• December 4, 2021

জুটমিল কথা

 জুটমিল কথা

সন্দীপ সাহা


সারি সারি ইঁটের ফাকে শ্যাওলা জড়ান পাঁচিল। যার এক পারে পাট শ্রমিকদের প্রতিদিনের আতঙ্ক, অভাব, কাজ হারানোর ভয় জড়িয়ে থাকা উচ্ছেদের জীবন …। উচ্ছেদ কেবল সিরিয়াতে নয় মায়ানমারের নয় প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে আমাদের বাড়ির পাশে ঘটে চলা দৈনন্দিন সংবাদে। এ উচ্ছেদের গল্প বিটি রোডের ধার ঘেষে থাকা দু পারের। অর্থাৎ জগদ্দল, কাঁকিনাড়া নৈহাটি জুট মিল শ্রমিকদের জীবন, অতীত থেকে বর্তমানে ঘটে চলা মুহূর্তরা।
এই গল্প সেই সব শ্রমিক পরিবারকে ঘিরে, তাদের সন্তানদের ঘিরে। যাদের ছেলেবেলা হারিয়ে যাচ্ছে। এ উচ্ছেদ শৈশবের কৈশরের, শেষ পরিণতিতে জীবনের। এই গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্র উচ্ছেদের কৈশর জীবন।
যাদের চোখ নামক মনের দরজা দিয়ে জেনে নেব ওদের প্রতিদিন। সেই প্রতিদিনের ভিতর ব্যক্তি জীবনের সংঙ্কট ধর্মীয় দাঙ্গা সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, আর্থিক সঙ্কট, পুলিশি হেনস্থা এবং নাগরিক পরিসেবা বঞ্চনা সর্বপরি উচ্ছেদের ভয়।

স্থানঃ ভারত/ পশ্চিমবঙ্গ/  উত্তর ২৪ পরগণা/ ভাটপাড়া থানা
তারিখঃ ১৯/ ০৯/ ২০১৯-১০/ ০৬/ ২০২০
সাক্ষরঃ সন্দীপ সাহা


বসত বাড়ির দরজা। কৃষি জমি থেকে উৎখাত হয়ে কয়েকশো কিমি দূরে কারখানার চিমনী বেয়ে শিফট শুরুর ভোঁ কয়েক দশক পার করে দিলেও  দরজার অমসৃন কাঠের পাটাতনে ফুল বেল পাতা হয়ে বিহারের মধুবনি গ্রাম বেঁচে থাকে। রুজির কারণে উদ্বাস্তু। তবু শিকড়ের টান ভুলে যাবার নয়। মাথা গোঁজার মতো শ্রমিক মহল্লায় এক আধ টুকুরো গ্রামের ছবি এ ভাবেই জেগে থাকে।আবার ও উচ্ছেদ। রাতারাতি ঘর ছেড়ে বেঘর। জীবন বাঁচাতে এক পোষাকে অজানা অন্ধকারে। গেড়ে বসা ধর্মের জিগির ভয় আতঙ্কের উগ্র সংঙ্কেত হয়ে দেওয়াল দরজায় সীমানা কায়েম করে। ফাঁকা মহল্লা। বই-খাতা-প্রতিদিনের সংসার ধর্ম পেশি শক্তির কাছে ছাড়খার হয়ে ছড়িয়ে থাকে। 

ইয়াসমিন ক্লাস ৬ এর ছাত্রী। ঠাকুরদার একমাত্র স্মৃতি ১২০ এমএম ফটো নোগোটিভ । ইয়াসমিন বলে ১৯৯৬, ২৬ শে জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস, সে দিন জুট মিলের সেফটি ট্যাঙ্ক ফেটে ছয় জন জুট মিল মজুরের সাথে তার ঠাকুরদাও মারা যান। আজও জুট মিলের স্নানাগার ও পয়োপ্রনালী একই রকম দুরাবস্তায় রয়ে গেছে। 

৬/ ০২/ ২০২০ গুলনার পারভিন সব হারানো ১৫ বছরের মেয়ে। শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি স্বপ্ন দেখে লেখক হওয়ার। চারপাশের সব গল্প কাগজে কলমে ধরে রাখার। দাঙ্গায় সব হারানো এই মেয়ের বই খাতা পেন যাবতিয় যা কিছু লুঠ হয়েছে। পরিবারের রোজ ব্যবহার করার একটা চামচে পর্যন্ত ছাড় দেয়নি। এত কিছু লুঠ যাবার পরেও এই মেয়ের স্বপ্ন লুঠ করতে পারেনি। 

নুর মহম্মদ অবসর হওয়া চট কল-মজুর। বিহার ছেড়ে বাবার হাত ধরে ১৯৬০ সালে ষোল বছর বয়সে জগদ্দলের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান জুট মিলে জুতে যান। বর্তমানে পেনশন না পাওয়ায় ১২০ টাকা রোজে বদলি শ্রমিক হয়ে কাজ করেন।
২৩/ ০৫/ ২০১৯ দাঙ্গায় লুট হয়ে যায় সর্বস্ব। বেআব্রু বসত ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে একটাই আক্ষেপ – ‘১৯৬০ থেকে খাবারের জন্য লড়ছি… আমার বাবাও তাই করেছিল।’

নাজিবুল ৭০ এর বৃদ্ধা, বেঁচে আছেন মৃত স্বামীর এক মাত্র পাসপোর্ট ছবিকে দু হাতের তালুর শক্ত মুঠোয় আগলে রেখে। একের পর এক উদ্বাস্তু হয়ে সব হারিয়েও এই জীবন যৌবনের ৩.৫cm- ৪.৫cm  স্মৃতি কখন আলগা হতে দেননি।
৭.হাজরা পারভিন আট মাস বাদে লুঠ হয়ে যাওয়া পায়রা ফিরে পায়। ২০১৯-র দাঙ্গায় ৮ বছরের হাজারা হারিয়ে ফেলে তার সাধের কবুতর।


সন্দীপ সাহা ঃ চিত্র সাংবাদিক। 

  •  
  •  
  •  
  •  

6 Comments

  • Just marvellous.. actually I am a very fastidious person to praised someone,of that view it is obviously good… keep it up… In future it’s also carry on by you

    • ধন্যবাদ প্রদীপ দা।

  • লেন্সের কাব্যে চোখের জল

    • ধন্যবাদ।

  • অসাধারণ কাজ ও চিন্তা

    • ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *