• September 27, 2022

লকডাউন গাঁথা

 লকডাউন গাঁথা

শুভনাথ

“চোখের যতটা মণি তার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে দেখো
ধরো আমি রয়েছি মর্গে
ছায়ার বাতাসে চোখ ঘষে দেখো
কোন পাপ লেগে আছে কি না!”

  • সমীর রায়

‘আকাশে চাঁদট দেখ কেমন ত্যাজ মেরে ফুটেছে। লিসচয় চাঁদটকে কেউ ভালো-মুন্দ খেতে দেয়। পুলাও, মাংস, দই, মিষ্টি কত কিছু ফল-মাকর। তবে চাঁদট যতই ফুলে উঠুক। উর তো আর সংসার নাই। ইকা ইকাই বাঁচে। অমন রুপ লিয়ে আর কি হবেক। ছেলে-পুলে নাই, মরদ না, অমন জীবন নিয়েই বা কি হবেক! আমার সব আছে বাপু। মরদ ঘরে না থাকলেও ইই যে তু দিকে রেখে গেইছে। তুরাই তো আমার সব।’ পাশে তাঁর মেয়ে দুটিকে বসিয়ে অনর্গল এইভাবে শান্ত স্বরে কথা বলে চলেছে কবিতা। মেয়ে দুটির বয়স পাঁচ ও তিন। তাঁর মায়ের কথা কতটুকু বুঝছে কবিতা নিজেও জানে না। ছোট মেয়েটা শুকনো স্তনে মুখ রেখে হাত দিয়ে কবিতার ঠোঁট ছুতে ছাইছে। যেন বলতে চাইছে ‘মা এবার চুপ করো’। বড় মেয়েটা খুটে খুটে দেওয়ালের মাটি ছাড়িয়ে মুখে ভরছে।
আজ লকডাউনের চুয়াল্লিশতম দিন। দেশের সমস্ত কিছু বন্ধ হয়ে গেছে চুয়াল্লিশ দিন আগেই। এ্যাম্বুলেন্স ও স্বর্গরথ ছাড়া সমস্থ যানবাহন স্তব্ধ। কোথাও কোথাও স্পেশাল পারমিট নিয়ে চলছে যান চলাচল। তবে সেটা ভারতবর্ষের স্পেশাল মানুষদের জন্য স্পেশাল রুল। বাজারপাট বন্ধ। যাদের হাতে অর্থ ছিল খাদ্য মজুত করেছে। তাঁরা এখন একটু হুইস্কি বা গাঁজা জোগাড়ে ব্যাস্ত। মদ না পেয়ে মরে গেছে কিছু অ্যালকোহলিক। ফেসবুক সহ যাবতীয় সোশ্যাল সাইটে মানুষজন আপলোড করছে তাদের রোজ দিনের খাবারের মেনু। স্বামীর হাতের চিকেন পকোড়া তো বউয়ের হাতে গ্রিন-টি। কাজের চাপে যাদের গলা বসে গেছিলো এতদিনে তাঁরা পুরনো হারমনিয়াম খুলে ঝেড়ে মুছে সকাল শুরু করছে রবীন্দ্র সঙ্গীত দিয়ে। যারা বাচ্চা বয়সে লেখালেখি করতো তারা হঠাৎ তাদের প্রতিভাব কথা মনে করতে পেরে বসে গেছে খাতা কলম নিয়ে। হস্টেলে থাকা ছেলে-মেয়েদের কাছে পেয়ে বাবা-মা উগড়ে দিচ্ছে তাদের অনেকদিনের জমানো আদর। কারখানার যন্ত্রপাতিগুলো জিরিয়ে নিচ্ছে নিজেদের। পরিবেশ জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে প্রান ভরে। একটা বড় অংশের মানুষ ছাড়া সকল পশুপাখি, কিট পতঙ্গ মেতেছে উৎসবে।
এনজিওগুলোর দেওয়া খাবারের ওপর চলেছে এতদিন। আজ সব শেষ। যেটুকু মুড়ি ছিল, রাত বাড়তে দেখে সেইটুকু খাইয়ে ঘুম পারিয়েছে মেয়ে দুটিকে। দুদিন আগে শান্তি ফোন করেছিল। শান্তি মানে কবিতার মরদ। ঘরের দুর্দশার কথা শুনে তৎক্ষণাৎ সে ব্যাঙ্গালর থেকে রওনা দিয়েছে বাড়ির উদ্দেশ্যে। বিগত দুদিন ধরে তাঁকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। এতদিন সংসারে টান থাকলেও এমন দিন কখনো কাটেনি। মাঝে যখন শান্তির মায়ের শরীর খারাপ হয়েছিল। কবিতা তখন কয়েটি ঘরে ঝি এর কাজ করে সামাল দিয়েছিলো সংসারটিকে। তাছাড়া এরকম টুকটাক মুদির দোকানে কিছু ধারাবাকি থাকে সারা বছর। শান্তি এসে এসে মিটিয়ে দেয়। এখন সেই মুদির দোকানেও মাল নেই। থাকলেও ধারে দিচ্ছে না। নগদে চড়া দামে বিক্রি করছে।
শান্তির মা গত হয়েছে বছর দুই আগে। ছোটও মেয়েদুটি এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। মেয়েদুটিকে রেখে এখন কাজ খুজতে যাওয়া বিপদ। ভাইরাসের ভয়ে এই সময় কাজও দেবেনা কেউ। কবিতার মনে অস্থিরতার পারদ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এখনো রাত বাকি। ভেবেই চলেছে কাল সকালে মেয়েরা ঘুম থেকে উঠলে কি খেতে দেবে। সকাল হলে কি সে কাজ খুজতে বেরোবে? যা কাজ পাবে করবে। কিন্তু যদি পুলিশ মারে? যদি সাঁকরাইলের লাল স্বামীর মত কিছু হয়ে যায়? যে মানুষটি বাচ্চার জন্য দুধ খুজতে বেরিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে মারা গেলো। এখন যদি তাঁর কিছু হয়ে যায় মেয়ে দুটিকে কে দেখবে? শান্তি বাড়িতে নেই। এত কিছু প্রশ্নের জবাব নিজেই নিজেকে দিয়ে চলেছিল কবিতা। শারীরিক নিয়মে কবিতা ঘুমিয়ে পড়ে এই আশা নিয়ে শান্তি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে। দিন বদলাবে।
পরের দিন সকালে কবিতা সব কিছুকে উপেক্ষা করে মেয়েদুটিকে সাথে নিয়েই খাবারের সন্ধানে বের হয়। মানুষ সুযোগ সন্ধানী। পাড়ার এক চেনা যুবক অবস্থা বুঝতে পেরে খারের বিনিময়ে চেয়ে বসে শরীর। এক আঁচল আত্মমর্য়দাকে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরে আসে কবিতা। কোলের মেয়েটি তখন তাঁর কাছে ভারি হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ইচ্ছে হচ্ছে ছুড়ে ফেলে দিতে। পৃথিবীর সব চেয়ে ভার ধরে রাখতে হয় একজন মা কে। কোল থেকে নামিয়ে দেয় মাটিতে। হতাশা ও ঘৃণা নিয়ে বসে পড়ে। এমন শরীরের প্রস্তাব আগেও বহুবার শুনেছে কবিতা। তবে এরকম দুর্দিনে! আশ্চর্য হতে থাকে মানুষের মানবিকতা দেখে। শান্তিকে ফোন করার চেষ্টা করে। ফোন এখনো বন্ধ। ভাবে ফোনটা বিক্রি করে কিছু খাবার কিনে আনবে। পর মুহূর্তে ভাবে শান্তি তাহলে যোগাযোগ করবে কীভাবে। গ্রাম ছেড়ে একসময় শান্তি জীবিকার খোঁজে মফঃস্বলে উঠে আসে। মফঃস্বল যে তাঁর হৃদয়ের কোমলতায় এইভাবে পাথর চাপিয়ে দিয়েছে আজ বুঝতে পারছে কবিতা।
হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। কবিতা হুরমুরিড়ে পড়ে ফোনের উপর। ওপার থেকে একটা অচেনা কণ্ঠ। কবিতা কিছু বুঝতে পারছে না। বাংলায় বারবার বলে যাচ্ছে ‘কে? কে? শান্তি কই?’ ওপার থেকে এইবার হিন্দিতে একজন কথা বলে ‘শান্তি কাল রাত কো ট্রাক এক্সিডেন্টে মে গুজার গেয়া’। কবিতা তবু বুঝতে পারে না। বারবার বলে চলে ‘কি? কি? কি বলছ’। ওপার থেকে নিচু স্বরে ভেসে আসে ‘ওড়িশা কা বর্ডার মে লরি কা সাথ এক্সিডেন্ট মে শান্তি বাউরি মর গেয়া’। আবার কবিতা জিজ্ঞেস করে ‘কি? কি?’ ওপার থেকে এক্তু উঁচু গলায় বলে ‘শান্তি মর গেয়া’। এইবার চুপ করে যায় কবিতা। আর কোন কথা বলে না। ওদিকে থেকে বলতে থাকে ‘আধার কার্ড কা এড্রেস পে লাশ ভেজ দেঙ্গে। ফিকর মত কিজিয়ে’। কবিতা আর কোন উত্তর দেয় না। নীরব হয়ে যায়। সূর্যের ত্যাজ তখন আকাশ পুড়িয়ে ফেলছে।
নীরবতা ভেঙ্গে বড় মেয়েটি বলে ওঠে ‘মা খিদে লেগেছে’। কবিতা ঘুরে তাকায়। উঠে গিয়ে হাড়িতে জল ভরে আনে। আঁচল ভিজে তখন ধুলো মাখা হয়ে গেছে। উনুনে আগুন জ্বালায়। বড় মেয়েটি খুশি হয়ে যায় ভাত রান্না হচ্ছে ভেবে। ছোটও মেয়েটি কেঁদে ওঠে। কবিতা তাঁকে কোলে তুলে ব্লাউজ খুলে স্তন এগিয়ে দেয়। সে চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পরে নামিয়ে দেয়। সে আবার খেলায় ব্যাস্ত হয়ে পরে। ঘরের ভিতর গিয়ে তিনটে ফাঁস ঝুলিয়ে ফেলে। বাইরে এসে বড় মেয়েকে বলে ‘চল ভাত হতে হতে একটা খেলা খেলবো’। সে কৌতূহল নিয়ে ঘরে ঢোকে। ছোট মেয়ের হাতের পাথরগুলো কেড়ে ফুটন্ত জলে ফেলে দেয়। সে কেঁদে ওঠে। কবিতা ঘরে ঢোকে। বড় মেয়েকে বলে ওই দড়িতে মাথা ঢুকিয়ে ঝুলতে হবে। টুলের উপর চেপে তাড়াতাড়ি সে মাথা ঢুকিয়ে দেয়। কবিতা টুল সরিয়ে নেয়। মেয়েটি ছটফট করতে থাকে। কোলের ছোটও মেয়েটি দিদিকে ছটফট করতে দেখে হেসে ওঠে। তারপর কবিতা তাঁকে কোল থেকে তুলে ফাঁসের সামনে এগিয়ে দেয়। সে নিজেই দড়ি গলায় পরে। কবিতা তাঁকে ছেড়ে দেয়। সে ছটফট করতে থাকে। কবিতা হেসে ওঠে। এমন হাসি চাঁদ,সূর্য,আকাশ,বাতাস,পাহাড়,বন,নদী কেউ হাসতে পারে না। কেবল মানুষ পারে। সবশেষে কবিতা নিজে সেই ফাঁসে ঝুলে পরে। হেসে ওঠে মহামারি। উনুনে ফুটতে থাকে চারটি পাথর।

শুভনাথ, লেখক, রাজনৈতিক কর্মী

ফিচার ছবি: সুমন্ত মন্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published.