• December 4, 2021

প্রতিবাদ করলেই কিন্তু “রাষ্ট্রদ্রোহী”

 প্রতিবাদ করলেই কিন্তু “রাষ্ট্রদ্রোহী”

সায়নী চক্রবর্তী

“It is now incumbent that all those jailed in the Bhima Koregaon case and other detenues under politically motivated cases, misusing draconian laws like UAPA , Sedition etc, be released forthwith. উপরোক্ত লাইনটি একটি চিঠির যা রাষ্ট্রপতিকে পাঠানো হয় জুলাই মাসে, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর পর। আমাদের রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এর সই জ্বলজ্বল করছে এই চিঠির নীচে। সেই মুখ্যমন্ত্রীর তৃণমূল সরকারই গত ১২ ই সেপ্টেম্বর রাত এগারোটার সময় বেআইনি অপহরণের মতোন করে গ্রেফতার করে দীর্ঘ দিনের গণআন্দোলন কর্মী টিপু সুলতানকে। পাঁচ বছর আগে ঘটে যাওয়া একখানি মিথ্যা সাজানো মামলায় ইউ এ পি এ, আর্মস অ্যাক্টের মতোন ধারায় নিযুক্ত করা হয় তাকে। যে মামলার মূল অভিযুক্ত, রাজারাম মুর্মু, শাসকের সহায়তায় এখন সমাজের “মূলস্রোতের” অন্তর্ভুক্ত এবং হোমগার্ডের চাকরি করছে। আদালতে টিপু সুলতানের আইনজীবি তার জামিনের আবেদন জানালে তা খারিজ করে পাঁচ বছরের পুরনো মামলার তদন্তের স্বার্থে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজত দাবি করা হয়। বিচারক তাকে সাত দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
২০১৬ র যে দিনের মামলার ভিত্তিতে অর্থাৎ ২৯শে জানুয়ারি, ২০১৬, টিপু সুলতানকে ১৮/২০/২৩ ইউ এ পি এ, ২৫/২৭ আর্মস অ্যাক্ট, ৩/৪ ই.এস (এক্সপ্লোসিভ সাবস্ট্যান্স) অ্যাক্ট দেওয়া হয়েছে সেই দিন তার পরিবার ও বন্ধুদের বক্তব্য অনুযায়ী সে কলকাতা বইমেলায় ছিল।
এখন দেখা যাচ্ছে, যে পুলিশবাহিনী একজন তিন বছরের শিশুর ধর্ষণ ও খুনের বিষয়ে নীরব, দীর্ঘদিন স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় কোনও নাবালিকার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলে বোবা, সেই পুলিশ পাঁচ বছরের পুরনো একটি বিষয়ে এতটাই তৎপর যে টিপু সুলতানকে অ্যারেস্ট মেমো ছাড়াই মাঝরাতে আটক করা হয়েছে ইউ এ পি এ এর মতোন ঘৃণ্য আইনের সুবিধার্থে।
এবার এই ইউ এ পি এ এর উপরে একটু নজর দেওয়া যাক। Section 13 of The Unlawful Activities (Prevention) Act, 1967 (b) {বেআইনী ক্রিয়াকলাপ (প্রতিরোধ) আইন, ১৯৬৭-এর ১৩ নং অনুচ্ছেদ (খ)} অনুসারে কোনও ব্যক্তি রাষ্ট্রের আইনবিরূদ্ধ কোনও কাজে সরাসরি যুক্ত থাকলে, অংশগ্রহণ করলে, সমর্থন করলে, উষ্কানিমূলক আচরণ প্রদর্শণ করলে, পরামর্শ দান করলে রাষ্ট্র তার বিরূদ্ধে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড এবং জরিমানা আরোপ করতে সক্ষম। সংবিধানের ১৬তম সংস্করণে ১৯৬৩ সালে জাতীয় সংহতি পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত জাতীয় সংহতকরণ ও আঞ্চলিকতা বিষয়ক কমিটি, ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার উপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য এই আইন প্রণয়ন করে। যে বিষয়গুলির যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপিত হয় তা হল –

বাকস্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা;
শান্তভাবে এবং অস্ত্র ছাড়াই জমায়েত করার অধিকার; এবং
রাইট টু ফর্ম অ্যাসোসিয়েশন বা ইউনিয়ন।

এই বিলের উদ্দেশ্য হ’ল ভারতের অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত ক্রিয়াকলাপ মোকাবেলার জন্য ক্ষমতা রক্ষা করা। বিলটি সংসদের উভয় সভায় পাস হয়, এবং ১৯৬৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর, রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। সংশোধনী আইনগুলি হল নিম্নরূপ –

বেআইনী ক্রিয়াকলাপ (প্রতিরোধ) সংশোধন আইন, ১৯৬৭
ফৌজদারি আইন (সংশোধন) আইন, ১৯৭২
ডেলিগেটেড আইন বিধান (সংশোধন) আইন, ১৯৮৬
বেআইনী ক্রিয়াকলাপ (প্রতিরোধ) সংশোধন আইন, ২০০৪
বেআইনী ক্রিয়াকলাপ (প্রতিরোধ) সংশোধন আইন, ২০০৮
বেআইনী ক্রিয়াকলাপ (প্রতিরোধ) সংশোধন আইন, ২০১২
বেআইনী ক্রিয়াকলাপ (প্রতিরোধ) সংশোধনী আইন, ২০১৯
অর্থাৎ যে কোন ব্যক্তির ক্রিয়াকলাপ রাস্ট্রের অপছন্দ হলে তাকে নিঃসঙ্কোচে দিনের পর দিন জেল বন্দি করে রাখা যাবে। দেশে স্বাধীনতা দিবস রমরমিয়ে পালন হলে ইংরেজ আমলের রাউলাট আইনের সাথে এর খুব ফারাক পাওয়া যায় কি? এদেশে কুচকাওয়াজের দামামা বাজিয়ে প্রজাতন্ত্র দিবস পালন হয় কিন্তু মাঝরাতে অন্যায়ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে প্রায় ৯ ঘন্টা বেআইনিভাবে আটক রাখা যায়।
সমস্ত ছাত্র সংগঠন ও মানবাধিকার রক্ষা কমিটি ইতিমধ্যে এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে। গত ১৭ তারিখ কোলকাতায় ও ১৮ তারিখ শান্তিনিকেতনে এই ঘটনার তীব্রা নিন্দায় প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছে। এখনই সময় পক্ষ বাছার, আমাদের আবিলম্বে টিপু সুলতান তথা সমস্ত রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এবং ইউ পি এ এর মতোন বর্বর আইন বিলোপের দাবিতে একজোট হতে হবে।

সায়নী চক্রবর্তী : বর্তমানে বিশ্বভারতীতে পাঠরত ছাত্রী ও স্টুডেন্টস ইউনিটি ফর নিউ সোসাইটি নামক ছাত্রসংগঠনের সদস্য।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *