• December 9, 2021

ঠুড়গা প্রকল্প : উন্নয়ন অথবা সর্বনাশ

 ঠুড়গা প্রকল্প : উন্নয়ন অথবা সর্বনাশ

নাতাশা খান

“আদিবাসীরা গাছের একটা ডালে হাত দিলে বনবিভাগের অফিসাররা তেড়ে আসে অথচ বাইরের কোম্পানি এসে চোখের সামনে পুরো জঙ্গল কেটে সাফ করে ফেলছে – তা নিয়ে কারুর মুখে কোনো কথা নেই” খুব সাবলীলভাবে কথাগুলো বলে গেলেন পুরুলিয়ার অযোধ্যায় পরিকল্পিত ঠুড়গা পাম্প স্টোরেজ প্রকল্পের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের নেতা নকুল বাস্কে।ভারতীয় অরণ্য আইন (১৯২৭) ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (১৯৭২/২০০২/২০০৬) এবং অংশত অরণ্য সংরক্ষণ আইন (১৯৮০) অনুযায়ী ঐতিহাসিকভাবে অরণ্যের সর্বময় কর্তৃত্ব ছিল বনদপ্তরের হাতে। উক্ত আইনগুলিতে আদিবাসী বা বনবাসী মানুষের অরণ্য নির্ভর অস্তিত্বের কথা কোথাও ছিল না। অরণ্যের জমি মানেই ‘সরকারি জমি’। এই ধারণার সুযোগ নিয়ে ভারতবর্ষের অরণ্যের জমিতে হওয়া আরও অনেক বড় বড় প্রকল্পের মত পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়াতে শুধুমাত্র অযোধ্যা পাহাড়ের বুকেই চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কেন্দ্র, রাজ্য এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানি জাপানের ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) যৌথ পরিকল্পনায় প্রকল্পগুলি গড়ে তোলার কথা হয় বামনী, ঠুড়গা, বান্দু, কাঁঠালজল- এই চারটি নদীর উপর। পরিকল্পনামাফিক ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রোজেক্ট (পিপিএসপি) -এর কাজ শুরু হয় বামনী নদীর উপরে। নির্মানের কাজ চলে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। এই পর্যায়েই ২০০৬ সালে পাশ হয়ে গেছে ‘বন অধিকার আইন’ যা আদিবাসী ও বনবাসীদের অরণ্যে কৃষি ও বাসভূমির ব্যক্তিগত অধিকার, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ও বনভূমির উপর সামুদায়িক অধিকার, অরণ্যের পরিচালনা ও ব্যবহারের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবুও বনবাসীদের অজ্ঞতা আর অরণ্যের বিষয়ে শহুরে মধ্যশ্রেণির সহজাত উপেক্ষাকে সম্বল করে, অযোধ্যাবাসীর সাথে কোনো আলোচনা না করে, শুধুমাত্র চাকরি দেওয়া ও প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই এই প্রকল্পের নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

সাধারণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নদীতে বাঁধ দিয়ে জল ধরে রাখা হয় এবং জলধারার স্রোতের মুখে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুত উৎপন্ন করা হয়। কিন্তু ছোটনাগপুর মালভূমির অন্তর্গত অযোধ্যার পাহাড়ি এলাকায় নদী-নালাগুলিতে জলের পরিমাণ বেশি থাকে না। এক্ষেত্রে নদীর উপর কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ভিন্ন উচ্চতায় দুটি জলাধার তৈরি করা হয়। উচ্চ জলাধারে সঞ্চিত জল নিম্ন জলাধারে ছাড়া হলে টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুত উৎপন্ন হয়। কিন্তু নদীতে জলের পরিমান কম থাকায় পরবর্তী বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উচ্চ জলাধারে দ্রুত প্রয়োজনীয় জল মজুত হয় না। তখন নিম্ন জলাধারের জল পাম্প করে উচ্চ জলাধারে পাঠানো হয়। টারবাইন ঘুরিয়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়, পাম্প করে জল উচ্চ জলাধারে পাঠাতে তার চেয়ে কুড়ি শতাংশ বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন পড়ে। অর্থাৎ পাম্প স্টোরেজ প্রকল্প থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় তার চেয়ে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রকল্পকে পরিচালিত করতে প্রয়োজন। এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয় গ্রিড থেকে। ব্যয়বহুল এই প্রকল্পটি একটি পাওয়ার ব্যাক আপ প্ল্যান হিসেবে কাজ করে যা শহরে অথবা বৃহৎ কলকারখানায় বিদ্যুতের তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণ করে। নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়।

পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্পের ফলশ্রুতি স্বরূপ অযোধ্যা পাহাড়ের ছটি টিলার বারোশো একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে, কাটা পড়েছে সাড়ে তিন লক্ষ গাছ। দুটি জলাধারে আবদ্ধ হয়ে হারিয়ে গেছে বামনী নদী। যার ফলশ্রুতিতে অপ্রতুল হয়েছে চাষের জল, কমেছে জলস্তর। জলাধার দুটির মধ্যে জল প্রবাহের জন্য পাহাড় ভেদ করে একাধিক সুড়ঙ্গ খনন করা হয়েছে। ফলত পাহাড়ে ভূমিক্ষয় ও ধস নামার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই সুড়ঙ্গপথের জন্য উপযুক্ত পথ অনুসন্ধানের অজুহাতে পাহাড়ের গর্ভস্থল থেকে লুঠ হচ্ছে খনিজ আকরিক। জঙ্গলের হাতি খাবার না পেয়ে প্রায়শই হানা দিচ্ছে গ্রামে, চাষের ক্ষেতে। সংখ্যা কমছে খরগোশ, ভাল্লুক, ময়ূর, হরিণ, বন বিড়াল, শূকর, সাপ ও অন্যান্য পশুপাখির। অরণ্য ধ্বংস হওয়ায় বনবাসীরা হারিয়েছেন পশুচারণভূমি, রোজকার জ্বালানির উপকরণ, ঘর তৈরীর সরঞ্জাম, বিক্রির জন্য কেন্দু পাতা কিংবা বনৌষধি ভেষজ গাছ। পুরো প্রোজেক্টে মাত্র চারজন স্থানীয় আদিবাসী যুবক সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পেয়েছেন, তবে তা বেসরকারি সংস্থার অন্তর্গত এবং অস্থায়ী চাকরি। এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দৈনিক গড়ে ৮৫০-৮৬০ মেগাওয়াট হারে ব্যবহারের জন্য চলে যাচ্ছে রাঁচি, আরামবাগ বা কলকাতায়। প্রকল্প তৈরি হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অযোধ্যায় স্বাস্থ্য বা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির বদলে তৈরি হয়েছে বড় বড় রাস্তা।

২০১৫ সালে পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্প থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে ঠুড়গা নদীর উপর দ্বিতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। ৪২০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের জন্য পরামর্শদাতা সংস্থা হিসেবে নিযুক্ত হয় কেন্দ্রীয় জলসম্পদ মন্ত্রকের অধীনস্থ ওয়াপকস, জাপানি সংস্থা জে পাওয়ার, কেন্দ্রীয় সংস্থা সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি, সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন। অথচ মতামত নেওয়া হয় না অযোধ্যার আদিবাসী বনবাসীদের, যাঁদের অনুমতি ছাড়া কোন প্রকল্পই গড়ে উঠতে পারে না। ‘বন অধিকার আইন’ অনুযায়ী গ্রামের ব্যবহার্য জঙ্গল গ্রামসভার সাধারণ সম্পত্তি বা কমিউনিটি ফরেস্ট রিসোর্স৷ গ্রামের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসে যে গ্রামসভা তৈরি করবেন, তা এই জঙ্গল দেখাশোনা করবে। বনভূমিতে এ ধরনের কোনও প্রকল্প করতে গেলে গ্রামসভা ডেকে প্রকল্পের বিবরণ স্পষ্ট করে জানিয়ে ন্যূনতম পঞ্চাশ শতাংশ গ্রামবাসীর সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ হতে হবে মহিলা। এক্ষেত্রে তাঁর কিছুই করা হয় নি। ক্ষতিগ্রস্থ বনবাসীরা ২০১৮ সালে কলকাতার হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চে এই প্রকল্পের বিরোধিতায় মামলা করলে সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে ১৭টি গ্রামসভার মধ্যে মাত্র অযোধ্যা ও বাগমুন্ডি- এই দুই গ্রাম পঞ্চায়েতের গ্রামসভার নথি দেখানো হয়। এর মধ্যে একটিতে সই ছিল মাত্র ২৪ জনের আর অন্যটিতে একটিও নয়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী শুধুমাত্র অযোধ্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ১৬০০ এর বেশী। ২০১৯ সালে জুলাই মাসে কলকাতা হাইকোর্ট আন্দোলনকারীদের পক্ষে রায় দেয়। প্রকল্পের কাজে স্থগিতাদেশ বজায় থাকে। এই রায়ের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করে রাজ্য সরকার। গত সেপ্টেম্বর মাসে তার শুনানি শেষ হয়েছে। আদালতের রায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছেন অযোধ্যাবাসী।

এই রাজ্যে ‘বন অধিকার আইন’ সম্পূর্ণরূপে লাগু হয়নি কোথাও। এই আইন পাশ হওয়ার ষোলো বছর পরও সরকার বনবাসীদের আইনের ন্যূনতম অধিকারগুলো জানাবার কোনো প্রচেষ্টাই করে নি। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সেই অসম্পূর্ণ কাজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। প্রত্যেক গ্রামে গিয়ে নিজেরাই গ্রামসভা ডেকে গঠন করছেন ‘বন অধিকার সমিতি’। কাজটা সহজ নয়। কারণ ব্রিটিশ আমল থেকে অরণ্য রক্ষণাবেক্ষণের একমাত্র অধিকারী বনদপ্তর। গ্রামসভার মাধ্যমে ‘বন অধিকার সমিতি’ গঠনের মাধ্যমে এই আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার গোড়ায় সরাসরি আঘাত করা হচ্ছে। গ্রামসভাগুলির ক্ষমতায়ন হলে যেকোনো প্রকল্পের জন্য সহজে বনভূমির হস্তান্তর কঠিন হয়ে পড়ে। অরণ্যের রক্ষক বনবাসীর সাথে শিল্পগোষ্ঠীর অঙ্গুলিহেলনে কাজ করতে অভ্যস্ত ক্ষমতার সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। সেই কারণেই গত ২৭ ও ২৮শে সেপ্টেম্বর অযোধ্যা পাহাড়ে ‘প্রকৃতি বাঁচাও আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ’ এর উদ্যোগে ‘জনচেতনা র‍্যালি’র সাতজন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ডিস্যাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্টে মামলা দায়ের করা হয়। গত ৮ই অক্টোবর সারা রাজ্যের বনাঞ্চলে ‘বন অধিকার আইন’ চালু করা এবং প্রতিটি গ্রামে গ্রামসভা গঠনের দাবিতে ‘ভারত জাকাত মাঝি পারগণা মহল’, ‘পুরুলিয়া জুয়ান মহল’ ও ‘প্রকৃতি বাঁচাও আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ’ এর তরফ থেকে পুরুলিয়ায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থানের ডাক দেওয়া হয়েছিল। এই কর্মসূচি আটকানোর জন্য সমগ্র জেলা জুড়ে পুলিশ ব্যারিকেড করে আন্দোলনকারীদের বাস-গাড়ি আটকে দেয়। ‘অযোধিয়া বুরু বাঁচাও আন্দোলন’ সংহতি মঞ্চের কর্মীদের হুড়া থানায় প্রায় ছ’ঘণ্টা আটক করে রাখা হয়। এছাড়া আন্দোলনকারীদের ডেপুটেশনে আসার জন্য প্রয়োজনীয় বাস না দেওয়ার জন্য বাস মালিকদের উপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে, হুমকি দিয়ে, নানা ছল চাতুরি করে মিছিলের অংশগ্রহণকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়।

বহু বাধা সত্ত্বেও মূল কর্মসূচীতে যোগ দিতে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়সহ, মানবাজার, বান্দোয়ান, নেতুড়িয়া, সাঁতুড়ি ইত্যাদি অঞ্চল থেকে এবং বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ৪০০০ আদিবাসী মানুষ ধামসা, মাদল, তীর-ধনুক নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন। অরণ্যবাসির এই আন্দোলন আর শুধুমাত্র ঠুড়গা প্রকল্প বাতিলের আন্দোলনে আবদ্ধ হয়ে নেই। রাজ্যের বনাঞ্চলে ‘বন অধিকার আইন’ লাগু করা, গ্রামসভা গঠনের দাবির পাশাপাশি বনভূমি ধ্বংস করে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কেন্দ্র গঠনের বিরোধিতা, অযোধ্যায় প্লাস্টিক, থার্মোকল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা সহ আদিবাসীদের ধর্মীয়স্থান সুতানটানডি, মারাংবুরুর সংরক্ষণের কথাও উঠে এসেছে তাঁদের দাবি সনদে। পুরুলিয়া প্রশাসন এই সমাবেশের দাবি সনদের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বন অধিকার আইন’ প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাদের ঔদাসীন্যের কথা স্বীকার করে নেন। আগামী ১০ই নভেম্বর আদিবাসী দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে ‘বন অধিকার আইন’ লাগু করার প্রক্রিয়া নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। যদিও এই রকম বহু মিথ্যে আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতিতে অভ্যস্ত আন্দোলনকারীরা প্রয়োজনে দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।

তবে এই লড়াই শুধুমাত্র আদিবাসী ও বনবাসীদের নয়। গত ছয়-সাত বছরের ইতিহাস দেখাচ্ছে, দেশের আইন পরিবেশ বাঁচাতে যে সব রক্ষাকবচ তৈরি করেছিল, সেগুলো ক্রমশ আলগা, দুর্বল হচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯, এই পাঁচ বছরে পরিবেশের উপর শিল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য গঠিত এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট রুলস, সংক্ষেপে ইআইএ, একের পর এক সংশোধন করেছে কেন্দ্র। সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) সারা দেশে ৫৬টি জায়গা এই ধরনের জলাধার ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ-সহ পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতেই কম পক্ষে ন’হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে সিইএ তাদের রিপোর্টে কেন্দ্রকে জানিয়েছে। অর্থাৎ অনুমান করা যায় আরও অন্তত পাঁচটি প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আবার স্বল্প পরিসরে কয়েক কিলোমিটার ব্যবধানে পরিকল্পিত প্রকল্পগুলিকে একসাথে দেখলে পরিবেশের উপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়। ফলে পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড়পত্র আদায়ের জন্য সরকার পুরুলিয়ার অযোধ্যার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখানোর চেষ্টা করে আসছে। ঠুড়গা প্রকল্পের পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বান্দু এবং কাঁঠালজল প্রকল্পের জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের দুটি পর্যায়ের ছাড়পত্র পেয়ে গেছে। ঠুড়গা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আটকানো যাবে না বান্দু এবং কাঁঠালজল প্রকল্প। এই চারটি প্রকল্পের জন্য অযোধ্যা পাহাড়ে প্রায় ২০০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন যার মধ্যে ১০০০ হেক্টরই বনভূমি। বামনী নদী এবং ঠুড়গা নদী একসাথে গিয়ে পড়েছে শোভা নদীতে, যা পরবর্তীতে মিলিত হয়েছে সুবর্ণরেখার সাথে। ফলে বামনী আর ঠুড়গা নদী হারিয়ে গেলে কমবে সুবর্ণরেখায় জলের পরিমাণ। অযোধ্যা পাহাড়ের সন্নিহিত এলাকায় মেঘ ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি নামায়। প্রকল্পগুলির ফলে কমবে বৃষ্টির পরিমাণ, নামবে জলস্তর। বামনী প্রকল্পে কাটা পড়েছে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ গাছ, যার মধ্যে একটি গাছও অনত্র লাগানো হয় নি। ঠুড়গা প্রকল্পে কাটা পড়বে আরও অন্তত আড়াই লক্ষ গাছ। বাতাস, জল, মাটি এবং জীববৈচিত্র্য – বাস্তুতন্ত্রের এই চারটি উপাদানের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেই আঘাত লাগে প্রকৃতির ভারসাম্যে। নাগরিক সমাজের পরিবেশের প্রতি ঔদাসীন্য অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষে ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তাপ বাড়বে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা । আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও জানিয়ে দিচ্ছে আয়লা, বুলবুল, আমফান বা ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবন-জীবিকায়। অল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টির জন্য বন্যা, তার পর দীর্ঘ সময় ধরে অনাবৃষ্টির ফলে খরা হচ্ছে। শহরের মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য আজ যে প্রকল্প তৈরি হচ্ছে আগামীতে তার সর্বোপরি ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিস্তার নেই কারোর।

তবে জেলাশাসকের দপ্তরের সামনে উপচে পড়া জনসমাবেশ ভরসা জোগায় যে অরণ্য রক্ষা করার দায়ভার তুলে নিয়েছেন এই অরণ্যের অধিবাসীরাই। অরণ্যে স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি তাঁদের কাছে আত্মমর্যাদার, স্বাভিমানের৷ আর বিশ্বজোড়া পরিবেশ ধ্বংসের শতাব্দীতে ঠুড়গা প্রকল্পের বিরুদ্ধে লড়াই আমার আপনার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আন্দোলনকে এই সামগ্রিক মাপকাঠিতে দেখতে হবে।

নাতাশা খান : গণ আন্দোলনের কর্মী ও ‘ অধিকার ‘ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • অতি মূল্যবান লেখা। সকলের কাছে পৌঁছানো দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *