• December 4, 2021

বস্তির গল্প ও করোনা মহামারী

 বস্তির গল্প ও করোনা মহামারী

উত্তরোত্তর বেড়ে চলা করোনার ঢেউ যে কি ভাবে জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, বিশেষত ভারতের বিভিন্ন শহরাঞ্চলের বস্তিগুলিতে দৈনন্দিন কি ভীষণ ভাবে এর দ্বারা প্রভাবিত, তা নিয়ে নানান প্রতিবেদন, প্রবন্ধ লেখা হচ্ছে ক্রমাগত এবং সবখানে বারবার এই তথ্যই উঠে এসেছে যে বস্তি এলাকাগুলিতে বসবাসের যেরূপ শোচনীয় অবস্থা এবং সেখানকার বাসিন্দাদেরই যা আর্থিক সঙ্গতি তাতে করে ‛সামাজিক দুরুত্ব’ মেনে চলা তাদের কাছে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয় । ফলত অনেকেই করোনা পরবর্তী সময়ে শহরাঞ্চলের এই বস্তিগুলির অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে উন্নততর ব্যবস্থাপনা ও ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা বলছেন ।

               এই সমস্ত আলোচনার ভিড়ে একটা মূল প্রশ্ন কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনুৎসাহ ও অমীমাংসিত থেকে যায় । তাহলে কেন শহরাঞ্চলে এই বস্তিগুলি গড়ে উঠেছে ? এবং কেনই বা এই বস্তিগুলির উপস্থিতি আমাদের কাছে এক স্বাভাবিক একটা বিষয়? শিল্পায়ন এর সময় বিশেষত প্রথম দিকে বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরাঞ্চলে এসে ভিড় জমানোর যে প্রবণতা তা নগরায়নকে তরান্বিত করে অনুঘটকের মত কাজ করে । বহু বছর ধরে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বিভিন্ন তত্ত্ব ও মডেলের মাধ্যমে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে যাওয়ার এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তারা যে বিষয়ের উপর জোর দিচ্ছেন তা হল, কি ভাবে ভালো রোজগারের আশায় মানুষ কৃষি কাজের মত প্রচলিত আয়ের ক্ষেত্র ছেড়ে কলকারখানায় কাজ অর্থাৎ আধুনিক আয়ের ক্ষেত্রগুলির প্রতি ঝুঁকে পড়ছে । 

                 শুধু তাই নয় এক্ষেত্রে ঠিক কোন শ্রেণীর মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে উঠে যাচ্ছেন, এবং  এই পরিব্রাজনে পিছনে মূল কারণগুলিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠিক মতো চিহ্নিত করতেও ব্যর্থ এই মডেলগুলি । কারণ, স্বতঃস্ফূর্ত স্বেচ্ছাত্রিত হওয়া  অপেক্ষা এই ধরণের migration গুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিটেমাটি হারিয়ে প্রচন্ড আর্থিক অনিশ্চয়তার তাড়না থেকেই ঘটে থাকে । 
                   ফলতো এই সমস্যাকে ধারণার বাইরে গিয়ে একটু অন্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখলে হয়তো প্রচলিত মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতার উপরে আলোকপাত করা সম্ভব । একটা সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষকে ভিটেমাটি ছেড়ে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য করে তা বোঝা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । একসময় ব্রিটিশরা পণ্যের বাণিজ‍্যিকীকরণ ও বহুল যান্ত্রিক ব্যবহারের ধারণা রোপন করেছিল । ভারতের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, পরবর্তীকালে এই ধারণাগুলোই ভারতে ক্যাপাটালিজম প্রতিষ্ঠা করতে বড় ভূমিকা পালন করে । উৎপাদন ব্যবস্থাই যন্ত্রের প্রবর্তনের ফলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্প একরকম ধ্বংসের মুখে পড়ে যায় এবং একইসাথে জমিদারি, মহলওয়ারি, রায়তওয়ারি প্রভৃতি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমির মালিকানা স্বত্ত্ব ব্যক্তিবিশেষের হাতে চলে যাওয়ায় চাষীরা তাদের জমির অধিকার হারিয়ে ফেলেন ।

এমনকি স্বাধীনতা লাভের পরেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি । সবুজ বিপ্লবের ফলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থা ক্রমশ যন্ত্র নির্ভর হয়ে পড়েছে এবং ১৯৯১ সালের উদার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে আমাদের দেশীয় শিল্পগুলো বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলত, বহু কারিগর ও কৃষক বংশ পরম্পরায় চলে আসা জীবিকা কাজের সন্ধানে শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছেন । যেখানে তাদের বংশ পরম্পরায় শিখে আসা কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কোন কাজে আসে না ।
বিপুল সংখ্যায় পরিব্রাজন এবং কাজের অভাব ও একইসাথে জীবিকার চাহিদা শহরগুলিতে শ্রমশক্তির তথা শ্রমিকশ্রেণীর ক্রমবর্ধমান যোগান বজায় রেখেছে। এদের মধ্যে কিছু অংশ হয়তো একটা রুটিন কাজের সন্ধান পান। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপরীত চিত্রই চোখে পড়ে। এমনকি এদের কাজের প্রকৃতি এবং যুগপৎ চলতে থাকা বিপুল বেকারত্ব সমস্যা মালিক শ্রেণীকে ইচ্ছামতো কর্মী ছাঁটাই এবং ইচ্ছামতো বেতন নির্ধারণ করার সুযোগ করে দেয়। এবং যারা নিশ্চিত কর্মসংস্থান বা মাস মাইনে চাকরি জোগাড় করতে ব্যর্থ হন তাদের মধ্যে অনেকে ক্ষুদ্র ও স্বনিযুক্ত কর্মসংস্থানের পথ বেছে নেন। এই ধরনের কাজ গুলোতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের যোগদান লক্ষণীয়। তবে এই দুই শ্রেণীর কর্মীদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। তা হল জীবিকা ও বেতনের অনিশ্চয়তা এবং সর্বোপরি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের অভাব।

এইভাবে একটা গোটা শ্রেণীকে ক্রমশ খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।অপরদিকে শহরাঞ্চলের বিকাশের সাথে সাথেই বেড়েছে শহরে আস্তানা খোঁজার প্রতিযোগিতা। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফ্ল্যাট ও বাড়ি ভাড়া। ফলত, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে বসবাসের উপযোগী একটা ঠিকঠাক স্বাস্থ্যকর ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া করা যেমন অসম্ভব, তেমনি তাদের স্বল্প আয়ের আওতায় শহরের বুকে নিজস্ব একটি বাড়ি তৈরীর কথা ভাবাও অলীক কল্পনা মাত্র। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা বাধ্য হন শহরের নোংরা ও পশ্চাৎপদ এলাকাগুলোতে কোনমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিতে, যেখানে পানীয় জল ও শৌচালয়ের মত প্রাথমিক সুবিধাগুলো দুষ্প্রাপ্য।
এটাই হলো তথাকথিত তিলোত্তমা নগর সভ্যতার হত জীর্ণ ছবি। Development এর হাত ধরে আসা এই নগরজীবন সাক্ষী থেকেছে কিভাবে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে শহরের বুকে ছড়িয়ে থাকা বস্তি ও বস্তিবাসীর সংখ্যা। এই মানুষেরা এমনই এক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি বিষাক্ত পরিধির মধ্যে আটকা পড়ে গেছেন যে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে তারা শারীরিক মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তথা সকল অর্থেই এক নিম্নমানের জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পরিস্থিতির সাথে সংঘর্ষ করতে করতে তাদের মধ্যে উন্নতির আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। ফলত, শুধুমাত্র খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান অর্থাৎ বেঁচে থাকার প্রাথমিক তিন শর্ত পূরণের তাড়নায় তারা বাধ্য হচ্ছেন স্বল্প মজুরিতে নিজের শ্রম বিকিয়ে দিতে। এদের অসহায়তা এবং কোনরকমে কাজে টিকে থাকার মরিয়া প্রচেষ্টা এই শ্রেণীকে বংশবদ নিরীহ মজুরিতে পরিণত করেছে ,যা এই মুনাফালোভী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পক্ষে চরম লাভজনক।

এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিজ স্বার্থে শ্রমিক শ্রেণীর এমন চরম দুর্দশার সৃষ্টি করে রেখেছে এবং এই ব্যবস্থা জিইয়ে রাখার জন্য পুঁজিবাদের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ” বেসরকারিকরণ ব্যবস্থা” এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো আসার ফলে উন্নত মানের শিক্ষা সমাজের শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল অংশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে। বস্তি এলাকায় বাচ্চারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় শিশুশ্রম অথবা গৃহকর্মর কাজে নিযুক্ত থাকে। আর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেলেও সরকারি স্কুল ছাড়া তাদের ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহণের অন্য কোনো উপায়ও নেই। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে এই সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উপযুক্ত পরিমাণে শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব ও উপযুক্ত জলের অভাব রয়েছে। এবং এই ধরনের স্কুলগুলিতে স্কুল ছুটের সংখ্যাও প্রচুর।
এই শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের মধ্যে চলমান অর্থনীতিতে উন্নতি সাধনের উপযোগী অসামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা ও দক্ষতা জায়গাতে ব্যর্থ। যার ফলে এই শিক্ষা ব্যবস্থায় আটকে পরে এলাকার ছোট ছোট বাচ্চারা এই ব্যবস্থার আগামী শ্রমিক প্রজন্ম হিসেবে তৈরি হচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণীর এই অসহায়তা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের বহমান। যা সর্বহারা অসহায় সস্তা শ্রমিক উৎপাদনের চিরন্তন বৃত্তাকার প্রক্রিয়াকে চালু রাখতে সাহায্য করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একথা স্বীকার করে যে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শহরের বুকে ক্রমবর্ধমান বস্তিগুলোর বিস্তার এবং সেখানকার বাসিন্দাদের দুর্দশা সরাসরিভাবে নগরায়নের বিকাশের সাথে যুক্ত।
এমনকি ২০১৮ সালের ” The the United Nations World Urbanisation prospects: the 2018 Revision এ “সুস্থ স্বাভাবিক নগরায়নের জন্য ” যথাযথ আবাসন ব্যবস্থা ও গোষ্ঠীগুলোর জনঘনত্ব কমিয়ে তার উন্নতি সাধন ও শহর এবং শহরতলীর আশেপাশের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বস্তি বাসিন্দাদের পুনর্বাসন” -এর কথা বলা হয়েছে।
এবং গবেষকরা এই সম্পর্কে একই অভিমত প্রকাশ করেছেন।

নিঃসন্দেহে বস্তিবাসীদের অবস্থার উন্নতির জন্য এইসব নীতি প্রয়োগের কথা বলা হয়ে থাকে। যদিও বস্তি এলাকা গুলোর উৎপত্তির কারণ ও তার পেছনে লুকিয়ে থাকা সমস্যা গুলি চিহ্নিত না করতে পারলে এই সকল নীতি ও পরামর্শগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পর্যালোচনা করে তাকে বসতি এলাকার বৃষ্টির পিছনে বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে সমস্যা গুলি কে চিহ্নিত করতে হবে।

সাত্যকি দাসগুপ্ত ও অন্বেষা মুখার্জির যৌথ লেখা, বাংলায় তরজমা করছেন শ্রেয়া চক্রবর্তী।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • Very well written 👍👍

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post