• December 4, 2021

ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ—ক্যুয়ো ভাদিস!পর্ব-তিন

 ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ—ক্যুয়ো ভাদিস!পর্ব-তিন

অশোক মুখোপাধ্যায়

[ভারতে বহুকাল ধরেই ধর্ম এক রকমের বারুদ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতা দখল করার পর সে সারা দেশে এক দলীয় শাসন চাপিয়ে আরএসএস বয়ানে লোকে হাসবে কাঁদবে জামাপ্যান্ট পরবে গান গাইবে আর হিন্দুধর্মের নামে গর্বিত হতে গিয়ে মুসলমান খ্রিস্টান বিরোধী ঘৃণার চাষ করবে—এরকম একটা অসহিষ্ণু হিংস্র পরিবেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় ঘৃণার এই বাতাবরণের আড়ালে চলছে দেশি বিদেশি কর্পোরেটদের হাতে দেশের জল জঙ্গল জমি পাহাড় খনি বিনি পয়সায় তুলে দেবার নোংরা প্রকল্প আর তার জন্য স্থানীয় গরিব মানুষকে উচ্ছেদ। এই ব্যাপারে দুচার কথা বলা এখন চিন্তাশীল শুভমনস্ক মানুষের জরুরি কাজ। তারই অংশ হিসাবে আজকের এই প্রতিবেদন—আপাতত ৩য় ও শেষ পর্ব।]

রাষ্ট্রীয় মদতে ধর্ম সন্ত্রাস

এই বার অন্য দিকটাতে তাকানো যাক। ভারত থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পাকিস্তান আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি বিভিন্ন দেশের শাসকগোষ্ঠী কেন এই ধর্মীয় সন্ত্রাসে মদত দিচ্ছে? আজ থেকে বিশ বা ত্রিশ বছর আগে এই সব দেশে তো এরকম ঘটনা এত ব্যাপক হারে ঘটতে দেখা যায়নি। এখন কী হল?

এদের বেলায় হচ্ছে এক অনিরসনীয় আর্থসামাজিক সঙ্কট। যা থেকে এদের কেউ পরিত্রাণের পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যে ধনতন্ত্র এতদিন ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করছে, সে এখন নানা রকম সমস্যায় ভুগছে। তার সমস্ত উৎপাদিত পণ্যের বাজার নেই। তাদের বহু পণ্য অবিক্রীত হয়ে গুদামে পড়ে থাকছে। ফলে সেই বাজারের বড় হিস্যা ধরা নিয়ে এক একজন উৎপাদকের মধ্যে কী ভীষণ দ্বন্দ্ব! তারাই আবার সারা বিশ্বের কাঁচা মালের উৎস ভাণ্ডারগুলি দখল করে নিতে চায়। সে তেল হতে পারে, নিম গাছের অণু হতে পারে, নদীর পেয় জল হতে পারে, বিভিন্ন ধাতুর খনিজ আকরিক হতে পারে, জঙ্গলের কাঠ হতে পারে। সবই তারা নিঃস্ব করে পেতে চায়, কিন্তু চায় যে অনেকেই। ধনপতিদের মধ্যে এই নিয়েও তীব্র বিসম্বাদ!

ধনদাররা যত দখল করে নিতে চায়, সাধারণ মানুষ ততই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের চাকরির বাজারেও টান পড়েছে। বেকারের সংখ্যা প্রবলভাবে হু হু করে বেড়ে চলেছে। এক একটা দেশে বিদেশি শ্রমিকের বিরুদ্ধে সেই দেশের জনসমষ্টিকে খেপিয়ে তোলা হচ্ছে। মার্কিন ধনকুবেররা চায় তাদের অফিসের কাজ ভারত পাকিস্তানের মতো সস্তার শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে করিয়ে আনতে। তাদের শ্রমিকরা চায়, দেশের কাজ দেশেই করাতে হবে। তা নিয়েও দ্বন্দ্ব প্রতিদ্বন্দ্ব বাড়ছে। বিক্ষোভ হচ্ছে। মিছিল হচ্ছে। ধর্না জমায়েত হচ্ছে। প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে জোরে জোরে।

মধ্য চাষিও ফসলের দাম পাচ্ছে না। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে কৃষিতে যে বিনিয়োগ করছে, তোলা ফসল বিক্রি করে সেই খরচও পুরোটা তুলতে পারছে না, লাভ করা তো দূরের কথা। বিজয় মাল্য রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা শোধ না করে ব্যবসা লাটে তুলে দিয়ে কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রেখে দেশ ছেড়ে পালাতে চাইলে সরকার তাকে সুরক্ষিত পাহারায় বিমান বন্দরে পৌঁছে দেয়। নীরব মোদীকে আরও বেশি টাকা নিয়ে পালাতে দিয়েছে। আধার লিঙ্ক সহ। আর সাধারণ চাষিকে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা ঋণ শোধের অক্ষমতায় আত্মহত্যা করতে হচ্ছে।

ভূ-পরিবেশ ক্রমশ দুষিত হয়ে চলেছে। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভেজাল সুখাদ্য, প্রতিদিনের বিশুদ্ধ পানীয় জল, বুক ভরে নিশ্বাস প্রশ্বাস চালাবার মতো নির্মল বায়ু—কোনো কিছুই ধনতন্ত্র আজ আর সাধারণ মানুষের জন্য অব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় ফেলে রাখতে রাজি নয়। উচ্চফলনশীল শস্য চাষের স্বার্থে রাসায়নিক সার, কীটনাশক আর সংরক্ষক-দ্রব্যের দীর্ঘমেয়াদি এজমালি ক্রিয়ায় এবং দ্রুতখাদ্য হিসাবে আমাদের উদরে যে অন্তিম উপচার প্রবেশ করে, তা একই সঙ্গে রসায়ন শাস্ত্রের এমন কিছু সদস্যকে বয়ে আনে, যা আমাদের শরীরকে বেশি দিন সুস্থভাবে বাঁচতে দিতে চায় না। স্থূলতা, কর্কট, স্মৃতিভ্রংশ, পার্কিন্সনি রোগ—ইত্যাদি এখন সারা পৃথিবী জুড়ে মনুষ্যসৃষ্ট এক সংগঠিত মহামারী রূপে আত্মপ্রকাশ করে চলেছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও বর্জ্য পদার্থের সম্মিলিত চাপে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। যার ফলে প্রতি বছর প্রতি দিন প্রতি ঘন্টায় কিছু না কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির অসময় অপ-বিলোপন চলছে। জীব বাস্তুতন্ত্র এক অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সব কিছু মিলিয়ে কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব আর বড় জোর একশ বছর।

আর এই সব ঘটনার এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, মেঘ বৃষ্টি ভূমিকম্প ঘুর্ণিঝড়ের মতোই এরকম যাবতীয় সমস্যার চরিত্র এবং সমাধানের উপায় প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশের রামপালে সুন্দরবনের গা ঘেঁসে তাপবিদ্যুত কারখানা স্থাপন করলে যে জল ও বায়ু দুষণ হবে তা স্থানীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তা ভারতের বুকেও আছড়ে পড়বে। ভারত যদি তিস্তার জল আটকে হিমালয়ের ভঙ্গুর বুকে জলবিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণ করতে যায় এবং তার দ্বারা নিজস্ব সীমানায় জল বেশি ব্যবহার করতে চায়, তাতে শুধু  বাংলাদেশকেই বেকায়দায় ফেলা হবে এমন নয়; অল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চ-তিস্তার সংলগ্ন অববাহিকায় বাড়তি সঞ্চিত জলের যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে তার ফলে যে কোনো সময় একটা ভাঙন সৃষ্টি হয়ে নিম্ন-তিস্তা অববাহিকায় প্রলয় ঘটে যাবে। এগুলো আজ আর সম্ভাবনা মাত্র নয়, অপ্রত্যাশিত দুর্বিপাকও নয়। সুপরিজ্ঞাত তত্ত্বজাত ঘটনা। ফরাক্কা বাঁধের ফলে শুধু বাংলাদেশের পদ্মাই শুকিয়ে যায়নি, ভারতের বুকেও মালদা এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়ে চলেছে তা এই বহুদেশিক সমস্যার দিকে অঙ্গুলীনির্দেশ করছে। সুতরাং, যারা এই সব সমস্যার সমাধানের দাবিতে এগিয়ে আসবেন, তাদের আন্দোলনের চরিত্রও প্রথম থেকেই অসীমান্তিক। তার সাফল্যের সম্ভাবনা শক্তি এবং প্রতিশ্রুতিও তাই অনেক বেশি। 

স্বভাবতই, ভুক্তভোগী মানুষ যতই এই সব ঘটনার কথা জানতে পারছে, ততই সে বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। দেশে দেশে কালে কালে। হওয়ারই কথা। যারা এই সমস্ত সমস্যার কারক এবং জন্মদাতা, তারাও তা জানে। তাদের তাই আগে থেকে সাবধান হয়ে রাস্তা খুঁজে বের করতে হচ্ছে, কীভাবে এই সব বিক্ষোভকে প্রশমিত করা যায়, বিপথগামী করা যায়। এক কথায় প্রকাশ করতে গেলে, সাধারণ মানুষের নজর কীভাবে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।

গত একশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই নজর ঘোরানোর প্রযুক্তি সারা দুনিয়ার দুস্ট শাসকদের হাতে একটিই। তা হল, কিছু ফালতু বা অমূলক অভিপাদ্যের দিকে সংবেদনশীল জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের উত্তেজিত করা। দেশ বিপন্ন। জাতি বিপন্ন। ধর্ম বিপন্ন। তার জন্য কিছু “শত্রুপক্ষ”-এর ছবি তৈরি করাও দরকার, যাদের এই সব বিপদের অপ্রতিরোধ্য আবাহক হিসাবে প্রতিপন্ন করা যায়!

আরও লক্ষণীয়: এই সমস্ত “বিপন্নতা”-র মধ্যে আবার ধর্মের “বিপন্নতা” সংক্রান্ত গর্জনাদ গসাগু হিসাবে বাকিগুলোর সাথে ভারি চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যায়! 

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? আচ্ছা, প্রথমে এই উদাহরণটা দেখুন।

এই মুহূর্তে প্রায় সমস্ত ইসলাম ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশে “ইসলাম বিপন্ন”  আওয়াজ তুলে দিলে, সেই সব দেশের আপামর জনগণকে দিয়ে অনেক রকম দুরাচার গ্রাহ্য করিয়ে নেওয়া যায়। করতে উৎসাহও দেওয়া যায়! কে কী কেন কবে কোথায়—কিছুই না জেনেও নাগরিকদের এক বিরাট অংশ ধরেই নেবে, নিশ্চয়ই বিপন্ন, না হলে আর ওরা বলছে কেন? সত্যিই ইসলাম বিপন্ন কিনা—এও যেমন তাদের অধিকাংশই ভাববে না, ইসলাম বিপন্ন হলেই বা তাতে আমার কী হাতিঘোড়া এসে যায়—সেই কথাটাও তারা আর ভেবে দেখতে চাইবে না। “অত সময় কই মশাই? আগে, এক্ষুনি, যে ইসলামকে বিপদে ফেলেছে, তার মাথাটা কচাৎ করে কেটে ফেলি গে’। তারপর আপনার ওসব যুক্তি তর্ক নীতিকথা শুনব’খন।” এরকম একটা গণ প্রক্ষোভ (mass hysteria) তাদের মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ তৈরি হয়ে যায়! তালিবান আল কায়দা আইসিস বোকো হারাম ইত্যাদি ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো ঠিক এই কৌশলেই তাদের যাবতীয় কুকর্ম করে চলেছে। আর পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেশ জাতি আর ধর্মের বিপন্নতাকে একই মৌল সমসত্ব বিপন্নতা হিসাবে দেখানো খুবই সহজ কাজ। আর এরকম অবস্থা একটা দেশে একবার তৈরি করতে পারলে ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের প্রশ্ন, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার—এক কথায় মানুষের সমস্ত গণতান্ত্রিক স্বাধিকার ভোগ করার সুযোগ কেড়ে নেওয়া যায়।

আর আজকাল কে না জানে, এই যাবতীয় ইসলামি জঙ্গি সন্ত্রাসী সংস্থাগুলোকে তৈরি করে টাকাপয়সা নিরাপত্তা দিয়ে চালু রেখেছে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের “শান্তি ও গণতন্ত্র প্রিয়” সরকার। সেই রাষ্ট্রীয় মদত। আল কায়দা তালিবান থেকে শুরু করে আজকের আইসিস পর্যন্ত সব কটি ইসলামি সন্ত্রসবাদী শক্তিই আমেরিকার যুদ্ধ মেশিনের আড়াল-সন্তান।

বাংলাদেশে অন্য নামে, এক আধটা যুক্তিবাদী নাস্তিক বক্তব্য সম্পন্ন ফেসবুক পোস্ট দেখিয়েও, সেখানকার ইসলামিক সংগঠনগুলি ঠিক এই কাজই করে চলেছে। তাদের পেছনেও আছে বাংলাদেশ সরকারের প্রচ্ছন্ন মদত ও সুরক্ষা। ওদেশেও গণতন্ত্রকে বধ করার নাটক একই সঙ্গে অভিনীত হয়ে চলেছে।  

এবার ভারতের কোনায় কোনায় দেখুন। একই ছবি। পাকিস্তান জুজু দেখিয়ে, কাশ্মীরের ঘটনা দেখিয়ে ভারতের “অখণ্ডতা বিপন্ন” বলে হাঁক দিলেই অধিকাংশ মানুষের যুক্তিবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। পাকিস্তান কী করেছে, তার ক্ষমতা কদ্দুর, দুচারটে জঙ্গি হানা করে বা জঙ্গি গ্রুপ ঢুকিয়ে এত বড় একটা দেশের অখণ্ডতা সত্যিই খণ্ড খণ্ড করতে পারে কিনা—এই ধরনের সমস্ত কার্যকর প্রশ্নগুলো তোলার কথা মানুষ ভুলে যায়। কিংবা, মুম্বাইয়ের সাত তারকা হোটেলে জঙ্গিরা এত বিপুল অস্ত্রশস্ত্র জমা করল কীভাবে, সীমান্ত রক্ষীরা কী করছিল—সেই সমস্ত জরুরি প্রশ্ন তুলতেও ভুলে যায়। অন্য কেউ সেই সব প্রশ্ন তুলে দিলে বা বলতে চাইলে, তাকে পাকিস্তানের দালাল বলে গাল পেড়ে আবার একই কথা বলে যাওয়া যায়!

এ এক ধরনের গণ বিভ্রান্তি (mass hallucination), একটা কাল্পনিক চিত্রকে বাস্তবের ছবি বলে মনে করা এবং তার ভিত্তিতে সামষ্টিক উত্তেজনা প্রদর্শনমূলক আচরণ করা। এই উগ্র আচরণ যখন চারদিকে পরিদৃশ্যমান হয়ে ওঠে, অন্য মত, বিপরীত চিন্তা, ভিন্ন অবস্থান নেবার অধিকার—কোনো কিছুকেই তা মাথা তুলতে দেয় না। যুক্তির ফুসফুস এক অসহায় শ্বাসরোধী অবস্থায় তখন হাঁসফাস করতে থাকে।

উঁহু, আপনি এই জিনিসটা বোধ হয় লক্ষ করতে ভুলে গেছেন। এই উগ্র দেশপ্রেম জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির নামে গণ বিভ্রান্তি তৈরি করার পক্ষে একটা সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অবকাঠামো অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছে। সেটা হচ্ছে পাকিস্তান আর কাশ্মীরের সঙ্গে মুসলমান জনসংখ্যার অস্তিত্ব। আর হিন্দুত্বের মোড়কে মুসলিম ধর্মের এবং ধর্মবিশ্বাসীদের বিরোধিতা। অর্থাৎ, আবার সেই ধর্ম নামক গুণনীয়কটি এসে গেল। গণ বিভ্রান্তিই বলুন, আর গণ প্রক্ষোভ—উভয়েরই পেছনে রয়েছে সেই ধর্মের পক্ষ-বিপক্ষ খেলা। সেই তোমরা আর আমরা। তোমারটা শান্তির নাম করে সন্ত্রাস; আর আমারটা সন্ত্রাস রুখবার নাম করে জঙ্গিপনা! এখানে আমার গায়ের এবং গলার জোর বেশি। অতএব আমার কথাটাই সত্য। বা, আধুনিক অধুনোত্তর পরিভাষায় পরাসত্য (post-truth)!

কিন্তু এমন অনেক দেশ তো আছে, যেখানে হয়ত ধর্ম সরাসরি কোনো উত্তেজনার বারুদ হিসাবে কাজ করেনি, সেখানেও কি তার একটা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে?

অবশ্যই থাকে।

জার্মানিতে হিটলার যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, তার মধ্যে যে ইহুদি-খ্রিস্ট ধর্মের বিরোধকে কাজে লাগানো হয়েছিল, তার কথা কি ভুলে গেলেন? হ্যাঁ, ইহুদি সেখানে জাতিসত্তারও প্রতীক বটেই। অনেকেই জাতিসত্তায় ইহুদি হলেও ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিলেন। তাতেই বা কী হল? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের খান সেনারা যেমন বাঙালি মুসলমানকে মুসলমান বলে মনে করত না, তার জাতিসত্তাকেই প্রাধান্য দিয়ে তাদের ইসলামের শত্রু বলে ভাবত এবং প্রচার করত, হিটলারের আমলেও অনেকটা এই রকমই ব্যাপারটা ঘটেছিল। “হুঁ হুঁ বাওয়া, খ্রিস্টান সেজে ভেবেছ আমাদের চক্ষে ধুলো দেবে? কক্ষনও না। তোমার সাদা-ধূসর চোখের মণি, তোমার নামের শেষে -স্টাইন, তোমার নামের মধ্যাংশে জোসেফ ডেভিস আইজ্যাক প্রমুখ শব্দ বলেই দিচ্ছে তুমি ইহুদি ধর্মপথের পথিক। আমরা ওটাকে ঘৃণা করি। সেই ঘৃণা আমরা আমাদের জাতির মধ্যে ছড়িয়ে দেব। বিশুদ্ধ খ্রিস্টানরা তোমাদের ভেজালকে মেনে নেবে না। আর্য রক্তকে তোমাদের দ্বারা কলুষিত হতে দেবে না!” এই ভাবেই সেদিন হিটলারের নাৎসি প্রচার যন্ত্র জাতিবাদ, জাতীয়তাবাদ আর নৃজাতিসত্তার সাথে ধর্মকে মিলিয়ে মিশিয়ে খিচুরি পাকিয়ে বৃহত্তর জার্মান জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছিল। আর সেই গণ বিভ্রান্তির জালে পড়ে আম জার্মানরা অধিকাংশ তখন বেশ কয়েক বছরের জন্য জীবন সংগ্রামের আসল আসল মুদ্দা থেকে এই নকল মুদ্দার দিকে নিজেদের নজরকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে ধর্মের মতো নেশাপ্রদ দ্রব্য আর হয় না। এলএসডি মারিজুয়ানা তো কোন ছাড়!  

ফ্যাসিবাদ আসছে

ধর্মীয় নেশার আসলে কাজ কী? এবার সেই জায়গাটা আমাদের বুঝে নিতে হবে। আমরা আগেই দেখিয়েছি, ধর্ম যে এক নিরুপায় অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে তার অন্যতম প্রধান ও প্রথম কারণ তার জ্ঞানের জগত থেকে উত্তরোত্তর বিচ্ছিন্নতা। যা কিছু সে বলে, যা কিছু সে প্রচার করে—তার সবই মিথ্যার উপর, বর্জিত জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে। তার ঈশ্বর ধারণা, স্বর্গ-নরক পাপ পুণ্য ধারণা, আত্মা-পরমাত্মা শেষ বিচার জন্মান্তরের ধারণা, তার আচার বিচার প্রথা প্রকরণ, তার নৈতিক নির্দেশনা, পবিত্র অপবিত্র ভেদাভেদ বোধ, তার খাদ্যবস্তুর হালাল হারাম বিভাজন, তার পুরুষ নারী সম্পর্ক অধিকার ও দায়িত্ব সংক্রান্ত ভাষ্য, তার বস্তুজগত সম্পর্কিত ব্যাখ্যা—এক কথায় বলতে গেলে, এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই সে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ বিশুদ্ধ ভুলের সুসজ্জিত রঙ্গমঞ্চে।

হ্যাঁ, সে তো বটেই। ভুল থেকেই আমরা জানার কাজ শুরু করি এবং ধীরে ধীরে ভুলগুলিকে এক এক করে ঝেড়ে ফেলে সঠিক জ্ঞানের দিকে পা ফেলে এগিয়ে যাই। মানব জাতির জ্ঞানজগতের ইতিহাস হচ্ছে অজ্ঞতা থেকে সত্য জ্ঞানের দিকে অগ্রগতি। সেই অর্থে ভুল করাটা কোনো দোষের কথা নয়। এগোতে পারলেই হল।

কিন্তু মুশকিল কী জানেন? এই অগ্রগতির প্রশ্নটিই ধর্মের এক প্রকাণ্ড অপস্থিতি (anti-thesis)। তার শাস্ত্র, তত্ত্ব, বিচার, প্রথা, সবই প্রাচীন এবং সে সব যত প্রাচীন তত পবিত্র এবং শ্রদ্ধার্হ। সেখানেই সে স্থিত থাকাটাকে তার পরম কর্তব্য মনে করে। সেই সব ছেড়ে এগোলেই তার পতন। তার এই স্থৈতিক অবস্থানই তার জ্ঞানরহিত স্থবিরতার গ্যারান্টি। আর জ্ঞানরহিত বলেই ধর্মের পক্ষে এক রকম অন্ধতা ও যুক্তিহীনতার জন্ম দান করা সহজ ও সম্ভব হয়ে ওঠে। সচেতনভাবে ধর্ম চর্চা করার সঙ্গে তাই অন্ধতা গোঁড়ামির শিকার হয়ে ওঠা এক স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখা দেয়। এর মধ্যে কোনো ভণ্ডামি বা অসৎ পরিকল্পনা নেই। এই তার ভবিতব্য। এমনটাই এর অমোঘ নিয়তি। ধর্মীয় বিশ্বাসের গণ্ডী থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে না পারলে অন্ধতা ও গোঁড়ামির থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। আর যত তার সঙ্কট বাড়ছে, ততই সে এই ভবিতব্যকে আরও জোরে, আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরছে।   

আধুনিক শোষণমূলক ধনতান্ত্রিক সমাজ এই সব ঐতিহাসিক সত্য ও শিক্ষাগুলিকে বেশ ভালোভাবেই আত্মসাৎ করতে পেরেছে। ফরাসি বিপ্লবের চাইতে ইংল্যান্ডের বিপ্লবই তার কাছে অধিক পছন্দসই। ধর্মকে ওরা একেবারে উচ্ছেদ করে ফেলেনি। কিছুটা জায়গা ছেড়ে রেখেছিল। আবার জার্মানির বুর্জোয়া বিপ্লবকে সে আরও বেশি পছন্দ করে। যেখানে কান্ট ফিখটে শেলিং হেগেল প্রমুখদের হাত ধরে ধর্মের সাথে আপসকে এক প্রচ্ছন্ন তাত্ত্বিক দার্শনিক পরিচ্ছদে আবৃত করেই বুর্জোয়ারা সমাজ পুনর্গঠনে হাত লাগিয়েছিল। নাস্তিক নিৎসেও ধর্মকে এক ভাবে কাজে লাগানোর কথা বলে যান স্রেফ শ্রমিক বিপ্লবের সম্ভাবনাকে রুখবার অচেতন প্রয়োজনবোধ থেকেই। এক সার্ত্রকে বাদ দিলে অস্তিবাদী দর্শনও জার্মানির মাটিতে বসে ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বকে জড়িয়ে ফেলে।

মানব জাতির ইতিহাস ভারি রসিক এবং নির্দয়।

আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত মারণ যজ্ঞ স্বরূপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা লক্ষ করে একদল মানবতাবাদী চিন্তাবিদ বিজ্ঞান এবং যুক্তিশীলতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ধর্ম এবং ঈশ্বরের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়লেন। আরও বেশি বেশি করে তাঁরা আধ্যাত্মিকতার জয়গান গাইলেন। যা মানুষকে আরও অন্ধতা ও গোঁড়ামির দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে গেল। সেই অন্ধতা আর গোঁড়ামি আবার মিথ্যা দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘি ঢেলে ঢেলে উত্তেজনার উত্তাপ বাড়িয়ে সেই সব দেশগুলিকেই আরও নিশ্চিতভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে আপ্লুত করে দিল! হিটলার আর মুসোলিনিকেও সেই অন্ধতা আর কট্টরতা দারুণভাবে সাহায্য করেছিল তাদের ফ্যাসিস্ত রাজ কায়েম করার কাজে। ধর্মের কাছে শান্তি চেয়ে তাঁরা পেলেন আরও ব্যাপকতর হিংসা। 

আজ ভারতের বুকেও আমরা সেই একই খেলা দেখতে পাচ্ছি।  

এক বিরাট সংখ্যক সাধারণ মানুষ ধর্মীয় ভাবাবেগের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। গো-ভজনা, মুসলমান বিদ্বেষ, কাশ্মীর নিয়ে গা-গরম দেশপ্রেম, পাকিস্তান বিরোধী জিগির, ইত্যাদি পরিবেশনের ক্যালেন্ডার দেখলেই তা বোঝা যাচ্ছে। সেই মনমোহনের আমল থেকেই ভারতীয় পুঁজিবাদ খুব দ্রুত অর্থনীতি রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। স্বাধীনতা উত্তর কালে যতটুকু সীমিত গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল, সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার প্রভাবে যে সামান্য একটা জনমুখী অর্থব্যবস্থার ঠাটবাট তৈরি করা হয়েছিল, ১৯৯১-উত্তর “উদার”-নীতির আমলে সেই সমস্ত ভেঙে দিয়ে ভারতীয় পুঁজিবাদ তার দাঁত-নখ বের করে ফেলেছে। আর কংগ্রেসি রাজনীতিতে যে ঢিলেঢালা ভাব ছিল, বিজেপি তা কাটিয়ে উঠে দ্রুত সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে শাসক দলীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ফেলতে চাইছে। প্ল্যানিং কমিশন ভেঙে দেওয়া, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাথায় দালাল বসানো, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সঙ্ঘের লোকজনকে নিযুক্ত করা, বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে নেবার প্রচেষ্টা, পার্লামেন্টের বাইরে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়া—এসব এখন যেন সাধারণ ঘটনায় পর্যবসিত।

গোপাল গান্ধী ২০১৪ সালে (তখনও মনো আমল) সিবিআইয়ের প্রতিষ্ঠাদিবসের ভাষণে অভিযোগ করেছিলেন, একটা কর্পোরেট পরিবার (রিলায়েন্স গ্রুপ) দেশের সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদের সিংহভাগের মালিক ও নিয়ন্ত্রক হয়ে বসেছে। দিল্লির সরকার তাদের কথায় ওঠবোস করে চলেছে। সেই অভিযোগ আরও সাংঘাতিকভাবে এখন মূর্তরূপ ধারণ করেছে। তবে হ্যাঁ, একটা নয়, একাধিক কর্পোরেট গ্রুপ। আম্বানির পাশাপাশি আদানি, বেদান্ত, এশার, মাল্য, রামদেব, ইত্যাদিরাও এই সার্বিক লুটের খেলায় এখন টিম হিসাবেই হাজির। এই লুটের অংশ হিসাবেই সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তারা ফেরত দিচ্ছে না, সেই অবস্থাতেই আবার ঋণ নিচ্ছে এবং মোদীর বদান্যতায় পেয়েও যাচ্ছে। ছত্তিসগড়ে অ্যালুমিনা সহ বিবিধ খনিজ আকরিক উৎসের উপর বিনি পয়সায় দখল নেবার জন্য আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে পাহাড় জঙ্গলের যথেচ্ছভাবে ইজারা বন্টন চলছে। কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার একর জমি পাতঞ্জলিকে বিনা পয়সায় দান করা হচ্ছে তার ব্যবসাকে বাড়িয়ে তোলার জন্য। এইভাবেই ২০১৬-১৭ সালে বড় নোট বাতিলের হিংস্র আগ্রাসনে দেড় শতাধিক নাগরিককে হত্যা করে এক ধাক্কায় কয়েক লক্ষ কোটি টাকা মানুষের পকেট থেকে জবরদস্তি কেটে এনে ব্যাঙ্কের শূন্যপেট ভরানোর ব্যবস্থা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বাধা সত্ত্বেও জোর করে সর্বত্র আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করে জনসাধারণের ব্যক্তিগত তথ্য ভারত সরকার হয়ে আমেরিকান সরকারের মহাফেজখানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি একটা বিল আনা হয়েছে, যার লক্ষ্য হচ্ছে বৃহৎ ব্যাঙ্কগুলি দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছলে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত অর্থ থেকে টাকা কেটে তাকে রক্ষা করা হবে। এ যেন এক বিপ্র-অভিস্রবণ প্রক্রিয়া (reverse osmosis) চলছে, যেখানে বিপুল পুঁজির মালিক আম্বানি-আদানি-নীরবদের অনাদায়ী ঋণের বোঝার ভার কার্যত বইতে হবে নিঃস্বপ্রায় আম জনতাকে।

সরকার এবং শাসক দল এই সব চূড়ান্ত জনস্বার্থ হত্যাকারী পদক্ষেপগুলোকে লোকচক্ষুর থেকে আড়াল করে রাখতে এবং সাধারণ মানুষকে অন্য দিকে মাতিয়ে দিতে চাইছে, যাতে তারা খানিকটা বোঝার পরও এর দিকে যথেষ্ট মনঃসংযোগ না করে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও মনন-বিভাজন, গোরক্ষার হুজুগ, লাভ জেহাদ রোখা, পাকিস্তান বিরোধী জিগির, ইত্যাদির নামে যত্রতত্র হামলা চালিয়ে সঙ্ঘ পরিবার তাদের নানা রকম সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে এক উগ্র ধর্মান্ধ হিংস্রতার জন্ম দিয়ে চলেছে। দেশীয় ঐতিহ্যের নাম করে প্রাচীন কালজীর্ণ জাতপাতের ঘৃণা বিদ্বেষকে নতুন করে চাগিয়ে তুলে বিভিন্ন প্রান্তে দলিতদের উপর বর্বর আক্রমণ ও অবমাননার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের মতোই ভারতেও একের পর এক নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ প্রমুখকে হত্যা করে এরা যুক্তিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রতিবাদী মুখগুলোকে ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে দিতে চেষ্টা করছে।

আমাদের দায়

যাঁরা এই সব দুর্যোগ দেখে একে রুখবার কথা ভাবছেন, তাঁদের উপায়ের কথাও ভাবতে হবে। অযুক্তি কুযুক্তি অন্ধতা অজ্ঞতা এবং হিংসার জবাব দিতে হবে যুক্তি তথ্য সত্য জ্ঞানের প্রবলতর চর্চার মাধ্যমেই। শেষ পর্যন্ত তার শক্তি অনেক বেশি। ইতিহাসে এই শক্তিই শেষ অবধি টিকে যায় এবং বিজয় লাভ করে। আমরা জানি, ব্রুনোর হত্যাকারী গ্যালিলেওর নির্যাতনকারীদের নাম মানুষ বহু কাল আগেই ভুলে গেছে; ব্রুনো গ্যালিলেওরা ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন! বাইবেলের বিদ্যা এখন শিশুদের হাস্যরসের অফুরান জোগানদার। আর তাঁদের নিরলস অকুণ্ঠ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞান ভাণ্ডার মানব জাতির যৌথ সম্পদ হয়ে রয়ে উঠেছে। আমাদেরও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও জীবন-জীবিকার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি যুক্তিবাদের চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচার ও প্রচারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করবে। এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই এক দিন সাধারণ মানুষ শুধু তাদের ভুলটা ধরে ফেলবে না, এই সব বিভ্রান্তি প্রচারের নিগূঢ় উদ্দেশ্যও ধরে ফেলবে!

এত দূর এসে ধর্ম সম্পর্কে মার্ক্স এবং মার্ক্সবাদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

কেন না, এই সময়ে এসে এক সমস্যা হয়ে গেছে একালের মার্ক্সবাদীদের, আমাদের মতো দেশের বামপন্থীদের। তাঁরা যেন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। ধর্ম সম্পর্কে মার্ক্সের লেখা একটা ছোট অনুচ্ছেদ তাঁদের এই বিপাকে ফেলে দিয়েছে। এক সময় তাঁরা অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটির উদ্ধৃতি দিতেন। “ধর্ম হচ্ছে জনগণের আফিম।” ওতে যে আরও কিছু বাক্য আছে, তা যেন তাঁরা ভুলে থাকতেন। আর এখন আবার, এই বাক্যটিকেই তাঁরা সযত্নে ভুলে থাকতে চান। এখন তাঁরা কেবলই বলতে চান, এই তো দেখ, মার্ক্স ধর্মের বিরোধিতা করেননি; তিনি বলেছেন, ধর্ম হচ্ছে গরিবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন পৃথিবীর হৃদয়, ইত্যাদি। যে যা ধর্ম কর্ম করতে চায় করুক না, আমরা তাতে আপত্তি করছি না। ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা না করলেই হল।

যাতে লোকে স্পষ্ট করে বোঝে, এই জন্য তাঁরা উদাহরণ দিয়েও বলেন, নরেন মোদীর মতো করে ধর্ম করবেন না, নরেন দত্তর মতো করে ধর্ম করুন। অবাক হয়ে দেখছি, গত বিশ বছরে ভারতের মার্ক্সবাদীদের মধ্যে বিবেকানন্দের চর্চা হঠাৎ যেন বেশ বাড়াবাড়ি রকম বেড়ে গেছে। প্রতিযোগিতা চলছে, কোন বামপন্থী দল কত বেশি বিবেকানন্দ ভক্ত সাজতে পারেন! কিংবা আধুনিক সাংবাদিকদের ভাষা নকল করে বলা যায়, এই সব বামপন্থীরা এখন সঙ্ঘ পরিবারের হাত থেকে বিবেকানন্দকে হাইজ্যাক করে আনতে চাইছেন!

পাঠকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে আগেই বলে রাখি, বিবেকানন্দ নিয়ে আমার কোনো বীতরাগ নেই। দেশকাল ভাবনা পত্রিকায় ২০১৫ সালের শারদ সংখ্যায়, বা মুক্তমনা ওয়েবসাইটে ২০১৬ সালে আমার বিবেকানন্দ সম্পর্কিত প্রবন্ধ/পোস্ট পড়লেও এটা বোঝা যাবে। চিন্তায় বিবেকানন্দের ১৮২ ডিগ্রি উল্টোদিকে অবস্থান করলেও আমি মনে করি, তাঁর থেকে আমরা মার্ক্সবাদীরাও অনেক কিছু শিখতে পারি, নিতে পারি। প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর কিছু মূল্যবান এবং সঠিক পর্যবেক্ষণ আছে। তাঁর বাংলা গদ্য ভাষার বাচন শৈলী এবং তীক্ষ্ণতা ভয়ানক শক্তিশালী। সর্বোপরি, মঠ মিশন নির্মাণে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা থেকেও আমাদের শিক্ষণীয় বিষয় কিছু আছে। আমরা বস্তুবাদী যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক এমনকি মার্ক্সবাদীরাও আজ অবধি ওরকম কিছু একটা জনগ্রাহ্য গণপ্রতিষ্ঠান ভারতের বুকে গড়ে তুলতে পারিনি। অথচ, ১৮৯৭ সালের নরেন দত্তের তুলনায় আজ আমাদের সকলের সম্মিলিত শক্তি অনেক বেশি।

প্রশ্নটা আসলে হল, বিবেকানন্দ থেকে নেওয়া, দুর্বিপাকে পড়ে তাঁকে ব্যবহার করা নয়। আজকের সমস্যা বিবেকানন্দের উদার ধর্ম দিয়ে মোদী কোম্পানির কট্টর ধর্মকে মোকাবিলা করা নয়। যাঁরা বুঝে বা না বুঝে এটা করতে চাইছেন, তাঁরা আবার অন্য দরজা দিয়ে ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছেন। আর, সমাজে যতক্ষণ ধর্ম বিশ্বাস থাকবে, ততক্ষণ সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ এবং তার ভিত্তিতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার শক্তি সঞ্চয়ের প্রধান মূলধনটি হাতের সামনে উপস্থিত থাকবে। 

মার্ক্সের বক্তব্যও আসলে তাই। আফিম জাতীয় নেশায় আচ্ছন্ন মানুষকে সেই নেশা থেকে মুক্ত করতে হবে। যে সমস্ত পার্থিব দুঃখ দুর্দশার কবলে পড়ে তারা ধর্মের স্বর্গীয় প্রতিশ্রুতিতে আস্থা এবং সান্ত্বনা খোঁজে, তার বিরুদ্ধে বাস্তব সংগ্রামে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সেই সাথে মনে রাখা দরকার, এই উক্তি মার্ক্স যবে করেছিলেন (১৮৪৩), তখনও তিনি মার্ক্সবাদী হননি। সদ্য হেগেলের ভাববাদের প্রভাব কাটিয়ে উঠে তিনি ফয়ারবাকের মানবমুখী বস্তুবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন মাত্র। তাঁর বয়ানে বাচনে ও বিশ্লেষণে তখনও হেগেল ফয়ারবাকের প্রভাব সুস্পষ্ট। তথাপি তিনি সেদিনই দেখিয়েছিলেন, ধর্মকে নিছক যুক্তি আর তথ্য সমৃদ্ধ বিতর্ক দিয়ে দুর্বল করা যাবে না। মতাদর্শিক বিতর্ক তো চালাতেই হবে; পাশাপাশি, আর্থসামাজিক মুদ্দার ভিত্তিতে গণ সংগ্রামের ময়দানে সাধারণ মানুষকে নামিয়ে তার মাধ্যমেই ধর্মীয় কুসংস্কার ও বিশ্বাসের আফিম থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে। একটা সার্থক দাবি আদায়কারী মানুষের সংগঠিত দল নিজেদের ঈশ্বরের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী বলে চিনতে শিখবে। এই দুটো মিলে একটা অবিভাজ্য কর্মসূচি। এর কোনো একটাকে বেছে নিয়ে অন্যটাকে বাদ দিতে গেলেই ভুল হবে।ওরা ওদের লুটতরাজ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির কাজটা দিব্যি গুছিয়ে করে চলেছে। এবার থেকে আমাদের কাজটাও আমাদের সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। 

অশোক মুখোপাধ্যায়: মার্ক্সীয় প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ সম্পাদক, সেস্টাস।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *