• December 4, 2021

অথ ভারতীয় কদলী-কথা

 অথ ভারতীয় কদলী-কথা

 চন্দ্রপ্রকাশ সরকার

রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যত কোনও ভূমিকাই নেই, অথচ আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি রয়েছেন বহালতবিয়তে। যাদের হাত থেকে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সেই ব্রিটিশ-দেশে রাজতন্ত্র না থাকলেও রাজা-রানী রয়েছেন এখনো। সেদেশের রাজা/ রানী আর আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি একই রকমের কলের পুতুল। নির্বাচিত সরকার বিশেষত মহামহিম প্রধানমন্ত্রী যতটা দম দেবেন এবং যেদিকে চালাবেন, রাষ্ট্রপতি থুড়ি কলের পুতুল ততটুকুই চলবেন। কলের পুতুল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অনেকে তাঁকে নৈবেদ্যের শোভাবর্ধনকারী কদলী অর্থাৎ কলার সাথেও তুলনা করে থাকেন। আমিও তাদের সাথে সহমত। তবে মামুলি কদলীটির পিছনে খরচখরচা কিন্তু কম নয়। তাঁর রাজকীয় সেবার পিছনে বিপুল ব্যয়ভারের কথা শুনলে কর্মহীন-নিরন্ন-নিরাশ্রয় দেশবাসীর পিলে চমকে যাওয়ার কথা। কারণ তাদেরই ঘাম -রক্ত মোক্ষণ করা অর্থে কদলীটির ভরণপোষণ-বিলাসব্যসন সবই নির্বাহ করা হয়।     

গত ২৯ জুন বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ প্রকাশ্য জনসমাবেশের এই মর্মে আক্ষেপ করেছেন যে, তাঁর মাসিক বেতন মাত্র পাঁচ লাখ টাকা। এই সামান্য বেতনের ৫৫ শতাংশ নাকি কর দিতেই চলে যায়! করটর দেওয়ার পরে যা হাতে থাকে তা নাকি উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা এমনকি শিক্ষকদের চেয়েও কম! আহা রে, কী দুঃখ, কী দুঃখ! এত কম মাইনেয় নৈবেদ্যের চূড়ায় বসে থাকা কি মানায়! দেশের প্রথম নাগরিকের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার জন্য তাই আয়কর আইনকেও দায়ী করা যায়। তবে নিন্দুকেরা বলছেন, আইকর আইন যেমন আছে, তেমনি আইনের ফাঁকও আছে। তিনি চাইলে আইনের ফাঁক গলে আয়করের আওতার বাইরে বেরিয়ে যেতেও পারেন। তা যিনি  ‘গরিব দেশের’ মাথায় বসে নিজের ৫ লাখ টাকা মাসিক বেতন সত্ত্বেও কাঁদুনি গাইতে পারেন, তিনি যে আইনের গলিঘুঁজি খুঁজবেন না তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।   

থাক সে কথা, দেখে নেওয়া যাক আর কী কী সুযোগসুবিধা এদেশের প্রথম নাগরিক মহোদয় পেয়ে থাকেন। অবসরের পরেও তিনি আমৃত্যু বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ও আবাসন পরিষেবা পেয়ে থাকেন। নৈবেদ্যের শোভাবর্ধন করার সময়কালে তিনি থাকেন রাইসিনা হিলের রাজপ্রাসাদে। সেটাই হলো রাষ্ট্রপতি ভবন। এই  নামকরণ হয় ১৯৫০ সালে। তার আগে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর, ওই ভবনটিকে গভর্মেন্ট হাউস নামে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আর ব্রিটিশ আমলে এটি চিহ্নিত ছিল ভাইসরয়ের বাসভবনে হিসেবে। নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় ১৯২৯ সালে। নির্মাণ কর্মী হিসেবে কাজ করেছিলেন ২৯ হাজার শ্রমিক। রাষ্ট্রপতি ভবনের জমির পরিমাণ ৩৩০ একর। ভবনটিতে রয়েছে ৩৪০টি কক্ষ। শুধুমাত্র বসবাসের জন্যই কক্ষ রয়েছে ৬৩টি। বলা বাহুল্য, সমগ্র রাজপ্রাসাদটির রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক রাজার সুখ-স্বাচ্ছন্দ নিশ্চিত করার জন্য নিযুক্ত রয়েছেন প্রচুর দাস-দাসী, পাইক-বরকন্দাজ। তাদের ভাতা বাবদই সরকারি কোষাগার থেকে বার্ষিক বরাদ্দ করা হয় ৮০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় বাজেটে বার্ষিক বরাদ্দ থাকে ২০০ কোটি টাকারও বেশি। রাজকীয় পরিবহন, রান্নার গ্যাস, টেলিফোন ইত্যাদি কোন কিছুর জন্যই রাজামশাইকে তাঁর মাত্র পাঁচ লাখ টাকা মাসোহারা থেকে একটি পয়সাও খসাতে হয় না। তবুও তাঁর নাকিকান্না শুনতে হচ্ছে হাড়-হাভাতে দেশবাসীকে!   

প্রসঙ্গত, আরও একটি অপ্রীতিকর রাজ-সংবাদ দেওয়ার আছে। রাইসিনা হিলের মুকুটহীন আধুনিক রাজামশাই কিন্তু তাঁর একমাত্র ছোটভাই অর্থাৎ ছোট কদলীটিকে আপন আরাম-আয়েসের ছিটেফোঁটা ভাগও দেন না। ভাইয়ের কোনও ঠাঁই ওই রাজপ্রাসাদে নাই। এ নিয়ে রাজার প্রধানমন্ত্রীর মনে বড়ই দুঃখ। দুঃখ হবে নাই বা কেন! তাঁরই গুরুভাই বেঙ্কাইয়া নাইডু এখন ছোট কদলী রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁকে ৬ নম্বর মৌলানা আজাদ রোডের সাড়ে ছয় একর জমির উপর নির্মিত একটি ভবনে কত কষ্ট করে থাকতে হয়! তাই বিচক্ষণ এবং দরদী প্রধান মন্ত্রীমশাই স্থির করেছেন রাজ-ভ্রাতার জন্য পৃথক একটি রাজপ্রাসাদ বানিয়ে দেবেন। তার জন্য খরচ হবে মাত্র ১৯২ কোটি টাকা! কুড়ি হাজার কোটি টাকার সাধের সেন্ট্রাল ভিস্তা আর প্রায় ২০০ কোটি টাকার নতুন রাজপ্রাসাদ আগামী বছরের ১৫ আগস্ট — স্বাধীনতার প্লাটিনাম জুবিলীতে — একই সাথে উদ্বোধিত হবে।   

দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কত তা জানা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন এদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। গতবছর আচমকা লকডাউনে বিপর্যস্ত কত শ্রমিক পথেই প্রাণ হারিয়েছেন সে হিসেবও নেই সরকারের কাছে। গত বছরের ২৬ নভেম্বর থেকে চলমান কৃষক ধর্নায় কতজন মারা গেছেন জানে না কৃষক দরদী সরকার। জানে না গত এক বছরে কত মানুষ কাজ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। সরকার শুধু জানেন যাবতীয় আপত্তি-বিপত্তি পদদলিত করে সেন্ট্রাল ভিস্তা বানাতেই হবে, সেই সঙ্গেই বানাতে হবে ২০০ কোটির ছোট কদলী-ভবনও!

জয়, ভারতমাতা কি জয়! জয়, ভারত-মাথা কি জয়!

চন্দ্রপ্রকাশ সরকার :সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক ও সম্পাদনা ঝড় পত্রিকা। 

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post