয়না বিক্রি করতে হয়!”
“না হলে মদের নেশাটা পূরণ করবে কি করে? অখিল বাবু রেগে উত্তর দিলেন ।
নমিতা দেবীকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “আপনার কি রবিবার রাতে ওনার সাথে ঝগড়া হয়েছিল?”
উনি বললেন, ” না, সেদিন রাতে অদ্ভুতভাবে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
“সোমবার সকালে আপনারা কখন ঘুম থেকে উঠেছিলেন?”
কেউ কিছু বলছে না দেখে শশধর বাবু বলতে শুরু করলেন, “ আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন সবাই ন’টা নাগাদ ঘুম থেকে উঠেছিলেন৷ যেখানে প্রতিদিন ৬ টার মধ্যে বাড়ির মেয়েরা ঘুম থেকে উঠে পড়ে আর ছেলেরা আটটার দিকে ওঠে৷”
“আচ্ছা আপনাদের মধ্যে কে কে বাইক চালাতে পারেন?”
“আমি আর মামা পারি আর বাবাও চালাতে পারতো ” দ্বৈপায়ন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো।
“আমি আপনাদের ঘরগুলো আরও একবার সার্চ করতে চাই আর আমার পারমিশন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে বেরোবেন না।” এক তলার ঘরগুলো সার্চ করে শশধর বাবুর ঘুমের ওষুধের বোতলটা পাওয়া গেল। শৈলেন বাবুর ঘরের ভেতর আর তেমন কিছু লক্ষণীয় জিনিস পাওয়া গেল না। এরপর ওপরের ঘরে যেতে যেতে শান্তনু আমায় বলল” স্যার , আমার মনে হয় নমিতা দেবী… ৷”ওর কথা শেষ না হতেই আমরা চলে গেলাম সেই ছোট লাইব্রেরী ঘরটায়, দেখলাম হোমাগ্নির সাথে ওর ভাই বই পড়ছে৷ হিমানীশ কে ইশারা করতে ও ঘরের বাইরে চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই ভেতর থেকে আওয়াজ এলো,” হিমু, তোকে না বলেছি অচেনা লোক ডাকলে যেতে নেই।”
পরক্ষণেই আমাদের উ্দ্দেশ্যে বললো, “আপনারা ঘরে আসতে পারেন।”
হিমানীশ বলল, “পুলিশ কাকু পিসুর কি হয়েছে?”
“উফ্, সেই এক কথা! তুই যা তো মায়ের কাছে” হোমাগ্নি বিরক্তির স্বরে বলল ।
আমি বললাম” দাঁড়াও হিমানীশ ,তুমি পিসুকে মিস করছো খুব?”
“হ্যাঁ, খুব! পিসু আমাকে রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি এনে দেবে বলেছিল” শান্তনু ওকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,” আচ্ছা আমি তোমাকে এনে দেব রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি কেমন !
“স্যার,বাকি ঘরগুলো সার্চ করে নিচ্ছি।” “করো৷” ঘরটা আগের দিনের থেকে অনেকটা গোছানো। দেওয়ালে একটা ইংলিশ লেখা দেখে বাংলায় অনুবাদ করে বলতে লাগলাম ” আমরা কারো না কারো গল্পে খলনায়ক ..” কথাটা শেষ না হতেই এই ঘরের অন্য সদস্য বলল “…বা খলনায়িকা”। হঠাৎ তার এরকম কথায় বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “ তুমি গল্পের বই পড়তে খুব ভালোবাসো তাই না!” ভুরু দুটি কুঞ্চিত করে একটু অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বলল, “এটা কি আপনার তদন্তে লাগবে! আপনার প্রশ্নটা খুবই অযৌক্তিক।” এই মেয়েটার সামনে কেন জানি বারবার বোকা বোনে যাই! নিজের গাম্ভীর্যতা বজায় রেখেই বললাম, “সবকিছুই আপেক্ষিক; বাড়ি থেকে বেরোবে না যতক্ষণ না আমরা বলছি। মেয়েটা জবাব দিলো “অবশ্যই”।
“আচ্ছা,পিসেমশাই তোমাকে ভালবাসত?”
“ভীষন”
চলে যাওয়ার সময় টেবিলের ওপর রাখা বইটা দেখলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘রক্তকরবী’।
কয়েকজন পুলিশ ওই বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে আমরা থানায় ফিরে আসছিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খটকা লাগছিল। কিছু একটা জিনিস চোখের সামনে আছে অথচ আমি ধরতে পারছিনা।এদিকে শান্তনু আমাকে বলতে লাগল নমিতা দেবী ওনার নিজের স্বামীকে খুন করে সেটা চাপা দিতে চেয়েছে। কিন্তু যদি চাপাই দিতে চাইবেন তাহলে বাড়িতে কেন বডিটা রেখে দেবেন। শুধু গয়নার জন্য তার নিজের স্বামীকে খুন করাটা সম্ভব! দরজাটা সে পরেও খুলতে পারে। হঠাৎ হোমাগ্নির মুখটা ভেসে ওঠে এক ঝলকে ৷ ২২ বছরের জীবনে দেখা সবচেয়ে অদ্ভুত মেয়ে ,ওর চোখ , ওর কথা বলার ধরণ, ওর থুতনিতে তিল সবকিছু এক নিমেষে ভেসে ওঠে ,ওর বলা কথাগুলো “অথবা খলনায়িকা”, আর “ভীষন”কিছু একটা ব্যাপার ছিল শেষ শব্দটায়। ঠিক তখনই একটি ছোট্টো অথচ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের কথা মনে পড়তে ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি ঘোরাও, শশধর বাবুর বাড়ি যাবো । থানার এতটা কাছে এসে ফিরে যাওয়ায় শান্তনু অবাক হলো। ওকে কিছু বললাম না , গাড়ি নিয়ে গিয়ে থামল ওই বাড়ির সামনে। হঠাৎ ফিরে আসায় বাড়ির লোক অবাক হয়ে গেছে, কাউকে কিছু না বলে চলে গেলাম হোমাগ্নির ঘরে | ও তখনও পড়ছে টেবিলে। আমার আচমকা প্রবেশে প্রথমটায় একটু হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল খুব সহজে । ওর টেবিলের ওপর পুতুলের গলায় থাকা একটা চাবি সহ রিং হাতে নিয়ে বসে পড়লাম। আমার কাছে এখন এই ঘটনাপ্রবাহের সবকিছু স্পষ্ট৷ এই মেয়েটাকে তো আমি অন্য চোখে দেখেছিলাম৷ ওর সম্বন্ধে এই চরম সত্যিটা মেনে নিতে আমার কষ্ট হচ্ছিল, মাথা না তুলেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম “তুমি বাইক চালাতে পারো?”সে মাথা উঁচু করে জবাব দিল “হ্যাঁ”।আমার কান মাথা দিয়ে যেন আগুন ছুটতে লাগলো, ঘরের মধ্যে যে সবাই এসেছে এটা লক্ষ না করেই আমি তার দুই হাত শক্ত করে ধরে বললাম,” তুমি খুনটা করেছ! তুমি!” জবাব এল ” না আমি খুন করিনি৷ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, “যে মরতে চেয়েছিল তাকে মরতে সাহায্য করেছি শুধু।”চেয়ে দেখলাম নামের মতোই যেন হোমের আগুন জ্বলছে ওর চোখে। সেই আগুনের শিখায় বিদ্ধ হয়ে আমি আর ওর হাত ধরে থাকতে পারলাম না৷ সকলের সামনে চাবিসমেত রিংটা তুলে ধরতেই সবাই অকপটে স্বীকার করল যে এটা শৈলেন বিশ্বাসের বাইকের চাবি । ওর মা-বাবা ওর কাছে ছুটে এসে প্রচন্ড বিস্ময়ের সাথে ওকে বলল ,”এসব তুই কি বলছিস হোমি! এসব সত্যি ! ” এই প্রথম কোনো অপরাধীর জন্য বুকের ভিতর ভীষন একটা টানাপোড়েন অনুভব করলাম। হোমাগ্নি বিন্দুমাত্র অনুতাপ প্রকাশ না করে বলল,” তোমরা তো জানো আমি মিথ্যা বলিনা!” ঘরের মধ্যে প্রত্যেকেই যে অবাক হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ওর বাবা বলল, “কিন্তু কেন!”এবার নমিতা দেবী ওর কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলতে লাগল,”যে তোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো, নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতো, তাকেই তুই মেরে ফেললি! কিসের জন্য শুনি! একবারও বিবেকে বাঁধলো না!”
ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম কথাটা শোনার পর ওর মুখে একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটে উঠেছে ৷ চোখের জল বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে কিন্তু পারছেনা।
উনি আরো বলতে লাগলেন,” কীরে বল কেন?”দ্বৈপায়ন এসে বললো,”ছিঃ! হোমি ছিঃ! আমার বাবা তোকে বেশি ভালোবাসতো বলে আমার রাগ হতো বাবার ওপর; আর তুই কিনা তাকে মেরে ফেললি!”নমিতা দেবী পুনরায় গর্জে উঠে বললেন,” কীরে বল কেন! কেন মারলি পিসুকে?”
ও এবারে চিৎকার করে বললো,” তোমাদের এই তথাকথিত ভালোবাসার জন্য । কথাটা শেষ হওয়ার পরেই দেখলাম ওর চোখ থেকে আবিশ্রান্ত ধারার জল পড়তে লাগলো; কিন্তু এখনো পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ও। ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে আবার সে বলে উঠলো, “ভালোবাসা! কিসের ভালোবাসা পিসিমণি ! মা-বাবা, দাদা, দাদু …. তোমাদের কি কখনও কোনদিনও চোখে পড়েনি এই ভালোবাসাটা! কেন আমাকেই এত ভালবাসা সহ্য করতে হলো বলতে পারো! এটাকে যদি তোমরা ভালোবাসা বল তাহলে যৌন নির্যাতন , ধর্ষন.. এগুলো কী?”বলে মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল। যেন একটি মহীরুহ বৃক্ষ হঠাৎ দমকা হাওয়ায় ধীরে ধীরে নুইয়ে পড়ছে ৷ ওর এই কথাটি আমার বুকে অগ্নীবানের মতো বিঁধলো ৷ আহেলি দেবী আর অখিল বাবু ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,” এসব কি বলছিস মা!, কি করে হলো! আমাদের এতদিন কেন বলিসনি!” নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ওর মায়ের মুখটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে চরম হতাশা বুকে নিয়ে বললো, “তোমরা কেন বুঝতে পারোনি মা! তোমরা কি অন্ধ ছিলে? আজ থেকে তো নয়, সেই ক্লাস টু থেকেই । আমাকে তখন বোঝানো হয়েছিল আমি যদি কাউকে বলি তাহলে সবাই পিসুকে মেরে দেবে, সেই ভয়ে কাউকে বলতে পারিনি মা। আর এই না বলতে পারাটা দিনকে দিন আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে। তোমার মনে পড়ে মা.. আমি পিসুকে কতটা এড়িয়ে চলতে চাইতাম কিন্তু তোমরা বুঝতে পারতে না.. তোমরা আমাকে বারবার যেতে বাধ্য করতে আর একটাই কথা বলতে, এত ভালোবাসে তাও কেন আমি যেতে চাইনা… কারণটা কি তোমরা কখনও জানতে চেয়েছ! খোঁজার চেষ্টা করেছো! আমি না গেলে রাগ করবে ,রাগ করে থাকলে আমি গেলে কমে যাবে, না খেতে চাইলে আমি গিয়ে বললে খেয়ে নেবে …কেন এত ইমপরট্যান্ট ছিলাম আমি? শিবরাত্রির দিনগুলো মনে পড়ে! তোমরা পূজা দিতে যেতে আর সারারাত ধরে আমাকে নিয়ে খেলা হতো মা! খেলা! আমি নাকি মেয়ের মত! ওমন পিশাচের মেয়ের মতন হয়ে থাকাটাও যন্ত্রণার৷” ওর কথাগুলো আমার কানে তীরের মতো বিঁধছে , দেখলাম ওর সমন্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে, ওর চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে ও কতটা সত্যি কথা বলছে। নমিতা দেবী হিংস্রের মত ওর দিকে তেড়ে এসে বলতে লাগলো ,” মিথ্যে কথা , সব মিথ্যে, এত বড় মিথ্যে বলতে তোর লজ্জা করেনা! কি প্রমান আছে এসবের!” আমি আর শান্তনু ওনাকে আটকাতে গেলাম। হোমাগ্নি আবার বলতে শুরু করল,”মিথ্যে কথা! আমায় যে এতটা ভালোবাসে ..এত খেয়াল রাখে তার নামে মিথ্যে বলতে যাব কেন পিসিমনি! কি লাভ আমার! এই প্রমাণ দেখানোর ভয়ে আমি এতদিন কিছু বলতে পারিনি, কারণ আমার কাছে তোমাদের দেখানোর মতো প্রমাণ কিছুই নেই যে।” সম্মোহিতের মত সমস্ত পুরনো কথা আওড়াতে লাগলো ও।”তোমরা কোনদিনও দেখেছো, আমি কতবার কেঁদেছি ? আমি কতবার মরতে চেয়েছি ? তোমরা কোনদিনও দেখনি। প্রত্যেকটা দিন কেঁদেছি, প্রত্যেকটা দিন বলেছি ভগবান আমাকে মেরে ফেলো।আসলে ভগবানও খুব স্বার্থপর, জানতো! না হলে আমিও তো আগে ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম, আমাকে মারল না কেন? শারীরিক হোক বা মানসিক, নিজের কষ্টগুলো একান্ত নিজেরই হয় ৷ বাইরে থেকে কারও সাধ্য নেই সেই ক্ষতের গভীরতা মাপার ৷ প্রচুর মানুষের ভীড়ে আমরা নিতান্তই একা ৷ আসলে সম্পর্কগুলো ভিত্তিহীন৷ সবচেয়ে মজার কথা কি জানতো! আমাকে বলতো আর এক বছর বাঁচবে, আমিও কেমন পাগলের মত সেসব বিশ্বাস করে নিতাম ৷ ভাবতাম একটাই বছর তো; সবকিছু একটু কষ্ট করে সহ্য করেনিতাম ৷ কিন্তু দেখ বছরের পর বছর বেঁচে ছিল ৷ আর বছরের বছর আমায় এসব সহ্য করতে হয়েছে।এখন ভাবি আমি কতটা বুদ্ধিহীন ছিলাম। আমি এতটাই বোকা ছিলাম যে ভাবতেই পারিনি এই কথাগুলো যদি আমি থানায় বলি তাহলে ওই লোকটার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত। মেডিকেল টেস্ট করলে সব কিছু বোঝা যেত। একবার না বারবার আমি ধর্ষিতা ।”
শেষ কথাটা আমার হৃদকম্পন তিনগুণ বাড়িয়ে দিলো। ঘরের সবাই নির্বাক, সবার চোখে জল। কারোর সান্ত্বনা দেওয়ার মতো বাক্য সরছে না মুখ থেকে।
আহেলি দেবীর উদ্দেশ্যে বললো,”তুমি খেয়াল করে দেখেছ মা, আমি তোমায় সবসময় বলতাম পড়তে নিয়ে যেতে, তুমি তো আমাকে বলত যে ভাই আছে বলে আমায় নিয়ে যেতে পারবেনা ৷ পিসুর বাইকে যেন চলে যাই।এই বাইকে ঘুরতে যাওয়াটাই তো আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি কষ্টকর ছিল মা, আমাকে যে কতটা নোংরা কথার সম্মুখীন হতে হয়েছে তুমি কখনো ভাবতে পারবেনা,আমাকে ১৮ বছর হলে রেজিস্ট্রি করবে, আমাকে নিয়ে আরও কি কি করবে এ সব বলতো ৷ আমি পালাতে চাইতাম সমস্ত কিছু থেকে, কিন্তু আমি পারিনি ! আমি ব্যর্থ৷ পিসিমনির আর দাদার মুখটা ভেসে উঠতো বারবার, সমস্তটা শুনলে ওদের কি অবস্থা হবে !আমি চাইনি আমার জন্য পিসিমনির সংসার ভেঙ্গে যাক ।আমার সঙ্গে নাকি সংসার করবে!থুঃ।”চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলনলো,”আমি নোংরা হয়ে গেছি মা , ভীষন নোংরা! নিজেকে আয়নার সামনে দেখলে নিজেরই ঘেন্না লাগে ৷ যখন স্কুলে থাকতাম তখন সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম ৷ কেউ কোনদিনও বুঝতে পারবে না আমি কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটিয়েছি। শুধু ভগবানকে জিজ্ঞাসা করতাম, আমিই কেন? আমার জীবনে কেনো এত দুর্যোগ এল !এখানে তো আমার কোন হাত ছিল না! তারপর যখন মরতে গিয়েও মরতে পারলামনা ঠিক করলাম দেখব জীবন আমাকে আর কতটা যন্ত্রনা দেয়। আমার মত এত পৈশাচিক যন্ত্রণাময় জীবন আর যেন কোন মেয়ের না হয় । আজকাল আমি কোন ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারিনা , এমনকি আমার বাবাকেও না । ৫ দিন আগে যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা বহু বছর আগে ঘটা উচিত ছিল ৷ তাহলে আমার ছোটবেলাটা এইভাবে নষ্ট হতো না মা।”
প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমার সামনে যদি ঐ লোকটাকে পেতাম, আমি নিজ হাতে খুন করতাম। হোমাগ্নির দিকে আমি তাকাতে পারছিলাম না।কিছুক্ষণ পর যখন ও একটু শান্ত হলো শান্তনু জিজ্ঞাসা করল, “রবিবার রাতে কি হয়েছিল? এমন একটা ঘটনা ঘটলো বাড়ির কেউ জানতে পারল না!”হোমাগ্নি আবার সেই বিদ্রুপাত্মক হাসি দিয়ে বলতে শুরু করল,”জানতে পারবে কি করে? ঐদিন তো সবকিছুই আগে থেকে ঠিক করা ছিল ৷ সবার খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছিল ৷ ওই লোকটা যা ভাবতো তাই করতো।আমি সাধারণত দেরি করে ভাত খেতাম আর সেই দিন সন্ধ্যাবেলা আমাকে অনেক উল্টোপাল্টা কথা বলাতে আমার ভাত খেতে ইচ্ছা করছিল না। বাধ সাধল ঐ মিস্ত্রিকাকুরা, ওরা সেদিন বাড়িতে ভাত খেলো না। রাত একটার দিকে জল আনতে আমি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি হঠাৎ কে একটা আমায় টেনে নিয়ে গেল নিচের ঘরে , ঘরের আলোতে দেখলাম ওটা পিসু। আমারতো বুকের ভেতর হঠাৎ প্রচন্ড ব্যাথা করে উঠলো। তারপর কি অকথ্য ভাষায় কথা বলতে লাগল আমার সাথে। সবার খাবারে ঘুমের ওষুধের মিশিয়েছে ৷ কেউ কিছু করতে পারবে না আজ । মিস্ত্রি কাকুদের অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দিয়ে বলল, ওরা খাইনি তাই ওদের ওপরের ঘরে তালা দিয়ে এসেছে । আজ আর আমায় কেউ বাঁচাতে পারবে না। আবার হবে সেই পৈশাচিক নাট্যলীলা।মিস্ত্রিকাকুদের সাথে ঝামেলা নিয়েও আমাকে বলতে লাগলো যে, আমার বাড়ির লোক নাকি ওনাকে কেউ সহ্য করতে পারে না ! উনি নাকি পিসিমনিকে বিয়ে করেছিলেন শুধুমাত্র আশ্রয়ের জন্য! উনাকে নাকি কোনদিনও সুখী করতে পারেনি পিসিমনি! উনি শুধু আমাকেই ভালোবাসতেন। আরো অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলে আমাকে পিসিমনির সোনার হার টা পরিয়ে দিতে এগিয়ে এলেন।আমি তাকে ঠেলে দিয়ে চিৎকার করে বললাম, আমি তোমাকে ভালবাসি না তুমি বুঝতে পারো না! আমি তোমাকে ঘৃণা করি, আমি তোমার কন্যাসম, আমার সাথে এরকম ব্যবহার করতে খারাপ লাগেনা । সে রেগে গিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমি আমার সাথে এরকম করবে তো আমি আর এ জীবন রাখব না, বলে সে একটা কালো কাঁচের শিশি বার করে সেটা থেকে কিছু একটা খেতে শুরু করলো। এ নাটক আমার দেখা আর শিশিটাও আমার অনেক চেনা। আগেও এরকম নাটক অনেকবার দেখেছি আর বাধাও দিয়েছি ৷ কিন্তু আজ আমার সমস্ত ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে | তাই নির্বাক দর্শকের মত নাটকটা দেখতে দেখতে উপরে উঠে আসছিলাম, দেখলাম সেও আমার পিছু পিছু আসছে, আমি আর সহ্য করতে না পেরে জোরে ধাক্কা মেরে উপরে উঠে এলাম। দেখলাম ওনার মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে আমার চোখের সামনেই তিলে তিলে ছটফট করতে করতে মরে গেলো পিশাচটা । অনেক ডাকার পর পিসিমণি উঠেছিল কিন্তু ঘুমের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারছিল না, আমার কথা না বুঝেই নিচের ঘরের দরজাটা আটকে আবার ঘুমাতে চলে গেল। তারপর বাইকটা নিয়ে চলে গেলাম জীবনের প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে। এতদিন পর বুঝতে পারলাম খাঁচায় বন্দি পাখি মুক্ত আকাশের সন্ধান পেলে বোধহয় এমন করেই উন্মত্তের মতো হারিয়ে যেতে চায় ৷ যাই হোক তেল শেষ হয়ে যাওয়াতে বাইকটা ওখানে রেখে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হল। তারপর বাড়ির মেন সুইস অফ করে মিস্ত্রি কাকুদের দরজা খুলে দিয়েছিলাম। সেদিন খুব শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিলাম আমি। ১০ বছরের কারাগার থেকে যেন মুক্ত হয়েছিলাম সেদিন।”আমার দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বললো, “আমি উনাকে ধাক্কা মেরেছি সুতরাং আমি অপরাধী, আপনারা আমায় শাস্তি দিতেন পারেন ।”
ও সব কথা শেষ করে নমিতা দেবীকে একটা সোনার আংটি দিল আর বলল ,”এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা পিসিমণি!”নমিতা দেবী কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলো ওকে।
ঘন্টা খানেক পরে ন’টার দিকে আমি হোমাগ্নির সাথে আলাদা করে কথা বললাম। বুঝতে পারছিলাম ওর মনটা বড্ড এলোমেলো ছিল, তাও কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করারই ছিল। অন্য অপরাধীদের সাথে ওকে কিছুতেই একই সূত্রে মেলাতে পারছিলাম না ৷ তাই প্রথমে কি কথা বলে শুরু করব সেটা বুঝতে না পেরে বললাম “ঠিক আছো এখন?”ও বলল ,”আপনি কি অদ্ভুত প্রশ্ন করেন সব সময়!” মৃদু হেসে বললো,” কোথায় আমাকে অ্যারেস্ট করবেন, দশ পাঁচটা পুলিশ নিয়ে এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবেন তা না.. আমি ঠিক আছি কিনা জিজ্ঞেস করছেন!”আমি বললাম, “আমার মনে হয় না তোমার এই শাস্তিটা হবে , self protection টা সবার আগে , বুঝলে! তো যাই হোক আমি যেটা বলছিলাম , তুমি তো চাইলে সবকিছুর বাইরে থাকতে পারতে, তোমার বিরুদ্ধে তো কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি | বাইকের চাবিটা অন্য কোথাও রাখতে পারতে বা রাস্তায় ফেলেও দিতে পারতে, তাহলে তো কিছুই মিলাতে পারতাম না এত তাড়াতাড়ি।” ও আবার হেসে বলল,”আপনি তো অনেক দেরি করে ফেলেছেন আমিতো চেয়েছিলাম প্রথম দিনে আপনি আমাকে ধরে ফেলুন। অপরাধ যখন করেছি শাস্তিকে ভয় পাইনা।” মেয়েটাকে যতই দেখছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। ও আবার হাসতে হাসতে বলে উঠলো,”এত দেরি করলে কিন্তু অপরাধী পালাবে, স্যার ৷” ওর ওই শিশু সুলভ হাসির সৌন্দর্য্যে আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম মেয়েটা কতটা দৃঢ়মনষ্কতা সম্পন্ন। আমি বললাম,”ও কে. বাই, টেক কেয়ার আশা করি আমাদের আর কোনো দিনও দেখা হবে না।” মুখে তো বললাম ঠিকই কিন্ত মনে মনে খুব চাইছিলাম ওর সাথে যেন আমায় রোজ দেখা হয়। ও বললো ,”আপনি খুব কম ভাবেন জানেন তো ,ভাবুন ভাবুন ,ভাবা প্র্যাকটিস করুন ,আমাদের খুব শিগগিরই আরও একবার দেখা হবে, মিস্টার ধ্রূবীশ সোম।”

       শৈলেন বিশ্বাসের কেসটা ক্লোজ হয়ে গেছিল। ওদের বাড়ির লোক আর কেসটা চালাতে চাইনি। সমস্ত প্রমানের সাপেক্ষে শৈলেন বাবুর কেসটা আত্মহত্যার ভিত্তি গড়ে। খবরের কাগজে লেখা হয়েছিল পারিবারিক মনোমালিন্যে আত্মহত্যার চেষ্টা । হোমাগ্নি কে এসবের মাঝে জড়ানো হয়নি। আসলে ব্যক্তিগতভাবে আমিও ব্যাপারটা চাইনি। সেদিন রাতে সুশান্ত আর আমি বাড়িতে ছিলাম ৷ সুশান্ত আমাকে বলেছিল,"মেয়েটা সত্যি অদ্ভুত .. সাহসী ও বটে। আমি লোকটাকে হাতে  পেলে তো এনকাউন্টার করে দিতাম।"আমি সেদিন মনে মনে বলেছিলাম, আমি হলে তো পুরোনো cheado d'if -এ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতাম ৷ আমি খুব খুশি হয়েছি লোকটার এমন পরিণতি দেখে। আরো বেশী খুশী হতাম যদি হোমাগ্নি শৈলেন বিশ্বাসকে নিজের হাতে মারতো, তাহলেই ওর প্রতি হওয়া অন্যায়টার যোগ্য শাস্তি হত, আমি আইনের রক্ষক হয়ে বলছি। শান্তনু বললো ,"প্রতি বছর মোট নারী নির্যাতনের প্রায় ত্রিশ শতাংশ শিশু এবং কন্যা প্রতিনিয়ত শারীরিক এবং মানসিক ভাবো নিগ্রীহিত হয় নিজেদের পরিবার থেকেই ৷ বিচার ব্যবস্থা এত কঠোর হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে যৌন নিগ্রহ,  শ্লিলতাহানীর পরিসংখ্যান হ্রাস পাচ্ছে না৷ আজও আমাদের দেশের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো বয়সের মেয়েরা সামাজিক দৃষ্টিতে ততটা নিরাপদ নয়৷ যতই আমরা সভ্য সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করিনা কেনো আমরা আদতে রয়েছি মলিন অসভ্যতার অতল গহ্বরে। এ বিষয়ে আমাদের আরো সতর্কতা বাড়ানো প্রয়োজন । সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের মনে মৃত মনুষত্বের  পুনর্জন্ম দেওয়া। যাইহোক, এটা কিন্তু মানতেই হবে স্যার , হোমগ্নি সত্যি খুব সাহসী ।" আমিও সেটাই ভাবছিলাম অনেক্ষণ থেকে, কিন্তু শান্তনুকে আর বললাম না।   শেষের দিকে হোমাগ্নির বলা কথাগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবাচ্ছিল ৷সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি৷ ওর প্রত্যেকটা কথা আমার চোখের সামনে পুরো রিপিট টেলিকাস্টের মতো ভেসে আসছিল । আর সত্যিই তিনদিন পরে ওর সাথে আমার আবার দেখা করতে হলো৷ তবে ওর বাড়িতে নয়, ওর স্কুলের সামনে। ও হাসতে হাসতে বললো," কি মিললো আমার কথা?" ওর ওই সুন্দর নিষ্পাপ হাসিতে আমি কিছু সময়ের জন্য মোহিত হয়ে গেলাম৷ ওই মুহূর্তটির জন্য আমি আর কোনো কিছুই ভাবতে পারছিলাম না ৷ ও আবার বললো,"এতদিন পর তাহলে আপনি সমস্ত রহস্যের সূত্র জুড়ে ফেলতে পেরেছেন দেখছি!” কথাটি বলেই ও আবার ভেসে গেল সেই মনমোহিত হাসিতে, যার বানে আমি বারে বারে বিদ্ধ হই৷ পরক্ষণেই বলল,  “ কিন্তু আজ আপনার সহকর্মীরা কোথায়? আর সবচেয়ে বড় কথা আপনি যে সিম্পিল ড্রেসে ...কেন?" আমি বললাম,"শৈলেন বাবুর ওরকম নাটক অনেকবার হয়নি, ওইদিনই প্রথম হয়েছিল তাই তো.. ! অন্যদিন সেগুলোতে ঘুমের ওষুধ থাকতো কিন্তু ওই দিন ছিল ‘Nerium indicum’ মানে রক্তকরবী৷ দুটো ঘুমের ওষুধের শিশি ছিল৷ একটা থাকতো শশধর বাবুর কাছে আর একটা শৈলেন বাবুর কাছে, যেটা নিয়ে বারবার তোমাকে ভয় দেখানো হত ৷ কিন্তু ঐদিন শৈলেন বাবুর ঘুমের ওষুধের শিশি থেকে সবাইকে ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়নি ...হয়েছিল শশধর বাবুর ঘুমের ওষুধের বোতল থেকে ৷ আর শৈলেন বাবুর ঘুমের ওষুধে মেশানো হয়েছিল রক্তকরবী।" ও মৃদু হেসে বললো, "ওয়েল ডান" , দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো," আমি আর পারছিলাম না রোজ রোজ একই নাটক ...  নাটকে বাধা দিয়েও কোনো ফল না পাওয়া, তারপর সেই নাটকে নিজেকে সামিল করতে  একপ্রকার বাধ্য হওয়া.. ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম৷ তাই ভাবলাম নাটকটা একেবারে শেষ করে দেই৷ হ্যাঁ আমি রক্তকরবী মিশিয়েছিলাম আর তাতেই তার মৃত্যু হয় ৷ সবকিছুই করেছিলাম এমন ভাবে যাতে আমার কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে...এই বুদ্ধিটা আমাকে সে নিজেই দিয়েছিল ৷ বারবার আমাকে বলতো রক্তকরবী  বিষাক্ত জিনিস, ওটা খেলে সে আর বাঁচবে না ৷   আমি ভাবতাম সত্যিই ওসব যদি খেয়ে ফেলে তখন কি হবে ৷ খেত না, শুধু নাটক করতো। আসলে কি বলুন তো আমি খুব বোকা, সবাইকে খুব সহজে বিশ্বাস করেনি ।" কিছু সময়ের জন্য আমরা দুজনই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম ৷ আমার শব্দ ভান্ডারে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পেলাম না ৷ এরকম জীবন কাহিনীর নিকট সান্ত্বনা নামক কোনো শব্দ না থাকাই শ্রেয়৷ নির্লিপ্ত স্বরে ও আবার বলল,"নিন এবার আমায় অ্যারেস্ট্ করুন ৷ আমার কোন দ্বিধা নেই কোন কিছুতেই" বলেই নিজের হাত দুটি বাড়িয়ে দিল আমার সামনে। ওর মৃদু কম্পিত হাত দুটি সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বললাম, "শৈলেন বাবুর কেসটা ক্লোজ হয়ে গেছে ৷ ওই কেসের অপরাধীকে আজ আমি ধরতে আসিনি বলেই এভাবে তোমার সাথে দেখা করলাম।" ক্ষনিকের জন্য চোখের পাতা দুটি বন্ধ করে, জীবন যুদ্ধে সহস্র প্রতিকূলতা  অতিক্রম করে বিজয়ের মুহূর্ত উপভোগ করার পর  দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। আমার মনে হল প্রতিটি মুহূর্তে ওর প্রতিটি নিঃশ্বাসকে আলিঙ্গন করে পরবর্তী জীবনের কাহিনী রচনা করি৷ অতি সন্তর্পণে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,"যে অপরাধের শাস্তি দেওয়ার কেউ থাকেনা   হোমাগ্নি, সেটা পাপ হতে পারে কিন্তু অপরাধ নয় ৷ " ও হাসতে হাসতে বললো,"বাব্বা! আবার রক্তকরবী!"আমি খুব মৃদু স্বরে হেসে বললাম, "তবে তুমি কিন্তু অন্য একটা কেসের খুব বড় অপরাধী, আজ ছেড়ে দিলেও খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে অবশ্যই অ্যারেস্ট করা হবে।" কথাটা বলে ফিরে যেতে যেতে দেখলাম ও হতভম্বের মত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ৷ বিকালের পড়ন্ত বেলায় সূর্যাস্তের ক্ষনিক লাল আলো প্রতিফলিত হয়ে ওর রক্তিম মুখমন্ডলকে আরও বর্ণময়  করে তুলেছে৷ নিজের মনে বললাম, “ ওর অবাক দৃষ্টিটাও কত সুন্দর তাই না!"
স্মৃতিকণা সরকার,ছাত্রী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post