• August 18, 2022

লাল পিঁপড়েদের আস্তাবল,দ্বিতীয় পর্ব

 লাল পিঁপড়েদের আস্তাবল,দ্বিতীয় পর্ব

শুভ নাথ-এর ধারাবাহিক উপন্যাস লাল পিঁপড়েদের আস্তাবল,দ্বিতীয় পর্ব

“আঁচলের মিল ঠোঁটে তিল
ত্বকরেখা মেরুর আকাশে
পেলব কুয়াশা খুঁজে খুঁজে
এখনো তিমিরা ফিরে আসে।”

-নবারুণ ভট্টাচার্য
তিলপাহাড়ির চেনা জল-হাওয়া এখন ঝিনুককে অনেকটা সুস্থ করে তুলেছে। গ্রামের মেটে রঙের দেওয়ালগুলিতে এখন ঝিনুকের আঁকা ছবি দেখা যায়। যাকে শহুরে ভাষায় বলে আদিবাসী দেওয়াল চিত্র। মন ভালো না থাকলে ঝিনুক খড়ি মাটির সাথে বচ ফলের আঠা মিশিয়ে, কিংবা এলে মাটি বা পোড়া খড়ের ছাই আবার কখনো কখনো বাজারি রঙ দিয়ে দেওয়ালগুলিকে ভরিয়ে তোলে। ফাঁকা সময়ে শালপাতা বোনে। নিম কাঠি কিংবা মহুয়া কুড়োতে যায়। বাড়ির টুকটাক কাজ করে। মাঝে মাঝে বাবা মা এর সাথে মাঠের কাজেও যায়। তবে এখানে সে লোকের জমিতে কাজ করতে যায় না।
আজ দুবছর ধরে সে নিজেকে নিমমহলি থেকে সরিয়ে রেখেছে। মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নের মত সেই পৈশাচিক রাতটা তাকে তাড়া করে। তবে মাঝে মাঝে তপনের সাথে সুখের স্মৃতিগুলোও ক্ষততে প্রলেপ বুলিয়ে দিয়ে যায়। তবে এই সময়টা ধরে ঝিনুক একেবারে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। এখন সে কোন উৎসবে প্রাণ খুলে যায় না। মেলাতেও যায় না। ভয় হয় তাঁর। যদি নিমমহলির কোন মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়। এমনটা নয় যে নিমমহলি থেকে কোন মানুষ তিলপাহাড়িতে আসে না। অনেকেরই যাওয়া আসা আছে।কিন্তু ঝিনুক তাঁদের কারোর সাথেই কথা বলে না। তাঁর রাগ হয়। একমাত্র লখিন্দর মাঝে মাঝে যখন এই গ্রামে আসে, ঝিনুক একমাত্র তাঁর সাথেই কথা বলে, একটু গল্পগুজব করে। এখানে লখিন্দরের আত্মীয় আছে। মাসির বাড়ি। লখিন্দর এলে তাঁকে ঝিনুক তাঁর শাশুড়ি ও তপনের কথা জিজ্ঞেস করে। লখিন্দর শাশুড়ির সম্পর্কে জানালেও তপনের সম্পর্কে খুব একটা কিছু বলতে পারে না। কারণ সে নিজেও জানে না তপন কোথায় আছে আর কবে ছাড়া পাবে।
তপনের আজ জেলে যাওয়ার প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি হতে চললো। এখনো জেল থেকে ছাড়া পায়নি। কবে পাবে সে নিয়েও নিমমহলির কেউ একটা খুব কিছু জানে না। তবে শেষবার তপন যখন মেদিনীপুরের এক জেলে ছিল, এক ভদ্রলোক এসে তপনের মা’কে নিয়ে গেছিলো তপনের সাথে দেখা করাতে। তবে সেটাও বছর খানেক আগে। তারপর আর কেউই আসে না। একটা ফোন নাম্বার দিয়েছিলো সেই ভদ্রলোক। সেই নাম্বারেও তপনের মা কাউকে দিয়ে ফোন করালে উল্টো দিক থেকে একটাই কথা বলে ‘চিন্তা করবেন না কমরেড তপন খুব তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়ে যাবে। খুব বড় উকিল লড়ছে ওর কেস। একদম চিন্তা করবেন না’। চিন্তা করতে বারণ করলেই কি চিন্তা করা বন্ধ হয়ে যায়। মায়ের চোখ জলে ভাসে। রাতের পর রাত ছেলের চিন্তায় ঘুম হয় না। আর অন্যদিকে সংসারে অনটন। তপনের বাপটাও মাতাল। একমাত্র মায়ের গতরে সংসার চলছে।
দেশদ্রোহিতার আইন যে কি আইন তা বুঝবার ক্ষমতা না আছে তপনের মা-বাপের, না আছে ঝিনুকের, না আছে নিমমহলির কারোরই। এই আইনে একবার জেলে ঢুললে যে এত সহজে ছাড়া পাওয়া যায় না তা এদের কেউই জানে না। আর সাঁওতাল-আদিবাসী হলে তো আর কথাই নেই। একটা জীবনও কম পড়বে জেল থেকে বেরোতে। এরা তো এই দেশের নিয়ম কানুন বলতে বোঝে সালিশি সভাকে আর লাল পিঁপড়েদের কানুন।
মহুয়া ফুলের গন্ধে ভরে উঠেছে নিমমহলির বাতাস। সহরাই এর ঘ্রাণ এখনো মাটিতে। এক আকাশ অন্ধকার। কুল গাছ ঘিরে চিকচিক করছে জোনাকিরা। ঘাসের মাঝে শুরু হয়ে গেছে ঝিঁঝিঁ পোকাদের অপেরা। একটা শুয়োর ঘ্যার ঘ্যার করতে করতে চলে গেল। দাঁড়িয়ে পড়লো ঝিনুক। চারিদিকে ভালো করে দেখে নিলো সে। অন্ধকার চিঁরে দেখার কৌশল যে সে শিখে ফেলেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। গুঁটি গুঁটি পায়ে সে তাঁর গন্তব্যে পৌঁছল। গিয়ে দেখে ততক্ষণে সকলেই পৌঁছে গেছে। মাটির বাড়ির এক কোনে গিয়ে ঝিনুক বসে পড়ে। এখানে ছাত্রছাত্রী বলতে মোট বারো জন। আর আজ নতুন একজন এসেছে তাকে নিয়ে তেরো। এই স্কুলে অনেকে আসতে চায় না সন্ধ্যায় বলে। সারাদিন কাজকর্মের পরে কে আর আসবে! সকলের শরীরই তখন বিশ্রাম খোঁজে। কিন্তু বিমল মাস্টারেরও সময় নেই এই সন্ধ্যাটুকু ছাড়া।
ঝিনুক ঢোকার পরে মাস্টার তাকে জিজ্ঞেস করে দেরি হল কেন, ঝিনুক মাথা নিচু করে বসে। মাস্টার ঝিনুকের এই স্বভাবের সাথে পূর্ব পরিচিত। সে জানে ঝিনুকের কি হয়েছে। তাই সে দেরি না করে আজকের নতুন ছাত্রী অনুরাধার সাথে ঝিনুকের পরিচয় করিয়ে দেয়। ঝিনুক ও অনুরাধা দুজনেই সৌজন্য সাক্ষাৎ সেই মুহূর্তে সেরে নেয়। মাস্টার আবার শুরু করে পড়াতে। সেই সন্ধ্যায় বিমল মাস্টার কথা বলেছিল রাশিয়ার বিপ্লবী ভ্লাদিমির লেনিন সম্পর্কে। দিনটা ছিল কমরেড লেনিনের জন্মদিন।
অনুরাধা ঝিনুকের থেকে বয়সে ছোট। বাড়ি ঝাড়খণ্ডের রাজপুর নামের প্রত্যন্ত গ্রামে।জেলা জামতাড়া। প্রতিনিয়ত অভাবের তাড়নায় ধুঁকতে থাকা অনুরাধার পরিবার। একদিন এক ঘটক অনুরাধার জন্য বিয়ের খবর নিয়ে আসে। ঘটক জানায় পাত্র রাজস্থানের জয়পুর শহরে থাকে। সেখানে বিশাল ব্যাবসা। বয়সে একটু বড়। সেদিকে পাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না বলে এদিকে খোঁজ করছে। তবে পাত্রী পেলে নিজেরা টাকা দিয়ে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। রাজরানী করে রাখবে সেখানে। টাকার কথা শুনে অনুরাধার বাবা-মা পারলে তো সেই দিনেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেয়। পরে ঘটক আর একদিন এসে অনুরাধার বাবা-মায়ের হাতে নগদ তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে যায়। সে তো অনুরাধার বাবা মায়ের খুশি ধরে না। এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ের দিন ঠিক হয়।
বাবা মা এর কাছে বোঝা হয়ে উঠেছিলো অনুরাধা। তাই বাবা-মা ভেবেছিলো মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে ঘাড়ের বোঝা নামবে সাথে মেয়েটাও খেয়ে পরে একটু সুখে থাকবে, সংসার করবে। পাত্রের বয়সের কথা চিন্তা না করেই বিয়ে দিয়ে দেয়। সাতেরোর অনুরাধাও বড় শহর, বড়লোক পরিবার ও সুখের স্বপ্ন ভেবে বিয়েতে একবারও না করেনি।
এক সপ্তাহের মধ্যে ছেলের বাড়ি থেকে পাত্র সহ পাঁচ জন এসে বিয়ে করে নিয়ে যায় অনুরাধাকে। পাঁচজন বরযাত্রী আসতে দেখে গ্রামের অনেকে অবাক হয়েছিলো। কিন্তু অনুরাধা ও তাঁর বাবা-মা ছিল খুশিতেই। রাজস্থানের মাটিতে পা রাখা মাত্র ভুল ভেঙে যায় অনুরাধার। ট্রেন থেকে নেমে চারজন শ্বশুরবাড়ির লোকের সাথে দুপাশের ইমারতে মোড়া শহর ছাড়িয়ে যখন তাদের গাড়ি ছুটে যায় গ্রামের মুখে অনুরাধার ভয় হয়। কারণ ঘটক বলেছিল পাত্রের বাড়ি শহরেই। ধীরে ধীরে অনুরাধার বাচ্চা বয়সে দেখা কাঁচের মত স্বপ্নগুলো ভেঙে চুরমার হতে থাকে। সেখানে রাজস্থানি বরের পরিবার রোজ অনুরাধার উপর চালাতে অকথ্য শারীরিক অত্যাচার, মারধোর ও ধর্ষণ। এমনকি যে ছেলেটি বিয়ে করে নিয়ে গেছিলো তাঁর পরিবারের তিনজন পুরুষই রাত্রে অনুরাধাকে নিয়ে যেত নিজেদের বিছানায়। বারবার মরতে চেয়েও সে মরতে পারেনি। শুধু মরার আগে সে একবার দেখতে ছেয়েছিল তাঁর গ্রামটাকে।
তিন বছর পরে অনুরাধার বাচ্চা হলো। সেই প্রথম এক আশ্চর্য প্রদীপের মত একদিন অনুরাধার কাছে এসে হাজির হল এক বিহন্নলা, যদিও সে এসেছিলো বাচ্চা নাচাতে। কিন্তু অনুরাধার শরীরে অজস্র ক্ষত চিহ্ন দেখে সেই বিহন্নলা বুঝতে পেরেছিল যে কি পরিমাণ অত্যাচার হয় অনুরাধার উপরে। কারণ সে এই অঞ্চলে মেয়েদের উপরে কি অত্যাচার হয়ে জানে। পরে গোপনে সেই বিহন্নলাই যোগাযোগ করে অনুরাধার সাথে। শোনে অনুরাধার দীর্ঘ যাত্রাপথের কথা। শেষে সেই বিহন্নলার মদতেই একদিন নিজের সদ্যজাত ছেলেকে রাজস্থানের ওই বাড়িতে রেখেই প্রাণে বেঁচে ফেরে অনুরাধা। প্রথমে সেই বিহন্নলার সাথেই সে গিয়ে ওঠে দিল্লীতে। সেই মানুষটি টাকে এক বস্তিতে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। ও কিছুদিনের মধ্যে এক দোকানে কাজ খুঁজে দেয়। সেই দোকানের মালিক অনুরাধার উপর জ্বালাতন শুরু করলে সেই কাজ অনুরাধা ছেড়ে দেয়। পরে সেই বিহন্নলা সি.আর পার্কের কাছে অনুরাধাকে এক বাঙালি বাড়িতে পরিচায়িকার কাজ খুঁজে দেয়। ধীরে ধীরে অনুরাধার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে সেই পরিবারের। সেই পরিবারের কাছে থেকেই অনুরাধা বাংলা ভাষাটা বলতে-বুঝতে শেখে। বছর খানেক পরে সেই বাঙালি পরিবারের মদতেই আবার গ্রামে ফেরে অনুরাধা। বাবা-মা ততদিনে গত হয়েছে। দাদা মেনে নেয়নি। তারপর গোটা গ্রাম তাকে গ্রামে রাখতে চায়নি। ততদিনে রাজস্থানের ক্ষত অনুরাধার মন থেকে কিছুটা মুছে গেলেও গ্রামের লোক, পরিবারের লোকের দেওয়া ক্ষততে দগ্ধ তাঁর মন। ভেবেছিলো বাংলি পরিবারটির সাথে যোগাযোগ করে আবার দিল্লী গিয়ে থাকবে। কাজ করবে আর খাবে। কিন্তু তা হলো না। অনুরাধার পিসি তাকে নিয়ে গেলো তাঁর বাড়িতে। পিসির বাড়ি নিমমহলির কাছেই। গ্রামের নাম তিলকাডাঙ্গা। সেই গ্রামেই পিসির সাথে থাকতে শুরু করে অনুরাধা। মাঝে মাঝে তাঁর রাজস্থানে ফেলে আসা ছেলের কথা মনে পরে চোখে জল আসে। কিন্তু নিজেকে সে সামলে নেই ও ভাবে নিজের সন্তানকে বলিদান দিয়েই হয়তো সে সেই নরক থেকে বেড়িয়ে আসতে পেরেছে। না দিলে হয়তো তাকে সেই নরকেই মরতে হত।
তিলকাডাঙ্গার মানুষজনদের সাথে ধীরে ধীরে মিলেমিশে যেতে থাকে অনুরাধা। সেখানেই একদিন তাঁর পরিচয় হয়ে যায় দীপার সাথে। দীপা এই গ্রামেরই। ধীরে ধীরে সম্পর্ক বাড়তে থাকে। একসাথে গল্পগুজব আড্ডা, মেলা-খেলা। ভাগ করে নিতে থাকে একে অপরের সুখ দুঃখ। ধীরে ধীরে দীপা অনুরাধাকে বোঝাতে থাকে বিমল মাস্টারের কাছে কত কিছু সেখা যায়-জানা যায়। অনুরাধা শুনতে থাকে আর অবাক হতে থাকে। কারণ সে তো দিল্লীর বাঙালি পরিবারের কাছে এইভাবেই বাংলা বলা শিখেছিল। আর সেই পরিবারে মাঝে মাঝে কত লোকজন আসতো। কত কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে তারা কথা বলত। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারতো না। তাই সে বার বার দীপাকে বলে তাকে বিমল মাস্টারের কাছে নিয়ে যেতে। বহুদিন ধরে কথা বলার পরে আজ দীপা অনুরাধাকে নিয়ে এসেছে বিমল মাষ্টারের কাছে। এখন অনুরাধা দীপার কাছেই থাকে বেশিরভাগ সময়। ধীরে ধীরে শিখে ফেলছে সাঁওতাল সমাজের ভাবধারা ও কর্মঠ জীবনের অভ্যাস। একটু একটু করে শিখছে সাঁওতালি ভাষা বলতে ও অলচিকি হরফ লিখতে। যদিও অনুরাধার তিলকাডাঙ্গা এসে এই ভাষা ও ভাবধারা শেখাতে বেশ প্রশ্রয় রয়েছে পিসির।
খুব তাড়াতাড়ি ঝিনুকের সাথে অনুরাধার সম্পর্ক গভীর হয়ে উঠছিল। তাঁর অবশ্য কারণ ছিল। অনুরাধা ঝিনুককে শোনাত তাঁর জীবনের কথা। রাজস্থানের কথা, দিল্লীর কথা। যার বেশির ভাগটা ছিল ঝিনুকের কাছে অজানা ও আশ্চর্যের। ঝিনুক তবে তাঁর জীবন সম্পর্কে যদিও খুব একটা কিছু বলতো না অনুরাধাকে। কারণ ঝিনুকের লক্ষ্য ছিল স্থির। আর সে মনে করতো সেই লক্ষে পৌঁছান পর্যন্ত তাঁর নিজেকে যাবতীয় পিছুটান থেকে দূরে সরিয়ে রাখা দরকার।
ঝিনুক আপন মনে একটা দেওয়ালে ছবি এঁকে চলেছে। একপাশে কতগুলো গরু। তার পাশে রাখাল। একটা গাছ ও গাছের নীচে অনেকগুলো পাথর আর পাথরের ফাঁকফোঁকর থেকে বেরিয়েছে ঘাস। একবারে একটা সাদামাটা ছবি। পাশেই রাখা রঙের কৌটো। রঙ বলতে বাজার থেকে কেনা কিছু রঙ ও পোড়া খড়ের ছাই, এলে মাটি এইসব। তুলি দুটো। বাকি তুলির কাজ হয়ে যায় কাপড় ছেঁড়া কিংবা পাখির পালক দিয়ে। ঝিনুকযে ছবিটা যে শুধুমাত্র নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে আঁকে না তা খুব ভালভাবে বোঝা যায় ছবির ভাষায়। গ্রামের দেওয়াল জুড়ে আঁকা তার বহু ছবি রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক ছবির সামঞ্জস্য হচ্ছে একটা রাখাল। ওই রাখল ছাড়া তার কোন ছবিতেই মানুষের আর কোন অবয়ব নেয়।
বসন্তের এই সময়টায় ভোর থেকে শুরু হয় জঙ্গল লাগোয়া গ্রামে গ্রামে ব্যাস্ততা। সারা বছরের কিছুটা উপার্জন তাঁরা এই সময়টায় করে থাকে। গাছে গাছে মহুয়া ফোটে। রাতে মহুয়া ফুটে ঝরে যায়। সেই মহুয়া কুড়োতে গেলে ভোররাত থেকে জঙ্গলে যেতে হয়। পাহাড়া দিতে হয় গাছ। যে আগে গিয়ে গাছ পাহাড়া দেবে সেই গাছের মহুয়া তাঁর। অনেক আদিবাসী অঞ্চলে মহুয়ার সমবন্টন নীতি থাকলেও এই অঞ্চলে তা প্রযোজ্য নয়। তারপর নিজের নিজের গাছের মহুয়া কুড়োতে শুরু করে পরিবারের লোকেরা। সাধারণত মহিলা ও শিশুরাই বেশি থাকে এই কাজে। এই কাজ চলে মাস খানেক। তারপর সেই মহুয়া নিয়ে গিয়ে নিজেদের বাড়ির উঠোনে শুকোতে দেয় তাঁরা। পরে কিছুটা মহুয়া নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে মহাজনের কাছে। আর কিছুটা রেখে দেয় বাড়িতে অতিথি এলে কিংবা উৎসবের দিনগুলোতে মদ তৈরি করার জন্য।
এমনই এক সকালে মহুয়া কুড়িয়ে গ্রামে ফিরছিল কিছু মহিলা। ঝিনুকও তাঁদের সাথে মাঝে মাঝে যায় মহুয়া কুড়োতে। আজ সে যায়নি। ঝিনুককে ছবি আঁকতে দেখে একজন মহিলা বলে উঠলো – ‘কি ড়ে ঝিনুক আজ সকাল থেকেই কি তুর মুন খারাপ?’ ঝিনুক তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি হেসে আবার আঁকাতে মন দিলো। কথটা শোনার পরে জানেনা কেন ঝিনুক নিজের শাড়িতে হাতে লেগে থাকা রঙ মুছে নিলো। এমনটা সে করে না। এই দৃশ্য দেখে সকলেই একটু অবাক হলেও মশকরার ছলে যেতে যেতে বলতে লাগলো – ‘বেশি করে লাল রঙ দিঁয়ে ছবি আঁক বুঝলি, মুন ভালো থাকবেক’। ঝিনুক সে কথায় কর্ণ পাত করলো না। আসলে সে আজ বড্ড উদাসীন। এমনটা হয় মাঝে মাঝে তাঁর। নিজের মত এঁকে যেতে থাকে, কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। পরে আবার সব ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু সেই সময়টায় সে হয়ে ওঠে বড্ড একরোখা। এখন গ্রামের প্রায় সকলেই জানে ঝিনুকের মন খারাপ থাকলে সে দেওয়ালে ছবি আঁকে। আর হয়তো কিছুটা ভয়ে হলেও সেই সময়ে কেউ তাঁর কাছে গিয়ে খুব একটা কথা বলে না তাঁর সাথে। পাছে ঝিনুক কষ্ট পায়।
ঝিনুকের মা ঝিনুককে নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। রাতে তাঁর প্রায় ঘুম আসে না। তবু সারা দিনের খাটুনির গতর এলে যায় শরীর বিছানায়। শুধু তাঁর চিন্তা হয় এই বয়সের একটা মেয়ে ওই ভাবে বদনাম নিয়ে গ্রামে ফিরতে হল! এই কচি বয়সে যদি ঝিনুকের আর বিয়ে না হয়! কীভাবে নিজেকে সামলাবে ঝিনুক। যেখানেই যাক সে নিজের মেয়ের জন্য পাত্রের সন্ধান সব সময় জারি রাখে। এমনই সে বার বার করে ঝিনুককে বোঝায় চটুইনাথ বাবার কাছে গিয়ে পুজ দিয়ে আসতে। তাহলে যদি আবার এটা বিয়ের কথা আসে। ঝিনুক কিন্তু কোন মতেই যায়নি। সে নিয়ে তাঁর মায়ের ক্ষোভের শেষ থাকে না। যদিও পরক্ষণে মেয়ের প্রতি মায়া হয় তাঁর। আর ভাবে যা করছে করুক। বিয়ের সন্ধান এলে তখন না হয় মেয়েকে বোঝানো যাবে। কিন্তু ঝিনুক মায়ের এই কথাগুলকে নানান কথার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে দেয়। ঝিনুকের এই মন্দির, মেলা বা চটুইনাথ না যাওয়ার পিছনে যে একটা বড় যুক্তি তৈরি হয়েছে তা তাঁর মায়ের অজানা। জানবেই বা কি করে, তাঁর মায়ের জানারও কথা নয়।
নিমমহলির ঘটনার পরে পরেই ঝিনুক তিলপাহাড়ি ফেরেনি। মাঝের পাঁচটা মাস সে ছিল কুন্ডহিতের একটি বাড়িতে। পলাশবনের বিচারের পরে সেই যে দ্রোপদির মত পাঁচজন নর রাক্ষসের সাথে সে জঙ্গলে যায়। জঙ্গলে গিয়ে সে একবারও তাঁদের কাছে নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্য ভিক্ষা চাইনি। তখন তাঁর মাথায় ঘুরছিল তপনের কথা। তপন কোথায় আছে, কীভাবে আছে। বেঁচে আছে না মরে গেছে। সে ফিরে আসবে কি না, এইসব। চারজন মিলে জোর করে ঝিনুকে নিয়ে গিয়ে শোয়াল জঙ্গলের ভেতরে একটা বড় পাথরের উপরে। ঝাঁপিয়ে পড়লো একজন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সজোরে চিৎকার করে বাধা দিতে চায়লো সেই চারজনকে। প্রাণপনে সে বোঝাবার চেষ্টা করতে থাকলো বাকিদের। কিন্তু তাঁর কথা বোঝার অবস্থায় তখন কেউ নেয়। চারজনের শরীরে জেগে ওঠা উদগ্র কামনা তখন তাঁদের বহুগুণ হিংস্র করে তুলেছে। বাধা দিতে আসা ছেলেটিকে তাঁরা চারজনে সমানে মারতে শুরু করলো। কোনক্রমে চারজনের হাত থেকে বেঁচে সে দৌড়ে পালায়। তারপর চারজনেই একে একে ঝাঁপিয়ে পড়লো ঝিনুকের উপরে। পাগলা হায়নার দলও এইভাবে নর মাংসের উপরে ঝাঁপিয়ে পরে না। জঙ্গলের চারিদিকে তখন নীরবতা। কোথাও কোন শব্দের লেশমাত্র নেয়। ঝিনুকের চোখে তখন কেবলই ভেসে উঠছে রবিনের মুখ।
প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যাওয়া ছেলেটি আবার ফিরে আসে ভোর রাতে। সেদিনের মৃদু চাঁদের আলোতে সে এসে দেখে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পরে আছে ঝিনুক। লজ্জায় তাঁর চোখ মাটি থেকে উঠতেই চাই না। কোন রকম ঝিনুককে তুলে সে নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। মুখে হাতে জল দিয়ে ঝিনুকের শাড়ির আঁচলেই মুছিয়ে দেয় তাঁর মুখ। তারপর তাকে উঠিয়ে নদী পেরিয়ে সে কোন ক্রমে ঝিনুককে নিয়ে যায় কুন্ডহিতে। তখনও সকাল হতে কিছুটা দেরি। আলো আঁধারি ভরে দুজনে গিয়ে ওঠে বিমল মাষ্টারের বাড়িতে। বিমল মাস্টার ঝাড়খণ্ড-পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া আদিবাসী গ্রামগুলতে সন্ধার সময় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখায়। কুন্ডহিতে গ্যারেজে কাজ শেখার সময় ছেলেটির পরিচয় হয়েছিলো বিমল মাস্টারের সাথে। বিমল মাস্টারের কথা ভালো লাগতো তাঁর। মাঝে মাঝে বিমল মাস্টারের বাড়ি এসে পড়াশুনা শেখার চেষ্টাও করেছিলো। কিন্তু শেষমেশ বাবা মারা যাওয়ার পরে গ্যারেজের কাজ ছেড়ে ফিরে যেতে হয় নিমমহলিতে।
সেই দিনের পর থেকে ঝিনুক পাঁচটা মাস বিমল মাস্টারের বাড়িতে ছিল। বিমল মাস্টার তাকে অনেকবার তিলপাহাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা বললেও সে ফিরতে চাইনি। মাস্টারও তাকে জোর করে ফিরে যেতেও বলেনি। মাস্টারের বাড়ির কাজকর্ম করে দিত ঝিনুক আর সন্ধ্যা বেলায় মাস্টার ফিরলে পড়তে বসতো। এমনটা হতে লেগেছিল বেশ কয়েক দিন। সেই ছেলেটি রেখে যাওয়ার পরে একটা ঘরে যে মাস্টারের থাকতে ঝিনুকের ভয় করেনি তা নয়। প্রথম প্রথম ঝিনুক মাস্টারকে দেখতে ভয়ে শুকিয়ে যেত। সেই রাতের ঘটনার পরে পুরুষ দেখলেই ভয়ে-আতঙ্কে কুঁকড়ে যাওয়াটাই যে স্বাভাবিক। সেই ভয়েই কিছুদিন ঝিনুক ঘুমাতে পারতো না। ঝিনুকের এই রাত জেগে থাকা প্রায় দিন লক্ষ্য করতো মাস্টার। পরে একদিন পড়াতে না গিয়ে সন্ধ্যা থেকে ঝিনুকের সাথে গল্প করতে বসে মাস্টার। পরিকল্পনা করেই সে বসেছিল। মাস্টার জানতো ঝিনুকের ভয় না ভাঙতে পারলে প্রাণ খুলে তাঁর সাথে কথা বলতে পারবে না। আর কথা না বললে ঝিনুককে সে পড়াশুনাও করাতে পারবে না। সেই সন্ধ্যায় এমন গল্প শুরু হল যে সেই গল্প গিয়ে শেষ হল ভোরবেলায়। সেদিনের সেই মৃদু ভাষী মাস্টারের সাথে দীর্ঘ কথাবার্তার পরে কিছুটা হলেও ভরসা পেয়েছিল ঝিনুক। তারপর থেকে মাস্টারকে নিয়ে ঝিনুকের মনে আর কোন ভয় বেঁচে ছিল না।
তবে মাঝে মাঝে ঝিনুক ভাবতে থাকে সেই ভয়ানক রাতের ছেলেটির কথা। গ্রামের ছেলে হওয়ার সত্ত্বেও মোড়লদের নির্দেশের বিপক্ষে গিয়ে কেনই বা সে ঝিনুককে বাঁচাতে গিয়ে বাকি চারজনের হাতে মার খেলো। কেনই বা ভোর রাতে ফিরে গিয়ে ঝিনুককে এনে রেখে গেলো এই মাস্টারের বাড়িতে। ঝিনুক উত্তর মেলাতে পারছিল না কিছুতেই। তাঁর পরের দিন থেকে সেই ছেলেটি একবারও এলোনা মাস্টারের বাড়িতে! এই প্রশ্নগুলো ঝিনুকের মনে একটা চাপা সন্দেহ তৈরি করছিল রোজ। কিন্তু বাইরের পৃথিবীর থেকে এখন সে মাস্টারের বাড়িতে নিজেকে অনেকটা সুরক্ষিত মনে করছে। তাই আর সে মাস্টারকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি সেই ছেলেটি সম্পর্কে।
এই সময়ে দাঁড়িয়ে গ্রামে গ্রামে যে মানুষেটি বিমল মাস্টার। সত্তর দশকে সে ছিল বিমল বৈদ্য। গ্রামের আর পাঁচটা ছেলের মতোই। কিন্তু স্বভাবে ছিল স্পষ্টভাষী ও নির্ভীক। একদিন গ্রামের অশ্বিনী মোড়ল এক নীচু জাতের ছেলেকে মারধোর করে দুর্গা মন্দির থেকে নামিয়ে দেয়। বিমল তাঁর প্রতিবাদ করে। কেন গ্রামের নীচু জাতের মানুষেরা মন্দিরে উঠতে পারবে না এই প্রশ্ন তোলে। সেখানে বিমল কোণঠাসা হয়ে পরে ব্রাম্ভন ও উঁচু জাতির মানুষদের ক্ষমতার কাছে। যদিও বিমল ছিল উঁচু জাতের তবে তাঁর বন্ধু তালিকায় জাতের বা ধর্মের কোন ভেদাভেত ছিল না। থাকবেই বা কি করে। ছোটও বেলায় বাবা মারা যায়। তিন বোন আর চার ভাই। নিজেদের জমি বলতে সেভাবে কিছু ছিল না। ওই কয়েক কাঠা। সেই ফসলে সবার পেট চালানো দুঃসাধ্যের বিষয়। এবাড়ি ওবাড়ি নানান কাজ করে দিনের শেষে মা কিছু চালের ব্যাবস্থা করে ছেলে মেয়েদের চালাত। বিমলরা তখন তিন ভাই একটু বড়। বিমলের দুই দাদার মাথায় তখন এক গুরুভার। এতজনের পরিবারে তাঁদের লেগে ছিল রোজকার অভাব। তাই খুব অল্প বয়সে শারিরীক শ্রম দিতে গিয়ে বিমল বুঝেছিল শ্রমের কোন জাত নেই।
সেই সময় চারু মজুমদার, কানাই চ্যাটার্জির ডাকে মুক্তির দশক শুরু হয়েছে। অভাবে অনটনে থাকা মানুষ, জাতিগত ও ধর্মীয় ভাবে শোষিত মানুষ, মেহেনতি মানুষ সকলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শোষকদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র সংগ্রামে। নীচু তলায় থাকা মানুষরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে দেশের সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে। বিমলও ঝাঁপিয়ে পরে সেই মুক্তির সংগ্রামে। প্রথমে সে নকশাল দলে যোগ দেয় শুধু মাত্র ব্রাম্ভন ও উঁচু জাতের মানুষদের উপর প্রতিশোধ নেবে বলে। নেবেই না কেন! সে তো নিজের চোখে দেখত গ্রামে কীভাবে লুঠ করা হয় গরীবদের। নকশাল দলে নাম লিখিয়ে ঘর ছাড়া হয় বিমল। তারপর করতে থাকে গোপনে গোপনে কাজ। প্রথমে সে নকশাল নেতাদের চিঠি পৌঁছানর কাজে নিযুক্ত হয়। সেই কাজে ধীরে ধীরে পারদর্শী হতে থাকে। ধীরে ধীরে চালাতে শেখে আগ্নেয় অস্ত্র। তাঁর সাথে সাথে হতে থাকে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন। শ্রেণী শত্রু খতম করে মেহেনতি মানুষের রাজ কায়েম করা তাঁর লক্ষ। গ্রামে তখন অনেক ছেলে মেয়ে যোগ দিচ্ছে নকশাল দলে। সুদখোর মহাজন, পুলিশ, বড় জমির মালিক অর্থাৎ এক কথায় ধনীরা তখন গ্রাম ছাড়া। দেশের কেন্দ্র ও এই রাজ্যের সরকার তখন চিন্তিত কীভাবে নকশালদের খতম করা যায়। বিমলের তখন প্রায় নকশাল দলে এক বছরের মত কাজ করা হয়েছে। সেই সময় ইন্দিরা গান্ধী সরকার সারা দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে। শহর থেকে গ্রামে মাটি লাল হতে থাকে নকশাল নেতা কর্মীদের রক্তে। মেলিটারি বাহিনি উজার করে দিতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। ধর্ষণ থেকে অকথ্য অত্যাচার কিছু বাদ যায়নি।
বীরভূমে তখন নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব তুঙ্গে থাকায়। সারা বীরভূম জুড়ে চলেছিল এক নারকীয় সন্ত্রাস। একদিন বিমলদের গ্রামে রাতে পুলিশ আসে সঙ্গে জলপাই পোশাকের মেলেটারি বাহিনী। সকলেই প্রায় নেশা গ্রস্থ। নাম বিভ্রাটের কারণে তুলে নিয়ে যায় বিমলের মেজ দাদাকে। বিমলের মা রুখে দাঁড়িয়ে ছিল সেই মেলেটারি বাহিনীর সামনে। কিন্তু মেজ ছেলে কে নিয়ে যাওয়া থেকে আটকাতে পারেনি বৃদ্ধা মহিলা। তবে বিমলের মা যে অপার সাহসী মহিলা ছিলেন তা আশে পাশে সব গ্রামের মানুষজন জানতো। এক বাঙালি পুলিশের তৎপরতায় পরে অবশ্য বিমলের মেজদা কে ছেড়ে দেয় পুলিশ। কিন্তু সেদিন গ্রামের খুন করে অনেক তরুন নকশালদের। তাঁর মধ্যে ছিল রাম। রাম নাকশাল করতো না। করতো তাঁর ভাই শ্যাম। শ্যামকে না পেয়ে এক পুকুরপাড়ে পিটিয়ে পিটিয়ে রামকে হত্যা করেছিল পুলিশ। তারপর রামের রক্তাক্ত মৃতদেহ টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিলো গ্রাম ঢোকার মাথায় এক বড় বট গাছের ডালে। যাতে গ্রামে নকশালরা ঢুকতে ভয় পায়।
তার পরদিন ইন্দ্রগাছা নামে পাশের এক গ্রাম থেকে বিমল ধরা পরে তাঁর আরও তিন কমরেডের সাথে। তাঁদের সন্ধার অন্ধকারে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের এক ছোট নদীর ধারে। তারপর পুলিশ ভ্যান থেকে নামিয়ে বলে পালা ছেড়ে দিলাম। সকলেই জানতো তাঁরা পালাতে গেলেই পিছন থেকে গুলি করে মারবে তাঁদের। কিন্তু বিপ্লবীদের যে মরার ভয় থাকে না। সারা দেশ জুড়ে তখন হাজার হাজার ছেলেমেয়ে প্রাণ দিচ্ছে। তাঁরা নদী বরাবর ছুটতে শুরু করে। কিন্তু আশ্চর্য ভাবে সেদিন পিছন থেকে গুলি চলেনি। প্রাণে বেঁচে চারজন মিলে চারদিকে চলে যায়। পরে অবশ্য জানা গেছিলো সেই পুলিশ দলের যে বড় বাবু ছিলেন তাঁর ছেলেকে গতরাতে কলকাতায় নকশাল সন্দেহে মেরে ফেলেছে কলকাতা পুলিশ। তাই সে নিজের ছেলের কথা ভেবে ছেড়ে দিয়েছিলো বিমলদের।
সেই সন্ধ্যায় প্রাণে বেঁচে বিমল চলে যায় বিহারের হাজারিবাগে। সেখানে কেটেছিল তাঁর ছয়টা বছর। পরে সব মামলা মুকদ্দমা উঠে গেলে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্তিত ঠিক হলে বিমল গ্রামে ফেরে। ফিরে দেখে আন্দোলনের আর কিছুই বেঁচে নেয়। নেতারা জেল থেকে বেড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। অনেক নেতাতো তাঁদের ছেলেমেয়েদের বিদেশেও পড়তে পাঠিয়ে দিয়েছে। গ্রামে আবার শুরু হয়েছে লুঠোত রাজ। গ্রামে কিছুদিন থাকার পরে বিমল ভাবে এইভাবে বেঁচে থাকার থেকে না থাকা ভালো। তারপর সে গ্রাম ছেড়ে দেয়। গিয়ে ওঠে কুন্ডহিতে এক কমরেডের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে আর এই রাজনীতিতে ফেরেনি সে। বয়স্ক কমরেড মারা গেলে তাঁর বাড়িতেই থেকে যায় বিমল। দিনে সব্জির দোকান দেয়। আর সন্ধ্যার সময় একটা পুরনো ঝরঝরে মোটরসাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পরে গ্রামে গ্রামে পড়াতে। আদিবাসীদের শিক্ষিত করা এখন তাঁর লক্ষ্য। তবে লালাপিঁপড়েদের প্রতি রয়েছে তাঁর এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সরাসরি সে রাজনীতিতে না থাকলেও। যখন যেভাবে পারে লালপিঁপড়েদের সে সাহায্য করে। সে শেলটার দেওয়া হোক, খবর পৌঁছে দেওয়া হোক কিংবা মাঝে মাঝে টাকা পয়সা দিয়ে সহায়তা করা হোক। সময়ের সাথে সাথে বিমলের বয়স বাড়লেও। এখনো একজন কিশরের মতই সে স্বপ্ন দেখে বিপ্লব হবেই। শ্রেণী, জাতি, ধর্ম, বর্ন মুছে দিয়ে মেহেমতি মানুষ গড়ে তুলবে শোষণহীন এক সমাজ। আশমান ছুঁয়ে উড়বে নকশালবাড়ির লাল পতাকা।

শুভ নাথ : লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post