• December 4, 2021

১৬ বিঘা বস্তি

 ১৬ বিঘা বস্তি

বর্ণালী মুখার্জি

কলকাতার পাশে মহেশতলা পুরসভার ১৬ বিঘার বস্তি নিয়ে। যে বস্তি আজ জলে ডুবে আছে। আলো নেই, খাওয়ার জল নেই। জল তিন প্রকার। আকাশ ভেঙে জল পড়েছে, হাইড্রেনের জল পাম্পিং মেশিনের সাহায্যে বস্তিতে ঢুকছে। আর রেল লাইনের অন্য পার থেকে জল ঢুকছে তেড়ে। বস্তির ভিতর কোনও পাকা রাস্তা নেই, তাই বস্তি এখন কাদায় আবর্জনায় থৈ থৈ। জলে সাপ, মল, তরকারির খোসা, মুরগির মাথা সবই ভাসছে। হয়তো ৫-৬ দিনের মধ্যে আস্তে আস্তে জল নামবে। আবার কদিন পরে বৃষ্টি হবে, আবার এই হাহাকার।

শহরের আর পাঁচটা বস্তির সাথে একে এক সারিতে রাখা যাবে না। কারণ সরকারি খাতায় নাকি এর কোনও অস্তিত্ব নেই। নামে ১৬ হলেও, আসলে প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে এই বস্তি। ব্রেস ব্রিজ থেকে সন্তোষপুর যেতে রেল লাইনের পাশে বিস্তৃত। মহেশতলা পুরসভার চেয়ারম্যান শ্রী দুলাল বিশ্বাসের কাছে বস্তিবাসীরা গেছেন বহুবার। খুবই সাধারণ দাবি নিয়ে, যেমন খাওয়ার জল চাই, রাস্তা চাই, বিদ্যুৎ চাই — কিন্তু নেতার ওই এক কথা। এরকম কোনও বস্তির অস্তিত্ব নেই আমাদের খাতায়। যদিও উনি এটা জানেন যে ওই ১০০ বিঘা প্রাইম অঞ্চলে একটা বিরাট রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সুযোগ ছিল, ২০১২ সাল থেকেই তার পরিকল্পনা হয়েছে, সেই অনুযায়ী এগিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বস্তির সৈয়দ, দুলুচাচি, রাইমা, আক্রামরা সব ভেস্তে দিয়েছেন।

প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। ক্যানিং-মগরাহাট-বাসন্তী, সুন্দরবনের সব অঞ্চল থেকে দুই কি তিন দশক আগে পেটের দায়ে বজবজ সংলগ্ন এক নরকে উঠে এসেছিলেন বেশ কিছু মানুষ। গৌতম ঘোষের পার চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকার মতোই তাদের চেহারা ছিল। জ্যান্ত ও মরা শুয়োর, জ্যান্ত ও মরা সাপ, জ্যান্ত ও মরা কোলের সন্তান নিয়েই তাদের জীবন, জীবন না বলে সংগ্রাম বলাই বোধহয় শ্রেয়। জলের উপর মাচা বেঁধে বসবাস শুরু করে এরা। তাদের জীবনে সারা বছরই ছিল বর্ষাকাল। তাদের বাঁচতেই হবে। তাদের রিক্সা টানতেই হবে, শাড়িতে জরি লাগাতেই হবে, দর্জির কাজ শিখতেই হবে, দর্জির ঘরে রান্নার কাজ করতেই হবে। পাতকুয়োর কাজ করতে হবে, মিস্ত্রির কাজ তো আছেই। সে এক আশ্চর্য দিন ছিল, বলেন পাকা চুলের বাপ-চাচারা। সাঁতরে সাঁতরে স্টেশনে গিয়ে সারা দিন রিকশা টেনে, আবার সন্ধেবেলা সাঁতরে বাড়ি ফেরা।

“মুসলমান ঘরের মেয়ে-বউ নিয়ে এসেছিলাম গো মা, কিন্তু ধর্মের সব রক্ষা পেলে কি আর পেট ভরত?” অর্থাৎ, মেয়েদের ‘আড়াল-আব্রু’ কিছুই রাখতে পারেননি তারা। রেললাইনে দাঁড়িয়ে, খোলা আকাশের নীচে পরিষ্কার শাড়ি ছেড়ে ভিজে-নোংরা শাড়ি পরে তবে ঘরে ওঠা। কারণ ঘরের মেঝে মানে যে জল! এ এক অন্য ভেনিস। শহর কিন্তু এদের আপন করে নেয়নি। চাল-চালা-কোয়ার্টার কিছু সৌভাগ্যবান শ্রমজীবী মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল। কলকাতার যে সব জায়গার দিকে কেউ ঘুরেও তাকাত না, সাপ-ব্যাঙও বোধহয় ঘেন্নায় থাকত না, সেই সব জায়গাই বেছে নিয়েছিল এই সব শ্রমজীবী মানুষ। তবে ভাবলে ভুল হবে যে একেবারেই বিনা পয়সায় তারা এই জমি পেয়েছিল। এই সব জমি খাস হয়নি অন্তত তখনও। মালিকদের কাছ থেকেই পয়সা দিয়ে কিনে নিয়েছিল তারা দুই এক ছটাক জমি। তার পর আস্তে আস্তে তারা হয়ে গেল ১৬ বিঘে বস্তির বাসিন্দা। সন্তান সন্ততি হল। শ্রমজীবী মানুষ চাইলে মরুভূমিকে মরুদ্যান বানাতে পারে, আর এ তো ১৬ বিঘে বস্তি। বাসস্থানের অযোগ্য এই অঞ্চলকে তারা বাসযোগ্য করে তুলেছে, জমির দাম হাজার গুণ বাড়িয়ে তুলেছে শ্রম-রক্ত দিয়ে। এমনকি এই জলা জমিকে উঁচু করেছে ওই রিকশা টানার পয়সা দিয়েই। কাঁধে করে পাথর বয়ে এনেছে পুরুষ-মহিলা। শুধু এইটুকু এলাকাই নয়, এদের শ্রম ছাড়া কি সন্তোষপুর এলাকা আজ এত বর্ধিষ্ণু হতে পারত? আজ যা হয়েছে তা এদের কাছে স্বর্গ। হবে না-ই বা কেন? শুধু বস্তিবাসীদের দিকে তাকিয়েই মুদির দোকান, তেল-লিপিস্টিক-শ্যাম্পুর দোকান, চা-চপের দোকান, ফুচকা-ফলের দোকান চলবে — তা সেদিন ছিল কল্পনাতীত। ক্রেতা বিক্রেতা সকলেই বস্তির মানুষ। বস্তিবাসী আজ ক্রেতা। আজ এমন কোন ঘর নেই যাদের দুবেলা ভাত জোটে না। এমন ঘর নেই যাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় না। জ্বর হলে ওষুধ জোটে, খালি পায়ে চলে না তারা। জুতো-চটি পরে।

২০১২ এবং ২০১৩ সালে বস্তিতে আগুন লাগল। বস্তির প্রায় সকলেই মুসলমান, অথচ সকলেই বললেন যে আসলে আগুন লাগানো হয়েছিল। দুটি শিশু মারা গেছে সেই আগুনে। একটি ৩-৪ বছরের, অন্যটি ৭-৮। আগুন যখন গিলতে আসছিল ওই কোলের শিশুটিকে, ঘরে মা ছিলেন না, কাজে গেছিলেন। আগুন যখন গ্রাস করছে ঘর দুয়ার, বাচ্চাটি টলমল পায়ে বেরিয়ে এসেছিল, মায়ের আঁচল না পেয়ে জড়িয়ে ধরেছিল একটা গাছকে, গাছটাও পুড়ল, আর আমাদের ওই খোকাও মুড়োল। সাত-আট বছরের ছেলেটি আগুন ব্যাপারটা বোঝে, তাই আগুন আসছে দেখে চোখ ঢেকে উবু হয়ে বসে পড়েছিল। যেন বা কানামাছি খেলছে, চোর সে। সে চোখ বন্ধ করলে নিশ্চয়ই আগুনও তাকে দেখতে পাবে না! কিন্তু তা হয়নি, আগুন ওকে দেখে নিয়েছিল, দেহাংশটি যখন পাওয়া যায় তখনও সে উবু হয়ে আছে, হাত দিয়ে মুখ ঢাকা!! যাকগে, এরা তো সব মুসলমানের বাচ্চা। কত হয়, একটা দুটো গেলেই বা কী? রেললাইনের ধারে এই বস্তি, মাসে একটা দুটো এমনিই কাটা পড়ে!

২০১২ সালে আগুন ধরতেই সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী এসে হাজির হয়েছেন হুজুর সেজে। মৌলবী মানুষ, টাকারও সংস্থান বিরাট। অতএব খড়কুটোর মত তাঁকেই আঁকড়ে ধরলেন মানুষ। তিনি আশ্বাস দিলেন কোনও চিন্তা নেই, এখানেই সকলে থাকবেন। “উচ্ছেদ করতে এলে নন্দীগ্রাম বানিয়ে ছাড়ব, সকলে ঘর পাকা করে নাও”। তাই-ই করে নিলেন বহু মানুষ। কিন্তু তাঁরা বোঝেননি, ঘর পাকা করতে গিয়ে যে হাজার হাজার টাকা তাঁরা ব্যয় করছেন, তা আসলে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীকে সাংসদ বা মন্ত্রী করার জন্য বিনিয়োগ মাত্র। যেখানে হুজুর হুকুম দিয়েছেন, সেখানেই তাঁরা গেছেন। মিছিলে, তাঁর সভায় মাঠ ভরিয়েছেন। সেই জনসমাগম দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জীর সুনজরে এসেছেন চৌধুরী, মন্ত্রী হয়েছেন। চৌধুরীকে মন্ত্রী বানানো হল, তার বিনিময়ে ১৬ বিঘের বস্তি উচ্ছেদ করে দু হাজার কোটি টাকার রিয়েল এস্টেট প্রকল্প হওয়ার কথা। একথা কোনও সরকারি নথিতে নেই, কিন্তু বস্তির হাওয়ায় এই অংকটা উড়ছে। নেতারা ঘোষণা করলেন, এবার নাকি উঠে যেতে হবে সকলকে। বললেন, ৩৫০টি ফ্ল্যাট দেওয়া হচ্ছে বস্তিবাসীদের। তাঁদের ৬০ হাজার টাকা দিতে হবে। চেয়ারম্যান বললেন, বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তু হলে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন (Refugee Rehabilitation) দপ্তর দায়িত্ব নিত, কিন্তু তা যখন নয়, অতএব উঠে যেতেই হবে। এটা নাকি হুজুরের হুকুম। বস্তিবাসী বলছেন হুমকি।

বস্তিবাসী দুলুদি, ইউনেস্কোর কর্মী, বলছেন, “ওসব ফ্ল্যাটের যোগ্য আমরা নই। ওখানে নাকি কাঠে রান্না করা যাবে না, গ্যাস জ্বালাতে হবে! তা গ্যাস কেনার টাকা কি আমাদের ওই * চৌধুরী দেবে?” আমরা, যারা ভদ্রজন, তারা কানে আঙুল দিচ্ছি ওই সব গালাগাল শুনে। তবে যে লোকে বলে মুসলমানেরা ধর্মভীরু! অন্যদিকে রাকেয়া দিদি আবার বাজারে মাছ বিক্রি করেন। বলে ওঠেন, “আরে আমার ঘরের ছাদে লাউ হয়, সামনে দাওয়ায় টমেটম। এই তো গত হপ্তায় সাতটা লাউ বেচলাম, সবুজ টমেটম বেচে দিলাম হাটে। তা ওই পায়রার খুপরিগুলিতে কি লাউ হবে?” ইদ্রিস চাচা বলেন, “আমাদের মুসলমানের সংসার ১৩-১৫ জনের। ছেলেদের শাদী দিয়েছি, ঘরে বউ এসেছে। তাদেরও ছেলেপিলে হয়েছে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি সেই গোবরায়। মাঝে মধ্যে মেয়ে-জামাই-নাতি-নাতিনরা আসে। ওই ফ্ল্যাটে কোথায় থাকতে দেব তাদের?” রাইমার মা বলেন, “চৌধুরী বলছেন যাদের ছেলেদের শাদী হয়নি তারা নাকি একটাই ফ্ল্যাট পাবে? আরে হয়নি কিন্তু কাল তো হবে!” একথা বলা মাত্র ওঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন রাবেয়া আর মঞ্জুলা বিবি। “কেন রে *, আমাদের ছেলেদের তো শাদী হয়েছে। আমাদের কি দুটো ফ্ল্যাট দিচ্ছে নাকি? একটাও তো দিচ্ছে না! ওই ৩৫০ ফ্ল্যাট শুধু হুজুরের চামচাদের দেওয়া হবে।”

ভুতুড়ে বস্তি এটা। সরকারী নথিপত্রে এর কোনও অস্তিত্বই নেই। এখানকার ছেলেমেয়েদের লোকালয়ের স্কুলে ভর্তি করতে অসুবিধা হয়। কারণ এদের কোনও ঠিকানা নেই। পাহাড়পুর মৌজার দাগ নাম্বারে অবস্থিত এই বস্তির নাম সরকারি খাতায় নেই। এটা রাজ্য সরকারি জমি নাকি কেন্দ্র সরকারি, খাস জমি নাকি ব্যক্তি মালিকানাধীন, খাস হলে কতটা, কোনও প্রশ্নেরই সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া হয় না সরকারি দপ্তর থেকে। সুতরাং এখানে শিশু জন্মালে তার বার্থ সার্টিফিকেট পাওয়া যায় না, কেউ মারা গেলেও নয়। রেশন কার্ড নেই, ভোটার কার্ডও নেই।

এই মানুষগুলির ঠিকানা চাইলাম আমরা অনেকে মিলে। হাইকোর্টের বিচারপতি মহামান্য ম্যাডাম চেল্লুর রায় দিলেন, এমন অদ্ভুত কথা নাকি কোর্ট কোনদিন শোনেইনি। এত বড় অঞ্চল, এতগুলি মানুষ বসবাস করেন অথচ তা ভুতুড়ে? সুতরাং বস্তিবাসীর মুখ চুন করে আদালত সরাসরি কোনও রায় দিল না। যদিও একটি নির্দেশ দিল, নিজেকেই। আদালতকে সরেজমিন তদন্ত করতে হবে এবং পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট জমা দিতে হবে। বলাই বাহুল্য আজ অবধি তা কার্যকর হয়নি। ঘড়ি বন্ধ হয়ে আছে হয়ত।

১৬ বিঘা বস্তির এই জমিকে বাস্তুজমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে কি? কেউ জানে না। ১৯৬৪ সালের উচ্ছেদ আইন দেখিয়ে এতগুলি মানুষকে তুলে দিয়ে সেই জায়গায় কী হবে? কোনও জনস্বার্থ প্রকল্প? কেউ জানে না। নিন্দুকে বলছে বড়লোকদের জন্য বহুতল হবে। শহুরে জমি মাফিয়াদের হাতের মুঠোয় হাজার হাজার কোটি টাকা। বস্তিবাসীরা বলছেন কিছুতেই উঠব না, এই বস্তিতেই নিজের নামে জমির মালিকানা আমাদের চাই। এই বস্তিকেই কলোনি করে দিতে হবে। উল্টোডাঙার বাসন্তী কলোনি যেমন, তেমনই আমাদেরও কলোনি। জমির পাট্টা চাই আমাদের। বস্তি উন্নয়নের জন্য রাজ্য সরকার যে টাকা পায় তা বস্তিবাসীদের জন্য পাকা রাস্তা, স্কুল, পাকা বাড়ি বানানোর জন্য ব্যয় করা হোক। যথোপযুক্ত পুনর্বাসনের স্লোগান ওঠেনি, কারণ উচ্ছেদের পর সেখানে কোনও জনস্বার্থ প্রকল্প হবে তেমন কোন সরকারি ঘোষণাও হয়নি।

বস্তির ‘ভার্টিকাল উন্নয়ন’-এর নামে এক চূড়ান্ত বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই লড়াই। মহারাষ্ট্র ৭০-এর দশকে এই ভাবেই জমি মাফিয়াদের হাত ধরেছিল। তৎকালীন বম্বে শহরে বস্তিগুলির তথাকথিত ভার্টিকাল উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু যে জমি পাওয়া গেছিল তাতে কতটা জনস্বার্থ প্রকল্প হয়েছিল, প্রশ্ন সেটাই। মহারাষ্ট্রের শ্রমজীবী মানুষ শ্রম-ঘাম-রক্ত এবং শ্রমের পয়সা ব্যয় করে যে সব জমিকে বসবাসযোগ্য করে তুলেছিলেন তা সোনার দামে বিক্রি করেছিল সেখানকার দুলালরা। জন্ম হয়েছিল দাউদ ইব্রাহিমদের।

আজ উচ্ছেদবিরোধী লড়াই এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। রেশন কার্ড বা পরিচিতি কার্ডহীন এই সব মানুষদের পুনর্বাসনের আন্দোলন নিশ্চয়ই এক নতুন আইনের জন্ম দেবে।

কিন্তু সেই পাট্টা পাওয়ার আগে চাই ন্যূনতম বাঁচার অধিকার। রাস্তা, জল, বিদ্যুৎ আর বর্ষাকালে এই নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। আর তার জন্য চাই সরকারি প্রশাসনের সামান্য একটু মানবিক মুখ!

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post