• December 4, 2021

ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, অস্ত্র যখন ধর্ষণ

 ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, অস্ত্র যখন ধর্ষণ

ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, অস্ত্র যখন ধর্ষণ

কোয়েল সাহা (গবেষক, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়) : ভরা যৌবনের একটি মেয়ে, যে সগর্বে মাথা উঁচিয়ে হেঁটে যায়। এ দর্প বোধহয় সহ্য হয় না। যে ফ্রেম আপনার আমার সমাজ তৈরী করে মেয়েদের জন্য, তা বোধহয় ভেঙে যাবার সম্ভাবনা থাকে প্রতি মুহুর্তে। তাই দর্প ভেঙে দিতে চায় ফ্রেমটিকে অটুট রাখার জন্য। হ্যাঁ, এরকমই এক রাস্তায় নেমেছিলেন গ্রামীন পাঞ্জাবের দলিত পরিবারের মেয়ে নওদ্বীপ। স্কুল ছুট হলেও দমে না গিয়ে, হাতের কলম আর চেতনার ধারে মাঞ্জা দিতে ভোলেননি। কেবল নিজের অধিকার নয় লকডাউনে রাতারাতি কাজ হারিয়ে রাজধানী শহরের কুন্ডলি অঞ্চলে বন্ধ কারখানার দরজার বাইরে দাঁড়ানো আরও অনেক শ্রমিকের হক প্রতিষ্ঠার জন্য সোজাসুজি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন অধিকার কেড়ে নেওয়া মালিক পক্ষের দিকে। পরিণামে রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীর মুঠোয় মাথার বেনী আর গোটা শরীরের বিভিন্ন অংশ ধরে পাশবিক টানাটানি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল নারী ঘরের পরিসর ছেড়ে আন্দোলনে সামিল হলে রাষ্ট্র সেখানে আইনকে বুড় আঙ্গুল দেখিয়ে পুরুষের পেশি শক্তিকে খোলামেলা ভাবেই ব্যবহার করে থাকেন।
মেয়ে মানুষের চরিত্র হয়। তা ফ্রেমে বাঁধানো থাকে। বড় ঠুনকো। ইচ্ছে হলে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখা যায় আর ইচ্ছে মত যায় ভাঙা। মেয়ে মানুষের চরিত্র শরীরকে জড়িয়ে পেঁচিয়ে বেড়ে ওঠা মিথোজীবি সম্পর্ক। বাড়ির উঠোন সমাজ রাষ্ট্র এই মিথোজীবি সম্পর্ককে দুই হাতে ভোট দেবেন। কেউ দেবেন বুঝে আর কেউ না বুঝে। সত্যি এটাই যে – হাত তুলবেন সবাই।
থাংজাম মনোরমা ২০০৪ – রাষ্ট্রো সুরক্ষায় যার শরীর হয়ে ওঠে জলপাই পোষক মিলিটারি বাহিনীর টার্গেট। গণধর্ষনের এই খবর অনড় শীতল শরীরের অবক্ত ভাষা মণিপুরের মায়েদের বাকময় শরীরি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে কাংড়া ফোটের সামনে থেকে তামাম দুনিয়ার পিতৃতান্ত্রিক বর্বরতাকে উলঙ্গ করে দেয়। এক নারী শরীর ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের যেমন নিশানা হয়েছে ঠিক তেমনই শরীর হয়েছে নগ্ন প্রতিবাদের ভাষা।
নারী শরীর মন অত্যাচারের ক্ষত, ইতিহাসের করুণ গাঁথা। ইতিহাসের এই অধ্যায় ভৌগোলিক সীমানা, চেতনা মূল্যোবোধ ম্লান করে দেওয়া মানুষের তৈরী সভ্যতার কলঙ্ক। এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা, ইত্যাদি কোন মহাদেশ এই ধর্ষণ অস্ত্রটিকে বাদ দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রাখতে পারেনি। সুদূর সুদান। আফ্রিকা মহাদেশের এই ছবি ঘুরে ফিরেই টিভি পর্দা থেকে পত্রপত্রিকার শিরোনামে এসেছে। আড়ালে থাকা সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার খেলা- দুটি উপজাতির মধ্যে নিজেদের লড়িয়ে দেওয়া। দক্ষিণ সুদানের নুইয়ে উপজাতি ও ডিনকা উপজাতি। যেখানে প্রথম দিন কোন গ্রাম আক্রমনের প্রথম কাজ হয় স্বামী থেকে ৫-৭ বছরের বাচ্চাদের খুন করা। মহিলা ও মেয়েদের মারা হয় না। শুধু ধর্ষণ করবে বলে বাঁচিয়ে রাখা হয়। বাঁধা দিলে বিষয়টা অন্যরকম। তারপর ২৭ বছরের মেরি নামক মায়ের সামনে চলে-
কী চলে তার কোন শব্দ ভাষার জগতে এখনও আবিস্কৃত হয়নি। ১০ বছরের নায়ালত কেবল রক্ত। এরপর আসে মেরির কাছে। কয়েক ঘন্টার মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত হয় ১০ বছরের নায়ালতের। আর মা মেরি!
বেঁচে থেকে পেয়েছে মৃত্যুর মানপত্র।
দেশের শিক্ষিত প্রগতিশীল সমাজ বলবে সাম্রাজ্যবাদের নিশানা খনিজ। ফলাফল জীবন মৃত্যু নিয়ে খেলা।
স্থান ভারতবর্ষ। কাল ২০১১। শীতের রাত। বান্ধবের সাথে সিনেমা দেখে ফেরার পথে রাস্তায় চলমান বাসে প্রথমে ধর্ষণ তারপর খুন হতে হয়। ধর্ষক জানিয়েছে খুন তাকে করত না। তারা মেয়েটিকে সামান্য শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। সামান্য ধর্ষণের মধ্যে দিয়ে। মেয়েটি বাঁধা দিয়েছিল তাতেই বিপত্তি।
ভৌগোলিক সীমা, সংস্কৃতি সব বদলে পাল্টে গেলেও নারীর বিষয়ে স্লোগান একটাই।
আমাদের দেশ ভাগের মোটা দাগ মাথা পেতে নিয়েছে এদেশ ওদেশ; মাথা নীচু ঘাড় নিচু ঠিকানার খোঁজে নাজেহাল মানুষ গুলো। ছিঁড়ছে শিকড়ের টান। দেদার সম্পদ লুঠের সঙ্গে নারী ভাগ্যে জুটেছে ধর্ষণ।
একদিকে স্বাধীন দেশ গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার হর্ষধ্বনিতে মাতোয়ারা পূর্ব-পশ্চিম দু পারের সীমানা। অন্যদিকে নারী শরীর – তার রক্ত ভেষে গেছে। মান্টোর সকিনারা দু দেশের কাঁটা তারের মাঝে দাঁড়িয়ে তাই বোধহয় আজও পায়জামার ফিতে খুলেই যাচ্ছেন।
যে লুঠ ধর্ষন খুন এর মধ্যে দিয়ে ১৯৪৭ এ জাতীয় পতাকা উঠেছে তা এত সহজে অতীত ভুলবে কি করে, বলা ভালো সেই রক্ত ভেজা মাটির শপথ নিয়েই বোধহয় স্বাধীনতার ৬৯ বছর পরেও ভারত রাষ্ট্র তার নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ ঘোষণা করে – কাশ্মীর, বস্তার আস্ত একটা দেশের জনগণের উপর যুদ্ধ চাপায়। নিজের দেশের জনগণকে ভাগাভাগি করে ধর্মের নামে রাজনীতির নামে উন্নয়নের নামে, যুদ্ধ চলে।
সাধারণ মানুষ মারা পড়েন, দিশেহারা হন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে এলেও দু পায়ে ভর করে নারী যাতে দাঁড়াতে না পারে তার জন্য ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের ধর্ষণ অস্ত্র সদা স্বকীয়। সেই যৌন অত্যাচারের কদর্য চেহারা একা তুমিই জান, নারী।
বাড়ির উঠোন, সমাজ, রাষ্ট্র তোমার জন্য চরিত্রহীনতার দেওয়াল লিখন খাপ পঞ্চায়েত ধর্ষণের নিত্য নৈমেত্তিক দাঁড়ি কমা নিয়ে তৈরী।
যুদ্ধ জয়ের লুটের মাল তুমি গ্লোবালাইজেশনের খোলাবাজারি মাল-
সমাজতন্ত্রের অর্দ্ধেক আকাশ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post