• December 9, 2021

নব্যহিন্দুত্ব ও ভারতীয় মিডিয়া: একটি আন্তর্জালিক আঁতাত,পর্ব-১

 নব্যহিন্দুত্ব ও ভারতীয় মিডিয়া: একটি আন্তর্জালিক আঁতাত,পর্ব-১

অত্রি ভট্টাচার্য

নেটওয়ার্ক-সোসাইটির সমাজতত্ত্ব বিষয়ক অন্যতম তাত্ত্বিক ম্যানুয়েল কাসলের মতে, ইন্টারনেটের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটি শুধুমাত্র প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতেই প্রভাব বিস্তার করছে এমন নয়, গরিব তৃতীয় বিশ্বেও এই প্রয়োগ ফুলেফেঁপে উঠছে। ভারতবর্ষে ইন্টারনেটের আগমন মিডিয়াক্ষেত্রে এক নতুন ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’-র জন্ম দিয়েছিল। যা ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি অর্থনৈতিক উদারীকরণের সাথে সাথে ভেঙে দিয়েছিল রাষ্ট্র-পরিচালিত দূরদর্শন ও অল ইন্ডিয়া রেডিওর একচেটিয়া মৌরসীপাট্টা। এখন ভারতবর্ষের ইন্টারনেট উপভোক্তা প্রায় চারশো মিলিয়নেরও বেশি। ঐতিহাসিকভাবে আমরা যদি দেখি তবে দেখবো নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের ইউরোপের কাঁধে চেপে বসা সম্ভব হয়েছিল মাস-মিডিয়ার লাগাতার প্রসারের কল্যাণেই। কমিউনিস্টরা যেখানে শিল্পমাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনীতির কথা বলছিলেন, সেখানে ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের রাজনীতিকেই পরিণত করছিল ‘পারফর্মিং আর্ট’-এ। এবং তার জন্য তারা যেকোনো স্তরের বৃহত্তর স্পেকটাকল তৈরী করতে সক্ষম ছিল। যেমন তৈরী হয়েছিল একটি নাৎসি-প্রোপাগান্ডা ফিল্ম, দি ট্রায়াম্ফ অফ দি উইল (১৯৩৫) যা একজন শক্তিশালী নেতা হিসাবে হিটলারের-মিথটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। এখন ফিরে আসা যাক আজকের ভারতে, যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহুর্তে ছড়িয়ে যায় নেহেরু-গান্ধী মিম, রাস্তায় জুকবক্সে বাজে গ্যাংনাম স্টাইল এবং টুইটারের চিফ-এক্সিকিউটিভ অফিসারের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধিতার অভিযোগে হ্যাশট্যাগ চলে। এখানে প্রতিটি ট্রেন্ড ‘গ্লোবাল’ কিন্তু ভারতীয়দের স্বকীয় ভঙ্গিতে তা মাইক্রো-স্তরে ‘লোকাল’।

এবং বিভাজনরেখা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। ভারতের স্বনির্বাচিত লিবারালরা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের লোকেরা সাধারণত একটি ‘অপর’ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে পারছেননা। অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে একেবারেই ভিন্নমত-পোষণকারী ‘হার্ডলাইন’ হিন্দুত্ববাদীরা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একনিষ্ঠ অনুগামীরা, এতদিন যারা ক্ষমতার বিচারে ছিলেন সংখ্যালঘু সেই ‘দক্ষিণপন্থী’রা। এই অনলাইন-ক্যাডাররা শাসকগোষ্ঠীর মৌখিক-ভাষ্যতে লুকানো হিংসাকে বাস্তবায়নে সবসময় উদগ্রীব। ২০১৪-লোকসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হিন্দুত্ববাদী-আইটি সেলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে ঘটতে থাকা হিংসা তারই জানান দেয়। যদিও ভারতীয় সমাজের হিংস্রতা-তার সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য। তার মাধ্যমগুলি কখনো বর্ণভেদ-কখনো ধর্মীয় সংঘর্ষ, কখনো বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। সেই হিংস্র আগ্নেয়গিরির স্ফূরণ ঘটে তখনই, যখন গোহত্যা ও শিশু-অপহরণের গুজব ছড়িয়ে যায় হাত থেকে হাতে। প্রতিটি হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে। ফেক-নিউজ ফরোয়ার্ডের গ্রাসে উন্মত্ত-জনতা পিটিয়ে মারার-গণসংস্কৃতি নির্মাণ করে।

হিন্দুত্ববাদীদের এই সাইবার-বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে মোদী-সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করে এবং সরকারী-নীতির সমালোচকদের গণশত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার কাজটিও অত্যন্ত সফলতার সাথে করে। এছাড়াও অনলাইন মিডিয়ার উপযুক্ত ব্যবহার করে ভারতবর্ষের ‘বিকল্প’ ইতিহাস লেখার কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে। এবং সবথেকে উল্লেখযোগ্য যা, তা হল জনগণের আলোচনার ও চিন্তার বিষয়কে কেন্দ্রীভূত করে জনজীবনের নতুন স্বর- যা ঘৃণা ও হিংসার উপর স্থাপিত তাকে প্রতিষ্ঠা করছে হিন্দুত্ববাদীরা। হিন্দু-জাতীয়বাদীদের, যাদের অনেককেই টুইটারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই ফলো করেন, তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হল: ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন। যে হিন্দুরাষ্ট্র-প্রজেক্টটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯৮০’র দশকে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামজন্মভূমির ‘ঐতিহাসিক’ দাবীতে।

অত্রি ভট্টাচার্য : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post