• December 9, 2021

‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’

 ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’

  মৃন্ময় সেনগুপ্ত                

স্পাইওয়্যারের সাহায্যে বিরোধীদের ফোন হ্যাক করার অভিযোগ নিয়ে দেশ এখন উত্তাল। অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকার কেবল বিরোধী দলের নেতাদেরই নয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের ওপর নজরদারি চালাতেও নাকি এই স্পাইওয়্যার ব্যবহার করেছে। সরকারের বিরুদ্ধে বহুবছর ধরেই বিরোধী পক্ষের ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ উঠে চলেছে। শাসক দলের  বদল হলেও, শাসন পদ্ধতি বদলায় না। সবই হয় দেশের নিরাপত্তার নাম করে। শাসক দলের স্বার্থ আর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেখানে সমার্থক। ফোন এভাবে হ্যাক করা আইনসম্মত কিনা তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। আইনসম্মত শব্দটা বড় গোলমেলে। আইনসম্মত হলেই তা নৈতিক এমন কোনো অর্থ নেই। আইনের নামে অনৈতিক কাজকে রাষ্ট্র বৈধতা দেয়। ভারতে ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্রদ্রোহিতা আইন থেকে শুরু করে স্বাধীন দেশের ইউ এ পি এ আইন ব্যবহার করে বিরোধী কন্ঠরোধ করার ভুড়ি ভুড়ি দৃষ্টান্ত আমরা আজও প্রত্যক্ষ করছি। দেশের প্রচলিত আইন, বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই রাষ্ট্র চরম স্বৈরাচারি হতে পারে। রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই রয়ে গেছে ফ্যাসিবাদী উপাদান। ইউ এ পি এ, আফস্পার মতো আইনের সুপ্রয়োগে (অপপ্রয়োগ কখনই নয়, কারণ এসব আইন রচিতই হয়েছে আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে) বেড়ে চলে রাষ্ট্রের নজরদারি। সম্প্রতি ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্তদের কম্পিউটার হ্যাক করে তাঁদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর কথা উঠে এসেছে। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এন আই এ) নাকি এভাবেই তাঁদের ফাঁসাতে চাইছে। বিচারব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয় নি। স্ট্যান স্বামী হত্যার পর আপাত কিছু গণতান্ত্রিক কথা বললেও এই মামলায় সরকার, বিচারব্যবস্থা, বড় বড় মিডিয়া একই সুরে কথা বলে চলেছে।     ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নামে নাগরিকের ওপর নজরদারির জন্য আয়োজনের খামতি নেই। আমাদের গতিবিধির ওপর নিরন্তর নজরদারি চলছে। গতবছর করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার একটি অ্যাপ বাজারে নিয়ে আসে। তাতে যে করোনার মোকাবিলা হয় নি, তা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু সেই অ্যাপ ডাউনলোড করলে আমাদের যাতায়াতের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়। ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও বাস্তবে সেই স্বীকৃতি মেলে নি। বরং প্রতিদিন আমাদের সেই অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আধার কার্ড আবশ্যক নয়। অথচ ব্যবহারিক জীবনে এটি ছাড়া আমাদের চলবে না। কয়েক বছর আগে ঝাড়খন্ডে আধার কার্ডের জটিলতায় প্রেমারি কানোয়ার নামে এক  বৃদ্ধার অনাহারে মৃত্যু হয়। স্টেট ব্যাঙ্কের একটি শাখায় তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার নম্বর সংযুক্ত করা হয়েছিল। সেই অ্যাকাউন্টে তাঁর বিধবা ভাতার মাসিক ছ’শো টাকা জমা হত। যেটা ছিল তাঁর একমাত্র উপার্জন। কিন্তু তাঁর ভাতার টাকা বাইশ কিলোমিটার দূরে সেই ব্যাঙ্কের অন্য শাখায় জমা হতে থাকে। তাও তাঁর নামে নয়। অ্যাকাউন্টটি ছিল অন্য এক মৃত ব্যক্তির নামে। সেই অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে কীভাবে প্রেমারি দেবীর আধার নম্বর সংযুক্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভৌতিক কান্ড! দু’মাস বিধবা ভাতার টাকা না পেয়ে প্রেমারি দেবী মারা যান। তাঁর মৃত্যু অনাহারে না অপুষ্টিতে তানিয়ে পন্ডিতদের তর্ক চলতে পারে। কিন্তু একে কি রাষ্ট্রীয় হত্যা বলা যাবে না? আধার কার্ড না থাকায় মিড ডে মিল থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও এদেশে ঘটে। আমাদের পার্লামেন্টে এসব নিয়ে ঝড় ওঠে না।   এখন এক দেশ এক রেশন কার্ডের নামে আধার সংযোগ করতেই হবে। ‘পরিযায়ী’ শ্রমিকদের জন্য নাকি এমন ব্যবস্থা। শুনতে ভালো। আইন থাকা সত্ত্বেও পরিযায়ী শ্রমিকদের তথ্য যে রাষ্ট্র রাখে না, যে সরকারের মন্ত্রী সংসদে বলতে পারেন যে, লকডাউনে বাড়ি ফিরতে গিয়ে কতজন শ্রমিক মারা গেছেন সরকার তা জানে না, সেই রাষ্ট্রের এত শ্রমিক দরদে সন্দেহ হয়। রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার সংযোগের নামে নজরদারির ব্যবস্থা আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে। এটা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টারের (এন পি আর) একটা ধাপ। এন পি আরে নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে আধারের সঙ্গে সেই তথ্য যাচাই করা হবে। অর্থাৎ আধার আবশ্যক। নাগরিকের যাবতীয় তথ্য চলে যাবে রাষ্ট্রের হাতের মুঠোয়। জনগণনার সঙ্গে ইচ্ছে করেই এন পি আরকে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এন পি আরের তথ্যের ভিত্তিতে এন আর সি তালিকা প্রস্তুত করা সহজ হবে। মতলব আসলে সকলের রেশন নয়, ধাপে ধাপে এন আর সি’র পথে এগোনো। রান্নার গ্যাসে ভর্তুকির নামে এমনই করা হয়েছিল। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ফোন ও আধার নম্বর সংযুক্ত আবশ্যিক করা হয়। সরাসরি ভর্তুকির টাকা ব্যাঙ্কে ঢুকবে। চুরি হবে না। শুনতে ভালো। কিন্তু ধীরে ধীরে ভর্তুকি গেল কমে। অদূর ভবিষ্যতে ভর্তুকি উঠে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু ঘুরিয়ে আধার সংযোগ কার্যত বাধ্যতামূলক করে নজরদারির বন্দোবস্ত পাকাপোক্ত করা হল। আধার কার্ডের দক্ষযজ্ঞ শুরুর সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল এই কার্ডেই সব কাজ হয়ে যাবে। অন্য কিছু লাগবে না। এখন আবার নতুন পরিচয়পত্র। যে আধার কার্ডের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হল, তা নাগরিকত্বেরও প্রমাণ নয়! সেদিনের শাসক দল আজ বিরোধী। সরকার বদলেছে। নীতি বদলায় নি।   সাতে পাঁচে না থাকা ছাপোষা নাগরিক এসবে আপত্তির কিছু নাই দেখতে পারেন। কারণ তাঁরা ‘রাজনীতি’ করেন না। রাষ্ট্র যদি নজরদারি চালায়, আপত্তি কী? ভোট দিয়ে নাগরিকত্বের মহান দায়িত্ব পালন করলেই হল। রাষ্ট্রের প্রতিটি নির্দেশ, প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করাকেই কর্তব্য বলে শেখানো হয়। অধিকার নাই বা থাকুক, কর্তব্য পালনেই আমাদের মুক্তি! কিন্তু রাষ্ট্র যখন দেশদ্রোহীর ভূমিকা পালন করে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ জারি রাখে, তখন তার বিরোধিতাও নাগরিকের কর্তব্য। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা রাষ্ট্রবাদী নাগরিকও ভাবেন না, আরেক নজরদারির জালে আমরা কীভাবে জড়িয়ে   পড়ছি। ইন্টারনেট ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আমাদের বিপুল তথ্যভান্ডার জমা পড়ছে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার হাতে। রাষ্ট্রীয় নজরদারি নিয়ে হইচই হলেও, কর্পোরেট নজরদারি নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়। আন্তর্জালের মাধ্যমে বিশ্বজোড়া যার  সাম্রাজ্য। বলা হচ্ছে তথ্য নির্ভর সমাজ ধীরে ধীরে নজরদারি সমাজে পরিণত হতে চলেছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, খোদ রাষ্ট্রসংঘ ২০১৫ সালে এর মোকাবিলায় প্রাইভেট চিফের একটি পদ সৃষ্টি করে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ওপর কর্পোরেট নজরদারির বড় হাতিয়ার। আমরা কী ধরনের লেখা পড়ি বা লিখি, কোন ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া জানাই, কোন গান বা সিনেমা  শুনতে/দেখতে পছন্দ করি সব সোশ্যাল মিডিয়া জানিয়ে দেয়। অনলাইনে খাদ্য থেকে শুরু করে নানা ভোগ্যপণ্য কেনা  জানিয়ে দেয় আমাদের পছন্দ। অনলাইনে, বিভিন্ন কার্ডে বা ডিজিটাল লেনদেনে জিনিস কেনা, গান শোনা, সিনেমা দেখা থেকে শুরু করে অ্যাপ ক্যাবে যাতায়াতের তথাকথিত আধুনিকতা প্রত্যেক ব্যক্তির তথ্যভান্ডার গড়ে তোলে। আমাদের সেই তথ্যভান্ডার আজ পণ্য। আমাদের অন্ধকারে রেখেই যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। জেনেভার ক্র্যাকড ল্যাবস নামে একটি সংস্থা কয়েক বছর আগে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। নাম, কর্পোরেট সারভেলিয়েন্স ইন এভরিডে লাইফ। রিপোর্টে বলা হয়, টেলি পরিষেবা, মিডিয়া, ব্যাঙ্ক, বীমার মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান, খুচরো ব্যবসা, অ্যাপ, ওয়েবসাইট প্রভৃতির মাধ্যমে ব্যক্তির তথ্য পাচার হচ্ছে। বিপুল তথ্যভান্ডার জমা হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির হাতে। পুঁজির কেন্দ্রীভবনের সঙ্গে সঙ্গে চলছে ব্যক্তিগত তথ্যের কেন্দ্রীভবন। বিভিন্ন ক্রেডিট রেটিং  কোম্পানি একজন ব্যক্তি কত অর্থ কোথা থেকে ধার নিয়েছেন, কতটা শোধ করেছেন, তাঁর আর্থিক অবস্থা কেমন এসব তথ্য সংগ্রহ করে অন্য কোম্পানিকে বিক্রি করে। গোটা প্রক্রিয়া চলে বিভিন্ন কোম্পানির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে। ২০২০ সালে বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানি গ্রাহকদের তথ্য বেচে ৮০ লক্ষ কোটি ডলার আয় করেছে। গ্রাহকের পরিচিতি যাচাইয়ের নামে ইকুইফ্যাক্স ৮২ কোটি গ্রাহকের জীবিকা, ফোন নম্বর, পরিবারের যাবতীয় তথ্য মজুত করেছে। আয়ার্ল্যান্ডে অনলাইনে পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবসা করা ট্রাস্টটেভ কোম্পানিকে ২০১৫ সালে ট্রান্সইউনিয়ন অধিগ্রহণ করে। ট্রান্সইউনিয়ন  একটি ক্রেডিট রিপোর্টিং এজেন্সি। ট্রাস্টটেভের তথ্য তারা ব্যবসার কাজে লাগায়। বিনি পয়সায় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে নানা মাধ্যম ব্যবহার করে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড়ের সুযোগ পেয়ে আহ্লাদে ভেবেও দেখি না কর্পোরেট নজরদারি কীভাবে আমাদের অন্দরমহলে থাবা বসিয়েছে।  গ্রাহকের পরিচিতি যাচাই ও জালিয়াতি রোধের নামেও চলে তথ্য পাচার। জালিয়াতি রোধের বদলে খুলে যাচ্ছে জালিয়াতির নতুন নতুন পথ। আজ রাষ্ট্রের থেকে বেশি শক্তিধর কিছু কর্পোরেট সংস্থা। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের কর্মকান্ড, ইন্টারনেটে কী কী সার্চ করছি সেসব তথ্য সহজেই রাজনৈতিক নজরদারির সহায়ক হয়ে ওঠে। কেবল রাষ্ট্রই নয়, বিভিন্ন  আন্তর্জাতিক সংস্থাও আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের তথ্য পেয়ে যায়। আমাদের বায়োমেট্রিক তথ্য – আঙুলের ছাপ, মুখাবয়ব, হাঁটা চলার ধরন কোনো কিছুই আর গোপন থাকে না। কয়েক বছর আগেই ভারতে একটি টেলিকম পরিষেবা কোম্পানি সিমের সঙ্গে আধার সংযোগের পর গ্রাহকের নামে তাদের পেমেন্টস ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছিল। গ্রাহক জানতেও পারতেন না। অনেকের রান্নার গ্যাসের ভর্তুকি সেই পেমেন্টস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার পর জানাজানি হয়। প্রায় ৩০ লক্ষ গ্রাহকের ভর্তুকির মোট ১৯০ কোটি টাকা তাদের ব্যাঙ্কে জমা হয়। মাত্র ৫ কোটি টাকা জরিমানা দিয়েই মুক্তি পায় সেই কোম্পানি। প্রশ্ন উঠেছিল যে, আধার কর্তৃপক্ষ ইউ আই ডি এ আই এবং ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া এর দায় এড়াতে পারে না। অথচ, আধার সংযোগ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ভর্তুকি, ডিজিটাল লেনদেন – সবই নাকি স্বচ্ছ ভারত গড়ার হাতিয়ার। আসলে রাষ্ট্র আর কর্পোরেট দুনিয়ার মেলবন্ধনে চলা নজরদারি ব্যবস্থা। ব্যক্তি স্বাধীনতা, স্বাছন্দ্যের নামে এভাবেই আমাদের সবকিছু বাজারি পণ্যে পরিণত হয়। গোপন বলে আর কিছুই থাকে না। আমাদের জীবন যাপন, রুচিবোধ, সংস্কৃতি, মতাদর্শের নজরদারিতেই এরা থেমে থাকে না। সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও চালায়। কালক্রমে আমাদের অজান্তেই তারা এসবের নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়। ব্যক্তি স্বাধীনতা কীভাবে কেড়ে নেওয়া হয়ে আমরা বাধ্য, সুবোধ নাগরিকরা ভাবতেই পারি না। ভাবার অভ্যাসই যে আমাদের হয়নি!


মৃন্ময় সেনগুপ্ত : রাজনৈতিক কর্মী ও লোকায়ত পত্রিকার সম্পাদক।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *