• December 4, 2021

সামসেরগঞ্জের নদী ভাঙন সমস্যা ও রাজনীতি

 সামসেরগঞ্জের নদী ভাঙন সমস্যা ও রাজনীতি

শুভেন্দু বিশ্বাস

2020 সালের আগষ্ট মাসে সামসেরগঞ্জে নদী ভাঙন শুরু হয়। একে নদী ভাঙন বললে ভুল হবে, বলা যায় মানুষের স্বপ্নের ভাঙন। মুর্শিদাবাদ জেলায় নদী ভাঙন সমস্যার শুরু অনেক আগে থেকেই। তবে পুরোনো সেই ইতিহাস তুলে ধরার চেয়ে সাম্প্রতিক প্রক্ষাপটে বিষয়টি দেখা অতি আবশ্যিক। বলতে গেলে একদিকে রয়েছে, ভাঙন কবলিত এলাকার সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা। আর অন্য দিকে রয়েছে, সেই ভাঙনকে রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিশ্রুতির বন্যা। একদিকে রয়েছে নদী তীরবর্তী মানুষের সবকিছু হারানোর ভয়। আর অন্যদিকে সরকারের অজুহাত। এই দুই টানাপোড়েনে মধ্যে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার।
এবছরও আগষ্ট মাস থেকে সামসেরগঞ্জে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। মূলত বর্ষা এলেই এলাকাবাসী ভাঙনের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে যায়। বর্ষার জলের অতিরিক্ত চাপ এবং ফারাক্কা ব্যারেজ জল ছাড়ার ফলে এই ভাঙনের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। আগের বছরের বর্ষায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম, কিভাবে নদী একের পর এক বাড়ি, চাষযোগ্য জমি, বাগান গ্ৰাস করে যাচ্ছিল। নিমেষেই নিজের স্বপ্নের বাড়িটি হারিয়ে মানুষ গৃহহীন হয়েছে। এবছরের ভাঙন আগের মতো এত তীব্র না হলেও ভাঙন প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। আশঙ্কায় দিন গুনছেন অগনিত মানুষ। তবে আমাদের এটা ভুললেও চলবে না, যে করোনা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ফলত বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, গৃহহীন সাধারণ মানুষ কত কষ্টে রয়েছেন।
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, ভাঙন সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান কি নেই? নেই বলা ভুল হবে। যদি বলা যায় স্ব-প্রনোদিত ভাবে সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে না! নদী ভাঙনের সাথে রাজনীতির মতো বিষয় জড়িত আছে। সামনেই সামসেরগঞ্জে ভোট। সেখানে রাজনীতির আবহাওয়া যথেষ্ট গরম। আর ভাঙনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক দলের নির্বাচনী প্রতিনিধি তাঁর দলবল নিয়ে ভোট প্রচারে নেমে পড়েছেন। তবে সবাই যে ভাঙনকে হাতিয়ার করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন, তা কিন্তু হয়। গতকয়েক দিন ধরে সামসেরগঞ্জের রাজনীতির খবরের উপর দৃষ্টিপাত করলেই সব ষ্পষ্ট হয়ে যাবে।
গত বর্ষায় ভয়াবহ গঙ্গা ভাঙনের কবলে পড়ে সামসেরগঞ্জের ধানঘরা, হীরানন্দপুর, ধুসরীপাড়া, কামালপুর ও শিবপুর এলাকা। গঙ্গার ভাঙনে তলিয়ে যায় শতাধিক পরিবারের পাকা বাড়ি সহ কয়েকশো বিঘা কৃষি জমি ও আমবাগান। এছাড়া, তলিয়ে যায় বিএসএফ চৌকিও। লাগাতার কয়েক দিনের তাণ্ডবে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন বহু মানুষ। ভিটেমাটিহারা নিঃস্ব পরিবারগুলিকে সরকারি জমি দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও, এখনও পুনর্বাসন পাননি অনেকেই। ফলে এখনও বহু মানুষ ত্রিপলের তলায় রাত কাটাচ্ছেন এবং নিকটবর্তী স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। এখনও ভাঙন ঠেকানো বা বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকার মানুষ একাধিকবার ব্লক প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হন। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তাই, এলাকাকে নদী ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করেন। আসলে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষিতমহল কেউই খুব বেশি চিন্তিত নন। ফলত নেতাগণ প্রতিশ্রুতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেন। আর সমাজের শিক্ষিত মানুষদের হাতে এত সময় কোথায় যে নদী ভাঙনে সর্বস্বান্ত হ‌ওয়া মানুষদের খবর নেবেন!

আমরা অবগত আছি যে, এই ভাঙন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে একদিন দেখা যাবে পুরো সামসেরগঞ্জ মুর্শিদাবাদের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙন প্রক্রিয়া চললেও ফারাক্কা ব্যারেজ কতৃপক্ষ থেকে শুরু করে আমাদের জনকল্যাণগামী সরকারের কোন হেলদল নেয়। এমন মনে হচ্ছে, এটা শুধুমাত্র আমাদের জেলার সমস্যা। আমাদের‌ই এর সমাধান খুঁজে বার করতে হবে। আসলে মুর্শিদাবাদ জেলাকে সবসময়ই অবহেলিত জেলার মধ্যে রাখা হয়। বর্তমান তৃনমূল সরকার এসে সেই ধারাকে বজায় রাখার চেষ্টা করে চলেছে। যদিও বেশ কিছু ক্ষেত্রে জেলার অগ্ৰগতি এই সরকারের আমলে হয়েছে, এতে অস্বীকার করার মতো কোন জায়গা নেই। তবে এই সরকারের তুলনায় বাম সরকার নদী ভাঙন সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি। ২০০০ সালের বন্যায় পুরো রাজ্যসহ মুর্শিদাবাদ জেলাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্ষা মানেই নদীতে স্রোতধারার গতি বেড়ে যায়। ভাঙন চলতে থাকে। ২০০০ সালের ১৭ জুলাই ভগবানগোলার নশিপুর খড়িবোনার ঘটনা‌। গঙ্গা-পদ্মা ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে নিরন্তর জেলা প্রশাসনের সাথে সাক্ষাৎ ও ডেপুটেশনে জমা দেওয়া হয়। তাতেও কোন কাজ না হ‌ওয়ায় কমিটির পক্ষ থেকে অবস্থান বিক্ষোভ করা হলে, পুলিশ সেখানে লাঠি চালায়। এখানেই পুলিশ থামে না। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর গুলি পর্যন্ত চালানো হয়। এই ঘটনায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর জখম হন। ঘটনা স্থলেই মারা যান নহিরুদ্দিন সেখ। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মুর্শিদাবাদ জেলা বন্যা ও ভাঙন প্রতিরোধ কমিটির ডাকে বহরমপুর গ্ৰান্টহলে একটি কনভেনশন এর আয়োজন করা হয় এবং সেখানে ১৭ জুলাই ভগবানগোলা নশীপুর খড়িবোনায় পুলিশের গুলিতে নিহত নহিরুদ্দিন সেখকে স্মরণ করে শহীদ ঘোষণা করা হয়।

সামসেরগঞ্জ, ধুলিয়ান, লালগোলা, জলঙ্গীসহ আরও অনেক স্থান এই নদী ভাঙন কবলিত এলাকার মধ্যে পড়ে। প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এই ভাঙন চলছে। কোন ক্ষেত্রে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ভাঙন অল্প বিস্তর চলতে থাকে। নদী ভাঙন সমস্যাকে শুধুমাত্র সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখা বড় ভুল হবে। বন্যা, নদীর ভাঙনের সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো যাবে কোথায় ? তাদের কৃষি জমি, ঘর বাড়ি সব‌ই তো নদী গ্ৰাস করে নিয়েছে। তাদেরকে নতুন জায়গা, আবার নতুন করে ঘর-সংসার তৈরি করতে হবে। ফলত অবশিষ্ট জমির উপর বাড়তি চাপ পরবে। জেলার অর্থনীতির উপর চাপ পড়বে। ভাবতে অবাক লাগে, কলকাতা একদিন জলমগ্ন হলে রাজ্যের প্রথম সারির খবরের চ্যানেলগুলো, বারবার সেই খবর দেখাতে থাকে। কিন্তু ভাঙন কবলিত মানুষের কথা, তাদের দুর্দশার চিত্র কোন খবরেই দেখানো হয় না। কয়েকটি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকে দেখা গেছে ভাঙনের চিত্র তুলে ধরতে, তাও আবার খন্ডচিত্র বলা যায়। আসলে সংবাদ মাধ্যম ভাঙনের খবর দেখায় না, নাকি দেখাতে দেওয়া হয় না। এই বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট নয়। সরকার থেকে ভাঙন কবলিত পরিবারকে অর্থ সাহায্য ও পুনর্বাসন দেওয়ার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তারা আদ‌ও সেই অর্থ পেয়েছে কিনা ? তাদের কিরূপ পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে, তার খবর কিন্তু এখনও প্রকাশিত হয়নি। শুধু প্রতিশ্রুতির খবর প্রকাশিত হতে দেখা গিয়েছে। এখন তো সবকিছুতেই কাটমানির গল্প চলছে। সুতরাং এখানেও যে, সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?


সে যাইহোক, নদী ভাঙন সমস্যা শুধুমাত্র নদী তীরবর্তী মানুষদের সমস্যা নয়, এটাকে জেলার বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা হোক। ভাঙন কবলিত এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে বসবাসকারী মানুষদেরও উচিত ভাঙন কবলিত মানুষজনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য আওয়াজ তোলা। যাতে দ্রুত নদী ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায়।

শুভেন্দু বিশ্বাস ঃ ইতিহাসের শিক্ষক, পলাশী কলেজ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post