• December 4, 2021

কাঁচের মতনই ভেঙে যায় হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস

 কাঁচের মতনই ভেঙে যায় হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস

দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়

১৯৫০ সালে আসানসোল মহকুমার সালানপুর ব্লকে গড়ে ওঠে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা। ভারত সরকারের উদ্যোগে এই কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে স্বাধীনোত্তর সময়ে দেশের প্রথম বৃহৎ শিল্পের শুভ সূচনা হয়েছিল। প্রায় সমসাময়িক সময়ে আসানসোল মহকুমায় শিল্প স্থাপনের জন্য পুঁজি বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসে নামী বিদেশী সংস্থাও। যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্ববিখ্যাত কাঁচ উৎপাদনকারী সংস্থা ইংল্যান্ডের ‘পিলকিংটন ব্রাদ্রার্স’। এই সংস্থার প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধানে ১৯৫১ সালের ৭ জুন আসানসোল শহরে গড়ে ওঠে অত্যাধুনিক কাঁচ তৈরির কারখানা ‘হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস’। আসানসোল শহরের ঊষাগ্রাম ও কালিপাহাড়ীর মধ্যবর্তী স্থান জিটি রোডের পাশ বরাবর ৫৪.৪৫৬ একর জমির উপর এটি স্থাপিত হয় । ১৯৫৪ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস্ (এইচপিজি)-এর চুল্লিটিকে কার্যকরী হতে দেখা যায়। সেই বছরের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সফল ভাবে মসৃণ কাঁচ (শীট গ্লাস) সফল ভাবে উৎপাদন শুরু করে এইচপিজি।

গোড়ার দিকে এইচপিজি’র মোট শেয়ারের সত্তর শতাংশ মালিকানা ছিল ইংল্যান্ডের পিলকিংটন ব্রাদার্স লিমিটেডের। ফলস্বরূপ সেই সময় হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে ইংল্যান্ডের ওই সংস্থা এইচপিজি কারখানাকে পরিচালনা তথা নিয়ন্ত্রণ করত। পিলকিংটন ব্রাদার্সের কাঁচ উৎপাদনের প্রযুক্তি ছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ। যে কারণে ওই সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত আসানসোল শহরের এইচপিজি কারখানার মসৃণ কাঁচের উৎপাদন ক্রমশঃ বৃদ্ধি পায় এবং অতি উন্নত মানের উৎপাদিত মসৃণ কাঁচ বিদেশে রপ্তানি হতে থাকে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম কাঁচ কারখানায় পরিণত হয়। তৎকালে এইচপিজি কারখানার কর্মীদের বেতন ছিল অতি উচ্চ। সেই সঙ্গে এইচপিজি কারখানার কর্মীরা আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতেন। উচ্চ বেতনে আকর্ষিত হয়ে অন্যান্য সংস্থার চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এইচপিজি’তে কাজে যোগদান, অতীতে এহেন উদাহরণের কথা বেশ কয়েকটি শোনা যায়।

এরকম একটি লাভজনক সংস্থায় অশান্তির সূত্রপাত সাতের দশক থেকে। ১৯৭৩ সালের ১৯ এপ্রিল আসানসোলের এইচপিজি কারখানাকে কেন্দ্র করে বিধানসভা ভবন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। পশ্চিমবঙ্গ বি্ধানসভার ৫৪ তম অধিবেশনের বিবরণীতে থেকে তা জানা যায়। সেদিন দু’টি রাজনৈতিক দলের দুইজন শাসক দলের বিধায়ক সহ মোট তিনজন বিধায়ক এইচপিজি কারখানা প্রসঙ্গে বিধানসভা ভবনে বক্তব্য রাখেন । ওই দুইজন শাসক দলের বিধায়কের মধ্যে একজন ছিলেন আসানসোলের। তাঁদের বক্তব্যে পঁচিশ জন শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রসঙ্গ, স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকদের এইচপিজি কারখানায় প্রবেশে বাধা দেওয়া, আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর হিংসাত্মক হামলা সহ আরও বিভিন্ন অভিযোগ উঠে আসে। কিন্তু একমাত্র শ্রমিক ছাঁটাই ব্যতীত বাদবাকি অভিযোগগুলির কোনটিই এইচপিজি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছিল না। সেক্ষেত্রে এইচপিজি কারখানাকে কেন্দ্র করে দুটি রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ্যে আসে। এ কথা নিশ্চিত যে রাজনৈতিক দলের ট্রেড ইউনিয়নগুলি শ্রমিক স্বার্থের চাইতে এইচপিজি কারখানায় তাদের প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে বেশি সচেষ্ট ছিল। যার ফলে ওই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কারখানায় প্রতিদিন উদ্দেশ্যোপ্রণোদিত ভাবে সৃষ্টি করা হয় মালিক-শ্রমিক অশান্তি। যার দরুন দীর্ঘদিন ধরে ব্যহত হয় কাঁচের উৎপাদন। এই ভ্রান্ত রাজনীতির চরম পরিণতির কারণেই ১৯৮০ সালের ২৫ মে এইচপিজি কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানটিকে লকআউট ঘোষণা করে। ফলস্বরূপ কাঁচের মতনই ভেঙে যায় হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্কস।

হিন্দুস্থান পিলকিংটন গ্লাস ওয়ার্সের লকআউট পরবর্তী সময়ের ঘটনা আসানসোলবাসীর অনেকেরই জানা। ১৯৮১ সালে এইইচপিজি কারখানার মালিকানা সত্ত্বাধিকার হস্তান্তর হয়। সে বছরই নাটকীয় ভাবে কারখানা পুনরায় চালু করা হলে মালিকের বিরুদ্ধে রাতের অন্ধাকারে সেখানকার যন্ত্রাংশ পাচারের অভিযোগ উঠেছিল । এইচপিজি কারখানার যতখানি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নেপথ্যে তার চাইতে শতগুণ বেশি রচিত হয়েছে শ্রমিকের অশ্রুমোচনের কাহিনী । শুধুমাত্র মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব কারণেই এইচপিজি কর্তৃপক্ষ কারখানাটিকে লকআউট করতে বাধ্য হয়নি। সেই সঙ্গে একথাও উল্লেখ করা আবশ্যিক যে এই কারখানা বন্ধের জন্য শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দল বা তার শ্রমিক সংগঠনকে দায়ী করা যায় না।

চার দশকের অধিক সময়ের আগে বন্ধ হওয়া বিশাল আয়তনের এই কারখানাটির বেশিরভাগ অংশই বর্তমানে জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে। জিটি রোড থেকে লক্ষণীয় এইচপিজি’র মূল কার্যালয়ের ভবনটি যা বর্তমানে পরিত্যক্ত । কালিপাহাড়ী উড়ালপুলের নিকটে এইচপিজি’র একটি গ্যালভ্যানাইজড্ টিনের ছাউনির একটি ভবন চোখে পড়ল। পরিত্যক্ত এই ভবনটি এচপিজি’র কোন একটি বিভাগের কার্যালয় ছিল বলে জানা যায়। অতীতে এটি যে বহুজাতিক সংস্থার কার্যালয়ের মতনই সুসজ্জিত ছিল তা স্পষ্ট । ওই কার্যালয় সহ কারখানার বিভিন্ন স্থানে এইচপিজি’র নিজস্ব উৎপাদিত কয়েকটি উন্নত মানের মসৃণ কাঁচ এখনও সেখানে অটুট ।

দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়: আসানসোল নিবাসী, সাহিত্যকর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post