• December 4, 2021

দাড়ি-গোঁফের ফ্যাশনেও ডারউইনবাদের পুনরুজ্জীবন লেগে আছে

 দাড়ি-গোঁফের ফ্যাশনেও ডারউইনবাদের পুনরুজ্জীবন লেগে আছে

কৌশিক গুড়িয়া 

পাটের জমির পাশেই একটি পচা ডোবা। সদ্য বর্ষায় কানায় কানায় জল জমেছে সেখানে, আর অমনি পাড়ে বসে অন্তত শ’দুয়েক ব্যাঙ তীব্র ও কর্কশ স্বরে গান গাইছে। গাড় হলুদ বর্ণ তাদের। এ ছবি স্কুল গাড়ি থেকে নেমে অ্যান্ড্রয়েডে বন্দী করে রাখলেন কয়েকজন দিদিমনি। দিদিমনিরা পরিবেশ প্রেমী নিশ্চয়ই। এবার সে ছবির সামাজিক হয়ে ওঠার পালা। কেননা প্রকৃতি ও পরিবেশ আমাদের মনে মাধুরী দেয়, দেয় শস্য-শ্যামলম আভা। সেখানেই তো আছে সৃষ্টি-রহস্যের অমোঘ এক সুতো-রেখা।

এই দৃশ্যের আড়ালেই রয়ে গেছে যৌনতা ও কামনার একটি মিহি বার্তা। হলুদ ওই ব্যাঙ গুলো আসলে বুড়ো সোনা-ব্যাঙ। অনেকাংশে অথর্ব, অনেকাংশে কামী। বৃষ্টির স্বাদ পেয়ে অন্তর থেকে যেন জেগে উঠেছে তারা। এবার  চাই নারী-সঙ্গ। তাই গ্যাঙর-গ্যাং শব্দে সঙ্গীর দিকে কল ছুঁড়ে দিচ্ছে। যৌন লালসায় আকুল হয়ে উঠেছে, আকাঙ্ক্ষাই সবটুকু গলার স্বর হয়ে কোরাস সৃষ্টি করেছে চরাচরে! এবার কি ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসবে ব্যাঙ-বউ? নির্দ্বিধায় সম্ভোগ-রতি ভাগ করে নেবে পুরুষের সঙ্গে? না, তা হবার নয়। মানুষের মতো স্ত্রী ব্যাঙরাও সম্ভ্রান্তির পরোয়া করে! ফলে এবার তারা চিল্লায়মান পুরুষদের মধ্যে থেকেই বেছে নেবে উপযুক্ততমকে। যার রঙ সবচেয়ে উজ্জ্বল, যার গলা সাঙ্ঘাতিক ভাবে কর্কশ এবং যে পেশিবহুল ও দীর্ঘদেহী। তারপর গিয়ে রতির আলাপ। ততক্ষণে ব্যাক গ্রাউন্ডে ভেসে আসবে লালন সাঁইয়ের মিলনান্তক সেই পঙক্তি…

ব্যাপারটা সেই স্বয়ম্বর-সভার মতো শোনাচ্ছে না কি? হ্যা, অনেকটাই সেরকম। পুরাণ-গল্পে সত্যতার বিচার না করেও এক্ষেত্রে বলা যায় যে একজন স্ত্রী আদপে সেই পুরুষকেই বেছে নেন যিনি বাকি পুরুষদের টেক্কা দিতে পারেন অনায়াসে। পুরুষ এক্ষেত্রে ক্রীড়নক। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিকুল সেই উদাহরণ মজুত করে রাখে। ইথোলজি  বলছে সমাজের স্ত্রী সদস্যদের কাছে নজরকাড়া হয়ে ওঠাটাই পুরুষদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। শরীর ও মনের বেশভূষার নিরিখে প্রকৃতিও তেমন পুরুষদেরকে  নির্বাচন করে, যারা পর-পুরুষদের হারিয়ে কামনা জিতে  নিতে পারে স্ত্রী সদস্যের। তাই তো ময়ূররা ময়ূরীদের তুলনায় বহুগুণে অর্নামেন্টেড। ঝুরো বর্ষায় ময়ূরের মেলে দেওয়া পেখম যে আসলে রঙহীন-স্ত্রী-ময়ূরকেই বার্তা পাঠায়! তারা যেন বেছে নিতে পারে সফল ও সুন্দর নৃত্য- পারদর্শীকে।

যেমন সিংহ তার কেশর ফুলিয়ে যে পৌরুষ জাগ্রত করে, যে ক্ষিপ্রতা অপর পুরুষ সিংহকে পরাস্ত করতে পারে, তা দেখেই দূর থেকে ছুটে আসে কোনও এক সিংহী। জঙ্গলে তখন সমস্ত সৌন্দর্য নিভে আসে, পশুশক্তি ও হিংস্রতা কামের কাছে বশ্যতা  নেয়। পৌরুষের জাগরী দিয়ে স্ত্রী সদস্যকে কাছে পাওয়ার নমুনা শুধু মেরুদণ্ডীর নয়, আছে কীট-পতঙ্গ সমাজেও। এক  ধরনের ক্যাকটাস বাগ বাকী পুরুষদের সঙ্গে অঞ্চল দখল নিয়ে মারামারি করে। যে জেতে, স্ত্রী পতঙ্গ তার সঙ্গে প্রজননে লিপ্ত হয়। কারণ খুব সরল, তার পুরুষের দখল করা স্থলভাগেই যে ডিম পাড়বে সে।

পাখি রাজ্যেও নাকি সেই পুরুষদের কদর বেশি যারা বাসা বাঁধতে অপেক্ষাকৃত পটু। মনে হয় এক্ষেত্রেও কাজ করে ভালোবাসা এবং ভালো বাসা, পুরুষ যার কারিগর। 

তবে পুরুষ যে সত্যিই কর্মঠ, এবং বহু কাঠ-খড় পুড়িয়ে সঙ্গিনীর সানিধ্য পায় তা তো শরীর-বিজ্ঞান দিয়েও প্রমাণ করা যায়। দেখা যায় কয়েক মিলিয়ান স্পার্ম বিচিত্র জৈব-রাসায়নিক লড়াইয়ে সামিল হলেও ডিম্বাণুকে স্পর্শ মাত্র একজন। অর্থাৎ বিজ্ঞান বলছে সম্পদের ক্ষয় করবে পুরুষ, আর সুফল কুড়োবে স্ত্রী সদস্য। 

উদাহরণের ডালা কানায় কানায় পূর্ণ। যেমন পুরুষ মাছ, সাপ ও পাখি বেশি রঙিন, পুরুষ কুকুর ও বিড়াল বেশি লোমশ, শাখা-প্রশাখায় ভারি হয়ে থাকে পুরুষ-হরিণ। আর পুরুষ মানুষের গোঁফে তা দেওয়ার মুদ্রা কারা যেন আড় চোখে দেখে? তাই কি পুরাকালীন রাজা বা সম্রাটদের চুল ও গোঁফ-দাড়ির আকর্ষক সজ্জা চিকের আড়ালে থাকা রমণীদের কাতরতার কারণ হয়ে উঠত! তাই কি পৌনঃপনিকতার মোড়কে আবারও বিপুলভাবে ফিরে এসেছে পুরুষদের দার্শনিক-ধাঁচের গোঁফ-দাড়ি। ক্রীড়া থেকে চলচ্চিত্র কর্মী, আটপৌরে বাঙালি থেকে রাজনৈতিক নেতা কিংবা বেকার যুবক থেকে গৃহপালিত স্বামী, আজান্তেই বেছে নিয়েছেন সে দাড়ির ঘরানা। ইউরোপীয় প্যাটার্নকেই  কি তবে প্রকৃতি বেছে নেবে? মানে, দাড়ির বিবর্তনের মূলেও কি থেকে গেছে ডারউইন সাহেবের প্রচ্ছন্ন ছায়া? শোনা যায় এই ২০২১ সালে গ্র্যাভিড কোনও পুরুষ যদি স্তুব্বল, বালবো, গোয়াতি, ইম্পিরিয়াল, গারিবালডি,  ব্যান্ডহোলজ, বিয়ার্ডস্তাচি, লাম্বারজ্যাকি, কিংবা ফুলার বা ভান ডাইক নামক ফেসিয়াল হেয়ার-স্টাইলের কথা না জেনে থাকেন তবে তাঁর জীবনটাই বৃথা! এমনটাই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও আজকের দিনের পরিনত সমাজে  একজন স্বাধীন-মহিলা তাঁর-পুরুষের গালে কেমন রোম-সজ্জায় প্রলুব্ধ হবেন সে গবেষণার ফলাফল এখনও জানা যায় নি।

তবে বংশবিস্তারে বা যৌনতায় মূল কথাই যে পুরুষ-নির্বাচন, প্রকৃতি ও বিজ্ঞান হাত ধরাধরি করে সে কথা প্রমাণ করেছে। সেই নির্বাচনে নির্বাচক কিন্তু কেবল মাত্র স্ত্রী-প্রাণিরাই। পুরুষদের কেবল আছে নির্বাচিত হওয়ার অভিনয়।  প্রকৃতপক্ষে তাঁদের হয়তো শৃঙ্গার-বীক্ষা ছাড়া আর কোনও কৌশল জানাই নেই! অন্তত সমাজ-বিজ্ঞান তাই দেখায়।

অর্থাৎ, ৭৫ তম বর্ষেও পুরুষ কিন্তু কোনভাবেই স্বাধীন থাকলেন না, সে বিধিনতার রাশ থেকে গেল তাঁর নারীর আঙ্গুলে জড়িয়ে থাকা সুতোয়! বস্তুত স্বাধীনতাও যেন শরীর-নির্ভর হয়েই থাকলো।

কৌশিক গুড়িয়া: কবি ও প্রাবন্ধিক। 

   

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *