• December 4, 2022

দালান ঘর

 দালান ঘর

শুভনাথ

ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ঝিমুনি ধরেছে। আর কয়েকজনের পরেই তাঁর লাইন। খিদেও পেয়েছে। খিদে চেপে রেখেও ঘণ্টা খানেকের উপরে দাঁড়িয়ে আছে গোপী। সেই সকালে চাঁদমণি থেকে বেড়িয়ে আট কিলোমিটারের বেশি পায়ে হেঁটে বাজারে আসা। যদিও অভ্যাস হয়ে গেছে। বয়স হবার কারণে আর পারে না। কম বয়সে পায়ে হেঁটে নাকি সে সিউড়ি সদর পৌঁছে যেত। যদিও এখনো বয়সের ছাপ শরীরে খুব একটা নেই। কিন্তু ক্ষমতার ক্ষয় যে অনেকটা হয়েছে তা স্পষ্ট। হবে নাই বা কেন শেষ পাঁচটা বছরে স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে, বউমা একের পর এক সকলকে হারিয়েছে। এখন নাতনিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে। নাতনির বয়স নয় বছর। গোপীর ইচ্ছে নাতনির বিয়ে দিয়ে সে মরবে। মাঝে মাঝে সে আঁতকে ওঠে সে এখন মরে গেলে নাতনিটার কি হবে। মামার ঘরের লোকেরাও ভালো নয় যে নিয়ে গিয়ে রাখবে।
তবুও বাপ-মা মরা নাতনির জন্য যতটুকু করে যেতে পারে। নিজের ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে তো ছ-কাঠা জমি আর হালের বলদ জোড়াও বেচতে হয়েছে। এখন দেড় কাঠা জমির উপরে ভিটে। ভিটের এক পাশে ছোট ছোট দু কামরার মাটির ঘর। পাশে গোয়াল। গরু বাছুর নেই। দুটো ছাগল বাঁধা। আর রান্না ঘর আছে তবে সেটাকে ঘর না বলে চালা বলা ভালো কারণ চারটে বাঁশের উপরে খড় চাপানো। গেলো বর্ষায় ঘর প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। শেষে গ্রামের ছেলেদের বলে কোন প্রকারে পঞ্চায়েত থেকে একটা তিরপলের ব্যবস্থা করে খড়ের চালের উপরে ঢাকা দেয় তবে রক্ষে। সে ভেবেছিলো এইবার পুরনো খড় ছাড়িয়ে নতুন খড় লাগিয়ে মজুবুত করবে। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। লকডাউনে কাজ ছিল না। আর বয়সের চাপে খুব একটা কাজ এখন সে আর করে উঠতে পারে না। তাই তালি দিয়ে রেখেছে। নাতনিটা খুব ছোট,লোকের বাড়িতে যে কাজ করবে তাও পারবে না। আর গোপী নিজেও বাপ-মা মরা মেয়েকে কষ্ট দিতে চায় না। এখন সব হারিয়ে ওই নাতনিই তাঁর অমূল্য সম্পদ।
এমনিতে গ্রামের অভাব থাকলেও এখানের লোকে মিলে মিশে থাকতে জানে। আপদে বিপদে দাঁড়ানো তাঁদের অভ্যেস। গোপীর ঘরের অবস্থা দেখে অনেকেই গ্রামের পঞ্চায়েতে গিয়ে মাঝে মাঝে বলে আসে গোপীর জন্য সরকারি একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে। গোপী কিন্তু কোনদিন যায় না। শিক্ষা গত যোগ্যতা যাই হয়ে থাকুক কেন গোপী রাজনৈতিক ভাবে যে এখনো আদর্শবান। একসময় নকশাল রাজনীতি করেছে। কমরেডদের নিয়ে রাতে পর রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিয়েছে। বন্দুক চালাতে শিখেছে। নিজের হাতে খতম করেছে অনেক সুদখোর মহাজনদের। জেলে গেছে। ফিরে এসে ঘরসংসার করলেও আদর্শকে কখনো বিক্রি করেনি। তাই অনেকে তাঁর এই আদর্শের জন্য এখনো তাঁর সামনে মাথা নোয়ায়। কিন্তু সে নিয়ে গোপীর না আছে কোন অহংকার না আছে জীবনের এই না পাওয়াগুলোকে নিয়ে তাঁর কোন আক্ষেপ। এখনো সে বিশ্বাস করে ‘পার্লামেন্ট হল শূয়ারের খোঁয়াড়।’
সেই বছর চরম খরা। গ্রামে জলের জন্য হাহাকার না পড়লেও ভয়ঙ্কর জলকষ্ট তৈরি হয়েছে। নাতনিকে খাটিয়ার উপরে ঘুম পাড়িয়ে গোপী বাঁশতলার টিউবকলে জল আনতে গেছে। এমন দুপুরে লোকজন থাকবে না সেই ভেবেই যাওয়া। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে তখন বাঁশ তলায় আড্ডা মারছে পাড়ার রাজনৈতিক কিছু ছোকরা। গোপীকে দেখতে পেয়ে একজন বলে – ‘গোপী তুর নামে ঘর চলে এসেছে। পঞ্চায়েতে একবার দেখা করিস। কতগালা কাগজ লাগবে আর সই করতে হবে, করে দিস তাহলেই হয়ে যাবে। মুনে রাখিস তুদের মাওবাদীরা ঘরট দেয় নায়। দিদি দিয়েছে দিদি’। গোপী উত্তর দেয় না। গোপীর আত্মসম্মান জ্ঞান অনেক বেশি। ছোকরাটার চেয়ে গোপী কিছু না হলে বছর চল্লিশের বড় তারপরেও তাকে তু তুকারি করে ডাকছে। গোপীর গায়ে লাগে। গোপী একটু এগিয়ে গিয়ে জোর গলায় উত্তর দেয় – ‘লাগবেক না তুদের ঘর, তুরা লুটে পুটে দেকশটকে খেচিস। আরও খা, তুদেরই পেটট ভরুক। তুদের সরকারের ঘরের লেগে আমার কুনু লুব নাই’। গোপী আর কিছু বলে না কলতলে ঘড়া বসিয়ে কল হ্যাঁচকাতে থাকে।
বিকেল তখন হব হব। পাড়ার এর ওর সাথে কথা বলে গোপী যখন ঘরের কাছে ফিরছে দেখে অনেকে জড়ো হয়েছে। গোপী ভয় সংশয় নিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দেখে নাতনি ময়নার গালে এক মুখ হাসি। গোপী গিয়ে দাঁড়াতেই ময়না প্রশ্ন করে – ‘দাদু এইবার আমাদের দালান ঘর হবে?’ গোপী চুপ মেরে যায়। উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে থাকে। মন ভরে দেখতে থাকে ময়নার হাসি, উপভোগ করতে থাকে নাতনির আনন্দ। বাপ-মা মরার পর থেকে মেয়েটা এই বুঝি প্রথম এতটা খুশি হল। ময়না ঘুম থেকে উঠে পাড়াসুদ্ধু লোককে বলে বেড়িয়েছে তাঁদের দালান ঘর হবে। আর ময়নাকে ঘুম থেকে তুলে খবরটা দিয়েছিলো জানকি মাসি। পঞ্চায়েতে সে ঝাঁটপাট-মোছামুছির কাজ করে।
নাতনির আনন্দ দেখে থাকতে না পেরে গোপী যায় পাড়ার পঞ্চায়েত সদস্যর কাছে। অনেক কোথা শোনালেও গোপী সেগুলতে আর কান দেয় না। এখন তাঁর মন পুলকিত করে রেখেছে ময়নার হাসি। পঞ্চায়েত সদস্য তাঁকে কাল সব কাগজ নিয়ে পঞ্চায়েতে দেখা করতে বলে।
দালান ঘরে থাকার অনুভুতিকে অনুভব করতে করতে ময়না ঘুমিয়ে পড়ে। অন্যদিন রাত আটটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেও আজ গোপী রাত দশটা পর্যন্ত ভাবতে থাকে আকাশ পাতাল। সে ভাবতে থাকে এই বুড়ো বয়সে এসে তাঁকে আদর্শের সাথে সমঝোতা করতে হল! না, সে আর কোন কিছু ভাবতে নারাজ। ময়নার জন্য যদি একটা দালান ঘর করে দিতে পারে তাহলে হঠাৎ মরে গেলে তো আর মাথার উপর পাকা ছাদের অভাব হবে না।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ময়না দাদুর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। গোপী তখন ছাগলগুলোকে বাইরে উঠোনে বাঁধছে। পেয়ারা গাছের নীচে। দুচারটে পেয়ারা ডাল ভেঙে ছাগলগুলোকে দেয়। ময়না জিজ্ঞেস করে – ‘দাদু আইজকে আমাদিগে ঘর দিবে? হা গো দাদু কদিনে ঘর হবেক? কটা জানলা থাকবেক…’ আরও নানান প্রশ্ন করতে থাকে ময়না। গোপী একগাল হেসে বলে – ‘হবেক রে ময়না একট দালান ঘর হবেক। দাড়া এত জলদি কি হয়। টাকা আসবেক সরকার থ্যেকে। পুরানো ঘরট ভাঙতে হবেক। মিস্ত্রি লাগবেক। এত তাড়াতাড়ি কি হয়!’ দাদুর কথায় মন ভরল না ময়নার। সে বাইরে বেরিয়ে গেলো। এখন পাড়ার লোকজনকে সে এইসব প্রশ্ন করে বেড়ারে।
ঠিক এগারটার সময় ময়নাকে নিয়ে গোপী পঞ্চায়েতে গেলো। সব কাগজপত্র জমা দেবার পরে কয়েকটা জায়গায় সই করতে হল। সই করার সময় পঞ্চায়েতের একজন কর্মী গোপীর দিয়ে টিপছাপের কালি এগিয়ে দিলে গোপী তার মুখের দিকে তাকায়। কিছু বলে না। কলমটা চেয়ে নিয়ে সই করে দেয়। পঞ্চায়েত থেকে বেরনোর সময় একজন এসে গোপীকে একবার প্রধানের ধরে দেখা করতে বলে। গোপী ময়নাকে বাইরে চেয়ারে বসিয়ে রেখে ভেতরে যায়। সেখানে পঞ্চায়েত প্রধান গোপীকে জানায় দুবারে ঘরের টাকা ঢুকবে। আশি হাজার করে দুবার। প্রথমবার টাকা ঢোকার পরেই কুড়ি হাজার টাকা প্রধানের লোককে দিতে হবে। গোপী একবার ভাবে সে ঘর নিতে অস্বীকার করবে। কারন সে এতকাল সে ঘুষের বিরুদ্ধে কোথা বলেছে। কিন্তু আবারও ময়নার মুখের দিকে তাকিয়ে সহজে মেনে নেয়।
আষাঢ়ের প্রথম দশদিন পেরিয়ে গেলেও বৃষ্টির দেখা নেয়। মাঝে মাঝে কালবৈশাখির মত বৃষ্টি। ইতিমধ্যে গোপীর ঘরের টাকা ঢুকে গেছে। প্রধানের লোককেও কুড়ি হাজার টাকা দেওয়া হয়ে গেছে। পুরনো মাটির বাড়ি ভেঙে গোরট কাঁটা শুরু হয়েছে। পুরনো ঘরের মালপত্র গোয়ালের একপাশে রেখেছে। মাঝে খাটিয়া। সেখানেই এখন গোপী ও ময়না ঘুমায়। আর একপাশে চারটে ছাগল বাঁধা। ঘর করার দেখে ময়নার আনন্দের সীমা নেয়। এখন সে স্কুলেও যায় না। সারাদিন ওই মিস্ত্রীদের সাথে গল্প। গোপীও লেগে থাকে ঘর করার কাজে। অন্তত সারাদিনে একটা লেবারের টাকা সে বাঁচায়।
দিন পনেরর মধ্যে প্রথম আশি হাজার শেষ। নিলটন পর্যন্তও ওঠেনি। কাজ বন্ধ করতে হয়েছে টাকার অভাবে। শেষমেশ গোপী আবারও পঞ্চায়েতে যায়। পঞ্চায়েতে সাফ জানিয়ে দেয় নিল্টন পর্যন্ত না তুলতে পারলে পঞ্চায়েতের লোক গিয়ে ছবি করতে পারবে না। ছবি করে উপরে না পাঠালে টাকাও ধুকবে না। অগত্যা গোপী ফিরে আসে। ঘরের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ময়নারও মন ভার। শেষমেশ গোপী ছোটও পাঠি ছগলটা রেখে বাকি তিনটে হাতে গিয়ে বিক্রি করে আসে। সেই টাকা দিয়ে পরের দিন থেকে নিলটন দেওয়ার কাজ শুরু হয়। কোন ক্রমে শেষ হল নিলটন পর্যন্ত তোলার কাজ।
পরের দিন পঞ্চায়েতে গিয়ে গোপী খবর দিয়ে আসে নিলটন তোলার কাজ শেষ হয়েছে। পঞ্চায়েতের একজন কর্মচারী গোপীকে জানায় এক সপ্তাহের মধ্যে লোক গিয়ে ছবি তুলে আসবে। গোপী ফিরে আসে। গোয়ালের মধ্যে কষ্ট করে থাকতে হয় দাদু-নাতনিকে।
কিন্তু না সপ্তাহ কেটে গেলেও কেউ আসে না। আবারও পঞ্চায়েতে গিয়ে গোপী বলে আসে। এইবার গোপী নিজের পুরনো মেজাজ দেখিয়ে এসেছে। ঠিক দুদিন পরে পঞ্ছায়ের লোক এসে ছবি তুলে নিয়ে যায়। যখন ছবি তুলতে আসে, গোপী জিজ্ঞেস করে – ‘কতদিনে টাকাট ঢুকবেক?’ সেই কর্মীটি উত্তর দেয় – ‘জানিনা দাদু, এক সপ্তাহ লাগতে পারে আবার এক মাসও।’ কর্মীর এই কথা শুনে গোপীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। এইবার তো ভরা বর্ষা শুরু হতে যাবে! এই গোয়ালে কীভাবে থাকবে দুজনে।
গোপীর সেই দুশ্চিন্তা সত্যি হল আঠারো দিন কেটে যাওয়ার পরেও টাকা ঢুকল না। পঞ্চায়েতে গেলে পঞ্চায়েত বলে তাঁরা তাঁদের কাজ করে দিয়েছে এইবার ব্যাঙ্কে ঢুকবে, ব্যাঙ্কে গেলে বলে সরকার না পাঠালে টাকা ঢুকবে না, তারই মাঝে শুরু হয়েছে প্রবল বর্ষা। পুরনো বাড়ির চালের তিরপল খুলে গোয়ালের চালে লাগালেও দেওয়ালের ধার ঘেসে জল পরে অবিরাম। স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে। দেওয়ালের কিছু অংশ গলেও পড়েছে। তারপর ময়নার রোজ এক কথা – ‘দাদু আমাদের দালান ঘর কবে হবেক?’ গোপী নীরব থাকে আর ভাবে ঘর না নিয়ে যদি ছাগলগুলো বিক্রি করে পুরনো ঘরেই খর চাপাতো তাহলে আজ এই দুর্দশা আসতো না।
গোপী মাঝে মাঝেই ব্যাঙ্কে যায় জেনে আসে টাকা ঢুকেছে কি না। প্রত্যেকবার সেই এক উত্তর – ‘সরকার টাকা না পাঠালে টাকা ঢুকবে না।’
আজ সারাদিন ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে গোপী ঘরে ফিরেছে। শরীরের ঝিমুনি এখনো কাটেনি। তারপর আট আট ষোল কিলোমিটার হাঁটা। আজও দাদু ফিরতেই ময়না জিজ্ঞেস করে – ‘কি গো দাদু আমাদের দালান ঘর হবে না?’ গোপী ধমক দিয়ে ওঠে। ময়ানা মুখ ভার করে গোয়ালে খাটিয়ার উপরে শুয়ে পরে। তারই মধ্যে নেমে আসে সন্ধ্যা। একফুট ভাট আলু ফুটিয়ে নিয়ে গোপী ময়নাকে উঠিয়ে খাইয়ে দেয়। আকাশে তখন কালো মেঘের চাঙ্গড় ভাসছে। মেঘ দেখে থালা বাসন উঠোনে রেখে ময়নাকে বুকের কাছে টেনে খাটিয়ায় শুয়ে পরে। তারপর সারাদিনের এতটাই ক্লান্তি যে দিনে রান্না ঘরের চালাতে পাঁঠি ছাগল ছা’টাকে বেঁধেছিল তাকেও গোয়ালে ভরতে ভুলে যায়।
সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। বৃষ্টি থামার নামই নেই। বাইরে উঠোনে যেটুকু বালি পড়েছিল জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। জলের ঝিট মেখে ছাগল ছানাটা ম্যা ম্যা করে চিৎকার করেছে। কিন্তু না গোপী না ময়না কারোর ঘুম ভাঙছে না। ওই মাঝ রাতে গ্রামের কেউ ছাতা মাথায় নিয়ে, কেউ গামছা মাথায় নিয়ে কেউবা ভিজে ভিজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে খড় বাঁশ তাড়াতাড়ি সরিয়ে ফেলতে। যদি ভেতরে দাদু বা নাতনির মধ্যে কেউ বেঁচে থাকে। দালান ঘরের গা বেয়ে তখন গলে গলে পড়ছে সিমেন্ট-বালির মশলা।

শুভনাথ

,লেখক,প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.