• December 4, 2021

ফাঁকিবাজের স্বাধীনতা : স্বাধীনতার ফাঁকিবাজি

 ফাঁকিবাজের স্বাধীনতা : স্বাধীনতার ফাঁকিবাজি

অভিজিৎ রায় 

“আমি ক্লাসে এত করিয়া ছাত্রদের পড়াইলাম যে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়িয়া চন্দ্রগ্রহণ হয়; তাহারা তা পড়িল, লিখিল, নম্বর পাইল, পাস করিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হইল যখন আবার সত্যি সত্যি চন্দ্রগ্রহণ হইল তখন চন্দ্রকে রাহু গ্রাস করিয়াছে বলিয়া তাহারা ঢোল, করতাল, শঙখ লইয়া রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল।”  কথাগুলো আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের।  এক্কেবারে অন্য বিষয়ে। শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁকি বিষয়ে। আসলে ভারতীয়দের জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রতিটি শব্দ যেমন আছে তেমনই ওতোপ্রোতোভাবে প্রতিটি শব্দের সাথে জড়িয়ে আছে ফাঁকি শব্দটি।  আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ উগলে দিয়ে আসি, ডিগ্রি নিয়ে চাকুরিপ্রার্থীর লাইনে ভিড় বাড়াই অথচ শিক্ষিত হই না। পরীক্ষাহীন মাধ্যমিকে প্রতিবেশীর ছেলে অথবা মেয়ে নম্বর বেশি পেলে আমরা স্কুলে গিয়ে হাঙ্গামা জুড়ে দিই অথচ নিজের ছেলের জ্ঞানের পরীক্ষা দিতে ভয় পাই।আমরা, প্রায় প্রত্যেক ভারতবাসীই স্বার্থান্ধ, ধান্দাবাজ, অশিক্ষিত এবং তৈলমর্দনকারী হয়ে নিজেকে স্বাধীন রাখার বৃথা চেষ্টা করি এবং আমাদের সেই ফাঁকিবাজির ফাঁক গুলো অনাবৃত হয়ে পড়ায় কতিপয় বুদ্ধিমান রাজনৈতিক নেতা ও ধনকুবের আমাদের ক্রীতদাস বানিয়ে আমাদেরই কষ্টার্জিত অর্থ ও সম্পদ ভোগ করতে থাকেন ছলে, বলে, কৌশলে।  স্বাধীনতার মানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির কাছে ভিন্ন ভিন্ন।  নিজেদের উপার্জনের নিরিখে মানুষের স্বপ্ন আর স্বাধীনতা বদলে যায়।  লকডাউনের বাজারে কাজ হারিয়ে কুড়ি টাকার প্যাকে বাংলা মদ খেতে পাওয়াটাও কারোর কাছে স্বাধীনতা।   সমাজের উপরমহলের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যের গোপন আঁতাতে সমাজের শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার নামই এখন স্বাধীনতা।   সরকারের কাছে কোনও তথ্য চেয়ে পাওয়া না গেলেও টিভি চ্যানেলে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রী মনগড়া তথ্য দিয়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করতে সমর্থ হয়েছেন কোভিড ১৯ কে সামনে রেখে।আর সেই ভীত, সন্ত্রস্ত  সাধারণ মানুষ জানতেই পারলেন না তাদেরকে অর্থনৈতিক দিক থেকে মেরে ফেলতে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার এই অতিমারির সময়কালে কত বিপজ্জনক বিল পাশ করিয়ে নিলেন সংসদে।  শ্রম বিল, নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি এবং কৃষি বিল সংসদে পাশ করানোর সময় ভারতের সংবিধানকে পর্যন্ত বুড়ো আঙুল দেখানো হল।  রাজনীতি ও পুঁজিবাদের অশুভ আঁতাতে আর কিছুদিনের মধ্যেই দেশের সরকারি ব্যাঙ্কের সমস্ত সম্পদ, এমনকি আমার আপনার সঞ্চয়ও FRDI বিলের মাধ্যেমে কেড়ে নেবার পরিকল্পনা চলছে।  স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে ভারতের শ্রেনী ও অর্থনৈতিক বৈষম্য চরমে উঠেছে।  আর, এই সবই সম্ভব হয়েছে আমার শুরুর কথাগুলির গুনে।  স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর ধরে ক্রমশ শিক্ষার মান নিম্নগামী হওয়ায় দেশের অধিকাংশ মানুষ ডিগ্রিধারী অশিক্ষিত করা সম্ভব হয়েছে। আর এখন সেই সিংহভাগ নাগরিকদের ক্রীতদাস করার কাজ চলছে করোনার ভয়, ভ্যাক্সিনের গল্প আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ডোল আর ভর্তুকির শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে।
ডিগ্রিধারী শিক্ষিত বা অশিক্ষিত কোনও পক্ষই এখনও এই ফাঁকিবাজির গোপন পথ ধরে যে কালসাপ আমাদের তথাকথিত স্বাধীনতাকে প্রতিনিয়ত দংশন করছে তা বুঝতে অসমর্থ হচ্ছেন।   আর, আমাদের সামাজিক,  রাজনৈতিক,  ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্রমশ অন্তর্জলিযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে।  এমতাবস্থায় আমাদের আর কী-ই বা করার আছে? স্বাধীনতার আগের দিন রাষ্ট্রপতি এবং স্বাধীনতার দিন প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনে মাংসের দোকানে বাজারের থলি হাতে দাঁড়ানো ছাড়া? জনগণমন অধিনায়ক জয় হে গাইবার জন্য এমন একটি সুন্দর ছুটির দিন নিয়ে চলুন একটু গর্ববোধ করা শিখি।  নতুন করে শিখি ধর্ম ও জাতের দোহাই দিয়ে প্রতিবেশীকে এড়িয়ে চলতে অথবা ভয় পেয়ে বাঁচতে।  মুখোমুখি কথা বলার বা প্রশ্ন তোলার বিপদ ডেকে না এনে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বেঁচে থাকাটাকেই সৌভাগ্য মনে করতে!হ্যাঁ।  এই স্বাধীনতা দিবস আমাদের এটুকুই স্বাধীনতা দিয়েছে। নিজেদের অধিকারের কথা না তুলে যা পাচ্ছি তাতেই বেঁচে থাকার মতো বুদ্ধিমান বানানোর শিক্ষা নিয়ে গর্ব করা ভারতবাসী জানেনও না দেশমাতা ভিক্ষাপাত্র হাতে রাস্তায় নেমেছেন। দেশের নিরানব্বই ভাগ সম্পদ মাত্র এক শতাংশ রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং পুঁজিপতিদের হাতে রেখে আমরা বেলুন উড়িয়ে খুশি থাকার ফাঁকিবাজিতে মেতে থাকার দিন খুঁজছি আর গর্ববোধ করছি।

অভিজিৎ রায় ঃ সাহিত্যিক

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *