• August 18, 2022

দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্প ও সংগ্রামী জনগণের প্রতিরোধ,পর্ব-১

 দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্প ও সংগ্রামী জনগণের প্রতিরোধ,পর্ব-১

অচিন্ত্য রায়

“…মনে রাখবেন, সিঙ্গুর যেভাবে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, আমরা সেভাবে করবো না…” -এই ছিল গত ৯ নভেম্বর দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্পে রাজ্য সরকারের আর্থিক প্যাকেজ ও মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে ঘোষণার উপসংহার। আর তারপর থেকেই রাজ্য রাজনীতি তে দেউচা-পাচামি বর্তমানে অন্যতম হট টপিক হয়ে উঠেছে। এর আগেও একাধিকবার বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়লা খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে দেউচা-পাচামির মানুষের প্রতিবাদ, প্রতিরোধের ছবি ধরা পড়েছে। তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় এসে তৃণমূল সরকার পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং ভারতের বৃহত্তম কয়লাখনি প্রকল্প নিয়ে একেবারে উঠেপড়ে লেগেছে ঠিকই, কিন্তু দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্প নিয়ে ভারত রাষ্ট্রের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে এর অনেক আগে। দেউচা-পাচামি কয়লা খনি প্রকল্পের ইতিহাস, কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের ছাড়পত্র এবং একের পর এক কয়লা খনিগুলির বেসরকারিকরণ, শ্রমনিবিড় হীন এবং যন্ত্রনির্ভর খোলামুখ কয়লাখনির ভয়াবহতা, EIA- 2020 এবং মানুষ ও পরিবেশের ওপর প্রভাব, এই প্রকল্প কে এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজ্য সরকারের লেজুড়বৃত্তি করা “সমাজসেবী” সংগঠন এর ভূমিকা এবং দেউচা-পাচামি নিয়ে বিভিন্ন দালাল ও সুবিধাবাদী ভোটবাজদলগুলির অবস্থান- এই পুরোটা জুড়েই ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে একাধিক অংশে।

আজ থেকে ১১ বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সাল নাগাদ দেউচা-পাচামি কোল ব্লক বরাদ্দ করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত কোল কোম্পানি কে। কিন্তু ইসিএল বা ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড কয়লা ব্লক থেকে কয়লা না তোলায় ২০১৩ সাল নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ সহ মোট ৬ টি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা কে কোল ব্লক বরাদ্দ করা হয়। ২০১৫ নাগাদ দেউচা-পাঁচামি থেকে কয়লা খনন কার্যের পুরো প্রক্রিয়া টা দেখাশোনা করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি নতুন ভেঞ্চার (বেঙ্গল বীরভূম কোলফিল্ডস লিমিটেড) এর কথা ঘোষণা করেন। সেইসময় পশ্চিমবঙ্গ সহ আরও ৫ টি রাজ্য- বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, এবং কর্ণাটক ও একটি কেন্দ্রীয় সংস্হা যুক্ত ছিল এই উদ্যোগে। অর্থাৎ কথা ছিল, এই ৬ টি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা দেউচা-পাচামি র পুরো প্রজেক্ট টা দেখাশোনা করবে এবং কয়লা উত্তোলনের পর নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে। কিন্তু, সংশোধনবাদী দলগুলির অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সেই বছরই রাজ্য সরকার এই পুরো প্রক্রিয়াটি থেকে সরে এসে তারাই শুধুমাত্র গোটা প্রজেক্টটার দায়িত্বে থাকতে চাওয়ার কথা জানায় কেন্দ্র সরকার কে। এর ঠিক ৩ বছর পরে অর্থাৎ ২০১৮ সালে কেন্দ্র সরকার, মমতা সরকারের প্রস্তাবে রাজি হয়। আর তারপরই শুরু হয়ে যায় কোল রিজার্ভ ব্লক নিয়ে জল্পনা, কল্পনা। দেউচা-পাচামি র মাটির কতটা নীচে কয়লা আছে, কত পরিমাণে কয়লা আছে, তার মধ্যে কত পরিমাণে কয়লা মাটির ওপরে তুলে আনা যাবে, কিভাবে কয়লা উত্তোলন হবে ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন তথ্য উঠে আসতে থাকে। দেউচা-পাচামি তে ভূগর্ভের প্রায় ১৫০-২০০ মিটার নীচে ২১০ কোটি টন এরও বেশী কয়লা মজুত রয়েছে এবং মাটি থেকে কয়লা র মাঝখানের স্তরটাতে আছে বেসল্ট রকস বা কালো পাথর। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভূগর্ভের এতটা নীচে কালো পাথর কে ব্লাস্ট করে কয়লা মাটির ওপরে তুলে আনার মতো প্রযুক্তির জন্য নির্ভর করতে হবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপরে। সুতরাং, বিশ্ব-পুঁজির স্বার্থে বীরভূমের মাটি কে তছনছ করে মানুষের জীবন, জীবিকা কে ধ্বংস করে, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সর্বনাশ করে কয়লা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে তৎপর রাজ্য থেকে কেন্দ্র সরকার উভয়ই। এরপর দেউচা-পাচামি কোল ব্লক উদ্বোধন এর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কে আমন্ত্রণ করতে ২০১৯ এ লোকসভা নির্বাচনের পরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি ছুটে যান। কিন্তু ২০১৯ এর ডিসেম্বরে দেউচা-পাচামির সংগ্রামী আদিবাসী জনগণ এই কয়লাখনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের এই প্রকল্পের উদ্বোধন পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছিলেন সফলতার সাথে।

ক্রমশ…

অচিন্ত্য রায় : ছাত্র ও গৃহশিক্ষক

1 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post