• December 4, 2021

কতদিন আর নিজেরা নিজেদের বোকা বানাবো ?

 কতদিন আর নিজেরা নিজেদের বোকা বানাবো ?

সুমন সেনগুপ্ত

দু হাজার কুড়ির শুরুর দিকে যখন সারা পৃথিবীর পাশাপাশি ভারতেও কোভিড ঝড় আসছে, তখন অনেকেই বলা শুরু করছিলেন যে কোভিড কোনও রোগ নয়, এটা বড় বড় ওষুধ কোম্পানির ষড়যন্ত্র মাত্র। শুধু তাই নয়, অনেকেই মনে করতেন কেউ বা কারা এই ষড়যন্ত্রের পিছনে আছেন, যাঁদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। সেই কারণে আর অন্য যে কোনও কারণেই হোক অনেকেই প্রতিষেধক নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তারপর প্রথম ঢেউ এর পরবর্তীতে যখন দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়লো, যখন গঙ্গায় লাশ ভাসতে দেখা গেল তখন অনেকের হুঁশ ফিরলেও ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

ভারতের সমাজের অবস্থাও অনেকটা একইরকম। সারা দেশে যেভাবে রোজ ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, রোজ যেভাবে একটু একটু করে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কেই সমাজের যেকোনো অবক্ষয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে, তা দেশের ও সমাজের একটা অংশের মানুষ দেখেও দেখছেন না। কোনোদিন মধ্যপ্রদেশ তো কোনওদিন “উত্তম প্রদেশ” রোজ কোথাও না কোথাও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের কোথাও পিটিয়ে মারা হচ্ছে বা আফগানিস্তানে তালিবানদের অভ্যুত্থান দেখিয়ে মুসলমান বিদ্বেষ বা ইস্লামোফবিয়া ছড়ানো হচ্ছে, কিন্তু তাও বেশীর ভাগ মানুষ দেখেও না দেখার ভান করে চুপ করে থাকছেন। এরপর যেদিন এই বিষয়ে সমাজের মানুষের ঘুম ভাঙবে, ততদিনে না অনেক দেরী হয়ে যায়।

কিছুদিন আগে অবধি গরুকে উপলক্ষ্য বানিয়ে, এই সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। এখন একজন মানুষ যদি মুসলমান হন, তাহলে তাই যথেষ্ট সেই মানুষটিকে মারার জন্য। তাঁর পরিচিতি যদি কোনও কারণে মুসলমান বলে জানা যায়, যদি খবর পাওয়া যায় তিনি এমন কোনও অঞ্চলে শব্জি বা অন্যকিছু বিক্রি করতে গিয়েছিলেন, যে অঞ্চলে মূলত হিন্দু মানুষজন বাস করেন, তাহলে সেই কারণটুকুই কি যথেষ্ট নয়, সেই মানুষটিকে হেনস্থা করার পিছনে? সম্প্রতি এলাহাবাদ উচ্চ আদালত গোহত্যা সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ করার সময়ে গরুকে জাতীয় পশু হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে বলে জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিচারপতি শেখরকুমার যাদব জানিয়েছেন, ‘কেন্দ্রের উচিৎ সংসদে বিল এনে গোরক্ষাকে হিন্দুদের মৌলিক অধিকার হিসাবে ঘোষণা করা’। এই পর্যবেক্ষণের পরে নিশ্চিত আন্দাজ করা সম্ভব আর কতো লাঞ্ছনা এবং অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে একজন ভারতীয় মুসলমানকে যেতে হবে! এমনিতেই আফগানিস্তানে একটি মৌলবাদী সংগঠন যখন ক্ষমতা দখল করে, তা দেখিয়ে ভারতের সমস্ত মুসলমানদের আরও কোণঠাসা করা হয় আর অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন আদালতের বিচারপতিদের কিন্তু হুঁশ নেই। তাহলে কি করে একজন সাধারণ নাগরিক, তিনি সংখ্যালঘুও হতে পারেন আবার নাও হতে পারেন, এই বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখবেন?

অথচ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি অবধি উষ্মা প্রকাশ করেছেন যে একশ্রেণীর সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে সমস্ত খবরকে একটা সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়া হচ্ছে তাতে দেশের মাথা হেঁট হচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন এই সামাজিক মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো হচ্ছে তা দেখে মনে হচ্ছে এই মাধ্যমগুলো একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করলেই কি এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? আর কারাই বা এই নিয়ন্ত্রণ করবেন, যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাঁদের তো উদ্দেশ্য ভিন্ন। তাঁদের তো উদ্দেশ্য আইন করে বিরোধী কণ্ঠকে দমন করা, তাঁদের তো উদ্দেশ্য, এই সরকারের বিরোধী যে মানুষজন আছেন, তাঁদের প্রশ্ন করার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া। না হলে, আদালতে দাঁড়িয়ে দেশের প্রধান বিচারপতির সামনে সরকার পক্ষের আইনজীবি এই সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি স্বীকার না করে, কি করে বলেন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্যেও বেশ কিছু খবর করা হচ্ছে, সেটাও দেখা জরুরী। আসলে সরকার পক্ষের আইনজীবির উদ্দেশ্য একটাই, সরকারকে বাঁচানো, তাতে সাধারণ মানুষের প্রাণ দুর্বিসহ হয়ে উঠুক আর যাই হোক। সরকার পক্ষের আইনজীবি বা যে সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদ মাধ্যম এই সাম্প্রদায়িক রঙযুক্ত খবর করেন, তাঁরা কি একজন সাধারণ ভারতীয় মুসলমান মানুষের শঙ্কা এবং উৎকন্ঠা বোঝেন, একজন সাধারণ মানুষ যদি শুধুমাত্র জন্ম পরিচয়ে মুসলমান হন, তাহলে গত সাত বছরে তিনি বা তাঁর পরিবার যে কত বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন তার আন্দাজ কি করা সম্ভব?

অনেকে তর্ক করার জন্যে বলতে পারেন যে যেহেতু সামনে উত্তরপ্রদেশে নির্বাচন আসছে, তাই এই সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ তৈরী হয়েছে, কিন্তু এটা কি অস্বীকার করা যায়, যে প্রতিটি নির্বাচনকে এই সরকার শুধু ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর, হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক একটি ধাপ হিসেবে দেখেছে, তা যদি না হতো, ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের পরে সমস্ত সাম্প্রদায়িকতা স্তব্ধ হয়ে যেত, কিন্তু তা কি হয়েছে, না উত্তরোত্তর এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য প্রতিটি নির্বাচনকে ব্যবহার করা হয়েছে? যদি খেয়াল করা যায়, কোনও একটি নির্বাচনী প্রচারকে এই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর দলের লোকজন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরী করার কাজে ব্যবহার না করে ছাড়েননি। যখন একদিকে বিহার নির্বাচনের প্রচার চলছিল আর অন্যদিকে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী একটি প্রচার সভায় বলেছিলেন, কারা এই নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, তা তাঁদের পোষাক পরিচ্ছদ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। যেহেতু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে ‘মুসলমান’ দের বাদ রাখা হয়েছিল, এবং যেহেতু তাঁরাই মূলত বিরোধিতায় রাস্তায় নেমেছিলেন, তাই প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কি বিভাজনমূলক ছিল না? একদিকে করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে ঋণাত্মক বন্ধনীর মধ্যে জিডিপির কিঞ্চিৎ এগোনোকেই দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী না থাকলে এই সাফল্য হতো না। প্রতিটি নির্বাচন এসেছে, দেশের বেশ কিছু মিডিয়া একটা কথা প্রচার করে গেছে, বিজেপি ছাড়া অন্য যে কোনো বিরোধী দলের পক্ষে নরেন্দ্র মোদীকে হারানো সম্ভব নয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু শিল্পপতি গোষ্ঠী সুবিধা পাচ্ছে, আর অজস্র মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছেন। প্রতিদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের দাম বাড়ছে আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ শোভা পাচ্ছে, রান্নার গ্যাস, পেট্রল, ডিজেলের দাম বাড়ছে আর প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখা যাচ্ছে পেট্রলপাম্পে। জাতীয় স্তরে, তাঁর জনপ্রিয়তা হ্রাস পেলেও আমাদের বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে এক শ্রেণীর সংবাদ মাধ্যমের তরফ থেকে, আর যাই হোক আমরা আফগানিস্তানের থেকে তো ভাল আছি। বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে মোদীর বিকল্প কোথায় আর আমরা ভাবছি, সত্যিই তো এর থেকে হয়তো খারাপ সময়েই আসবে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে। ওদের তৈরী করা ফাঁদে পড়ে ভাবছি এটাই হয়তো সেই কাঙ্খিত ‘আচ্ছে দিন’, আর যাই হোক না কেন মুসলমান, খৃষ্টান, দলিত, মহিলাদের তো নিজেদের জায়গা দেখানো গেছে। আমরা আমাদের ফাঁকা মানিব্যাগের দিকে তকিয়ে ভাবছি, পাশের মানুষটির তো মানিব্যাগই নেই, তাঁর তুলনায় তো আমি ভাল আছি। আসলে এটাই উদ্দেশ্য, কিন্তু কতদিন আর এইভাবে আমরা বোকা বনে থাকবো? যখন আমাদের ঘুম ভাঙবে, ততদিনে কি খুব দেরী হয়ে যাবে না?  

সুমন সেনগুপ্ত:কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুকার।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *