• December 4, 2021

চুপচাপ শুনে ফেলি ফিসফাস কথা

 চুপচাপ শুনে ফেলি ফিসফাস কথা

কোয়েল সাহা
শহর জীবনে বদ হাওয়ার প্রকোপ কানায়কানায় ভরে ওঠা। কেন বদ কি করানে বদ সেটা এক কথায় বললে দাঁড়ায় দূষণ। যে দূষণ সম্পর্কে বিষদে না এগিয়ে শহরের পরিধি অতিক্রম করে বাংলা উড়িষ্যার উপকূলে ডাগারা কে লক্ষে রেখে বেড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে আমাদের চলনটা সোজা নাক ধরার চাইতে একটু বেকিঁয়ে নাক ধরার প্রতিই বিশেষ আগ্রহ তৈরী করল।
তাই ভোর রাতের সরকারি দীঘা যাওয়ার বাসে চেপে চূড়ান্ত অ্যাডভেনচারের জন্য কাঁথি বাস স্ট্যান্ডে নেমে পড়া হল। পূর্বনির্দ্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুসারে মোটর গাড়ি সহ তরুণ সারথি এসে হাজির। সময়কে অবহেলা না করে মোটর চেপে সোজা প্রথম হল্ট সুজলপুর রেলগেট। ঝিড়ঝিড়ে বৃষ্টি মাথায় হাওয়া বদলের প্রথম পাঠ শুরু হল চায়ে চুমুকের পাশাপাশি দোকানের অনান্য খরিদ্দারদের সাথে কিছুটা আলাপ সেরে রেখে।
আকাশের মুখ হাঁড়ি করা ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে মইথানে পৌছাতেই হৃদযন্ত্র কান মাথার ভিতরে তীব্র আলোড়ন অনুভব হল। খোঁজ নিতে জানা গেল শোকের মহোরমকে বাদ্যময় করে তোলার জন্য সামান্য জগঝম্পের আয়োজন। বাদ্যময় পরিবেশের মুখ্য ভূমিকায় আছেন তিন তলা চার তলা সমান পাহাড় সাদৃশ্য বিশেষ বক্স। যার মাহাত্বে বিভীষিকাময় পারমানবিক দামামার উপলব্ধি পাওয়া যাবে। এক একটি বক্স পাহাড় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার ভাড়ায় অভিনব মহোরম পালনের প্রধান অতিথি। হিসেবের সাহস দেখানো যায় নি তবে ১৫-২০(আনুমানিক) টি বক্স পাহাড় গ্রামের এক চিলতে পথকে চারিদিক থেকে হিমালয় রেঞ্জের মতো ঘিরে রেখেছিল। আর শব্দ জব্দে সুকুমার রায় এর ‘গন্ধ বিচার’ লাইন গুলিকে স্মরণ করায় যেমনঃ গন্ধ শুকে মরতে হবে এ আবার কি আহ্লাদ


এমত পরিস্থিতিতে কেবল ‘গন্ধ শুকে’ -র স্থান পরিবর্তন করে শব্দ শুনে মরতে হবে এ আবার কি আহ্লাদ এর আমদানি করতে হবে।
আপনারা কিন্তু আমাদের কোন ভাবেই ইসলাম বিদ্বেষী তকমা সেঁটে দেবেন না দয়া করে। আমরা বড় জোড় ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠানের অন্ধ আনুগত্য বিরোধি। আমরা সামান্য, এলেবেলে। যাইহোক এ, এলাকার অর্থের অক্ষ শক্তি কাজু কারখানা। সেই ঠিকানায় পাকা ঘরে আছে, আছে আমদানি করা বিলাতী মেসিনের দেমাক সৎ-অসৎ পন্থা, কাঁচা পয়সা এবং শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষাবিধি এক রকম ফুৎকারে মিলিয়ে বা মুছে যাওয়া পরিণতি। হয়তো বাতাসে ভেষে বেড়ানো আরও অনেক ফুঁর সাথে মেলার আকাক্ষা। জলা বুজিয়ে ইমারত খাড়া করা কাঁচা পয়সার ইসারা আমাদের শহর তলির সৎ-অসৎ, অধিকার আইনের ধারা গুলিকে যেমন আত্মসাৎ করে দানবিয় গুণে। আহা নিন্দুক ভেবে ভ্রূকুটি করবেন না যেন। নিন্দার কোন এক্তিয়ার নেই, আছে টোটাল মনোপলি সিস্টেমের ডাল-পালা। যা সময়ের গুণে দেশ রাজ্য পাড়ার চৌকাঠে সংস্কৃতির বৃহত্তর ময়দান হয়ে লালিত হচ্ছে।
গ্রামটি মুসলিম। গ্রামের এক ঘরে ভাত ডাল শাক চচ্চোড়ি মাছ ভাজা দিয়ে ভরা মধ্যাহ্নের ভোজন সেড়ে গ্রাম ছাড়তে হবে। ভোজনের সেই স্বাদ ভুলে গেলেও শব্দ জব্দের অনুভূতি কিছুতেই ফিকে হতে চায় না। ফিসফাস শোনা গেল গ্রামের শিক্ষিত সমভ্রান্ত ব্যক্তিরা শব্দ দামামাকে অবলিলায় তালিবানি বলে দেগে দিচ্ছেন। ভৌগোলিক বেড়া টপকে উগ্রপন্থাকে এক নাম এক পরিচিতির স্বিকৃতি দিতে চায় আস্ত পৃথিবী। BJP; RSS যে ভাবে একদেশ এক ভাষা এক সংস্কৃতির বোঝা চাপিয়ে দিতে চায়। ভঙ্গিমা সেই একই।
যাইহোক মোটর চেপে ধোঁয়া ছুটিয়ে নাক ডাকিয়ে চোখ বন্ধ করে এলান শরীর যখন ধাক্কা খেল মোটর দাঁড়িয়ে পড়েছে। আকাশের মেঘ সমুদ্রে ঢলে পড়ছে। পরিচিত জায়গা তালসারি। পাড় ঘেষে সার দিয়ে দাঁড়ানো নৌকা আর ছড়িয়ে থাকা মাছের জাল নিজেদের উড়ো রোদে একটু সেঁকে নিতে চাইছে। পাকা দালানের ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে। পাশ থেকে ফিসফিসে গলায় শোনা গেল ইয়াসের সময়, জল ছাউনির ছাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। পাকা দালানের গায়ে কেমন চওড়া ফাটল। এই তো ঝড়ের দাপটের চিহ্ন এখন ও কেমন রয়ে গেছে। হাতেনাতে প্রমান পাওয়াতে বেশ খুশি। না ঝড়টা একটু বেশীই তেজি ছিল সগক্তি করে বসে। আসলে সন্দেহ। মধ্যবিত্ত নিরাপদ বলয়ে থাকা মানুষরা একটুতেই ভেবে নিতে পারেন গরিব গুর্ব হাড় জিড়জিড়ে মানুষ গুলো যেন মিছিমিছিই ঝড়ের তান্ডব নিয়ে বারাবারি রকম গলা চড়াতে চায়।
মধ্যবিত্তের খুশির তালিকা ‘পথে ঘটে’ ফেরি ঘাটে এসে উপছে পড়ল। আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে … নদীটা ছোট নয় নাম সুবর্ণরেখা। আঁকাবাঁকা গতি পথে, এ সেই পারাপার করার ঘাট। ঘাটের পাশে বৃহৎ বৃক্ষের ছায়া। সেই গাছেরই ছায়া আলপনায় লেপটে এগিয়ে দিয়েছে টায়ার বাঁধা দোলনা। এঁটেল মাটির কাদায় ডুবে থাকা নদীর তীরে দোলনা কাদার মেল বন্ধন এক ঝটকায় মনে করাল সত্যজিৎ বাবুর ‘সমাপ্তি।
লাল কাদা মাটির ৬ কিলো মিটারের কাঁচা রাস্তা। দু ধারে সার বাঁধা তাল গাছের ছায়া। তারপর পাকা রাস্তা থেকে মোটরে চেপে সোজা বেলাভূমির উপত্যকা দাগারা। যা এখনও পর্যন্ত টুরিস্ট স্পটের স্পট লাইটে আসতে পারেনি। তাই থাকার জায়গা অপ্রতুল। সবের ধন নীলমণির মতো একখানা আছে। আছে সমুদ্র বেলাভূমি থেকে থাকার জায়গার মাঝে বৃহদাকার ঝাউ পাঁচিল। আছে বেলাভূমির একপ্রান্তে কাসাফল, ডুগডুগি নদীর মোহনা নিটোল ঝাউ বনের আড়াল আর অন্য দিকে কারাফল আর সুবর্ণরেখার সুমুদ্রে মিশে যাওয়া। দীগন্ত বিস্তারে উজার আকাশ নদী জল সীমারেখার মাঝে মেঘ রোদ বৃষ্টির খেলা।
এ হল রেখে ঢেকে প্রকাশ পাওয়া বেড়িয়ে পড়ার আউটলাইন। বাকি অন্যদের লেখার পালা।

ফোটোগ্রাফঃ কোয়েল সাহা

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post