• December 4, 2021

শিক্ষার আদিগন্ত যাত্রা – শিক্ষার বিবিক্ত পথিক

 শিক্ষার আদিগন্ত যাত্রা – শিক্ষার বিবিক্ত পথিক

শিক্ষার আদিগন্ত যাত্রা – শিক্ষার বিবিক্ত পথিক

জয়ন্ত ভট্টাচার্য :

আজ থেকে ৫০ বছরেরও বেশি আগের কথা। এক ছোট মফস্বল শহর সেদিন রায়গঞ্জ। সব জায়গাতে ইলেকট্রিসিটিও নেই। আমাদের স্কুল কোয়ার্টার্সেও ছিল না। বাবা একটি মেয়েদের স্কুলের সংস্কৃতের শিক্ষক ‘পণ্ডিত মশাই’ ছিলেন। দেখেছি স্থানীয় ইউনিভার্সিটি কলেজের সংস্কৃতের অধ্যাপকও কোন দুরূহ শব্দতত্ত্ব বা অলঙ্কার নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের বাড়িতে আসতেন। সেসময়ের শিক্ষক! বোধহয় মাসে শ’দেড়েক বা দুয়েক টাকা মাইনে। বাড়িতে সম্ভ্রান্ত অতিথি এলে বসতে দেবার মতো ভালো কোন আসবাবপত্রও ছিল না। ছিল মা-র তৈরি স্বাদু জলখাবার আর চা। তাতে জ্ঞানচর্চার প্রবাহে কোন ঘাটতি পড়েনি। এসব দেখেশুনে আমার বড়ো হওয়া, বেড়ে ওঠা। শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছে আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশ।

বাবা, তুমি সেদিন পণ্ডিতম্নন্য কোন এক কলেজ শিক্ষকের ভুল সংস্কৃত এবং ততোধিক ভুল ব্যবহারের প্রকাশে বড়ো সংকুচিত হয়ে পড়েছিলে। দেবভাষার অমর্যাদা দেখে উত্তেজিতও হয়েছিলে ঈষৎ পরিমাণে। যদিও তেমন কোন বহিঃপ্রকাশ ছিলনা। আমি তখন সদ্যই ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে পড়ি। তোমার মুখ থেকে শুনে শুনে কালিদাস এবং অন্যান্য ধ্রুপদী সাহিত্যের রস অস্পষ্টভাবে পাচ্ছি। বাবা, তুমি সেই শিক্ষককে মুখের ওপরে কথাচ্ছলে বলেছিলে –

অগাধ জল সঞ্চারি রোহিত নৈব গর্বিতম ।

গণ্ডুষ জল মাত্রেন সফরি ফরফরায়তে ।।

এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায় – “গভীর জলে সঞ্চরণশীল  রুই মাছের মতো বৃহৎ মৎস্য নিজেকে (আত্ম) নিয়ে গর্বিত নয়, কিন্তু গণ্ডুষ মাত্র জলে একরত্তি মাছ পুঁটি বড্ডো আওয়াজ করে।” 

এমনই দুর্ভাগ্য, সে ভদ্রলোক এর অর্থ বোঝেননি। বাবা রেগে গেলে আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতেন। বললেন, “তুমি এই কথাগুলো সারাজীবন মনে রাখবে। কখনো সামান্য জ্ঞান নিয়ে মানুষের সাথে উন্নাসিক আচরণ করবেনা। নিজেকে জাহির করার চেষ্টা কখনো করবেনা। এতে মানুষ ছোট হয়ে যায়।”

জীবনের এতগুলো দশক আরো হাজারো মানুষের মাঝে, সাথে নিজেকে নিয়ে “সফরি ফরফরায়তে” করেই কেটে গেলো। তোমার বলা কথাগুলোর তেমন মর্যাদা রাখতে পারলাম কোথায়, বাবা?

আরেকটা পরিবেশও তো আমাকে শিক্ষিত করেছে। আমার দাদা তৎকালীন বিপিএসএফ-এর একনিষ্ঠ, সৎ, জঙ্গী কর্মী। দাদার বেসুরো গলায় “গঙ্গা যদিও মেকং নয় মেকং তোমায় লালসেলাম / এসো গঙ্গা মেকং এক করি এদেশে ভিয়েৎনাম গড়ি” এরকম সব গণসংগীত শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছি। আগেই বলেছি বাবা অতি সামান্য মাইনের আদর্শবাদী স্কুল শিক্ষক ছিলেন। অথচ বাড়িতে ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের (যাদেরকে সেসময়ে নবকংগ্রেসী বলা হত) দুস্কৃতিদের সশস্ত্র গুলি, বোমা, বন্দুকের আক্রমণ থেকে শেল্টার নেবার জন্য একের পরে এক দাদার কলেজের বন্ধুরা, ছোট-মাঝারি-উঁচু মাপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর কতো কতো গ্রামের মানুষ আসছে, থাকছে, খাচ্ছে। আমাদের বাড়িতে যতজন মানুষ তার সমান বা আরো বেশি মানুষের অন্নসংস্থান করতে হচ্ছে প্রতিদিন সামান্য সংগতিসম্পন্ন বাবাকে। যারা আসছে, থাকছে, খাচ্ছে, শেল্টার নিচ্ছে, তারা সবাই ১৯৬০-৭০-এর দশকের গোড়ার দিকের সিপিএম দলের নিষ্ঠাবান কমিউনিস্ট কর্মী।

কেউ স্ব- বা আত্ম-কে কেন্দ্র করে বাঁচেননি, নিজেদের আগামী সঞ্চয়ের জন্য কোন মূলধন জমিয়ে রাখেননি। আত্মাহুতি, মানুষের পেট-ভাত-কাপড়ের লড়ায়ে জীবন বাজি রেখে লড়াই করা, নিজের বিশ্বাস আর জীবনবোধের জন্য সবকিছু বাজি রাখতে পেরে চলা – এরকম চলমান মাথা-উঁচু করে চলা জীবনের চলচ্ছবি দেখেইতো তুমি বড়ো হয়েছ, জয়ন্ত! তোমার বাবা মা? কোন সঙ্গতি ছাড়াই বাড়ির যেসব বিক্রয়যোগ্য সামগ্রী আছে সেসব লুকিয়ে বিক্রী করে এদের খাবার জোগার হয়েছে। তোমার মা-কে না এক বড়ো নেতা, পরবর্তী সময়ের এক নামী গায়ক তথা সঙ্গীতপ্রতিভা সন্ধানী ব্যক্তিত্ব, বলেছিলেন – আমাদের “গোর্কির মা”! সেসময়েই তো প্রথম তুমি পড়েছিলে ম্যাক্সিম গোর্কির দুনিয়া কাঁপানো উপন্যাস “মা”, বাংলা অনুবাদে। সে এক অন্য জগতের অনুভূতি, কেমন উথালপাথাল করছিল বুকের একেবারে মধ্যিখানে। তোমারও তখন মানুষের যা কিছু ক্ষতি করে তার হাত চেপে ধরে “মা”-র পাভেলের মতো বলতে ইচ্ছে করছিল –“ব্যাস, অনেক হয়েছে।”

তুমি বোঝোনি তখন, বোঝার সময় আর ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি, আধুনিক ডিসকোর্সের ভাষায় যাকে এখন trace বা ছাপ বলে অ্যকাডেমিক মহলে, সে trace রেখে গিয়েছিল সেসব টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলো তোমার অস্তিত্বে। এ trace-তো তোমার দূরাগত জীবনের জলছবি নির্ধারণ করে দিয়েছিল শুধু সেদিনের জন্য নয়, ভবিষ্যতের অনাগত সময়ের জন্যও।

সেদিন জেনেছিলে বুকের বাঁদিকে জামার নীচে থাকে এক ধুকুপুকু হৃ্দপিন্ড, যাকে বলে হৃদয়। সেখানে তখন জীবনের ছোট কুলুঙ্গিতে সঞ্চয়ের বদলে ব্যয়ের আয়োজন বেশি, স্ব-রক্ষার চাইতে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর জীবন তিয়াসা অনেক প্রসারিত অস্তিত্বব্যাপী, সেখানে জীবন উপচানো আশ্চর্য শস্যকে সামাজিক শস্য বলে গণ্য করা হয়েছিল। আরো অনেকদিন পরে যখন তুমি বড়ো হচ্ছো, খানিকটা লেখাপড়া শিখেছ তখন পেয়েছিলে অত্যাশ্চর্য এদুটি লাইন –

সমস্ত আকাশ ভরা আলোর মহিমা

তৃণের শিশির-মাঝে খোঁজে নিজ সীমা।

চারপাশে একটা প্রবল কিছু চলছে টের পাচ্ছিলে তুমি। তোমার দাদার বন্ধুরা লুকিয়ে তাদের আত্মরক্ষার জন্য (অন্যদের ক্ষেত্রে আক্রমণের জন্য যদিও! – হাতিয়ারের কি আর জাত বিচার হয়? কে করছে কেন করছে – এটাই তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ) “গুপ্তি”, গ্রেনেড আরো কি কি সব আনতো টানতো। কেমন যেন মনে হত ঐ কিশোর মনে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের গল্পে পড়া রোমাঞ্চ তোমার পরিচিতদের মাঝে দেখতে শুরু করলে। দিয়েন বিয়েন ফু-র কাহিনী তোমার সবুজ-মাখা চোখে কি অসম্ভব উজ্জ্বলতা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তুমি চোখের সামনেই দেখতে পেতে সেই প্রকান্ড লম্বা টানেলের শেষ প্রান্ত আর ভিয়েতনামের অসমসাহসী যোদ্ধাদের। মনে হত তুমিতো ওদের সাথেই আছো! একইভাবে জলে-জঙ্গলে দিন কাটাচ্ছ। এই নাপাম বোমা ফেলতে এলো প্লেন আর তুমি লুকিয়ে পড়লে বাংকারে। তোমার বন্ধুরাও কি অনুভব করতো এরকম অনাস্বাদিতপূর্ব রোমাঞ্চ, শিহরণ জাগানো উত্তেজনা? উত্তর অজানা।

তোমার কিশোর মনে বারেবারে এসেছে – কিছু একটা ঘটছে। তোমার চোখের সামনে দেখলে ভোটের সময়ে চোয়ারে, হিংস্র চেহারার কিছু যুবক খোলা স্টেন গান নিয়ে (সিআরপিএফ, পুলিশের চোখের সামনে) বুথ বন্ধ করে দিয়ে ভোটারদের বের করে দিল। ২০১৭ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে বলে তোমার বাবা শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাইকে দেখে সমীহ নিয়ে কথা বলেছিল স্টেন গান আড়ালে রেখে। এখন মনে হয় তখনো খানিকটা সামাজিক বোধ বুঝি ক্রিয়াশীল ছিল।

জয়ন্ত, তুমি যখন রায়গঞ্জের স্কুলে পড়তে সেসময়ে স্কুলের দেয়ালে আলকাতরা দিয়ে লেখা দেখেছিলে – “চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান / চীনের পথ আমাদের পথ”। দেখেছিলে – “বিপ্লব জনতার উৎসব”। দেখেছিলে – “বিপ্লব কোন সূচিশিল্প নয়” এবং আরো কতো কতো লেখা যেগুলো কিরকম এক শিহরণ জাগাতো সমস্ত সত্তা জুড়ে। কলকাতার দেয়ালেও দেখলে সেসব শ্লোগান – কোথাও আলকাতরা দিয়ে, কোথাও লাল রঙ দিয়ে।

অনেকদিন পরে যেদিন “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না” যেদিন পড়েছিলে সেদিন বুকের মধ্যে সমুদ্রের ঢেউ ফুলে ফুলে উঠছিলো, ভেঙ্গে ভেঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তোমাকে –

             এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না

            এই জহ্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না

            এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না

            এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না

           আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেবো

           ……

           ভালোবাসা – যার থেকে আলোকবর্ষ দূরে জন্মাবধি অছ্যুৎ হয়ে আছি –

           তাকেও ডেকে নেবো কাছে বিপ্লবের উৎসবের দিন

তোমার কৈশোর, রায়গঞ্জের পরিচিত প্রাণস্ফূর্তিতে উচ্ছ্বল জীবন প্রবাহের দিন একসময়ে শেষ হল। ৪৫ বছরেরও বেশি আগে যেরকম রেজাল্ট করলে গ্রামাঞ্চল থেকে খোদ ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া যায় সেরকম এক পরিস্থিতিতে কলকাতায় এসে উপস্থিত হলে তুমি। হাওড়া স্টেশনে দেখলে দেয়াল জুড়ে বড়ো বড়ো করে লেখা আছে – “জরুরী অবস্থা মানে অনুশাসন”। কোন এক ত্রিকালজ্ঞ ঋষির কথা ছিল সেটা, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির ঘনিষ্ঠ। মেডিক্যাল কলেজে ঢুকে জানলে কিছু ছাত্র ইউনিয়নের দাদাদের হাতে মার খাচ্ছে। ওরা নানারকম কথা বলে – জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে, ডাক্তারকে রোগীর আরো কাছে যাবার কথা বলে, বলে এক বিদেশী সার্জন নর্ম্যান বেথুনের কথা। কৃতবিদ্য নর্ম্যান বেথুন চীনে যুদ্ধের সময়ে সামনে থেকে আহত কমিউনিস্ট যোদ্ধাদের চিকিৎসা করেছিলেন। এসব কথাও নাকি তিনি বলেছিলেন – ডাক্তারের কাছে রোগী আসতে না পারলে ডাক্তার যাবে রোগীর কাছে। ওঁকে নিয়ে লেখা “দ্য স্ক্যালপেল, দ্য সোর্ড” বইখানাও দাদারা পড়তে দিল। এ বইটাতে পরে আসছি। তার আগে বলতে হবে সেসব মার খাওয়া দাদারা  মিলে গড়ে তুললো মেডিক্যাল কলেজ ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (MCDSA)। আমিও এর একজন সাথী ছিলাম। বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, আবেগী অনুভব সম্বল করে।

কি তুমুল এক স্রোত বইতে শুরু করলো – জীবন, রাজনীতি, জীবনের যাপন, বন্ধুত্ব আর কমরেডশিপের অপরূপ যৌগপদ্যে। কোথায় সাঁওতালডিহির শ্রমিক আন্দোলন – হাজির আমাদের দল। কোথায় মেদিনীপুরের বন্যা – হাজির আমরা। কোথায় টিবি হাসপাতালের আন্দোলন (এখন যেটা কেপিসি মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে) – হাজির আমরা। কোথায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ছাত্রদের ওপরে আক্রমণ – হাজির আমরা। আমাদের কণ্ঠে গান – “কমরেড শোন বিউগল ওই হাঁক ছেড়ে, তোল কাঁধে নে জঙ্গী হাতিয়ার”। আমরা সর্বত্র। এর মাঝে কলেজে ছাত্র ইলেকশন হল। রেকর্ড ভোট পেয়ে ছাত্র প্রতিনিধি হলাম। আরো জড়িয়ে গেলাম।

হঠাৎ করে এক স্বর্ণখনির সন্ধান পেলাম। বা বলা ভালো সেসসময়ে সমস্ত পড়ুয়া দুনিয়া পরিবর্তনের স্বপ্নে উদ্বেল ডাক্তারি ছাত্রদের হাতে হাতে ঘুরতো The Scalpel, The Sword – কানাডার ডাক্তার নর্মান বেথুনের অত্যাশ্চর্য জীবনকাহিনী। ততোধিক অত্যাশ্চর্য অভিজ্ঞতা হল বইটির পাতার শব্দের দুটি শব্দের মাঝের অর্থের গভীরে ডুব দিয়ে। চীনে কমরেডরা তাঁকে আদর করে পাই চু এন বলে ডাকতো। এমন আদর পেতে কে না চায়? আমারও মনের মাঝে আকুলি-বিকুলি শুরু হল। জানলাম এক স্ব-জাত উদ্ভাবনী প্রতিভা বাসা বেঁধেছিল বেথুনের মাঝে। তখনো দুরারোগ্য টিবির চিকিৎসায় নতুন ধরণের সার্জারির উদ্ভাবন করলেন। যে সমস্ত পুস্তক-কেন্দ্রিক সার্জনরা বইয়ের বাইরে যাননা, নতুন পথে রোগীর চিকিৎসা করতে অপারগ তাদের জন্য বললেন – “The surgeon who can’t see the hints and answers the nature and the world thrust into his face should be digging ditches, not massacring the human body.” তাঁর তত্ত্বাবধানে ৭৩টি thoracoplasty (যে অপারেশনে রোগীর ফুসফুসের সার্জারি করা হত টিবি সারানোর জন্য) সহ ৩০০-র ওপরে বড়ো ও ছোট সার্জারি করা হয়েছিল এক বছরে। তাঁর গবেষণাপত্র Canadian Medical Association Journal এবং Journal of Thoracic Surgery-র মতো মান্য জার্নালে ছাপা হয়েছে। চীনে যাবার আগে স্পেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। চীনে গিয়ে যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে blood transfusion-এর ব্যবস্থা করলেন। তাঁর যাপ্য মন্ত্র ছিল – every leader starts by first leading himself. যুদ্ধক্ষেত্রে দিনে ২০টির বেশি অপারেশন করেছেন বেথুন। চীনের মুক্তিসংগ্রামে সবচেয়ে কার্যকরী অষ্টম রুট বাহিনীর তরফে তাঁর মাসোহারা যখন ১০০ ডলার দেবার প্রস্তাব দেওয়া হয় তখন তিনি সটান প্রত্যাখ্যান করেন সে প্রস্তাব। তখন একজন কমান্ডার পেতেন মাসে ৮ ডলার, একজন সৈনিক মাসে ১ ডলার। তিনি নিজেকে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে গণ্য করে মাসে ১ ডলার মাসোহারা নিতে সম্মত হন। তাঁর এক ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন সেটা হুবহু তুলে দিচ্ছি। অনুবাদ করলে এর ওজস্বিতা ভেঙ্গে যাবে।

আমরা খেয়াল করবো কাদের উনি ধন্যবাদ দিলেন। কোন নেতা বা বীরকে নয়, যারা প্রতিদিন জীবন উৎসর্গ করে চলেছেন সেসব অনামা, ইতিহাসের প্রান্তবাসীদের। বেথুন আগুন জ্বালিয়ে দিলেন আমার শরীরের সমস্ত কোষে। একদিকে মেধাবী ছাত্র হিসেবে আমার গবেষণার আকাঙ্খা, আরেকদিকে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে সামিল হবার সুতীব্র আবেগ – এ দুয়ের মেলবন্ধন ঘটালেন তিনি।

আমার শিক্ষা, আমাদের শিক্ষা ছড়িয়ে আছে এরকম কত অমোঘ দ্বন্দ্বের মাঝে, যন্ত্রণা-দীর্ণ হবার মাঝে। শিক্ষা যে একটি সরলরৈখিক ধারায়, চারধারে দেয়ালের ঘরে, স্তুপাকার পাঠ্যপুস্তকের মাঝে ধরা আছে – এমন শিক্ষা পাইনি আমার বেড়ে ওঠার, গড়ে ওঠার জীবনে।

সেরকম অগ্নিস্রবা সময়ে খোলা চোখে দেখতে পেলাম, চোখের সামনেই দৃশ্যমান হল, মেডিক্যাল কলেজের যে দাদাদের একটি অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে মনে করতাম তারা আসলে অনেকগুলো সত্তা। তাদের অনেক রাজনৈতিক বিভাজন। কেউ চারু মজুমদারকে নাকচ করছে সরাসরি, দায়ী করছে সত্তরের দশকের সমস্ত বিপর্যয়ের একমাত্র evil spirit হিসেবে। কেউ চারু-লিন পিয়াও পন্থী, কেঊ চারু-লিন বিরোধী অবস্থানে। কেউ মাঝামাঝি এক রাস্তায় হাঁটছে, কেউ কেবলমাত্র গণআন্দোলনের কথা বলছে। কেউ বলছে গ্রামে চলো, কারো মুখে ডাক্তারি শিখে বৈপ্লবিক চিকিৎসাব্যবস্থার কথা। কিন্তু সত্তরের দশকের জ্বলন্ত (গলন্তও বটে) প্রশ্নগুলোর সরাসরি কোন উত্তর পাচ্ছিনা।

অনীক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত চিন চিং মাই-এর উপন্যাস (যৌথ উপন্যাসও) “বিপ্লবের গান” অন্তরের জ্বালামুখ খুলে দিচ্ছে। কোথায় যাবো আমি? আমি কে? কিভাবে যাপিত হবে আমার জীবন? মেধার একটুখানি গুমোর বুঝি সবারই থাকে। আমিও কোন ব্যতিক্রম ছিলামনা। গোগ্রাসে মার্ক্সবাদের বুনিয়াদি বই বলে যেগুলো প্রচলিত ছিলো – সে মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও, এমনকি রোজা লুক্সেমবার্গ, হোচি মিন, চে গুয়েভারা অব্দি – সবই আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছি। চার খণ্ডে প্রকাশিত “মার্ক্সবাদী সাহিত্য বিতর্ক” পড়ছি, পড়ছি আন্তর্জাতিক “মহা বিতর্ক” বা great polemics-এর দলিলগুলো। পড়ছি সুপ্রকাশ রায়-এর “ভারতের কৃষক সংগ্রাম এবং গনতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস”। কি বিপুল শ্রম এবং যত্ন নিয়ে একটি পুস্তকের জন্ম হতে পারে প্রত্যক্ষ করলাম এ বই-এ। এর সাথে আরো দুটি আশ্চর্য বই পড়লাম – স্পেনের গৃহযুদ্ধের নেত্রী ডলোরেস ইবারুরির (Dolores Ibarruri) লেখা অদম্য প্রতিরোধ সংগ্রামের কাহিনী “লা পাসনারিয়া” (La Pasionaria – No passer on), বাংলায় যার অর্থ করা যায় – আর এগিও না! পিঠোপিঠি পড়লাম ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মারিয়া-আন্তোনিয়েত্তা মাকিওচ্চির লেখা “Daily Life in Revolutionary China” – কিভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে শিশুরা লেখাপড়া শিখছে চীনের স্কুলে, কিভাবে পড়াচ্ছেন ওখানকার শিক্ষক-শিক্ষিকারা। নতুন নতুন তত্ত্বভুবন খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে।

এরকম সময়েই লুকিয়ে চুরিয়ে হাতে এলো চারু মজুমদারের রচনাসংগ্রহ। দেখলাম কি অসামান্য ধীশক্তি দিয়ে তাত্ত্বিকভাবে আপাতদুরূহ ও জটিল সব প্রশ্নের এবং জিজ্ঞাসার সাবলীল, স্পষ্ট এবং লক্ষ্যভেদী উত্তর দিচ্ছেন। ভারতের কৃষক আন্দোলনের এতদিনের সঞ্চিত ব্যথা, যন্ত্রণা, অপ্রাপ্তি-কে মনে হল চারু মজুমদার নিজের সত্তায় ধারণ করেছেন। যেন প্রথমবারের মতো মন্ত্রোচ্চারণ শুনলাম – শিশুদেরও শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে। এতদিন যা ভাসাভাসা অস্পষ্ট অবয়বহীন এক চেহারায় ছিল তা অবয়ব পেতে শুরু করলো – এই শক্তিশালী ভারতরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি সশস্ত্র মোকাবিলা করতে হবে কৃষকদের ওপরে নির্ভর করে। মধ্যবিত্ত সমাজ, কেতাবী শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক-যুবতী এবং শ্রমিক সমাজ (শ্রেণী শব্দটি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম না) কৃষক আন্দোলনের সহকারী শক্তি হিসেবে কাজ করবে। শহরে ও গ্রামে ছোট ছোট গেরিলা স্কোয়াড, আচমকা আক্রমণ করে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে “বিপ্লবী বাহিনী”-কে সজ্জিত ও শক্তিশালী করা – এ ধারণাগুলো আমাদের মতো টগবগে নতুন যুবকদের কাছে সুস্পষ্ট এক চেহারা নিয়ে এল বিপ্লবী কার্যক্রম সম্পর্কে। নিজের অভ্যন্তরে শুরু হল এক নতুন ধরণের দোলাচলচিত্ততা – একজন ভালো ডাক্তার না বিপ্লবীকর্মী, কে অগ্রাধিকার পাবে আমার  জীবনের আগামী অজানা নতুন যাত্রাপথে, এই নতুন যাত্রাবিন্দুতে এসে?

একদিকে জরুরী অবস্থা আছে বলে মানুষ ফিসফিস করে কথা বলে, আবার সমস্ত কিছুকে ফাটিয়ে – সুভাষ মুখার্জীর কবিতার পাঁজর ফাটিয়ে কচি কচি পাতার হাসার মতো – দেয়াল লিখন রয়েছে “হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ”। তখন বারেবারে তোমার মনে পড়ছিলো – এ কলকাতার মাঝে আছে আরেকটা কলকাতা / হেঁটে দেখতে শিখুন / হেঁটে দেখতে শিখুন ঝরছে কি খুন দিনের রাতের মাথায় / আরেকটা কলকাতায় সাহেব আরেকটা কলকাতায়।

প্রশ্ন এলো আমরা কোন কলকাতায় অন্তরিন? পরে যখন ছাত্র রাজনীতির সাথে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছ তুমি তখন বস্তির মাঝে, নোংরা ড্রেনের পাশে ঝুপরির মাঝে যেসব মানবসন্তানের মতো দেখতে (হয়তো বা পূর্ণ মানব নয়) প্রাণীদের চিকিৎসা করা শুরু করেছিলে তখন আবার ফিরে দেখতে চাইলে টেক্সট বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হিসেবে হার্ট অ্যাটাক, ব্রেইন স্ট্রোক বা অ্যালঝাইমার’স শেখা আর “tropical neglected disease” শেখার মাঝে সমন্বয় সাধন হবে কিভাবে? একজন চিকিৎসক কি তার সিলেবাসের, পারিপার্শ্বিকের লোভনীয় হাতছানির ঊর্ণজালে অন্তরিন হয়ে পড়ছে? মনে পড়ে, বড়ো তীব্রভাবে মনে পড়ে, তোমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও কমরেড শুভাশিসের কথা। শুভাশিস নরেন্দ্রপুরে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে পড়তো, উজ্জ্বল ছাত্র। ও তো সাঁতার না জেনে তিন বছরের মধ্যে গ্রামজীবনের পাঠ নিতে গিয়ে জলঙ্গীর জলে হারিয়েই গেলো। জানিয়ে দিল আর কখনো দেখা করার জন্য, একসাথে পথচলার জন্য আর কখনো ফিরে আসবেনা।

“দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন”-এর সেই লাইনটি বারেবারে হানা দিয়েছে – “Old Russia was rapidly breaking up (খুব দ্রুত ভেঙ্গে পড়ছিল পুরনো রাশিয়া)”। মেডিক্যাল কলেজে ঢোকার ৫-৭ বছর আগে এরকমইতো দ্রুত ভেঙ্গে পড়ছিল পুরনো ভারত। আকাশ বাতাস জুড়ে ছিল – “শেকল ছেঁড়ো বন্ধু, শেকল ছেঁড়ো / শেকল ছেঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাঙ্গ হবে তোমার দুঃসহ দুঃখের দারুণ দুর্দিন”। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস বা অমোঘ নিয়মে রাষ্ট্র আবার ভেঙ্গে পড়া ব্যবস্থাকে সারাই করে নিয়েছিল, সমাজে রয়ে গিয়েছিল তার স্মৃতি। স্মৃতির রক্তাক্ত, নীরবে বয়ে চলা ইতিহাস জনসমাজ তখনো বহন করে চলেছে। মধ্যবিত্ত জীবনে রয়ে গেছে গভীর ক্ষত, শোনিতের গন্ধ, বারুদের ঝলকে ওঠার চলচ্ছবি, রাষ্ট্রের প্রহরীদের – ঊর্দি পরে বা না পরে – হাতে অসংখ্য মানবসন্তানের লাশ নিখোঁজ হয়ে যাবার আর গায়েব হয়ে যাবার টাটকা স্মৃতি। শঙ্খ ঘোষের যন্ত্রণাদীর্ণ ছড়ার লাইন ঘুরে বেড়াচ্ছে মুখে মুখে – “পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি / কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি …. এখন সবই শান্ত এবং ভালো”। এরকম মধ্যবিত্ত সমাজে – শহরে এবং শহরতলিতে, গ্রামীন শহরে এবং গ্রামে – প্রবেশ করেছিলাম আমরা। কিছু দ্বিধা সংশয় প্রাথমিকভাবে থাকা সত্ত্বেও মানুষ দাওয়ায় মাদুর পেতে দিয়েছে, ঘরে ডেকে নিয়ে ছিন্ন শয্যায় শুতে দিয়েছে, নিজের মুখের অন্ন বা সামান্য সংগতি ভাগ করে নিয়েছে আমাদের সাথে। জীবনের এক নতুন চলার পথ শুরু হয়েছিল। পড়ে আসা জ্যামিতির ভাষায় নতুন স্থানাংক, নতুন locus তৈরি হল।

এক বৃদ্ধ কৃষকের পাশে বসে তেভাগা আন্দোলনের সময়ে গ্রামের পর গ্রাম জুড়ে জনজোয়ারের কাহিনীমালা শুনেছি। অতি যত্নে মাটির ঘরের কুলুঙ্গিতে রাখা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য কার্ড দেখিয়েছেন – জীবনের পরম সঞ্চিত ধন।

আজ পেছন ফিরে দেখে মনে হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বোধে কখনো আসেনি (আমার বিশ্বাস সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সহ) আমাদের স্বপ্নের “বিপুল অভ্যুত্থানের” চেয়েও বিপুল রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটির ক্রিয়াশীলতা, এর maneuvering power and technique। আমাদের মতো একজন মানুষের মাঝেই বাস করে একটা-দুটো-তিনটে … মানুষ এই উপলব্ধি ধীরে ধীরে জায়মান হয়ে উঠছে। এতদিন বাদে এসে, ইতিহাসে যাকে টেলিস্কোপিক দেখা বলে, মনে হয় বিপ্লবী আবহাওয়ার ঝাঁঝে, নিজেদেরকে সুরক্ষিত আর শক্তিশালী রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী সমভূমিতে স্থাপন করার সুতীব্র তিয়াসা ও আরো কিছু সমসাময়িক বিষয় আমাদেরকে এরকম কোন বিপ্রতীপ উপলব্ধিতে পৌঁছনো থেকে দূরে রাখছিলো, এমনকি নেতৃত্বকেও। যদিও আমি নিজেই নবীন নেতৃত্ব হিসেবে ছিলাম।

তখন শব্দ শুষে নিচ্ছিল চিন্তাকে। কিছু শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে বিপ্লবের অন্তর্ভাষা, প্রকাশের ব্যাপ্তি, এমনকি মানুষের বিপ্লবী মনের ভাষাও – এ বিশ্বাস আমাদের, একটি গোটা প্রজন্মের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্র-যুবদের মাঝে প্রকান্ড থেকে প্রকান্ডতর হচ্ছিল। আর ক্রমাগত ছেয়ে ফেলছিলো আমাদের বৌদ্ধিক জগৎ, মননের শক্তি, চিন্তন ক্ষমতা। চিন্তার সবুজ, সজীব ধারা শুকিয়ে যেতে শুরু করলো। নেতৃত্বের জন্য প্রশ্নহীন আনুগত্য তার জায়গা নিলো। “রেডগার্ড স্কোয়াড” বলে কিছু শহরে যে কিশোর-যুব-ছাত্র-ছাত্রী বাহিনী তৈরি হল তারা স্বপ্ন দেখেছিলো রাশিয়া বা চীনের মতো শহর জুড়ে জন্ম নেবে বিপ্লবী বাহিনীর দল। যাত্রা করবে গ্রামে। গ্রাম আর শহরের অভ্যুত্থান জুড়ে যাবে – মেকং, গঙ্গা, ভল্গা, ইয়াং সি কিয়াং-এর মতো। হয়তো বা ইতিহাসের পরিহাস হিসেবে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার পরিবর্তে শহর থেকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী গিয়ে গ্রাম ঘিরে ফেলতে শুরু করলো। আর আমরা গ্রামে ক্রমাগত শেল্টার পালটে পালটে থাকতে শুরু করলাম। যখন সেটাও হলনা তখন শহরে এসে উঠলাম, আমাদের চারপাশের বলয়ে রইলো সশস্ত্র বাহিনী। রাষ্ট্রের তরফে “শহর দিয়ে গ্রাম ঘেরা”-ই বরঞ্চ সফল হল। আমরা আরেকবার অন্তরিন হলাম – নিজভূমে পরবাসীর মতো।

আজ বিশ্বাস করি নালকের মতো নিষ্পাপ সেই যুববাহিনী এমনকি অন্যায়ভাবে লেভিও তুলেছে শহরে। এরকম এক মুহূর্তে আমার রাজনৈতিক বোধ এবং বিচার আমার মাঝে বিদ্রোহের তাগিদ চাগিয়ে দিলো। আরেকটা কষ্টকর কথাও এখন অকপটে বলার সময় এসেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কয়েকজন “কৃষক চেতনা” এবং “শ্রেণী একাত্মতার” প্রবল তাগিদের অনুপান হিসেবে যেকোন শেল্টারে বা অন্য জায়গায় মদ্যপানকে স্বাভাবিকতার স্তরে নিয়ে এলো। এ বিলাসিতার যোগান হচ্ছিল শহরের বিশ্বস্ত বন্ধুদের লেভি বা  গ্রামে খেয়ে না-খেয়ে পড়ে থাকা কমরেডদের সংগৃহীত অর্থ থেকে। আমি আর মানতে পারছিলাম না। মতপার্থক্য শুরু হতে থাকলো। কিন্তু সুশীতল রায়চৌধুরীর মতো এ কোন দু-লাইনের সংগ্রাম ছিলনা।  আমার সে যোগ্যতাই ছিলনা। ততদিনে আমি আমার ভেতরে ভেতরে ভাঙ্গতে শুরু করেছি। পুরনো প্রশ্ন উঠে উঠে আসছে – বেথুনের মতো চিকিৎসক-বিপ্লবী কিংবা আমার অধীত বিদ্যা বিসর্জন দিয়ে শুধুই একজন বিপ্লবীকর্মী? হোল টাইমার হবার সময় ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি থেকে তিন-চারটে ডাক্তারির একেবারে গোড়ার শিক্ষার বই “চুরি” করেছিলাম। সেগুলো কাজে লেগেছিল যখন “অ্যাকশন”-এ গিয়ে এক কমরেডের হাতে গভীরভাবে তীর বিঁধলে তার সফল চিকিৎসা করতে পেরেছিলাম।

এখন ভেবে দেখি আমিতো পরভূমে নিজবাসীও ছিলাম, ছিল আমার মতো আরো অনেকেই। ভুলি কি করে সে সকালের কথা যখন যে ভূমিহীন রাজবংশী কৃষক পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলাম সে বাড়ির চারপাশে ঘিরে ফেলেছে আধাসামরিক বাহিনী, সেই ৬০-এর বেশী বন্দুক দখলের ঘটনার পরে। কৃষক বাড়ির ভারী মিষ্টি অল্পবয়সী বৌটি আমাকে মামা বলে ডাকতো, আমি নাকি ওর মামার মতো দেখতে। ও আমাকে ঘরের ভেতরে রেখে এক মস্ত বড়ো হাঁসুয়া নিয়ে মাটির দেওয়ালের দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আগে ও একজনের মাথা নামাবে তারপরে আমাকে ধরতে দেবে। অবশ্য তার আর দরকার পড়েনি। আধাসামরিক বাহিনীর মুহূর্তের অসতর্কতার সুযোগে প্রথমে আমরা তিনজন গড়িয়ে পাশের পুকুরের ঝোপে চলে এলাম। পরে চিরুনিতল্লাসী শেষ হলে কোনরকমে এলাকা ছাড়া হলাম। আর আমাদের আশ্রয়দাত্রী সেই “ভাগ্নী”? আর কখনো দেখা হয়নি। ৪০ বছরের ব্যবধানে মুখটাও স্পষ্ট মনে পড়েনা।

আমি চলে এলাম। আবার ডাক্তারিতে ভর্তি হলাম। ও কোথায় গেল, কিভাবে রইলো কিছুই জানিনা। গ্রামের, শহরের কত মানুষ তাদের অনেকের নাম আর এখন মনেও পড়েনা আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। বুক দিয়ে আগলে রেখেছে একই বিশ্বাসের সওয়ার হয়ে – এ সমাজ বদলাবে। কিন্তু তাদের কোন দায়িত্ব আমরা নিতে পারিনি। হয়তো তারা প্রত্যাশাও করেনি। কিন্তু আমার বোধের কাছে, বিবেক নামক অনুভব-নির্ভর বস্তুটির কাছে কোন জবাব দিতে পারিনি। এখনো নয়।

এদেরকে নিয়ে আধুনিক বিদ্যাচর্চার জগতে পোস্টকলোনিয়াল, সাব-অল্টার্ন ও আরও কতো কতো জ্ঞানচর্চার ধারা বিকশিত হয়ে চলেছে। কিন্তু বাস্তব praxis-এর অচলায়তনে এরা তো subject-ও নয়, agency-ও নয়। শুদ্ধমাত্র পেটের ভাত আর নিজেদের টিঁকে থাকবার অস্তিত্বকে বাঁচানোর জন্য রাজনৈতিক বর্ণ বদলে যায় এদের। সেসময়ে এদের নিজেদের স্ব-গত সত্তাও অনেকটা বদলে যায় বৈ কি।

আমার এত্তটুকু, অকিঞ্চিৎকর জীবনের এত্ত বড়ো ক্যানভাসে জীবনকে শিখে চলার পাঠ ঊৎকীর্ণ হয়ে আছে পরতের পরে পরতে। নাই তো থাকতে পারতো। কবেই তো পুলিসের গুলিতে শেষ হয়ে যেতে পারতাম! পুলিসের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাইনি বলেই তো সে অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখলাম চোখের সামনে – আমার নিজের পরিবারে, নিজের মা-কে ঘিরে। আমার নিষ্ঠাবতী, স্বপাক, ছোঁয়াছুঁয়িতে বিশ্বাসী ব্রাহ্মণ পরিবারের বিধবা মা তাঁর মৃত্যুর পরে উত্তরবঙ্গে প্রথম মরণোত্তর দেহদান করলেন। আমি তাঁর দেহ দিয়ে এলাম উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে। আমার বুকে তখন রক্তক্ষরণ চলছে। বড়ো বড়ো ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। আমার বুক ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছে করছিল –

“মাগো, আমার মা – / তুমি আমার দৃষ্টি ছেড়ে কোথাও যেয়ো না।

মাগো, আমার মা – / তুমি আমার এ ঘর ছেড়ে কোথাও যেয়োনা।”

তাঁর দেওয়া কর্নিয়া দিয়ে প্রায়-অন্ধ গ্রামের হতদরিদ্র একটি মেয়ে চোখের দৃষ্টি ফিরে পেল। মেয়েটি পরে মাধ্যমিক পাশও করেছিল। এজন্য মা-কে কমিউনিস্ট বা যুক্তিবাদী বা নারীবাদী কোনটাই হতে হয়নি।

“এভাবে নিথর এসে দাঁড়ানো তোমার সামনে

সেই কথা বলা

দীর্ঘ চরাচর,

তার চেয়ে আর কোনো দীর্ঘতর যবনিকা নেই

কেননা পড়ন্ত ফুল, চিতার রুপালি ছাই, ধাবমান শেষ ট্রাম

সকলেই চেয়েছে আশ্রয়

শূণ্যতাই জানো শুধু? শূণ্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সেকথা জানো না?” (শঙ্খ ঘোষ)

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *