• December 4, 2021

ফিরে দেখা ইলা মিত্র ও তেভাগা আন্দোলন

 ফিরে দেখা ইলা মিত্র ও তেভাগা আন্দোলন

শ্রেয়া চক্রবর্তী :

তেভাগা আন্দোলনের এক অতি পরিচিত নাম হল ইলা মিত্র। প্রথম জীবন থেকেই শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। পরবর্তী সময়ে রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের পুত্রবধূ হবার পরেও অন্দরমহলে আটকে না থেকে কমরেডদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শরিক হয়েছে কমিউনিস্ট আন্দোলনে। চন্ডিপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলে তার উপর নৃশংস অত্যাচারের কথা তার জবানবন্দি থেকেই আমরা জানতে পারি। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, প্রথম দিকে সমাজে স্বীকৃতি হারানোর আশঙ্কায় আদালতে এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন তিনি। পরে জেলে অপর দুই রাজনৈতিক বন্দী ভানু দেবী ও মনোরমা বসুর একরকম চাপে বিস্তারিত বিবৃতি দিয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫। পরবর্তী কালে এই কথা অকপটে স্বীকারও করেন ইলা মিত্র। কমিউনিস্ট আন্দোলনের যোদ্ধা হয়েও সামাজিক স্বীকৃতি হারানোর আশঙ্কায় দ্বিধান্বীত কিশোরী বয়সের সেই অভিজ্ঞতাই হয়তো পরবর্তীকালে তাকে নারী মুক্তি ও শ্রেণী সংগ্রাম কে অবিচ্ছিন্ন ভাবে দেখতে শিখিয়েছে। তাই নারী আন্দোলনের প্রশ্নে দ্বিধাহীন ভাবে তিনি বলেন,_ “১৯৪৩ সাল থেকে আমি আন্দোলনের সাথে যুক্ত । এখনাে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি । এজন্য শুধু মহিলাদের সংগঠিত হলেই হবে না , নারী ও নারী আন্দোলন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত । একে বিচ্ছিন্ন করে দেখা ঠিক হবে না । সমাজ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নারী মুক্তি সম্ভব”

তেভাগা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তির সময় এক বক্তৃতায় তেভাগা আন্দোলনের গতি প্রকৃতি ও বিগত ৫০ বছরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে কেন ভূমি বিপ্লবের কর্মসূচিকে যুক্ত করা যায়নি সেই বিষয়ে নিজেদের কাজের সমালোচনা এবং ভবিষ্যত কর্মসূচী আলোচনার ক্ষেত্রকে তুলে ধরেন তিনি।
এবং এক্ষেত্রে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে এশিয়া – আফ্রিকা – ল্যাটিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ গুলো নিয়ে গঠিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এমনকি, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেও পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে কৃষক সমাজ ও কৃষক সংঘঠনের কাজকে কতটা প্রয়োগ করা গিয়েছে সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এই সম্বন্ধে তার বক্তৃতার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো: “

আমাদের ব্যর্থতার সঙ্গে সঙ্গে সােভিয়েত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিপর্যয়ে , সমাজতন্ত্র তথা কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সহযােগিতার ধস নেমে আসে । এর ফলে আমরা নয়া উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত খােলাবাজার অর্থনীতির ফাঁদে পড়ে গিয়েছি । এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার বড় উপায় হচ্ছে সমাজতন্ত্রী দেশসমূহের মধ্যে সমাজতন্ত্রের নির্মাতাদের পুনরুত্থান । সঙ্গে সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিপ্রয়াসের পুনরুত্থান । এই মুক্তি প্রয়াসের বড় ভিত্তি হচ্ছে কৃষক সমাজ । অপর বিষয়টি হল যে, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক অভিশাপ আমাদের উপমহাদেশকে গ্রাস করেছিল ,তা সত্ত্বেও গত পঞ্চাশ বছরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা ও শােষণমুক্ত সমাজ গড়ার দিকে এগিয়েছি । কিন্তু শক্তিসমূহের ধারক – বাহকেরা অভ্যন্তরীণ কায়েমী স্বার্থ ও বৈদেশিক নয়া উপনিবেশবাদী – সাম্রাজ্যবাদীদের সাহায্যে আবার মাথা তুলছে । সুতরাং এ দিক থেকেও চাই নতুনতর প্রবলতর ভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরােধী চিন্তাভাবনা ও এই সকল কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া । তেভাগার উত্থান ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার একটা বিশেষ আবহ । সুতরাং তেভাগার পঞ্চাশতম বার্ষিকী হােক এদিক থেকে প্রস্তুতি ও পদক্ষেপের একটা বৈপ্লবিক মুহূর্ত । পরিশেষে দু’টি কথা সামনে রাখছি মার্কসীয় তত্ত্বের দিক থেকে :
প্রথমত , বাস্তবতা তথা বাধাবিপত্তি ও নানা ধরনের আক্ষেপ ও বিক্ষেপকে পদে পদে সরিয়ে এগিয়ে চলে আসছে সর্বাত্মক মুক্তিরধারা । বিপ্লব উত্থানের গতিধারার মূলসূত্র দ্বান্দ্বিক সামগ্রিকতার ধারায় ( Dialectical totality ) মুক্তির প্রক্রিয়ার • নব বিন্যাস নব নব বাধাবিপত্তিকে অতিক্রম করে চলে আসছে ।এই সূত্রে ঐতিহাসিক বাস্তবতাবাদ বলে একে অভিহিত করা যেতে পারে । সুতরাং তেভাগার উত্থানের সাফল্যকে পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের কৃষক সমাজের তথা উপমহাদেশের সমস্ত মুক্তিপ্রয়াসী জনসমাজের মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক দ্বান্দ্বিক জয় পরাজয় বা অগ্রগতি ও বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার ধারার মধ্য দিয়ে বুঝতে হবে । ( ২ ) শ্রম বা শ্রমশক্তি ( Labour বা Labour power ) শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের মূলধারা । বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মত আমাদের উপমহাদেশেও শিল্প বিপ্লব বা Industrial revolution- এর ধারায় কলকারখানার মত ক্ষেতখামারেও আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও যন্ত্রপাতির প্রবর্তন হয়েছে । আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে , কৃষক বা চাষী তথা ভূমিকৰ্মীর বিলুপ্তি ঘটেছে । কিন্তু সমস্ত ঘটনার দিকে তাকিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে , ভূমিকৰ্মীর তত্ত্বাবধানের অভাব ঘটলে অচল হয়ে যায় যন্ত্রপাতি । ব্যাপারটাকে আমরা দূর – দূরান্তে ছড়িয়ে পড়া ফসল উৎপাদনের কর্মকাণ্ডের চালনার দিকটাকে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারব । আধুনিকতম স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের প্রয়ােগের যেসব কলকারখানা গড়ে উঠেছে সেখানে শ্রমিক ছাড়া মুহূর্তে সব কিছু স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *