• December 4, 2021

অ-রাবীন্দ্রিক যাপনে রাবীন্দ্রিক গায়কি

 অ-রাবীন্দ্রিক  যাপনে রাবীন্দ্রিক গায়কি

মালবিকা চক্রবর্তী

অ- রাবীন্দ্রিক জীবন অর্থাৎ রাবীন্দ্রিক জীবন যাপনের বিপরীত অবস্থা। এই বিষয়টিকে স্পর্শ করার চেষ্টা করব , এই দুই বিপরীত অবস্থানকে যতটা সম্ভব দেখানোর চেষ্টা করবো। বৈপরীত্য মানব জীবনের একটি বিশেষ দিক। এখান থেকে সৃষ্টি হয়েছে অনেক কিছু।  স্ববিরোধীতা, বৈপরীত্য রবি ঠাকুরের ছিল না, বলা যায় না। তবু সে স্ববিরোধিতা সৃষ্টি বিমুখ ছিল না। তাকে হয়তো দোটানাও বলা যায়। স্বরলিপির অনুসরণ রাবীন্দ্রিক গায়কি এই বিষয়টিও খুব বড় আলোচনার বিষয় এবং পাশাপাশি স্ববিরোধীতা। অর্থাৎ যাপন ও গায়ন পদ্ধতি এ দুই , একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করছে।
 ‘নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান’রাবীন্দ্রিক জীবন যাপন, আজকের ভোগবাদী সমাজ – রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনায় সার্বিক ভাবে হয়তো সম্ভব নয়। তবু বলি, অ- রাবীন্দ্রিক জীবন ভোগবাদী সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে এই সমাজের চাহিদানুসরণে চলেছে। সে কখনোই স্বল্পে সন্তুষ্ট নয়। প্রতিমা ঠাকুরের ‘নির্বাণ’ গ্ৰন্থটি পড়তে গিয়ে জেনেছিলাম, বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্ৰহ করতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জার্মানি গিয়েছিলেন তাঁর আঁকা ছবির প্রদর্শনী করতে। ছবির প্রদর্শনী শেষে কবি খবর পান তাঁর আঁকা ছবিগুলি প্রশংসিত এবং ক্রেতারা ক্রয় করতে ইচ্ছুক। বিশ্বভারতীর সে সময় অর্থের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনকে প্রাধান্য না দিয়ে, ক্রেতাদের এমনিই সে ছবি দিয়ে দিতে বলেন কবি।আমরা নিজেদের বিজ্ঞাপিত করতে চাই। গুরুত্ব পেতে চাই, জাহির করি যখন তখন। আর অন্যদিকে স্বরলিপি শুদ্ধ রেখে দাঁত চেপে গেয়ে উঠি ‘আমার মাথা নত করে দাও’। সে সময়ে কেবল একটি কাঠামোকে কেবল অনুসরণ করি। ভাব গভীরতায় না পৌঁছে, স্ববিরোধী আচরণ করি।রবি ঠাকুর নিজেকে প্রকাশ করতে বলেছেন, নিজেকে জানাতেও বলেছেন। কিন্তু ঐ যে অহংকারে নিজেকে জাহির করা, অ- রাবীন্দ্রিক। এই অহং কবির জীবনে অনস্বীকার্য। কিন্তু এই অহং-এর প্রকাশ যেন সৃষ্টির ভেতর, কার্যক্ষেত্রে হয়।
‘অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান’সমাজের প্রায় সর্বস্তরে রবি ঠাকুরের বিচরণ ছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর লেখায় পড়েছিলাম। একবার স্বদেশী কাজে ‘মাতৃভাণ্ডার’ নির্মাণ করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ কাজে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন। এর মধ্যে খবর পেলেন রেলের কুলি মজুররাও কিছু অর্থ সাহায্য করতে চায়; রবি ঠাকুর সেদিন জল কাদা উপেক্ষা করে চলে গেলেন তাদের বস্তিতে। সাক্ষাৎ হল একটি  রেল গাড়ির দুটি কামরার মাঝের অংশে। তাঁদের কাছে কেবল অর্থ নিলেন তা নয়, তার আগে কুলি মজুরদের সঙ্গে বসে কথা বললেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নাগরিক যাপন, মানুষকে বাদ দিয়ে ছিলনা। মানদা সুন্দরী দেবী রচিত ‘শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত’ গ্ৰন্থে জেনেছিলাম, রাখি বন্ধন উৎসব আয়োজনের আগে রবি ঠাকুর তাঁদের পত্রযোগে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন । সে চিঠিতে, সকলকে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে রাখির ডালা সাজিয়ে ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। স্পষ্টতই বুঝতে পারি উন্নাসিক ও আত্মকেন্দ্রিক আমাদের এই জীবন কতখানি অ- রাবীন্দ্রিক।রাখি বন্ধন কেবল ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে নয় কেবল, সমাজ বিভেদের বিরুদ্ধেও। আমরা রাবীন্দ্রিক গায়কি নিয়ে এক একসময় যে সচেতনতা দেখাই সেটি অনেক সময়ই  আমাদের ছুৎমার্গীয় মানসিকতা বলে মনে হয়।’ওদের সাথে মেলাও যারা চরায় তোমার ধেনু’শিলাইদহ থেকে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কে লিখেছেন যে, লালন সা ফকিরের শিষ্যদের সঙ্গে কবি ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করতেন। কবি বলছেন ‘এই লালন ফকিরের মতে মুসলমান – হিন্দু- জৈন মত- সকল একত্র করিয়া এমন একটি জিনিষ তৈয়ার হইয়াছে যাহাতে চিন্তা করিবার অনেক বিষয় হইয়াছে। এ বিষয়ে সকলেরই মন দেওয়া উচিত।’কিন্তু সেই ভাবটিতে আমাদের মন কোথায়? মানবতাবাদের পাশ কাটিয়ে চলেছি আমরা।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গাইতে হলে, কিংবদন্তি রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস বলেই গেছেন, তাঁকে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথকে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। আর সেদিনই এই যাপনে ও গায়নে স্ববিরোধীতা ঘুচিয়ে আমাদের গেয়ে ওঠা সার্থক হবে‘ওই মহামানব আসে’।

মালবিকা চক্রবর্তীঃ শিক্ষিকা ও গায়িকা।

  •  
  •  
  •  
  •  

3 Comments

  • অপূর্ব ❤️

    • ধন্যবাদ।সঙ্গে থাকুন।

      • ভালো লেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post