• December 4, 2021

বঞ্চনা দূর হলেই উত্তরবঙ্গ রাজ্যের প্রয়োজন নেই

 বঞ্চনা দূর হলেই উত্তরবঙ্গ রাজ্যের প্রয়োজন নেই

রুপম দেব :- উত্তরের ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতি যেন ছোট্ট একটি ভারত। এই ছোট্ট ভারতে দিনাজপুর ও মালদা বাদ দিলে এবারের উত্তরের বিধানসভা ভোট পুরো বিজেপিমুখী। তারপর থেকেই প্রাথমিক ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে ধরে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ জন বারলার কন্ঠে ভেসে উঠে আলাদা উত্তরবঙ্গ রাজ্যের দাবি। গোর্খার স্বপ্ন আমার স্বপ্ন বলা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বা রাজ্য ভাগ না চেয়ে গোর্খ্যাল্যান্ড আন্দোলনের বিরোধিতা করে সাংসদ বারলার রাজনৈতিক উত্থান আজ অতীত। তাই কলকাতাকেন্দ্রীক রাজনীতি ও প্রকৃত উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গের সমস্যার একমাত্র সমাধান নাকি আলাদা রাজ্য গড়েই “সম্ভব?”। তবে বিজেপি এও বুঝে ভোটের আগে উত্তরবঙ্গের বৃহৎ জনজাতিদের তাদের স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে পরবর্ত্তীতে উত্তরবঙ্গ রাজ্যের আলাদা লাড্ডু বিতরন হিতে বিপরীত হতেই পারে। তাই গেরুয়া দল বর্তমানে অনেকটাই সাবধানী হলেও বারলা এবং কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামণিক কে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে উত্তরবঙ্গ আগামীদিনে বিজেপির বিরাট পরীক্ষাগার হতে চলেছে। যা উত্তরবঙ্গ সহ পুরো বাংলার ক্ষেত্রে মোটেই ভালো সংকেত নয়। সম্প্রতি কেএলও সংগঠনের বার বার প্রকাশ্যে আসা এই অশনি সংকেত কেই বুঝিয়ে দেয়। এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই ওদিকে রাজ্যের প্রধান যখন নবান্নে উচ্চস্বরে বলেন এই অঞ্চলের জন্য রাস্তা, সেতু, ভোড়ের আলো বা ডুয়ার্সকন্যা বানিয়ে উন্নয়ন ঘটিয়েছেন এবং দক্ষিণবঙ্গ থেকেও উত্তরের উন্নয়নের কাজ অনেক কিছুতেই বেশী। তখন মনে হয় উত্তরের মন বুঝতে কলকাতা বা দিল্লী আজো ব্যার্থ।

তবে রাজ্য গড়ার পেছনে বিজেপি অভিসন্ধি সন্দেহজনক বলেই বঞ্চিত উত্তরবঙ্গের প্রশ্নটি নস্যাৎ হয়ে যায় না। উত্তরবঙ্গের ভোটের ফলাফল দেখেই শাসকদলের উচিত এই বিষয়ে সঠিক বিশ্লেষণ করার। বহুমাত্রিক অঞ্চলের একমাত্রিক ফলাফলের কারণ কোন এক সুতো দিয়ে গাঁথা সত্যি ভুল হবে। তবে কিছু বিষয় লক্ষণীয়। যেমন, অঞ্চলগুলো এসসি ও এসটি বহুল এলাকা, উন্নয়নের নিরিখে দক্ষিনবঙ্গের জেলা থেকে পিছিয়ে থাকা, জাতিসত্তার আন্দোলন বরাবর এখানে বিরাজমান এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাজনীতির উপস্থিতি।
প্রথমে আসি তপসিলি আদিবাসী চা বলয় অঞ্চলের কথা। অতীতে দেখা গিয়েছে রাজ্যের রাজনীতির ধারার অভিমুখেই এখানকার ভোট হয়েছে। তবে ২০১৬ বিধানসভা ভোট থেকেই এর উলটো হাওয়ার আভাস পাওয়া যায়। যা ২০২১ বিধানসভা ভোটে চা বলয়ের আটটি জনজাতি কেন্দ্রের মধ্যে সাতটি বিজেপির দখলে। দিদির দল নিজেদের দিকে হাওয়া টানতে যে চেষ্টা করে নি এমন নয়। সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মন জয় করার ভরপুর চেষ্টা হয়েছে। তবে গত পনেরো বছরের মধ্যে আদিবাসী সমাজের ছেলে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার যে প্রসার ঘটেছে এবং আদিবাসী সমাজে যে মধ্যবিত্ত অংশ তৈরী হয়েছে তা দিদির দল বুঝতে ব্যর্থ। এরা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা চা বাগানে পাতা তুলতে চায় না। নতুন কিছু করতে চায়, তবে চা বাগানের স্বল্প মুজুরি আর জমির অধিকার না থাকা এদের কোন স্বপ্ন কেই যেন পূরণ করতে দেয় না। বাগানের বহু ছেলে মেয়েরা ব্যবসা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অন্তরায় হল শ্রমিকদের জমির আইনগত অধিকার না থাকায় কোথাও ব্যাংক থেকে ঋণ পায় না তেমনি চা পাতা তোলার পরিবর্তে বাগানে ভিন্ন কিছু করা বাগানের ম্যানেজারের ইচ্ছের উপর নির্ভর করে। আসলে জীবনের প্রাথমিক অধিকার গুলো না পেলে কোন খয়রাতিই মানুষের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটায় না। ন্যাশানাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (২০১৯-২০)রিপোর্ট বলছে রাজ্যের মধ্যে জলপাইগুড়ি জেলার মহিলাদের সর্বোচ্চ রক্তস্বল্পতা (পশ্চিমবঙ্গ ৬২.৫ ও জলপাইগুড়ি ৭১.৪ শাতাংশ)রয়েছে। তাইতো যে বাংলার মেয়েরা দিদি কে দেখে দু হাত তুলে ভোট দেয়। সেই বাংলার আদিবাসী মহিলারা দিদির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। সারা রাজ্যের মধ্যে চা বলয়ের কালচিনি ও মাদারিহাট বিধানসভা কেন্দ্র তে পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটার অধিক থাকা সত্যেও শাসক দলের দুই প্রার্থীকে প্রায় ৩০০০০ হাজার ভোটে হারতে হয়।
উত্তরবঙ্গের রাজবংশী জনগোষ্টির ভোটও এবার গেরুয়া শিবিরের দিকেই গিয়েছে। এন আর সি বিষয়ে রাজবংশীর বড় অংশের সমর্থন গেরুয়া ঝর উত্তরবঙ্গে উঠতে সাহায্য করেছে। যদিও বলতেই হয় আগের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে দিদি অনেক বেশী উত্তরবঙ্গে এসেছেন। বার বার প্রশাসনিক বৈঠক করেছেন। বহু জায়গায় রাস্তাঘাট, সেতু হয়েছে। রাজবংশী সমাজের সমাজসংস্কারক পঞ্চানন বর্মার নামে বিশ্ববাদ্যালয় বানিয়ে রাজবংশী সমাজের প্রতীকি সম্মান বাড়িয়েছেন। আবার রাজবংশী অ্যাকাডেমি ও কামতাপুরী অ্যাকাডেমিও হয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন যেটা থেকে যায় তা হল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন রাজবংশী শিক্ষক ও কর্মাচারী রয়েছে? ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এখনাকার ভূমিপুত্ররা নেই রয়েছে কলকাতা ও উত্তরবঙ্গের বর্ণ হিন্দু বাঙালিরা। এই একই চিত্র আপনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখতে পাবেন। কলকাতার মন্ত্রীদের সূত্রে বহু দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা শিক্ষক উত্তরের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চাকরি করছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কামতাপুরী অ্যাকাডেমি তে কলকাতায় বসবাসকারী একজন ইতিহাসবিদকে চেয়ারম্যান হিসেবে বসিয়ে দেওয়াও রাজবংশী সমাজ ভালো ভাবে নেয়নি। তবে এত কিছুর মধ্যে মূল প্রশ্নটা হল যে এতে রাজবংশীদের আর্থ সামাজিক উন্নতি হয়েছে কি? স্থানীয় সম্পদ কে ভিত্তি করে উন্নয়ন না হওয়ায় উত্তরবঙ্গ থেকে হাজার হাজার মানুষেরা বাইরের রাজ্যে কাজ করতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্যে আদবসী যেমন আছে তেমনি বড় সংখ্যায় রয়েছে রাজবংশী ও সংখ্যালঘুরা। চাইলেই আমরা চা শিল্প কে ভিত্তি করে ছোট ছোট শিল্প গড়ে তুলতে পারতাম যেমন ধরুন এখানকার শ্রমিকদের বর্ষাকালে পাতা তুলার জন্য ছাতা, ত্রিপলের প্রয়োজন হয়। যা প্ল্যান্টেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী মালিকের দেওয়ার কথা। এর উৎপাদন ডুয়ার্স ও পাহাড়েও হতে পারতো। কিন্তু তা না হয়ে কলকাতা ও শিলিগুড়ির ফড়েরা এর মুনাফা লুটে নেয়। উত্তরবঙ্গ খাদ্য প্রক্রিয়াকরন শিল্পের জন্য আদর্শ জায়গা হলেও এই নিয়ে আজো তেমন কিছু হয় নি। এরই মাঝে SSC তে নোর্থ জোন ও সাউথ জোন গুলো ভেঙ্গে দেওয়ায় উত্তরের মেয়েছেলেদের কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়তে হয়েছে। নিয়োগক্ষেত্রে বেড়েছে আরো ভয়ঙ্কর ভাবে দুর্নীতি। বঞ্চনার ঘা গুলো উত্তরবঙ্গবাসীর কাছে আরো গভীর হয়েছে। প্রকৃত উন্নয়ন আর জাতিসত্তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলেই আজ উত্তরবঙ্গ তিন থেকে চারটি জাতিসত্তা আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে।
এবার আসি পাহাড়ের কথায়। পাহাড়ের তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রর মধ্যে দার্জিলিং ও কার্শিয়াং গিয়েছে বিজেপি দিকে আর কালিম্পং আসন জয় লাভ করেছে তৃনমূল সমর্থিত অনিত থাপার দল। তবে ভোট ফলাফলের ব্যবধান দেখেই বোঝা যায় যে পদ্মফুলের হাওয়া পাহাড়ে বরাবর ছিল। আমরা পেছন দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাবো যে পাহাড়ের রাজনীতি দিল্লীর রাজনীতির দিকে বেশী আকৃষ্ট। পাহাড়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্যাভাষ গোবলয়ের বিপরীত হলেও হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্থানের রাজনৈতিক প্রভাব বেড়েছে কারণ বাংলা নিজেকে প্রগতিশীল বললেও ছোট ছোট জাতির সাথে বাংলা কোনদিন ভাতৃমূলক সম্পর্ক রাখতে পারেনি। সম্প্রতি প্রতিচী ট্রাস্টের উদ্যোগে আদিবাসী আর্থ সামাজিক অবস্থা নিয়ে একটি রিপোর্ট বেরিয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে এই সমীক্ষার একজন সমীক্ষক হিসেবে কালিম্পঙের দুর্গম একটি জায়গা গিয়েছিলাম যার নাম “আপার কাফের বসতি”। এক লেপচা মেয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। গল্পের ছলে বলে উঠলেন কলকাতায় থাকার সময় তার অভিজ্ঞতার কথা। চিঙ্কি আর নেপালের মানুষ বলে অনেক ব্যঙ্গ বিদ্রপ শুনতে হত তাকে। ফলত শত চেস্টা করেও নিজের পরিচিতির সত্ত্বাসংকট দূর করতে পারেননি। কাফেরের আরেকটি তামাং পরিবারে গেলাম। ওই পরিবারে একটি শিশু হওয়ায় বনদপ্তর তাকে একটা গাছ উপহার দিয়েছে। সাথে ওই গাছটিতে যে তারই অধিকার থাকবে তা বোঝার জন্য বনদপ্তর তাকে একটা ছোট্ট সার্টিফিকেট দিয়েছে। তবে পুরোটাই বাংলায় লেখা। শিশুটির মা আমাকে সার্টিফিকেটটি দেখানোর সময় হাসলেন। বললেন কি লেখা আছে তা বুঝিয়ে দিতে। হাসির কারনটা আমি বুঝতে পারি নি। হতে পারে বনদপ্তরের এই নির্বুদ্ধিতার জন্য হাসলেন বা বাঙালির জাতিদম্ভের আস্ফালনকে দেখে। বিধানসভা ভোটের আগেও পাহাড়ে বড় বড় হোডিং পড়েছিল “বাংলা তার মেয়ে কে চায়” কিন্তু পুরোটাই বাংলাতে। ডুয়ার্সে ও পাহাড়ে জয় বাংলা শ্লোগান মোটেই মানুষের কাছে পছন্দের হয় নি। আমরা হিন্দী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বললেও বাঙালি কিন্তু রাজ্যের ছোট জাতির প্রতি নিজ আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু বছর আগে নাসিকে ঘটে যাওয়া বাঙালির উপর আক্রমনের বিরুদ্ধে বাংলার রাজনীতি সরগরম হয়েছিল। আঙুল উঠেছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। কিন্তু বর্ণ বৈষম্যের ঘটনা পাহাড়ের মানুষের কাছে নতুন নয়। ভিন রাজ্যের থানায় অভিযোগ জানিয়েই তাদের ক্ষান্ত হতে হয়। কারণ কলকাতা থেকে দিল্লীতে কোন ফোন তাদের জন্য যায় না এমনকি রাস্তায় নাগরিক মিছিলে গাইতে শুনা যায় না সুমনের সেই বিখ্যাত গান- ‘আমি চাই নেপালি ছেলেটা গিটার হাতে, আমি চাই তার ভাষাতে গাইতে আসবে কলকাতাতে’। আর এমন সময়ই আজকের পাহাড়ের ছেলে মেয়েরা তাদের রাজনৈতিক সংকটকে কাছ থেকে দেখতে পায়। কর্মভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন না হওয়াও এই সংকটের এক বড় কারণ। তাছাড়া ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পাহাড়ে না থাকায় দুর্গম পাহাড়ে ঘেরা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে সরকারি প্রকল্প ঠিকমত পৌছায় না। এর সাথে দোসর হয়েছে দার্জিলিং বাগিচা শ্রমিকদের দুরবস্থা। দার্জিলিং চা হাজার লক্ষ টাকায় বিক্রি হলেও শ্রমিকদের প্রাপ্য হাজিরা মাত্র ২০২ টাকা।রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার প্রতি বছর কয়েকশো কোটি টাকার রাজস্ব চা থেকে যেমন পেয়েছে। তেমনি কলকাতার ভদ্রলোকেরা পেয়েছেন জঙ্গল ও পাহাড় ঘেরা শীতল আবহাওয়া। যা নিয়ে বাঙালির ফ্যান্টাসির অন্ত নেই।
মুশকিল হল উত্তরের বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব বরাবর রয়েছে। ছোট ছোট আঞ্চলিক দলের নেতাও খব সহজেই কলকাতা বা দিল্লীর কাছে মাথানত করেছে। তবে মানুষ কিন্তু জবাব দিতে ছাড়ে নি। উত্তরবঙ্গের দুই মন্ত্রী ও আলিপুরদুয়ারের প্রভাবশালী বিধায়কের হারের মাধ্যমে জনগণ এদের বুঝিয়ে দিয়েছে জনগণের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতার উদ্ধতের প্রকাশ ঘটানো গণতন্ত্রের পক্ষে শুভনীয় নয়। তেমনি শোভনীয় নয় যদি শাসকদল এই দাবীকে বিজেপির চক্রান্ত বলে পুরোপুরি ভাবে নস্যাৎ করে দেয়। উত্তরবঙ্গের বঞ্ছনা নিয়ে শাসকদলের সঠিক পদক্ষেপ পারে এই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান ঘটাতে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post