• December 4, 2021

পানসেটিয়া

 পানসেটিয়া

অভিজিৎ রায় :- ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো। দেওয়ালের রঙের সাথে ম্যাচ করে পর্দা। পর্দার রঙের সাথে কনট্রাস্ট করে বেডকভার। দক্ষিণ-পুব খোলা মন্দাকিনী আবাসনের চারতলার এই ফ্ল্যাটটা কেনার সময় ঘরটা একটু ছোট করে ব্যালকনিটা একটু বড় করে বানানো হয়েছিল নন্দিনীর স্পেশাল আবদারে। প্রমোটার প্রথমে বাহানা করে থাকলেও নন্দিনীর জেদের কাছে হার মেনেই হোক বা তার রূপে মজে বড় ব্যালকনি আর দক্ষিণের ফ্রেঞ্চ উইনডোটা শেষ পর্যন্ত করে দিয়েছিল প্রমোটার। ব্যালকনির গ্রীলে টব রাখার বাহারি ফাঁকও করা ছিল। এতদিন ঘরের ইন্টিরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকা নন্দিনী মাঝেমধ্যে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেও বেশিরভাগ অবসর খাটের উপর বসে পুবের জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির বাচ্চাটাকে বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করত নন্দিনী। গতকাল দুপুর থেকেই পুবের জানলার নীল ভারি পর্দাটা ফেলে রেখেছে সে। শেখর যতবার ফোন করেছে ততবারই নন্দিনীর চোখ চলে গেছে পুবের জানালায়। পাশের বাড়ির বাচ্চাটাকে খোলা ছাদে তার মা স্নান করায় গামলায় বসিয়ে। সারা ছাদে ঘুরে ঘুরে কাক আর শালিখ দেখিয়ে ভাতের গ্রাস ভরে দেয় মুখে—এইসব ছবি যেন তার চোখে ভেসে ওঠে। নন্দিনীর কষ্ট হয়। শেখরকে সে কিছুই বলতে পারে না। অফিসের ট্যুরে এবারে শেখর অষ্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আটকে পড়েছে। যে প্রজেক্টে গিয়েছিল তার মেয়াদ ছিল দু’মাস। অথচ কাজ সেরকম এগোতে পারেনি শেখরের টিম। দু’দিন আগেই শেখর জানিয়েছে আরও দিন পনেরো লাগবে তার কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে।


নন্দিনী এখন একা এবং একদম একা সে লড়ে যাচ্ছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার সাথে। মা মারা গেছেন অনেকদিন। বাবা তার নিজের রাজনীতির জগতে ব্যস্ত। বেশ কিছুদিন নন্দিনী ফোন করে খবর না নিলে বাবার মনে পড়ে মেয়ের কথা। সময়ে সময় পান না তিনি, অসময়ে ফোন করে মেয়ের যত্ন নেন। নন্দিনীর দুঃখের কথা শোনার মতো মন তার বাবার নেই জেনে সে কিছু বলেনি বাবাকে। তার এক বাল্যবান্ধবী ঋতু, ঋতুপর্ণার বিয়ে হয়েছে পাশের পাড়ায়। তাকে ফোন করে বলেছিল। আজ দুপুরে ঋতু আসবে বলেছে। এখনো আসেনি। নন্দিনী ঘড়ির দিকে তাকায়। আড়াইটে। ঋতু বলেছিল তিনটে নাগাদ আসবে। নন্দিনীর দুপুরের খাওয়া এখনো হয়নি। সে খাট ছেড়ে উঠে ডাইনিংরুমের দিকে যায়। এই ঘরটাও খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিল নন্দিনী। শেখর তাকে প্রায়ই উৎসাহ দেয় ইন্টিরিয়র ডিজাইন শিখে একটা ফার্ম খোলার ব্যাপারে। নন্দিনী হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। একদম গুরুত্ব দেয়নি। সে বরাবর সাজিয়ে গুছিয়ে সংসার করার স্বপ্ন দেখত। শেখরের সাথে বিয়ে হওয়ার সে সুযোগ নন্দিনী ভালভাবেই পেয়েছে। শেখর তার কোনো অভাব তো রাখেইনি বরং সব ব্যাপারে তাকে উৎসাহ যুগিয়েছে। শেখরের বাবা-মা তাদের ছোট ছেলের কাছে দিল্লীতে থাকায় কোনো দিন তেমন কোনো সমস্যা হয়নি নন্দিনীর। নিজের সংসার সে নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে কলকাতায়।
এইসব ভাবতে ভাবতে নিজের জন্য ভাত বাড়ছিল সে। থমকে গেল। সত্যিই কি সে তার সংসার গুছিয়ে নিতে পেরেছে? বিয়ের আট বছর পরও মা না হতে পারার মধ্যে কি তার গোছানো সমস্ত ঘরদোর অগোছালো হয়ে পড়েনি! শেখর এলে তার অনেকটাই বোঝা যাবে। তাদের ইস্যুর ব্যাপারটা নিয়ে শেখর বরাবরই বেশ পজিসিভ। যখন যে ডাক্তারের খোঁজ পেয়েছে, সেখানেই গেছে। নন্দিনী ঋতুর কাছেই শুনেছিল ওদের যখন সমস্যা হচ্ছিল ইস্যু হতে তখন নিলয়দা নাকি নিজের কোনো ফিজিক্যাল টেস্ট করাতে রাজি ছিল না প্রথমে। শেখর কোনোদিন এইসব মেল-ইগো নিয়ে বসে থাকেনি। যখন প্রথম নন্দিনীর কমপ্লেকেসি ধরা পড়ল তখনও বাড়ি ফিরে খুব আদর করে বলেছিল, “আরে! ডাক্তার বলেছে তো সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি শুধু ইস্যুর চিন্তা মাথায় না রেখে ইন্টারকোর্সের মজা নাও ম্যাডাম”। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল নন্দিনীর গাল, কান। শেখর কানে কামড় দিতেই শরীর সাড়া দিয়েছিল শরীরের ডাকে।

২.

  • ‘তুই বড্ড বেশি ভাবছিস মোম। শেখরকে আসতে দে। তারপর না হয় আলোচনা করে দেখ একটা কোনো বাচ্চা দত্তক নিতে ও রাজি কিনা’।
    নন্দিনী ঋতুর কথা শুনে একদৃষ্টে ওর দিকে চেয়ে থাকে। অনেকদিন পর কারোর মুখ থেকে ও তার ডাকনাম শুনল। বাবা তাকে বরাবর বুড়ি বলে ডাকে আর শেখর বিয়ের পর কিছুদিন ডাকার পর বলল, ‘মোম নামে তোমাকে ডাকলেই আমি বড় ইনসিকিউরিটিতে ভুগি নন্দিনী। আমি বরং তোমাকে নন্দিন নামে ডাকব’।
    নন্দিনী খুব হেসেছিল। বলেছিল, ‘ইঞ্জিনিয়ারবাবু এত রবীন্দ্রনাথ কবে কখন পড়লে? আমি কি তোমায় তবে রঞ্জন বলে ডাকব’?
    ‘কী রে কী হল? হাঁ করে থেকে গেলি কেন? তুই কি শেখরকে ব্যাপারটা জানিয়েছিস’?
    না রে। কী আর জানাবো? ও এলেই না হয় বলব। ও না হয় কিছুদিনের মধ্যেই আবার কাজে ডুবে যাবে, আবার বিদেশে যাবে ট্যুর নিয়ে। আমি কী করে সময় কাটাই বল তো?
    ঋতু খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, ‘তোর কী কী করতে ভাল লাগে বলতো’।
    কিচ্ছু না।
    কেন? ঘর সাজাতে তো তোর খুব ভাল লাগে।
    সারাদিন, সারারাত কি একা একা ঘর সাজাবো? কে দেখবে? কে লণ্ডভণ্ড করবে? কার জন্য আবার নতুন করে ঘর সাজাবো?
    বাগান করবি? ফুল ভাল লাগে?
    ফুল কার না ভাল লাগে? কিন্তু ফ্ল্যাটে বাগান করা যায় নাকি?
    তোর ব্যালকনিটা অনেক বড়। এত চওড়া ব্যালকনি সচারাচর দেখাই যায় না। সে তোর ইচ্ছে না হলে করবি না। বেহালা পেরিয়ে আমতলা যেতে আমার এক দাদার খুব ভাল নার্সারির ব্যবসা আছে। একদিন ঘুরে আসবি চল। ওর গাছ আর ফুল দেখে ভাল লাগলে অবশ্যই তখন না হয় বাগান করার কথা ভাববি’।
    চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নন্দিনীর দিকে তাকাতে তাকাতে কথা শেষ করল ঋতু।
    নন্দিনী কথা না বলে বাইরের ব্যালকনির দিকে হাঁটা দিল। ঋতু মনে মনে হাসল।
    ৩.
    এই গাছটার নাম কী অশেষদা? নার্সারির মালিক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করল নন্দিনী।
    একদিনে কি এতগুলো গাছ চেনা যায়? গাছের নাম মনে রাখা যায়? আশিস হাসতে হাসতে বলল। তারপর একটা ছোট টব একটা উঁচু টেবিলে রেখে নিচের দিকের হালকা হলুদ হয়ে যাওয়া পাতা ছোট একটা কাঁচি দিয়ে কাটতে কাটতে বলল, ‘ঋতু তোর বন্ধু তো দেখছি তোর থেকেও বড় পাগল! তা তোর সাদা গোলাপ আর জবা গাছে ফুল ফুটেছে?
    ফুল না ফুটলে তোমার দোষ, ফুটলে আমার কেরামতি’। ঋতু খুব জোরে হেসে উঠল।
    আশিস খুব আস্তে আস্তে বলল, ‘আরে! দোষ আর ক্ষমতা কি আর বিপরীতার্থক শব্দ’? কথাগুলো ঋতুর কানে পৌঁছাল না। কিন্তু নন্দিনীর কানে গেল। সে মনে মনে বলল, দোষ, গুণ। ক্ষমতা, অক্ষমতা।
    আশিস আবার বলল, অক্ষম অথচ গুণী সা-এ সুর লাগাতে পারেন, কবিতা লিখতে পারেন কিন্তু ফুল ফোটাতে পারেন কি? অথচ দেখ দোষী অথচ ক্ষমতাবান অনেক কিছু করতে পারে। বাগান করতেও পারে, ফুলও ফোটাতে পারে।’ কথাগুলো বলতে বলতে আশিস তার নার্সারির ভিতর দিকে এগিয়ে গেল। নন্দিনী মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাগুলো শুনল এবং আশিসের পিছু নিল। এক জায়গায় গিয়ে আশিস থামল। ঋতুর নাম ধরে খুব জোরে ডাকল। ঋতু কাছে আসতেই বলল, এই গাছগুলো যে তোকে আগের বছর দিয়েছিলাম, ফুল ফুটেছিল? ফুল দেখেছিস?
    না তো! এইগুলোকে পানসেটিয়া বলে না?
    হ্যাঁ তো।
    এগুলোতে ফুল ফোটে বলে শুনেছিলাম। কিন্তু গত কুড়ি বছরে আমি কখনো এ গাছে ফুল ফুটতে দেখিনি।
    আশিসের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ঋতু বলল, “তাতে দুঃখ কীসের আশিসদা? শীতকালে এই গাছের পাতাগুলোই তো টকটকে লাল ফুল হয়ে যায়। তাই না?”
    কিন্তু কেউ যদি ফুলটাই দেখতে চায়?
    ঋতু উত্তর দিতে পারে না। কথাগুলো শুনতে শুনতে নন্দিনী বলে, আমি কিন্তু এই গাছটা নেবোই।
    ঋতু গুগল খুলে তার ফোনটা,এগিয়ে দিতে দিতে বলে, দেখ, দেখ। গাছের পাতাগুলো কেমন লাল হয়ে যায়।
    কেন হয় জানিস? আশিস নন্দিনীর জন্য গাছগুলো প্যাক করতে করতে বলে, আমাকে যিনি নার্সারির ব্যবসা শিখিয়েছিলেন তিনি বলেছিলেন, পাতা যখন লাল হবে তখন বুঝবে পানসেটিয়া গর্ভবতী হয়েছে। ব্যস ওই পর্যন্তই। গর্ভের সন্তান চোখে পড়ল না কোনো দিন।

৪.
বার দুয়েক ডোরবেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল নন্দিনীর। শেখর আজ আসছে সে তো তার জানাই ছিল। আর বুকে ছিল জমাট অভিমান। দু-মাসের ট্যুর শেষ হল সাড়ে চার মাসে! দরজা খুলে দিয়েই সে ঢুকে গেল রান্নাঘরে। চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে বাথরুমের গিজার অন করে দিল। তারপর শেখরের উদ্দেশ্যে বলল, ‘তাড়াতাড়ি স্নান সেরে এসো। চা রেডি।’
শেখর ব্যাগপত্র ঘরে রেখে এসে নন্দিনীর পিছনে এসে দাঁড়াল। পিছন থেকে কাঁধে হাত দিতেই নন্দিনী অভিমান দেখিয়ে বলল, ‘থাক, অনেক হয়েছে। আগে স্নান সেরে এসো।’ শেখর স্নান সেরে বের হবার আগেই নন্দিনী চায়ের পট আর কাপ একটা ট্রেতে সাজিয়ে ব্যালকনিতে বসল। শেখর স্নান সেরে সেখানে এসে চমকে উঠে বলল, ‘আরে! করেছ কী? এ তো এক্কেবারে লালে লাল! কী ফুল এগুলো?’
ফুল! ফুল দেখলে কোথায় শেখর? ওগুলো সব পাতা। সবুজ ছিল। কিন্তু এখন লাল। এখন নাকি ও গর্ভবতী। এই গাছটার নাম পানসেটিয়া। নার্সারির আশিসদা বলেছে যে সেও নাকি কোনোদিন ওর ফুল দেখেনি। পানসেটিয়া কোনো দিন ফুল ধারণ করার সৌভাগ্য অর্জন করে না শেখর। ঠিক আমার মতো’। প্রথমে গলা ধরে এলো আর তারপর কাঁদতে কাঁদতে শেখরের বুকে মুখ গুঁজে দিল নন্দিনী।
আরে! সব টবে একই গাছ কেন? কিছু ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা তো রাখতে পারতে!’ শেখর নন্দিনীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে।
পারতাম না। পারতাম না শেখর। আমি তো কোনো গাছ পুঁতিনি শেখর! ভাল করে দেখ শেখর, আমি তো নিজেকেই টবে টবে ছড়িয়ে দিয়েছি। এ গাছে কোনো ফুল হয় না শেখর। এ গাছে কোনো ফুল হয় না। তুমি কি তুলে ফেলে ডালিয়া পুঁতবে? কিম্বা চন্দমল্লিকা!
শেখর প্রথমে কিচ্ছু বুঝতে পারে না। তারপর অপ্রস্তুত পরিস্থিতির সবটা বুঝতে পেরে নন্দিনীর হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে ধরে চুমু খায়। নন্দিন, আই লাভ ইউ নন্দিন। নন্দিনী নিজেকে সঁপে দেয় শেখরের কাছে। শেখর ঘাড়ে, কানের লতিতে চুমু দিলে নন্দিনীর মুখ, কান লাল হয়ে যায়। শেখর দু হাতের তালুতে নন্দিনীর মুখ তুলে ধরে দেখল পানসেটিয়ার গাছে ফুল ফুটেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post