• December 4, 2021

সিন্থেসাইজার-অক্টোপ্যাডে ঢেকে দিচ্ছে ঐতিহ্যকে,হারিয়ে যাচ্ছে মনসা গানের সাবেকিয়ানা

 সিন্থেসাইজার-অক্টোপ্যাডে ঢেকে দিচ্ছে ঐতিহ্যকে,হারিয়ে যাচ্ছে মনসা গানের সাবেকিয়ানা

বাপী সিংহ

সিন্থেসাইজারে সুর তুলে আধুনিক বাংলা গানের তালে লখিন্দরকে আদর করছেন মা সনকা।অক্টোপ্যাড,নাল বা ইলেকট্রনিক বাঁশির সুরে নেচে নেচে আদরের লখাইকে নিয়ে গোটা মঞ্চ ঘুরছেন মা সনকা।সঙ্গে মঞ্চ জুড়ে আলোর ঝলমলানি।

আবার মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেলায় ভেসে যেতে যেতে গানের তালে নিজের দুঃখের কাহিনী শোনাচ্ছেন বেহুলা।কেঁদে কেঁদে লুটিয়ে পড়েছেন মাটিতে,ব্যাকগ্রাউন্ডে দুঃখের সুর বেজে উঠছে প্যাড ও ক্যাসিওতে।

ধুয়া পাঁচালি নয়, আধুনিকতার ছোঁয়ায় ও বর্তমান প্রজন্মের মন রাখতে মনসাকীর্তনেও এখন পরিবর্তনের সুর। কখনো হাস্যকৌতুক আবার কখনো বাংলা হিন্দি আধুনিক গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে মনসাকীর্তনের গীতিনাট্য।আধুনিক প্রজন্মের মন রাখতেই এই আয়োজন, একবাক্যে মেনে নিচ্ছেন সকলে।

বাজনা,গীতিনাট্য ও আলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন ঘটেছে মনসাকীর্তনের পোষাকেও। বর্তমান মনসাকীর্তনের শিল্পীরা বলছেন, একটা সময় ছিল যখন মনসা কীর্তনের শিল্পীদের পোশাক-আশাক ছিল খুব সাধারণ। বাঙালির পোশাক ধুতি,গেঞ্জি আর ফতুয়া পরে শিল্পীরা আসর জমিয়ে দিতেন।নারীচরিত্রে অভিনয় করতেন পুরুষরা।যুগের চাহিদা মেটাতে মনসাকীর্তনে মহিলা শিল্পীদের দিয়ে অভিনয় করানো হচ্ছে।

   পোশাক-আশাকেও বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। রাজকীয় পোশাক থেকে সাধারণ পোশাক এমনকি মনসার সাজেও এসেছে বদল।ঝলমলে আধুনিক পোষাক ছাড়া মন উঠছে না নতুন প্রজন্মের দর্শকদের।

বাংলা বছরের জৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত মালদা জেলার বিভিন্ন গ্রামে মনসা পুজোর সাথে মনসাকীর্তনের চল রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে অনেকেই মনস্কামনা পূরণ হলে মনসা পূজার সাথে মনসাকীর্তনের আয়োজন করে থাকে। সাধারণত সাত থেকে তের দিনের ঘটভরা হয় মনসাকীর্তন এর জন্য।প্রাচীনকাল থেকেই মনসা কীর্তনে ধুয়া পাঁচালির মাধ্যমেই গীতিনাট্য তৈরি করা হতো।এটা একটা আয়ের উৎস হিসাবেও চিহ্নিত ছিলো।গানের মাঝেমধ্যেই ফেরি গান গাইতেন শিল্পীরা। উপস্থিত দর্শকেরা ফেরি গানে নিজেদের সামর্থ্য মত দক্ষিণা দিয়ে মা মনসার আশীর্বাদ নিতেন। সেই আয় থেকেই শিল্পীদের দিন চলে যেত।

বর্তমান মনসাকীর্তনে ফেরি গান প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কারণ বর্তমান যুগের দর্শকেরা ফেরি গানের এর পরিবর্তে আধুনিক বাংলা ও হিন্দি গানে বেশি সাবলীল। তাই দর্শকদের অনুরোধে ও দর্শকদের মন রাখতে কিছুটা হলেও বাধ্য হয়ে মনসাকীর্তনে আধুনিক গীতিনাট্য তৈরি করছেন শিল্পীরা। কখনো আবার দৃশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে আধুনিক বাংলা হিন্দি গান গাওয়া হচ্ছে মঞ্চে।অনেকসময় দর্শকদের ফরমায়েসেও গাইতে হচ্ছে আধুনিক গান।

এই পরিবর্তন সম্পর্কে আক্ষেপের সুরে মনসা গানের শিল্পী অনিল কর্মকার ওরফে ঘিনু বলেন,

মনসা গানের এই বদল সম্পর্কে বলতে গিয়ে লোকসংস্কৃতিবিদ ও বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিম স্মৃতিরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবীন দাস বলেন, মনসামঙ্গলের মূল কাহিনি পরিবর্তিত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।পরিবর্তিত হবে তার উপস্থাপন বা পারফরম্যান্স-সেটা যুগের চাহিদা মেনেই হবে।কারণ,আসরের পারফরম্যান্সের পিছনে কাজ করে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ।সময় বদলাচ্ছে,বিনোদনের বহু মাধ্যমের ফলে দর্শকরুচিরও বদল ঘটছে।এই বদলে যাওয়া দর্শকরুচির কাছাকাছি পৌঁছতে না পারলে লোকসংস্কৃতি টিকবে না।সেটা করতে গিয়ে অনেকক্ষেত্রে মূল জায়গা থেকে সরে যেতে হচ্ছে,ঐতিহ্য বা সাবেকিআনা বলে কিছু থাকছে না-কিন্তু লোকসংস্কৃতির এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে এই বদলকে দুঃখের সঙ্গে হলেও আমাদের মেনে নিতে হবে।
এভাবে আধুনিকতার চাপ সহ্য করে সাবেকিয়ানার বদল কতোটা সহ্য করতে পারে ঐতিহ্যবাহী মনসাকীর্তন ,একমাত্র অপেক্ষা ছাড়া আর কোন রাস্তা জানা নেই শিল্পীদের।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *