• December 4, 2021

ভূস্বামী রাজনীতির ত্রিপুরা এবং বামেদের মিথ

 ভূস্বামী রাজনীতির ত্রিপুরা এবং বামেদের মিথ

সিতাংশুরঞ্জন দে, আগরতলা :- ভূস্বামী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে ত্রিপুরা। বামেদের লালমাটির মিথ ভেঙে যাওয়ার পর গত তিন সাড়ে তিন বছরে বামেরা এক আউন্স শক্তির সঞ্চয় করতে পারেনি বরং খুইয়েছে। আবার বামেরা নীরবেই ঐতিহাসিক ভুল করে চলেছে। শক্তি, জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা শাসক বিজেপি জোটের কমলেও প্রধান বিরোধী বামেদের কিন্তু কিছুই বাড়ছে না। ফাঁকতালে মাথা তুলেছে তিপ্রা মথা নামের উপজাতি ভিত্তিক আঞ্চলিক দল। সে দলের প্রধান ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য প্রদ্যোতকিশোর দেববর্মন।
ত্রিপুরায় উপজাতিদের কাছে তিনি হলেন বুবাগ্রা। ত্রিপুরায় এক তৃতীয়াংশ উপজাতি জনসমষ্টির ভাষা ককবরক ত্রিপুরায় দ্বিতীয় সরকারি ভাষাও। এই ভাষার “হা বুবাগ্রা”। শব্দবন্ধের হা শব্দটির অর্থ হল ভূমি,পাহাড়, রাজ্য বা দেশ। এই ভাষায় গৃহস্বামীকে বলা হয় “নগ বুবাগ্রা”। সে অর্থে প্রদ্যোতকিশোর হলেন ভূস্বামী। তার পূর্ব পুরুষ ত্রিপুরার রাজা ছিলেন।সেই অর্থেই তাকে যে বুবাগ্রা বলা হয় তাতে আর সন্দেহ কি! দেশে রাজতন্ত্র না থাকলেও ত্রিপুরায় রাজপরিবারের প্রতি উপজাতি মানুষের রাজভক্তি অটল। রাজারা নিজেদের উপজাতি বলেন নি কখনো কিন্তু উপজাতিরা রাজাদের নিজ সম্প্রদায়ের বলেই মনে করে থাকেন। রাজমহলে সাতবার এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রাজার কদর প্রজারা বাস করতেন সমতলে, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন জেলাগুলিতে। ঐতিহাসিক কারণে সে অঞ্চলের মানুষের আয়ের দেশ ভাগের পর বর্তমান ত্রিপুরায় শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন, যারা মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ। ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্য ঘোষণা হলে তাঁর বিধানসভায় আসন সংখ্যা হয় ৬০। এর মধ্যে ২০ আসন উপজাতি সংরক্ষিত। প্রথম ১৯৭৮ সাল থেকেই ভোটের সময়ে বামের আগার ফলাফল পর্যালোচনায় আসন গুনত ২১ থেকে। কারণ উপজাতি ভোট মানেই বামেদের একচেটিয়া। ফলে প্রতিপক্ষ দলকে আসন গুনতো এক দুই বা তিন থেকে।
ছয়ের দশকে কাকদ্বীপ ষড়যন্ত্র মামলায় ত্রিপুরার পাহাড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন নৃপেন চক্রবর্তী। রাজন্য ত্রিপুরার পাহাড় তখন শাসন করছেন উপজাতি নেতা দশরথ দেব। নানান দিকে বিদ্রোহ বিক্ষোভ আন্দোলিত রাজ প্রাসাদ। তার মধ্যেই দশরথ দেবের নেতৃত্বে একদল শিক্ষিত যুবকের নিরস্ত্র, সশস্ত্র আন্দোলন চলছিল। দশরথ ছিলেন উপজাতি মানুষের কাছে রাজা দশরথ। নৃপেনবাবু, কমিউনিস্ট নেতা দশরথের আন্দোলনকে কমিউনিস্ট মতাদর্শের দিশা দেন ।এরপর থেকে ২০১৮ অব্দি ত্রিপুরার পাহাড় ছিল বামেদের গড়। বিপর্যয় এলেও তা সহজেই কাটিয়ে উঠেছেন তারা।
নির্বাচনে বামেরা মাত্র দুটি আসন পায় পাহাড়ে আর ২০২১ এর এপ্রিলে রাজ্যে দুই-তৃতীয়াংশ জমি নিয়ে গড়া ত্রিপুরা উপজাতি স্ব-শাসিত জেলা পরিষদের(এডিসি) ভোটে শূন্য হাতে ফিরেছে। এর পরও সিপিএম তাদের দলীয় মুখপত্রে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে কারণ এই ভোটে শাসক বিজেপি হেরেছে ।এ যেন ২০১৯ লোকসভার পশ্চিমবঙ্গ। মমতাকে শিক্ষা দিতে বামেদের ভোট চলে গেল বিজেপিতে। যদিও সে ভোট তারা আর ফেরাতে পারলেন না 2021 বিধানসভায়। উল্টে যা ছিল তার কিছুটা গেল মমতার দিকেই। ত্রিপুরায় বিধানসভার ভোট আসছে ২০২৩ সালে।এডিসি ভোটে দেখা গেছে কিছু কিছু সিপিএমের প্রার্থী ভোট পেয়েছেন। কি করে সম্ভব। অঙ্ক একই । বিজেপিকে শিক্ষা দিতে তিপ্রা মাথাকে ভোট । ২৩শে সে সব ভোট কি ফেরাতে পারবে বামেরা ?এখান থেকে উত্থানে কংগ্রেসের রাহুল কেবিনেটে ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত ত্রিপুরা কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি রাজবাড়ীর সদস্য প্রদ্যাতকিশোর দেববর্মনের। এটি স্পষ্ট যে এটিসি ভোটে এক তিরে দুই শিকার করেছেন প্রদ্যাত কিশোর। তার তিপ্রা মথা উপজাতি এলাকার দখল নিয়েছে একাধারে শাসক জোটের আইপিএফটি এবং প্রধান বিরোধী সিপিএম কে কাহিল করে দিয়ে। ২০১৮ তে বিজেপির জোটসঙ্গী আইপিএফটি শ্লোগান ছিল, তুইপ্রা ল্যান্ড। অর্থাৎ উপজাতিদের জন্য পৃথক রাজ্য। এবার এডিসি ভোটের আগে রাতারাতি তিপ্রা মথা দল গঠন করে নিয়ে শ্লোগান নিলো, গ্রেটার তুইপ্র্যাল্যান্ড চাই। বাস উড়ে গেল আইপিএফটি। তাঁদের অস্তিত্ব এখন কেবল বিজেপির মন্ত্রীসভায় দুই মন্ত্রীর ঘরে। এর বাইরে সবটাই মিশে গেছে মথার সঙ্গে। এই যখন পরিস্থিতি তখন সিপিএমের নেতারা এখনো ভাবছেন, বলছেন ও,- ত্রিপুরার মানুষ ভুল করেছে। মানে ভাবটা এমন যারা বিজেপিকে ভোট না দিয়ে ভুল করল যারা্যতারাই যেন আবার সিপিএমকে ক্ষমতায় এনে দেবে। তাঁদের এই ভাবনার কারন হল বিজেপি সরকারের প্রতিশ্রুতি খেলাপ। রাজ্যে ডবল ইঞ্জিনের সরকার প্রতিষ্ঠা হলে সরকার যা যা করবে তার একটা লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেই ভিশন ডকুমেন্টে ২৯৯ টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি হলো বছরে ৫০ হাজার বেকারের চাকরি, কর্মসংস্থান। স্বাভাবিক ভাবেই দিল্লির সহযোগিতা ছাড়া এই সব পুরন অসম্ভব। আর মোদি সরকার কর্মসংকোচন, কর্ম বিমোচন ইত্যাদি কারণে সারা দেশে যে পরিমাণ অপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার পর সে সব প্রতিশ্রুতি পূরণ ত্রিপুরায় যে একেবারে অসম্ভব তা বুঝে গেছে। কিন্তু এতে কি সিপিএমের প্রত্যাবর্তন সম্ভব?
মোদি জনপ্রিয়তা হ্রাসের ফল দেখা গেছে বঙ্গের ভোটে। মোদির সোনার বাংলা প্রতিশ্রুতি মানুষ বিশ্বাস করলেন না। এটা ঠিক বাংলার ফলাফল ত্রিপুরার বহু মানুষ উৎফুল্ল। তারা ঘোষণা দিয়ে কেউকেউ বিজেপি ছাড়ছেন তৃণমূলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস তো আর নেই। তার পাট চুকিয়ে দিয়ে সুদীপ রায় বর্মনদের নেতৃত্বে ছয় সাত বিধায়ক বিজেপিতে মিশে গিয়েছিল ২০১৮ সালে। আর এর আগেই বিজেপি গিয়েছিলেন মুকুল রায়। সুদীপবাবু বিজেপির হয়ে ভোটে জিতে বিপ্লব দেবের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। বহিস্কৃত হয়ে সংস্কারবাদী বিধায়ক দলের নেতা হলেন এবং দিল্লি গিয়ে বিপ্লবের অপসারণ চাইলেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আশ্বাসে এখন তিনি ঘরেই আছেন।
যতদিন ত্রিপুরায় তৃণমূল ছিল তার দেখাশোনা করতেন মুকুল রায়, আর শেষ দিকে এসেছিলেন সব্যসাচী বসু। মুকুলের প্রত্যাবর্তনে ত্রিপুরার রাজনীতিতে আশা জেগেছে হয়তো আবার খোলা হবে ত্রিপুরায়। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন, সুদীপ বাবুদের কি আবার ফেরানো হবে? ত্রিপুরা বিজেপির অভ্যন্তরের যে ছবি বারবার প্রকাশ্য হয়েছে তাতে এটি স্পষ্ট যে সুদীপবাবু দের পক্ষে এই ঘরে টিকে থাকা অসম্ভব। রাজনীতি বা প্রশাসনে বিপ্লব দেবকে যতই আনকোরা বা অনভিজ্ঞ বলা হোক দিল্লি তাঁকে সরাতে চাইবে না। আবার তার কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া দল টিকে থাকাও সম্ভব নয় সংস্কারবাদী সুদীপ বর্মনদের। সেক্ষেত্রে সম্মানজনক পথ হতে পারে আঞ্চলিক দল গঠন। সেখানেও কিন্তু সমস্যা থাকবেই। সে হল মথার কর্তৃত্ব। ২০ আসনের মথাই এখন নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠেছে এই রাজ্যে।
যদি এমন হয় নতুন লোকজন এনে ত্রিপুরায় সংগঠন করবে তৃণমূল কংগ্রেস তাদেরও মথা নির্ভরতা থাকবেই। উপজাতি এলাকায় গিয়ে বাংলার দলের পক্ষে মাটি পাওয়া কঠিন। ততদিনে দিল্লি আর রাজ্যের ক্ষমতায় বসা বিজেপি নিশ্চয়ই হাতে হাত দিয়ে বসে থাকবে না।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post