• December 4, 2021

কোথায় গেলেন ঘনাদা!

 কোথায় গেলেন ঘনাদা!

রঙ্গন রায়

এটা আপনার ক্ষেত্রেও হতে পারে। হ্যাঁ হতেই পারে। দেখা গেলো আপনি কোনো নিয়ম টিয়মের ধার ধারলেন না। হতেই তো পারে! ভাবলেন এই ভাইরাস আমার কিচ্ছু করতে পারবেনা। কারণ আপনিই তো ছোটবেলায় ড্রেনের থেকে বল কুড়িয়ে ক্রিকেট খেলে শচীন হয়েছেন! তারপর সেই হাতেই না থুতু মাখিয়ে প্যান্টে বল ঘষে অনিল কুম্বলের মত বলও করেছেন! কাজেই একদিন সকাল বেলা বেরিয়ে এলেন দরজা খুলে। মুখোশ টুখোশ ছুড়ে ফেলে দিয়ে পরিস্কার বাতাসে নাক ভরে শ্বাস নিলেন। আপনার তো অবশ্যই এটা অধিকার মশাই! সামান্য অক্সিজেন নেবেন তাতেও সরকারি বিধিনিষেধ? হুঃ! স্বরাজ আপনার জন্মগত অধিকার নাও হতে পারে , কিন্তু তাই বলে শ্বাস নেওয়াটা তো আর জন্মগত অধিকার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারেনা! কাজেই আপনি প্রকাশ্য দিবালোকে সমস্ত সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়ে ‘অধিকার’ ভোগ করলেন। বলা ভালো বিপ্লবই করে বসলেন। কিন্তু এমন সময় একটা কাগজ উড়ে এসে আপনার পায়ের সামনে লতপত করতে থাকলো। প্রবল কৌতুহলে আপনি সেটা কুড়িয়ে নিলেন। তাতে লেখা –
আজকের বিশেষ বিশেষ সংবাদ , বিজ্ঞানীরা এই মারণ ভাইরাসের একটি নতুন সম্ভাবনা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। ইহা বর্তমানে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন আর আপনি কোত্থাও সুরক্ষিত নন।
আপনার সঙ্গে কি এটা হতে পারে না? সবসময়ই , যেকোনো কার্যক্ষেত্রেই তো প্রবল ভাবে পরাজিত হলে আক্ষেপের সুরে বলে থাকেন ,
”আমার সঙ্গেই কেন এটা হয়!”
ঠিক এইভাবেই তো এটা আপনার ক্ষেত্রেও হতেই পারে! তখন আপনি কী করবেন? পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে? নাকি আরেক কবিকে ধার করবেন?
‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’।
কিন্তু মানুষ ঋণ স্বীকার তবুও করে না পৃথিবীর কাছে। সে একটুও ভালোবাসে না তাকে। ভালোবাসা মানে তো যে বাসায় আপনি ভালো থাকবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাসাটা আর মোটেই ভালো নেই। বরং যাচ্ছেতাই রকম খারাপ। ওই তো আপনার মাথার উপরের শয়তান দেশটাই যত নষ্টের মূল। এখন কল্পবিজ্ঞানের গল্পগুলোর মত অন্যান্য গ্রহেই না শেষমেশ চলে যেতে হয়!
আপনি সমস্ত বীরত্বের পায়ে কুঠারাঘাত করে ঘরে ফিরে এলেন। তারপর বিপ্লবের আধুনিক পরাকাষ্ঠা ‘মুখবই’ খুলে লিখতে বসলেন –

গল্পটা অনেকটা এরকম , জেল ভেঙে বেরিয়ে আসা পাগলা সিরিয়াল কিলার ঘুরে বেরাচ্ছিলো দেশে। স্বাভাবিকভাবেই সবাই প্রচন্ড ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। ছুটে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো সকলে। কিন্তু যারা বাইরে ছিল তারা অনেকেই মারা গেলো। অনেকেই ফিরতে পারলো না ঘরে। প্রবল আতঙ্কে দিন কাটছে সবার। সবসময় কী হয় কী হয় ভাব। এমন সময় দুঁদে পুলিশ টুলিশ মিলে তাকে খানিক নিয়ন্ত্রণে আনলো। বন্দী করে ফেললো। সবাই ভাবলো , আহা , এই তো বেঁচে গেলাম। কাব্যময়তায় ভেসে আবার সবাই ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো। একসঙ্গে বীরেন্দ্র সেহবাগের সেঞ্চুরির মত সূর্যের দিকে তাকালো। ভয়ের মুখোশ খুলে , স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরার ধুম পড়ে গেলো। আনন্দের চোটে উৎসবও শুরু হয়ে গেলো দেশ জুড়ে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটলো সম্পূর্ণ অন্যদিক থেকে। যখন অনুসন্ধানকারী দল খুঁজে দেখলো , তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। কারণ জেল ভেঙে মোটেই একজন সিরিয়াল কিলার বের হয়ে আসেনি।
সিরিয়াল কিলার ফিরে এসেছে। আপনাকে আবারও ভয়ের মুখোশ পরিয়ে দিয়েছে সে। আপনার নিশ্চয়ই চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা না , কে এই সিরিয়াল কিলার?

এখানে , এই ‘মুখবই’য়ে বলা ছাড়া আপনার আর কোথায়ই বা বলার আছে বলুন! আপনিও তো জানেন না কীভাবে লড়াই করতে হবে এই ভাইরাসের সাথে! কিন্তু আপনাকে তো কিছু বলতেই হবে! নাহলে পেটের ভেতর কী ভয়ঙ্কর যে আকুলিবিকুলি করবে তা বলবার নয়। বিপ্লব না করলে লোকে আর আপনার মত লোককে পুছবে কেন? সবসময়ই লাইমলাইটে থাকতে হবে। জানান দিতে হবে আমি সুখে আছি। আবার প্রয়োজনে সুখে থাকলেও জানাতে হবে এই মৃত্যু মিছিলে আপনি শোকে কেমন পাগল প্রায়। সবসময় বাজার যেটা চাইবে সেটাইতো করবেন! সেটা করাই বুদ্ধিমানের কাজ নয়কি!
কিন্তু আপনি ঘুণাক্ষরেও কাউকে নিজের সত্যি সত্যি মুখোশ খুলে ‘অক্সিজেন বিপ্লবে’র খবর জানাবেন না। কারণ যে বিপ্লব সমাজ কর্তৃক গৃহীত হবে না সে বিপ্লব জানানো কোনো কাজের কথা কী?
যাক অবশেষে আপনি ভয় পেয়েছেন। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার খবরে আপনি ভয় পেয়েছেন। কারণ আসলে আপনি কোনোদিনই সাহসী নন। আপনি বাড়িতে বসে সংক্রমণের সিনেমা দেখবেন। আর হাজার হাজার সংক্রামিত জোম্বি আপনাকে ঘিরে ফেলবে। আপনি পালাতে পারবেন না। আপনি কোত্থাও কোনোদিন পালাতে পারেন নি। কারণ আপনি —

এই ‘আপনি’ কে তা নিশ্চয়ই চিনতে পারছেন? যদি চিনতে না পারেন তাহলেও কোনো অসুবিধা নেই। কারণ উপরের এই লেখা গুলোর সত্যিই কোনো মানে নেই। ঐ উড়ে আসা কাগজে লেখা ভূয়ো খবরটার মতই একটা ভূয়ো লেখা। আর আপনি এতক্ষণ ধরে এই ভূয়ো লেখাটাই পড়ে গেলেন এই ভেবে যে , এই বোধহয় শেষে গিয়ে এমন কিছু পাবো যে চমৎকৃত হবো! এই একই আশাতেই তো রোজ রোজ কত কত ভূয়ো খবর দেখেন ইন্টারনেটে! প্রচন্ড উত্তেজিত হন! সঙ্গে সঙ্গে ‘শেয়ার’ করতে ভোলেন না প্রাণাধিক প্রিয় বন্ধুদের। অবশ্যই তাদের এটা বোঝানোর জন্য , ‘কী! কেমন দিলাম!’
এই তো প্রথম প্রথম মানে ২০২০তে শুনছিলাম এই ভাইরাস নাকি আসলে একটা বায়ো ওয়েপন। যদিও আমার বায়ো ওয়েপন বলতেই সবার আগে মনে পড়ে ‘সিস্টোসার্কা গ্রিগেরিয়া’ নয়তো ‘মশা’র কথা। আজ্ঞে ঐ গুলবাজ লোকটার কথাই বলছি। ঘনাদা। কিন্তু আজ তো বাড়িতে বাড়িতে ঘনাদা তৈরি হয়ে গেছে , যারা গুল দিচ্ছে উৎকৃষ্ট মিথ্যা খবরের মাধ্যমে! কিন্তু তারা কি সেই গল্পের শেষে থাকা দেশ তথা পৃথিবী বাঁচানোর মত মহৎ গুলটিও দিচ্ছে! না মশাই , আমরা সবাই শিবু শিশির গৌর সুধীর হলেও প্রকৃত ঘনাদার অভাব থেকেই গেছে। পৃথিবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বাঁচাতেও একজন ঘনাদার ভীষণ প্রয়োজন এখন।
ভীষণ।
অথচ আমরা শুধুই নিজেদের সিগারেটের টিন খালি করছি আশায় আশায় , আর রাষ্ট্রের ‘নির্দেশ’ এলে সেই টিনই পিটিয়ে যাচ্ছি প্রাণপন।
টিন পেটানোর কোনো বিরাম নেই। যেরকম বিরাম নেই নদীর জলে ভেসে আসা ঐ ‘বস্তু’গুলোরও। কিংবা কেউ কেউ টিনের অভাবে ফাঁকা অক্সিজেন সিলিন্ডারও বাড়িতে রেখে দিচ্ছে। ‘নির্দেশ’ এলে বাজানোর মত টিন নেই কি না! হেহে। আমি তো আপনার অনুগত দাস সেই জাদু প্রদীপের ‘দৈত্তি’।

রঙ্গন রায় ,

আনন্দচন্দ্র কলেজ, জলপাইগুড়ির ছাত্র
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *