• December 4, 2021

বাংলা থিয়েটারের পাগলা ঘোড়া

 বাংলা থিয়েটারের পাগলা ঘোড়া

অনিন্দ্য দাশ

তাঁর নাট্যভাবনার সঙ্গে বাংলার তথা ভারতীয় থিয়েটার কতটা একমত বা থিয়েটারকে মুক্ত করার তাঁর নাট্য অভিপ্রায়টি কতটা যুক্তিযুক্ত সে বিতর্কে না গিয়েও একথা বলা যায় যে ষাটের দশকের মাঝামাঝি বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটার যখন মোটামুটি একই গতবাঁধা পথে চলেছে, একইরকম নাট্যভাষায় তার প্রকাশ হচ্ছে,কতিপয় নাট্যকার ভাবতে শুরু করেছেন যে এই প্রকাশভঙ্গি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করা উচিত, প্রচলিত ফর্মটাকে ভাঙা প্রয়োজন, সেই সময় অতর্কিতে একজন নাট্যকার এসে উপস্থিত হলেন এক অসামান্য শক্তি নিয়ে। বাদল সরকার তাঁর ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন বাংলা নাটক একই রাস্তায় চলবে না । বাংলা নাটকও নতুন পথ আবিষ্কার করতে পারে,নতুন নতুন মাত্রা খুঁজে পেতে পারে। বাংলা নাটকও পারে নিজস্ব দর্শকসমাজের বাইরে থাকা মানুষের সঙ্গে ক্রমাগত এক অন্তহীন সংলাপ চালিয়ে যেতে যে সংলাপের লক্ষ্য থাকবে সমাজের চিন্তা,সংশয়, দোদুল্যমানতা,চাহিদা এবং তারই মধ্যে নানা স্তরের মানুষের অবস্থানের হদিস পাওয়া। বাংলা থিয়েটারে নতুন ভাবনা, নতুন প্রকাশভঙ্গি নিয়ে  আসতে চাওয়া নাট্যকারেরা তাঁদের সঙ্গী পেলেন। সারা ভারতব্যাপী প্রভাব বিস্তার করল এই নাটক।ভারতের অন্য রাজ্যের বহু নাট্যকারের নাটকের মধ্যেও প্রভাব পড়্ল ওই নাট্যভাষার ।
পেশায় ছিলেন টাউন প্ল্যানিং ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি সূত্রে বিভিন্ন দেশ ঘুরে কলকাতায় থিতু হলেন ১৯৬৭ সালে। থিয়েটার ছিল তাঁর বিনোদন, কিন্তু ক্রমশ এটাই তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। তৈরি করলেন নিজের দল শতাব্দী। এক  নতুন থিয়েটারের কথা বললেন বাদল। স্বাভাবিক থিয়েটারের বাইরে বেরিয়ে এসে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের উপকরণ,সেট,পোশাক, প্রপস,মেক আপ, আলো ইত্যাদির ব্যবহার যথাসম্ভব কম করে দর্শকদের সঙ্গে আরও নিবিড়, সরাসরি এক যোগসূত্র স্থাপন। প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সঙ্গে কুড়ি বছর অন্তরঙ্গ থাকার ফলে মনে অজস্র প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল,বাংলা নাটকের ভাষা, আঙ্গিক পরিবর্তনের একটা চাহিদার ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছিল।শতাব্দীর জন্মের পর সেগুলি সংহত রূপ পেল সত্তরের শুরুতে।বাদল সরকার বললেন ‘ থার্ড থিয়েটার ‘।থিয়েটারের মাধ্যমে কি করে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় তা খুঁজতে গিয়ে পেলেন থিয়েটারের এক নতুন ভাষা।তার সঙ্গেই উঠে আসলো ‘মুক্ত থিয়েটার ‘ বা ‘ফ্রি থিয়েটারের ‘ ভাবনা যা শুধুমাত্র শহুরে উচ্চ বা মধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা। এ থিয়েটার নমনীয়,বহনীয় এক মুক্ত থিয়েটার। এখানে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের উপকরণগুলি অপরিহার্য নয়। এখানে থিয়েটারের মূল হাতিয়ার যে মানুষের শরীর,অভিনেতাদের সেই শারীরিক সক্ষমতা,শক্তি সামর্থ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই নতুন ধারার নাটকে গ্যালারির মত করে সাজানো কাঠের বেঞ্চে বসবেন দর্শকরা।একটা চেয়ারে একলা বসার চেয়ে এইভাবে বসলে থিয়েটারের সঙ্গে দর্শকরা আরও একাত্ম বোধ করবেন।এই থিয়েটারে আলাদা কোন মঞ্চ নেই,অভিনয় করতে হয় মেঝেতে অর্থাৎ দর্শক ও অভিনেতার রয়েছেন একই পরিবেশের মধ্যে। এটাকে বাদল বললেন ‘অন্তরঙ্গ থিয়েটার ‘ । অভিনেতারা ব্যক্তিগতভাবে দর্শকদের কাছে যেতে পারেন, ছুঁতেও পারেন । বিচ্ছিন্ন কোন দূরত্ব থেকে দেখা বা শোনার জন্যে এ নাটক নয়। এ নাটক বলল,অনুভব করো,অন্তর্গত হও। বাদল বললেন, ” নতুন থিয়েটারের কাছে দর্শকরা বাস্তবের ইলিউশন দাবি করেনা । তাঁরা দাবি করে বাস্তবকে,অভিনেতাদের বাস্তব উপস্থিতিকে।…এ থিয়েটারে দর্শক ও অভিনেতাদের মধ্যেকার স্পেসটা বদলে গেল…। এই নতুন থিয়েটারের অভিনেতারা নেমে আসেন, কাছে আসেন,সে যেমন মানুষ ঠিক তেমনিভাবেই আর এক মানুষ দর্শকদের কাছে ধরা দেয়।” বাদল অনুভব করলেন তাঁর এই বদলে যাওয়া থিয়েটারের ভাষা তাঁকে দিয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগের অনুভুতি। এই নতুন থিয়েটারে বাদল এমন একটা স্বাধীনতা বোধ করলেন যা তিনি প্রসেনিয়াম থিয়েটারে করেননি। আরও একটা  বিষয়,যা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হল, তিনি দেখলেন,দামী মঞ্চ, পোষাক, প্রেক্ষাগৃহ এবং অন্যান্য উপকরণ বর্জন করে শুধুমাত্র মানুষের শরীরের ওপর নির্ভর করার ফলে তিনি তাঁর থিয়েটার কে অর্থের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে পেরেছেন। এই থিয়েটার যথার্থই ‘ফ্রি’ হতে পারে শুধু মুক্ত অর্থে নয় ‘ মাগনা ‘ অর্থেও।বাদল তীব্র ভাবে বিশ্বাস করতেন,থিয়েটারকে অবশ্যই ফ্রি হতে হবে,বেশীরভাগ মানুষের টিকিট কেনার সামর্থ্য নেই শুধু এই কারণেই নয়,বরং থিয়েটার যা মানুষের সঙ্গে মানুষকে সমমর্যাদার সঙ্গে মিলিত হবার বন্দোবস্ত করে দেয় সেখানে অর্থের প্রশ্নে প্রবেশ শর্তাধীন হয়ে গেলে সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়াবে ক্রেতা বিক্রেতার। এটা থিয়েটারের মত মানবিক একটা কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ‘থিয়েটারের জন্য থিয়েটার ‘ বা ‘ শিল্পের জন্য শিল্প ‘ এ ধরণের কোন আপ্তবাক্যে বাদল বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন তাঁর এই নতুন নাট্যভাষা তখনই প্রতিষ্ঠা পাবে যখন এটা একটা আন্দোলনের চেহারা নেবে। আজ যদি আমরা পশ্চিমবঙ্গ বা দেশের থিয়েটারের দিকে তাকাই,দেখতে পাব, বেশকিছু বিতর্ক, অমিল থাকলেও বাদল রচিত এই নাট্যভাষা কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।খুব সফল না হলেও থিয়েটারের এই প্রকাশভঙ্গীও একটা বিশেষ ঘরানা বলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯৫৭-৫৯ জুড়ে ডায়েরি এবং কবিতায় লেখা খসড়া থেকে ১৯৬৩ তে এল পরিমার্জিত পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘ এবং ইন্দ্রজিৎ ‘ । এর কেন্দ্রীয় চরিত্র এক লেখক,যে ক্রমশ আবিষ্কার করে,সাহিত্যের ক্ষেত্র নির্বাচনে ভুল হয়ে গেছে বিলকুল। সে নাটক লিখতে চায় কিন্তু পারেনা।তার চারপাশে অনেক লোক,অনেকেই অন্তরঙ্গ, পারিপার্শ্বিক ঘটনার ঢেউও বিস্তর এতদসত্বেও সে পারছেনা।তার চারপাশে জমে উঠেছে রাশি রাশি ছেঁড়া কাগজ । এবং দিনশেষে স্বীকারোক্তি, ‘ কিছুই করার নেই আমার ‘।  শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষেরই প্রতিনিধি অমল-বিমল-কমল-ইন্দ্রজিৎ। প্রথম তিনটি নামে রয়েছে অন্ত্যমিলের সাম্য,মিলের এই সুষমা ভেঙ্গে দিল ইন্দ্রজিৎ। এবং এখানেই লেখকের
প্রয়োজন হল একটি সংযোজক অব্যয় এবং।অমল,বিমল,কমল এবং ইন্দ্রজিৎ। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত জীবনের অবসাদ, একঘেয়েমি, স্বপ্ন,অন্ত:সারশূন্যতা  এবং তার মধ্যে দিয়ে একজন ইন্দ্রজিতের উঠে আসার তৃষ্ণা- র মধ্যে মধ্যবিত্ত জীবনের গভীর সত্যকে দর্শক পেল এক নতুন আঙ্গিকে যা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিল। ১৯৭৩, তাঁর অঙ্গনমঞ্চে হাজির করলেন ‘ স্পার্টাকাস ‘। এই নাটকের
বিশেষ প্রকাশভঙ্গী নায়িকা দিলো বাংলার বুধসমাজ কে। ‘ স্পার্টাকাস ‘ নামের চরিত্রটাকে বাদল বদলে দিলেন একটা শ্রেণীতে। মনে হল ‘ ‘ স্পার্টাকাস ‘ একজন ব্যক্তিমানুষ নয়, সে একটা শ্রেণী এবং আমাদেরই দেশের,আমাদের অত্যন্ত কাছের।এই নাটকটি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে বাদল বাংলা থিয়েটারে একটা বিপ্লবের কাজ করলেন।ছয়ের দশকের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ পরবর্তী নাটকগুলিতে শাহরিক মধ্যবিত্ত মানুষের ডালভাত জীবনের নিরাশা যেমন পরিস্কার আবার তেমনি মানবিক মূল্যবোধের উজ্জ্বল ভাস্কর্যও বর্তমান। ‘ বাকি ইতিহাস ‘,’ ত্রিংশ শতাব্দী ‘, বা পরবর্তীতে ‘ মিছিল ‘ বা ‘ভোমা ‘ -র মত নাটকের মধ্যে রয়েছে ইতিহাস চেতনা,দায়বদ্ধতা আর মানবিক বোধ । এই সময়ে বাদল সমাজে যে রাজনৈতিক অবস্থাটা রয়েছে তার পরিবর্তন চেয়েছেন তাঁর নাটকের মধ্য দিয়ে। বাদল তাঁর নাটকের মধ্যে যে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বললেন,যে সমাজ বদলের কথা বললেন তা কিন্তু কোন রাজনৈতিক দলের কথা বলে মনে হল না। সমাজের ত্রুটিগুলি,অব্যবস্থাগুলি চিনিয়ে দিচ্ছেন,শুধু চিহ্নিত করছেন তাই নয় পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেও প্রকাশ করছেন অথচ এটার জন্য কোন রাজনৈতিক দলের ইস্তাহার লাগলো না !সমকালীন নাট্যকার বা নির্দেশকরা অনেকেই তাঁর থিয়েটারকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন।অনেকেই তাঁর নাট্যভাবনা সম্পর্কে তাঁদের আপত্তি দ্বিধা বা সংশয়ের কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন কিন্তু তাঁরা বাদল সরকার সম্পর্কে তাঁদের অসীম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। তাঁর নাট্য অভিপ্রায় নিয়ে বিতর্ক ও সংশয় থাকলেও এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে তাঁর নাট্যভাষা ৬০ ও ৭০ দশকের বাংলা থিয়েটারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিলো এবং থার্ড থিয়েটার আন্দোলনে স্পর্ধা ও চোখে চোখ রেখে তাকানোর সাহস জুগিয়েছিলো।

অনিন্দ্য দাশ: গ্রন্থাগারিক,বামপন্থী গণ আন্দোলনের কর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post