• January 17, 2022

খনি নয়, উচ্ছেদ নয়

 খনি নয়, উচ্ছেদ নয়

প্রদীপ সিংহ ঠাকুর
(১)

দিনটা ছিল ৯ ই নভেম্বর, এবছরের। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ডেউচা-পাঁচামি খোলামুখ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে জানালেন: ‘সিঙ্গুর হবে না ডেউচা’, এর সাথে ঘোষিত হল ১০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ; যা ব্যয়িত হবে গ্রাম থেকে  উচ্ছেদ হওয়া মানুষ এবং ক্রাশার মালিক ও ক্রাশার শ্রমিকদের জন্য। এই প্রকল্পে রাজ্য সরকার যে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে, সে কথাও জানিয়ে দেওয়া হল।

এই ঘোষণার পর সারা ভারত ক্রান্তিকারী কৃষক সভা, আদিবাসী ভারত মহাসভা, সারা ভারত বিপ্লবী মহিলা সংগঠন, সারা ভারত বিপ্লবী যুব সংগঠন এবং জমি-জীবিকা, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটি – এই সংগঠনগুলি পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে প্রস্তাবিত প্রকল্পে যাওয়ার এবং সেখানে গিয়ে সরেজমিনে সমস্ত কিছু দেখা ও জনগণের সাথে মত বিনিময়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আট জনের একটি টীম গঠন করে আমরা গত ২৩ তারিখ প্রকল্প এলাকায় যাই।

আমাদের পর্যবেক্ষণ আমরা পরে রাখছি। তার আগে এই প্রকল্প সংক্রান্ত কতকগুলো তথ্য পাঠকদের জানিয়ে রাখি।

উক্ত প্রকল্পটি বীরভূম জেলার মহম্মদ বাজার ব্লকের ৫টি গ্রাম পঞ্চায়েতের (ভাঁড়কাটা, হিংলো, সেকেড্ডা, পুরাতন গ্রাম ও ডেউচা) ১১টি মৌজায় বিস্তৃত। মৌজাগুলি হল – হাটগাছা, চাঁদা, পাঁচামি, আলিনগর, মুকদম নগর, সালুসা, কাবিলনগর, নিশ্চিন্দিপুর, দেওয়ানগঞ্জ, হরিণশিঙা ও বাহাদুরগঞ্জ। 

এই প্রকল্পটির মোট এলাকা তিন হাজার চারশো একর জমিতে। সরকারি সমীক্ষা বলছে – এই পরিমাণ জমির নিচে প্রথম স্তরে ১৪০ কোটি ঘনমিটার ব্যাসল্ট এবং ১১৯.৮ কোটি টন কয়লা মজুত আছে।

ঘোষিত প্রকল্প এলাকার মধ্যে ১২টি গ্রাম আছে, যার মোট পরিবারসংখ্যা ৪৩১৪ টি এবং মোট লোকসংখ্যা ২১ হাজার, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন আদিবাসী। আদিবাসীদের একটা অংশ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রীষ্টান হয়েছেন, আছেন মুসলমান ও বাউরী সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

এই এলাকার মানুষদের জীবন-জীবিকার একটা বড় অবলম্বন পাথর খাদানের কাজ, দ্বিতীয়তঃ কৃষিকাজ এবং শেষতঃ জঙ্গল নির্ভরতা। রাজ্য সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে আছে ২৮৫ জন ক্রাশার মালিক এবং তিন হাজার শ্রমিকের কথা। এই সংখ্যাই বলে দিচ্ছে এই সব মানুষদের পাথর খাদানের ওপর নির্ভরতার সম্পর্ক।

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় অন্যতম দাবী ছিল – প্রকল্পের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে পূর্ণমাত্রার, ষোলআনা স্বচ্ছতা। এই প্রকল্পের নোডাল এজেন্সি হচ্ছে পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (পিডিসিএল)। এই সংস্থার ওয়েবসাইটে গিয়ে এই প্রকল্প সংক্রান্ত যে সমস্ত তথ্য জানান বিশেষ দরকার, যেমন কয়লা উত্তোলন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, উত্তোলনের সমগ্র কাজ কি পিডিসিএল নিজে করবে নাকি বেসরকারি সংস্থাকে দেবে; দিলে কোন বেসরকারি সংস্থাকে দেবে – এ জাতীয় কোন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে যাকে অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প বলা হচ্ছে, সেই প্রকল্পই বা কোল ইন্ডিয়া নিজের হাতে রাখছে না কেন?

একই ভাবে, যেহেতু এটা খোলামুখ খনির প্রকল্প এবং সেটিও ৩৪০০ একর জুড়ে, যে প্রকল্পের কারণে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাবে, গ্রামগুলো উৎখাত হয়ে যাবে, ওখানকার পুকুর-ডোবা লুপ্ত হয়ে যাবে, বিঘ্নিত হবে প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক, সংকটগ্রস্ত হয়ে পড়বে জীববৈচিত্র – এঅবস্থায় যা একান্ত জরুরী, তা হল প্রকল্পটির সামগ্রিক অভিঘাত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের – পরিবেশ বিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, বাস্তুতন্ত্র বিশারদ, ভূতত্ত্ব, চিকিৎসা বিভাগ – এদের  সকলের সম্মিলিত মতামত গ্রহণ ও তার জনসাধারণের মধ্যে প্রচার। এখনো পর্যন্ত পিডিসিএল-এর ওয়েবসাইটে গিয়ে কোনো উত্তরই পাওয়া যায়নি।

অথচ প্রকৃতি-পরিবেশ, জীববৈচিত্র এবং আদিবাসীদের জীবনের সাথে বনাঞ্চলের আত্মিক সম্পর্কের কারণে এই সমীক্ষার একান্ত প্রয়োজন ছিল।

(২)

আমরা দেওয়ানগঞ্জ গ্রামটিতে দু’ঘণ্টার বেশি সময় নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলেছি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করে রাখি যে, এই গ্রামটিতে প্রায় বারো আনা আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত, তিন আনারও বেশি মুসলমান সম্প্রদায় এবং অল্প সংখ্যক বাউরি সম্প্রদায়ভুক্ত। সবাই খেটে খাওয়া মানুষ।

আমাদের টীমটি নানানভাগে বিভক্ত হয়ে গ্রামবাসীদের মতামত জানা বোঝার চেষ্টা করেছেন। অনেকেই খুব স্পষ্ট করে বলেছেন – খনি চাইনা। আমরা ভিটে ছাড়বো না, জমি ছাড়বো না, গ্রাম ছাড়বো না – এমন জোরালো কথাও শোনা গেছে। আবার কম হলেও শোনা গেছে – প্যাকেজ কি দেখি।

আমরা এটুকু বুঝেছি যে, রাজ্য সরকার যে প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যাকে তৃণমূল দল ও সরকার এবং পুলিশ ও প্রশাসন সমকালীন সময়ে সর্বোৎকৃষ্ট প্যাকেজ হিসাবে দিবারাত্র প্রচার করে চলেছে, তা কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, আক্রান্ত মানুষদের সাথে ভয়মুক্ত পরিবেশে আলোচনার মাধ্যমে স্থির হয়নি। যা বরাবরই হয়ে এসেছে, ওপর থেকে আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শিশের বুলেট আর চিনির বুলেটের মিশ্রণ প্রয়োগ করে এক কৃত্রিম ও বলপূর্বক সহমত গঠনের জোরদার প্রচেষ্টা চলছে।

আমরা যখন দেওয়ানগঞ্জ গ্রামে গ্রামবাসীর মতামত সংগ্রহ করছি, তখন স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজেদের জমির দলিল, পাট্টা ইত্যাদি নিয়ে অঞ্চল অফিসে উপস্থিত হওয়ার আবেদন জানানো হচ্ছিল। এধরনের অতি নিরীহ কাজেও উপস্থিত দুটো গাড়ি ভর্তি  পুলিশ। তৃণমূল দল ও তাদের সরকারের পক্ষ থেকে যতই গলাবাজি করা হোক না কেন, তারাও খুব ভালোভাবে জানে যে, গ্রামবাসীরা নিজেদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়ার বিষয়ে সম্মত হবেন না।

আমাদের প্রচারের সময় অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় ছিল মহিলাদের বিরাট সংখ্যায় উপস্থিতি এবং প্রকল্পের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিরোধের শপথ।

আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা, বিশেষভাবে ভাঙ্গড়ের অভিজ্ঞতা আমাদের বলছে যে, মহিলাদের জোরালো উপস্থিতি ও সোচ্চার প্রতিবাদ ভবিষ্যৎ সংগ্রামের নিশ্চিত ইঙ্গিত।

গ্রামবাসীদের সাথে আমাদের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মাননীয় রবিলাল টুডুর সাথে আলোচনা। ইনি মাঝিবাবা। উনি আমাদের জানালেনঃ আমরা পাঁচ প্রজন্মের মাঝিবাবা। আমরা সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণে উৎখাত হওয়া পরিবার-পরিজনের ধারাবাহিকতা। আমরা কিভাবে আমাদের পবিত্র জাহের থানকে ছেড়ে যেতে পারি বলুন তো? তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানালেন যে, আমরা খনি চাই না। এটি আমার ব্যক্তিগত মত নয়, এটি সমস্ত গ্রামবাসীর সম্মিলিত মতামত। আশা রাখি, সরকার আমাদের মতামতকে সম্মান করবে।

আসলে আজকে প্রকল্প এলাকায় যে প্রতিবাদকে আমরা ধূমায়িত হতে দেখছি, তা এর আগে ২০১৭ সালে যখন জঙ্গল ধ্বংস করে পাথর খাদানের  উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তখনও আদিবাসী জনতার প্রতিবাদে সেই উদ্যোগ স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।

প্রকৃত প্রস্তাবে আদিবাসী জীবন ও বনাঞ্চল  ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। যতই ছ’শ বর্গফুটের ঘরের প্যাকেজ দেওয়া হোক, তা বর্তমান জীবন যাত্রায় অভ্যস্ত আদিবাসীরা মানবেন কিভাবে? মুরগি, হাঁস, ছাগল, গরু-বাছুর; ছোট ছোট ডোবা, পুকুর আর এসবকে ঘিরে বনাঞ্চল, এসবের ধ্বংস করে তার ক্ষতিপূরণ ঘটানো কি সম্ভব?

পুনর্বাসনের নামে ঘরদোর তৈরি করা যায় কিন্তু প্রকৃতির বনাঞ্চলকে ধ্বংস করে ‘বনসৃজনের’ মাধ্যমে তার ক্ষতিপূরণ করা কি সম্ভব কোনভাবে?

যখন প্যাকেজ মারফৎ এক লক্ষ কর্মসংস্থানের ঘোষণা করা হচ্ছে, তখন সরকারের পূর্বঘোষণার পরিণতি বারবার স্মরণে আসছে। এলাকার মানুষেরা প্রশ্ন তুলেছেন – মমতা সরকার কর্মসংস্থান সম্পর্কে যদি এতই আন্তরিক হন, তাহলে এখানকার জীবিকার অন্যতমক্ষেত্র পাথর শিল্পের এমন সংকটগ্রস্ত অবস্থা কেন? পাঁচামীর  সরকারী ক্রাশার বহু বছর ধরে বন্ধ কেন? বীরভূমের জায়গীরদার যতই দম্ভ করে বলুক না কেন উন্নয়ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, এলাকায় গেলে বোঝা যায় অনুন্নয়নের কোন পর্যায়ে যেতে পারে? পানীয় জল, স্বাস্থ্য, শিক্ষার কী করুণ হাল! এখন প্রকল্প ঘোষণার কারণে মানুষজনকে প্ররোচিত করার দায় থেকে উন্নয়ন যজ্ঞের প্রচার শুরু হয়েছে।

সব মিলিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছেঃ
পরিবেশ, জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র এবং জল-জমি-জঙ্গল ধ্বংসকারী এই প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ এই মারণযজ্ঞ থেকে মমতা সরকার যে সরে আসবেন না, তা খুবই স্পষ্ট। একদিকে অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে সামনে রেখে কমিটি গঠন করে সুশীল সমাজকে নিরস্ত করার কাজ চলছে অন্যদিকে অনুব্রত মণ্ডল জানিয়ে দিয়েছেন – প্যাকেজ নিয়ে আদিবাসী মানুষদের কেউ কেউ ভুল বুঝাচ্ছে। তাদের খুঁজে বার করে জেলাশাসক এবং এসপির কাছে খবর পাঠাতে হবে। এর সাথে যোগ করে দেওয়া যায়, যা না পড়লে পিছিয়ে পড়তে হয়, সেই পত্রিকার সম্পাদকীয়, যেখানে ‘তিক্ত ঔষধ অপরিহার্য হয়ে ওঠা’-র কথা বলা হয়েছে, বলা হয়েছে ‘প্রয়োজনে কঠোর হইতে হইবে, রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করিতে হইবে’।

তৃতীয়তঃ জানকবুল এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম যদি ফ্যাসিস্ট সরকারকে তার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করতে পারে, তাহলে তা আমাদের রাজ্যেও সম্ভব।

তার জন্য যেমন একদিকে দরকার প্রকল্প এলাকার জনগণের বিশেষভাবে আদিবাসী জনগণের জনজাগরণ, তার জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ; অন্যদিকে দরকার রাজ্যের বিশেষভাবে কলকাতা ও বীরভূমে প্রতিবাদী সকল শক্তির সমাবেশ। এই দুই শক্তির পারস্পরিক সাহায্য – সমর্থন – সহযোগিতায় গড়ে উঠুক সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-ভাঙ্গড়ের ধারায় আরও এক সফল প্রতিরোধ।

প্রকৃতি বাঁচুক, পরিবেশ রক্ষিত হোক, মানুষের জীবন ও জীবিকার নিশ্চিতি আসুক, জনপদগুলি মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকুক।

প্রদীপ সিংহ ঠাকুর : রাজনৈতিক কর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • জল , জঙ্গল ও পরিবেশ দূষণ কারি কোন উন্নয়নে , নির্দিষ্ট কোন জায়গার মানুষের কোন উন্নতি সাধন সম্ভব হতে পারে না । বিশেষ করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় তাদের উৎখাত করা সংবিধান বহির্ভূত কাজ ।তাই আমার ভাবনায় পঁচামি ও ডেউচা সহ আরো কিছু গ্রাম নিয়ে রাজ্য সরকারের কয়লা খাদান প্রকল্প যানাকি বেসরকারী মালিকানাধীন হবার কথা , তার সাথে আমি সহমত হতে পারছিনা । এতে করে পরিবেশ ,জীবন জীবিকা , জীব বৈচিত্র্য ,জল , জঙ্গলের অধিকার সব কিছুর থেকেই সাধারণ মানুষ চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে উঠবেন , যা মেনে নেওয়া যায় না । তাই লড়াই সংগ্রাম ই একমাত্র পথ ।
    Fight, fight nd fight is the only solution to bend down the anti people attitude of the State Government .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post