• December 9, 2021

কৃষক আন্দোলন ও আমাদের প্রত্যাশা

 কৃষক আন্দোলন ও আমাদের প্রত্যাশা

তারাশঙ্কর


কৃষি একটি সংস্কৃতি । ১২ হাজার বছর আগের আবিষ্কৃত এই কৃষিসংস্কৃতি মানুষকে আদিম যাযাবর জীবন থেকে থিতু অবস্থায় এনেছে । কিন্তু অন্যদিকে এই থিতু জীবনে শোষণ ব্যবস্থার পত্তন হয়েছে । শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস শুরু এই কৃষিব্যবস্থার উদ্বৃত্ত থেকেই । আজকের আলোচনাটির প্রেক্ষাপট “কৃষি আইন ২০২০” । দিল্লিতে FAO এর উদ্যোগে “8th Internanational Conference on Agricultural Statistics” অনুষ্ঠিত হয় , যেখানে স্বাগত ভাষণ দেন শিল্পপতি বিল গেটস । ১৮ থেকে ২১শে নভেম্বর ২০১৯ এই অধিবেশন চলে । ২০২০-এর মে মাসে ঘোরতর লকডাউনের পর্যায়ে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিলটি লাগু হয় । তিনটি আইনের মাধ্যমে যে সংস্কার আনা হল —–
১) আনাজ বা সব্জির মূল্য নির্ধারণ সুরক্ষা
২) চুক্তি চাষ
৩) নিত্য প্রয়োজনীয় আইন ১৯৫৫ সংশোধন

সেপ্টেম্বর ২০২০ তে বিলটির আইনি রূপ দেওয়া হয় ।
দীর্ঘ এক বছর ধরে চাষীরা আন্দোলন করে চলেছে দিল্লির গাজিপুর, সিঙ্ঘু, টিকরি বর্ডারে অবস্থানের মাধ্যমে। গত ১৯ শে নভেম্বর গুরু নানকের জন্মদিনে দূরদর্শনে ভাষনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী আইন টি প্রত্যাহার করার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই অনুযায়ী ২৭ শে নভেম্বর ক্যাবিনেট কমিটি আলোচনা করে বিল প্রত্যাহারের ড্রাফটিং করার জন্য একটি কমিটি গঠন করবে।
আন্দোলনরত চাষীরা এতে উল্লসিত হলেও আশ্বস্ত নয়। চাষীরা কেবল তিনটি আইন প্রত্যাহার করার জন্যই আন্দোলন করছিলনা। তাদের আরো দাবী ছিল –
১) ভর্তুকি তুলে দেওয়ার জন্য যে বিদ্যুৎ বিলের ড্রাফটিং করা হয়েছিল তা বাতিল করতে হবে ।
২) MSP- এর আইনি গ্যারান্টি দিতে হবে ।
৩) সাতশোর বেশি শহীদ কৃষকের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ।
8) হাজার হাজার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে ।
৫) লখিমপুর-খেরির অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে হবে ।
৬) ফসলের গোঁড়া পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য কঠোর শাস্তির আইন বাতিল করতে হবে ।

এছাড়াও আরো কিছু দাবী আছে। এই সমস্ত দাবীতে ২২শে নভেম্বর লখনৌ শহরে লক্ষ্যাধিক মানুষের মহাপঞ্চায়েত হয়ে গেল। আগামী ২৬ শে নভেম্বর দিল্লিতে অবস্থান আন্দোলনের বর্ষপূর্তি পালিত হবে। ২৯শে মার্চ সংসদ অভিমুখে ট্র্যাক্টর অভিযান হবে।

কী চাইছেন চাষীরা
এম এস স্বামীনাথন বলেছিলেন, কৃষি-সংক্রান্ত সমস্ত খরচের উপর C2+50 ফর্মুলায় সমস্ত ফসলের উপর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিতে হবে। তবেই কৃষি উৎপাদনে লোকসান বন্ধ করা যাবে । সরকার মজুরী ,বীজ ও সেচের উপর কেবল MSP ধার্য করে তাও ৬/৭ টি ফসলের উপর। চাষিরা এই MSP এর আইনি সুরক্ষা চাইছে এবং তা সমস্ত উৎপাদিত ফসলের উপরে । আদৌ সরকার এটা দেবে না। কেননা ২০২০ এর সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে বিলটি আইনি স্বীকৃতি পেল । এর আগে ২০১৫ সালে মোদী সরকার নিযুক্ত শান্তা কুমার কমিটি সুপারিশ করেছিল – সারা দেশে মাত্র ৬ শতাংশ চাষী MSP-র সুবিধা পান , কাজেই তা তুলে দেওয়া হোক। সরকার এফসিআই , নাফেডের মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ফসল কেনে চাষীদের থেকে । সারা দেশে ৭৫০০ এর মতো ধান কেনার মান্ডি আছে । সরকার আরো হাজার খানের ইলেকট্রনিক মান্ডি খুলেছে । এই ইলেকট্রনিক মান্ডি খোলার অর্থই হচ্ছে সারা দেশে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে চাষীরা ধান কেনাবেচা করার সুবিধা পাবে বাজার অনুযায়ী । তার মানে সাপোর্টিং প্রাইস তুলে দিয়ে বাজারের উপর কৃষিকে ছেড়ে দেওয়া । তাই সরকার “ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য” তুলে সরকার ভর্তুকি তুলে দিতে চাইছে । ফলে এমএসপি-র আইনি স্বীকৃতি নৈব নৈব চঃ।
WTO এর নির্দেশ , সমস্ত দেশকে কৃষিতে ভর্তুকি তুলে দিতে হবে । আমেরিকা জাপান জার্মান সব দেশই কৃষিতে ভর্তুকি দেয় । আমেরিকা ৭০০ গুণ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয় । তাই উন্নত দেশগুলো চাইছে তাদের সমস্যাটা গরীব ও উন্নয়নশীল দেশে চালান করে দিতে । পেটভাতায় চাষকে ফিরিয়ে আনতে চায় চাষীরা । উন্নত দেশগুলি তাদের কৃষিবাবদ ভর্তুকিতে ছাঁটাই করে ্দরিদ্র দেশ থেকে উৎপাদিত কৃষি পণ্য আমদানি করবে ।

অত্যাবশ্যক পণ্য আইন যা ছিল( Essential Commodity Act) যার সংস্কার করে মজুতের ঊর্ধসীমা তুলে দেওয়া হল, যার সুবিধা পেল আদানি আম্বানিরা। এই আইনে বলা আছে যা মজুত করা হবে তা দেড় গুণ দামে বেচা যাবে। অর্থাৎ ২০ টাকায় কিনে ৩০ টাকায় বেচা যাবে। পরের বছর ওটার ফেসভ্যালু দাঁড়াবে ৩০ টাকা। তার মানে পরের বছর তা ৪৫ টাকায় অব্দি বেচা যাবে। এই আইন বাতিল করলে পুরোনো ECA আইন কি বলবৎ হবে? বোধ হয় তা হবে না। কেননা, কেবল আদানি-আম্বানি-পেপ্সিকোর ছয় হাজার মজুতঘর ভেঙে ফেলতে হবে এবং চলতি ব্যবসা ভেঙে পড়বে।

১৪ বছর ধরে বিভিন্ন রাজ্যে চালু থাকা চুক্তি চাষ প্রথা কি বাতিল হয়ে যাবে? বোধ হয় না। কারেন্ট আইন বাতিল হলেও পুরোনো আইন দিয়ে কন্ট্রাক্ট-ফার্মিং বহাল রাখা যাবে।

আন্দোলনের শিক্ষা-
বর্ষব্যাপী এই আন্দোলন থেকে ভারতীয় সমাজ অনেকগুলি শিক্ষা লাভ করেছে। হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তর প্রদেশ এবং রাজস্থানের অনেক গ্রামে এই তিনটি ‘কালো কৃষি আইন’-এর বিরুদ্ধে মহাপঞ্চায়েত অনুষ্ঠিত হয়েছে , যাতে এলাকার খাপ পঞ্চায়েতগুলোর ভূমিকা স্পষ্ট। মনে রাখবেন যে এই মহাপঞ্চায়েতে মহিলাদের সংখ্যাও অস্বাভাবিক পরিমানে বেড়েছে ।
এই খাপ পঞ্চায়েতগুলোর পক্ষে কৃষকদের আন্দোলনের সমর্থনে একত্রিত হওয়া এবং সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা খুব ভাল উদ্যোগ।
আমাদের ধরে নেওয়া উচিত যে চিন্তাভাবনা এবং আচরণ সবকিছু পরিবর্তন করতে পারে এবং তাই আশা করি কৃষকদের আন্দোলন এবং তাতে মহিলাদের অংশগ্রহণ এবং এই মহাপঞ্চায়েতের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা এমনকি খাপ পঞ্চায়েতগুলির মধ্যেও মহিলাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে উৎসাহিত করবে৷
এটা জানা যে, খাপ পঞ্চায়েতগুলো সাধারণত নারীবিরোধী মানসিকতায় জর্জরিত। নারীদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ এবং বিশেষ করে প্রেমের বিয়েতে তাদের ভূমিকা খুবই সমস্যাযুক্ত। এমন উদাহরণও দেখা গেছে যে, এ ব্যাপারে খাপ পঞ্চায়েতগুলো,পরিবারগুলোর খাদ্যপানি বন্ধ করে দেওয়া, গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া এমনকি তাদের মেরে ফেলারও ঘটনাও অহরহ ঘটেছে ।
হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তর প্রদেশের এই খাপ পঞ্চায়েতগুলো নিয়ে অনেক লেখা-লেখি হয়েছে।

২০১৩ সালে যে মুজাফরনগর দাঙ্গা বিজেপি কে ক্ষমতায় আসতে রসদ যুগিয়েছিলো। রাকেশ টিকায়েতের ভাই নরেশ টিকায়েত ও মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে মহম্মদ জোলার নেতৃত্বে এই দাঙ্গা সংঘটিত হয়। ফলে উত্তরপ্রদেশের সামাজিক পরিবেশ ধর্মীয় বিভেদের সংস্কৃতে কলুষিত হয়ে পড়ে , এর ফায়দা নিয়ে কেন্দ্রে মোদী সরকার ও রাজ্যে যোগী সরকার ক্ষমতায় আসীন হয় । কৃষক আন্দোলন চলাকালীন উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আবার গভীর ঐক্যের বাতাবরন তৈরি হয়ে যায়।

হরিয়ানা রাজ্যে ২০ শতাংশ দলিত এবং ২৯ শতাংশ জাঠ, চীরকাল বিবদমান সম্প্রদায়।হরিয়ানার কৃষক মহাপঞ্চায়েতগুলি এই দুই শ্রেণী অবস্থানের মানুষদেরকে ঐক্যের পটভূমিতে দাঁড় করিয়েছে। মোদ্দা কথা, কৃষক আন্দোলনের ব্যাপ্তি হরিয়ানা, পাঞ্জা্‌ উত্তর প্রদেশের মানুষদের মধ্যে জাত-পাত লড়াই, ধর্মীয় বিভেদ , নারী-পুরুষের সামাজিক অসন্মানের সংস্কৃতি এর সমস্ত কিছুই আন্দোলনের জোয়ারে ধুয়ে মুছে অনেক খানি সাফ হয়ে গেছে। এই প্রসঙ্গে মার্ক্সের একটি চিন্তা স্মরণযোগ্য উৎপাদিকা শক্তির সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে সমাজ পরিবর্তন হয় ।

শুধু আন্দোলন বা শ্রেণিদ্বন্দ্বই কি সমাজ পরিবর্তন করতে পারে ?
বিশ্বে ১% ভার্সেস ৯৯% লড়াইতে “মেথড অফ প্রোডাকসন” চেঞ্জ হতে বাধ্য । চাষীরা বুঝতে পেরেছে একচেটিয়া ট্রান্স-ন্যাশনাল ক্যাপিটাল উপলব্ধিতে আসছে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে ফসল উৎপাদনই কেবল নয় , শিল্প-উৎপাদন , ডিজিটাল উৎপাদন করাও সম্ভব নয় । শিল্প উৎপাদনের ফলশ্রুতিতে বিশ্ব-উষ্ণায়ন , প্রকৃতিদূষণ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক খানি । একে মেরামত করতে হলে কার্বন দূষণ বন্ধ করতে হবে , প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ করতে হবে , পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে প্রকৃতির সম্পদ প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতে হবে । মানুষের পরবর্তী প্রজন্মের ভোগদখলের জন্যে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে । কৃত্রিম উৎপাদন ব্যবস্থা বদলে দিয়ে প্রকৃতির পক্ষে সহনশীল উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে হবে ।

এর জন্যে যা করতে হবেঃ-
১) IPCC এর সাম্প্রতিক ষষ্ঠ রিপোর্টে বলা আছে , ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান উপায় কৃষিভিত্তিক ভারতবর্ষে মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের পুরোনো সেচ ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে হবে , নদী সংস্কারে জোর দিতে হবে ।
২) হাইব্রিড ব্রীজ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে ।
৩) জৈব চাষ যা সিকিম অন্ধ্রপ্রদেশে চালু হয়েছে তাকে গুরুত্ব দিতে হবে । যাতে রাসায়নিক ব্যবহার থাকবে না ।
৪) শষ্য ওষধি চাষ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করতে হবে ।
৫) অ-কৃষিযোগ্য জমিকে চাষযোগ্য জমিতে রূপায়িত করতে হবে ।
৬) হাইওয়ে রাস্তা ধরে পুকুর খনন করতে হবে ।
৭) বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে হবে ।
৮) ফসল থেকে জৈবজ্বালানি বন্ধ করতে হবে ।
৯) কৃষকদের বিজ্ঞান প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে ।
১০) সর্বোপরি যেহেতু কৃষি একটি জীবন-সংস্কৃতি (Agri-Culture) সেজন্যে পুঁজিবাদী বাজার থেকে একে মুক্ত করতে হবে ।

        কৃষক আন্দোলনের ধারাবাহিক অগ্রগতি আগামি দিনে সমাজ পরিবর্তনের বার্তাকে অর্থবহ ভাবে গড়ে তুলুক এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি । 

তারাশঙ্কর : সমাজকর্মী ও প্রাবন্ধিক।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post