• December 9, 2021

নীরবে অরণ্যভূমি ত্যাগ করেছিল মাইথনের আদিবাসীরা

 নীরবে অরণ্যভূমি ত্যাগ করেছিল মাইথনের আদিবাসীরা

দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়

আসানসোল মহকুমার একশো বছরের ইতিহাসে এমন কোন প্রামাণ্য নথি নেই যেখানে দামোদর নদে বন্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু অতীতে এই নদের বন্যার ফলে বারে বারে বিপর্যস্ত হয়েছে পূর্ব বর্ধমান সহ দক্ষিণবঙ্গের আরও কয়েকটি জেলার বিভিন্ন জনপদ। ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে দামোদরের বিধ্বংসী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ জনগণের মধ্যে সরকার বিরোধী তীব্র জনরোষের সৃষ্টি হয়েছিল। ওই বন্যায় ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে ও গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোডের পরিবহণ ব্যবস্থায় ব্যঘাত ঘটে। বন্যা পরিস্থিতির সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চলার কারণে সরকারকে যুদ্ধ সরবরাহ কার্যে ভীষণ ভাবে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। যার ফলে তদান্তীন ব্রিটিশ সরকার দামোদর নদে বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ‘দামোদর বন্যা তদন্ত কমিটি’ নামে একটি পর্ষদ গঠন করে। ওই পর্ষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা উদয় চাঁদ মহতাব এবং বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ওই সময়ে দামোদর উপত্যকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সদস্য ভীমরাও আম্বেদকর-এর ভূমিকা ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। অবশেষে দামোদর উপত্যকায় বন্যা প্রতিরোধ সহ আরও বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য গঠিত হয় ‘দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন’ (ডিভিসি) যার ১৯৪৮ সালের ১৭ জুলাই আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে।

বরাকর নদের উপর মাইথন বাঁধ নির্মাণ স্বাধীনোত্তর ভারতে প্রথম বহুমুখী নদী পরিকল্পনাগুলির মধ্যে অন্যতম এবং এটি ছিল ডিভিসি’র তৃতীয় নির্মাণ প্রকল্পের কাজ। মাইথন বাঁধ বরাকর নদের উপর স্থাপন করা হলেও প্রকল্পটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য বরাকরের সঙ্গে সংযুক্ত দামোদরের বন্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা। ১৯৫২ সালের শীতকালীন সময় ডিসেম্বর মাসে মাইথন বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় । বাঁধ নির্মাণের ফলে বরাকর নদটি প্রসারিত হয়ে বিস্তীর্ণ জলাধারের আকার ধারণ করে। ফলস্বরূপ বাংলা ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের বিস্তীর্ণ স্থানের পাহাড় ঘেরা অরণ্যভূমি সহ বহু চাষযোগ্য জমি ওই জলাধারে তলিয়ে যায়। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের সমীক্ষা অনুযায়ী ৬৫ বর্গ কিলোমিটার বিস্তীর্ণ জলাধারটিতে তলিয়ে যাওয়া চাষযোগ্য জমির মধ্যে সালানপুর ব্লকের ঘাটকুল, গামারকুরি, সরকুরি এই তিনটি মৌজার জমি পরিমাণ হল ৬৯৯.০৮ হেক্টর। জীবিকা নির্বাহের জন্য ওই জমির উপর নির্ভরশীল হওয়া মানুষদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরাই বাঁধ নির্মাণের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল সব চাইতে বেশি।

মাইথন বাঁধ নির্মাণের সময় থেকেই শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন সিধাবাড়ি গ্রামের একজন ব্যক্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৮৫ বছর বয়সী ডিভিসি’র ওই প্রাক্তন কর্মচারী জানালেন, সেই সময় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের বাঁধ নির্মাতারা অতি সহজেই মাইথনের অরণ্যভূমি থেকে উচ্ছেদ করে। হতদরিদ্র ও নিরক্ষর আদিবাসীরা সেদিন তাদের নিজস্ব মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবেই ছিল অজ্ঞ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালে নিকটবর্তী চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা নির্মাণের সময় আদিবাসী উচ্ছেদ অভিযান প্রতিরোধ করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান বেশ কিছু সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ । রক্তাক্ত ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কায় মাইথনের অধিকাংশ আদিবাসী সেই সময় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নীরব থাকে। অতি স্বল্প সংখ্যক আদিবাসীদের মধ্যে আন্দোলন দানা বাঁধলেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাহায্যে তা অনায়াসেই দমন করা সম্ভপর হয়।

১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি মাইথন বাঁধের আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ডিভিসি’র এই প্রকল্পটি নির্মাণের ফলে সম্ভপর হয়েছে দামোদর নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিকার্যের জন্য সেচ ব্যবস্থা সহ একাধিক উন্নয়মূলক কাজ। ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পাহাড় ঘেরা স্থান মাইথন বাঁধ অনেকদিন আগেই ভারতের পর্যটন মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। নৌকা ও স্পীড বোটে চড়ে পাহাড় ঘেরা মাইথন জলাধারে ভ্রমণ পর্যটকদের কাছে অন্যতম মূল আকর্ষণ। ১৯৬৬ সালে অগ্রগামী পরিচালিত ‘শঙ্খবেলা’ বাংলা চলচ্চিত্রে সাদাকালো পর্দায় পাহাড় ঘেরা মাইথন জলাধারের দৃশ্য লক্ষ করা যায় । দৃশ্যপটে উত্তম-মাধবীর অভিনয়ের প্লেব্যাকে মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকরের দ্বৈত কন্ঠে বিখ্যাত গান ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ বাঙালির কাছে চিরস্মরণীয় ।

পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা মাইথনে আদিবাসী উচ্ছেদের ঘটনা কোথাও লিখিত আকারে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বাঁধ নির্মাণের সময় আদিবাসীরা সেখান থেকে অন্যত্র কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছিল তা আজও অজ্ঞাত হয়ে আছে । এ বিষয়ে তথ্যানুন্ধানের জন্য সালানপুর ব্লকের অন্তর্ভূক্ত মাইথন জলাধার সংলগ্ন সিধাবাড়ি গ্রামে গিয়ে কিছু কথা জানা গেল। সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দা জানালেন, বাঁধ নির্মাণের সময় সিধাবাড়ি গ্রামের বরাকর নদের তীরবর্তী স্থানে অনেক আদিবাসী পরিবারের বাসগৃহ ও চাষের জমি মাইথন জলাধারে তলিয়ে যায়। যে কারণে সেই সময় তারা বাধ্য হয়ে সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে বারাবনি ব্লকে খড়াবর নামক একটি গ্রামের নিকট বসতি স্থাপন করে। জানা যায়, পুরাতন বাসস্থানের কথা স্মরণে রেখে আদিবাসীরা ওই স্থানের নামকরণ করেছেন ‘নতুন সিধাবাড়ি’ ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post