• December 4, 2021

ব্যক্তিত্বময়ী রুকাইয়া সুলতান

 ব্যক্তিত্বময়ী রুকাইয়া সুলতান

সহেলি চক্রবর্তী

মধ্যযুগের উল্লেখযোগ্য নারীর কথা বললে আমাদের সাধারণত দুজন নারীর কথা সবার আগে মনে পড়ে, তাঁরা হলেন নূরজাহান ও মুমতাজ মহল।তাঁর বাইরে কেউ কেউ গুলবদন বেগম, জেবউন্নিসা বা যোধাবাঈ এর নাম শুনে থাকবে। কিন্তু আজ যাঁর কথা আলোচনা করবো তাঁকে আমরা সেইভাবে চিনিই না। যাঁর জন্য আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে তুর্কী সুলতানার আবাস নামক মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন, যিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের প্রধানা মহিষী, তিনি আর কেউ নন,তিনি রুকাইয়া সুলতান,আকবরের প্রথম বেগম এবং একমাত্র ভালোবাসা। আকবরের হারেমে ৫০০০হাজারের বেশি মহিলা ছিল। তার মধ্যে প্রধান বেগম ছিলেন রুকাইয়া সুলতান, হরকা বাঈ বা মরিয়ম উস জামালি এবং সলিমা সুলতান। কিন্তু আকবরের জীবনে যদি কোন নারীর বিশাল প্রভাব থেকে থাকে, তিনি হলেন রুকাইয়া সুলতান, আর কেউ নন।
১৫৪২সালে রুকাইয়ার জন্ম হয় মুঘল শাহজাদী রূপে। তিনি ছিলেন হিন্দল মীর্জার একমাত্র কন্যা।সেই সূত্রে বাবর ছিলেন তাঁর পিতামহ।জন্মসূত্রে রুকাইয়া ছিলেন তৈমুর বংশজাত।রুকাইয়া সেই যুগে যথেষ্ট শিক্ষিত মহিলা ছিলেন। তিনি ফারসী,আরবী,উর্দু ও চাঘতাই ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। পিতা হিন্দল মীর্জার আকস্মিক মৃত্যুর ফলে মাত্র নয় বছর বয়সে রুকাইয়ার বিবাহ হয় আকবরের সাথে যিনি ছিলেন সম্পর্কে রুকাইয়ার ভাই ও হুমায়ুনের পুত্র। ১৫৫১সালের নভেম্বরে তাঁদের বিবাহ হয়। হুমায়ুন বিবাহের পর হিন্দল মীর্জার অর্থ, সামরিক বাহিনী ও গজনী আকবরকে প্রদান করেন, যা ছিল একসময় হিন্দল মীর্জার জাগির। আকবর এতদিন ছিলেন হিন্দল মীর্জার ভাইপো, এই বিবাহের পরে তিনি হলেন জামাতা।
রুকাইয়া পাদশাহ বেগম হন মাত্র ১৪বছর বয়সে ১৫৫৬সালে।রুকাইয়া সুলতান আজীবন সন্তানহীনা ছিলেন কিন্তু মুঘল হারেমে তাঁর এক নিজস্ব উচ্চ আসন ছিল। ১৫৯২সালে খুররমের জন্মের পর আকবর ৬দিনের শিশুকে রুকাইয়ার হাতে তুলে দেন যাতে ভবিষ্যতের সম্রাটের শিক্ষা দীক্ষায় কোন ফাঁক না থাকে। আকবর চেয়েছিলেন খুররমের প্রতিপালন যেন রুকাইয়া সুলতানের হাতেই হয়।আকবর শুধু শিক্ষা বা তেহজিব ই নয় আসলে তিনি রুকাইয়াকে মাতৃসুখ ও দিতে চেয়েছিলেন আর তাই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।খুররম ১৩বছর বয়স পর্যন্ত রুকাইয়ার কাছে থাকেন। এরপর তিনি পিতা জাহাঙ্গীরের কাছে ফিরে আসেন,তবু তাঁর শিক্ষার প্রতি ছিল রুকাইয়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।জাহাঙ্গীর স্বীকার করেছেন তিনি খুররমকে যতটা ভালোবাসতেন তার থেকে রুকাইয়া সুলতান হাজার গুণ বেশি ভালোবাসতেন। রুকাইয়া সুলতান যে শিক্ষা খুররমকে দিয়েছেন তা তিনি পিতা হয়েও দিতে পারতেননা।
আকবরের জীবনে রুকাইয়ার বিশাল প্রভাব ছিল। তিনি শুধু আকবরের প্রিয় বেগম ছিলেন না তিনি ছিলেন আকবরের বন্ধু, যার প্রভূত অধিকার ছিল আকবরের ওপরে। তাঁর স্থান আকবরের জীবনে সবচেয়ে ওপরে ছিল, তাঁর অন্যান্য বেগমদের তুলনায়। আকবর তাঁর জীবনে একজনকেই ভালোবেসেছিলেন তিনি হলেন রুকাইয়া সুলতান, তাঁর প্রথম স্ত্রী।আর তাই জীবনের মধ্যাহ্নে এসে নিঃসন্তান রুকাইয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ভবিষ্যৎ সম্রাট খুররমের দায়িত্ব, যিনি পরে শাহজাহান রূপে খ্যাত হন।
রুকাইয়া সুলতান শাসনকার্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। আকবরের সাথে জাহাঙ্গীরের সম্পর্ক খারাপ হলে রুকাইয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন এবং সিংহাসনে জাহাঙ্গীরের দাবীকে পোক্ত করেন। মেহেরউন্নিসাকে মুঘল হারেমে নিরাপত্তা প্রদানে রুকাইয়া সুলতান বিশাল ভূমিকা পালন করেন। তাই মেহেরউন্নিসা থেকে নূরজাহান হওয়ার পরও রুকাইয়া সুলতানের সাথে তাঁর মধুর সম্পর্ক শেষ দিন পর্যন্ত বজায় ছিল। রুকাইয়া নূরজাহানকে বাকী বেগমদের তুলনায় বেশি স্নেহ করতেন।
আকবরের মৃত্যুর ২১বছর পর ৮৪বছর বয়সে ১৬২৬সালে রুকাইয়া সুলতান দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে কাবুলে বাগ -এ-বাবরে পিতা হিন্দল মীর্জার পাশে সমাধিস্থ করা হয়।শাহজাহান তাঁর সমাধি নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মচরিতে রুকাইয়া সুলতানকে তাঁর পিতা আকবরের প্রধানা মহিষী রূপে স্বীকার করে গেছেন। রুকাইয়া সুলতানের মুঘল হারেমে এবং আকবরের জীবনে অপরিসীম কর্তৃত্ব ছিল। আকবরের মৃত্যুর পরে জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের কাছ থেকে তিনি বিশেষ মর্যাদা পেয়ে এসেছেন। মুঘল হারেমের নারীদের মধ্যে খুব কমজনকে নিয়েই আলোচনা হয়।বাকীরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। রুকাইয়া সুলতান ও সেইরকমই এক নারী যিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেছেন কিন্তু মুঘল হরেমে ও বাদশা আকবরের জীবনে এই ব্যাক্তিত্বময়ী বেগমের অবদান অনস্বীকার্য।

সহেলি চক্রবর্তী ঃ ইতিহাস চর্চা করেন এবং ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লেখিকা।সম্পাদিকা প্রত্নচিহ্ন ই ম্যাগাজিন।

  •  
  •  
  •  
  •  

3 Comments

  • ভালো বেশ। অনেকেই হয়তো জানেন না। পড়ে উপকৃত হবেন।

  • Just wooow

  • তথ্য সমৃদ্ধ মূল্যবান রচনা। ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথ ‘ থেকে সহেলি কুড়িয়ে এনেছন এক অপূর্ব সুগন্ধি পুষ্প। তাই লেখিকাকে অভিনন্দন জানাই। প্রত্যাশা করি তাঁর কাছ থেকে এমনধারা আরও রচনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *