• January 17, 2022

হাওড়ার ফুসফুস ‘ডুমুরজলা’কে বাঁচাতে রাস্তায় নামুন

 হাওড়ার ফুসফুস ‘ডুমুরজলা’কে বাঁচাতে রাস্তায় নামুন

তৃষিতা মান্না

আজকের কলকাতার ‘যমজ শহর’ হাওড়া কোনো একসময় ছিল বিস্তীর্ণ নীচু জলাভূমি৷ শিল্প এবং নগরায়ণের প্রয়োজনে আঞ্চলিক মানুষজন এই জলাভূমিকে ধীরে ধীরে বুজিয়ে গড়ে তোলে শহর হাওড়া৷ মনে করা হয়, হাওড়ার নামকরণ হয় ‘হাওড়’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘জলাভূমি’৷ শিল্প প্রসারের সাথে সাথে স্বাভাবিক প্রয়োজনেই বাড়তে থাকে ইট-কাঠ-পাথরের স্তূপ এবং কমতে থাকে সবুজ ও জলাভূমি৷

বর্তমানে এই ঘনজনবসতিপূর্ণ এলাকার মধ্যেই একটুকরো সবুজপ্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘হাওড়ার ফুসফুস ডুমুরজলা’, যা একাই প্রায় ১৫ লাখ হাওড়াবাসীর ৬০ শতাংশ অক্সিজেনের যোগান দেয়৷ শুধু তাই নয়, স্থানীয় মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বেশ কিছুটা জুড়ে আছে এই মাঠ; বয়স্কদের অবসরকালীন জীবনযাপন থেকে কমবয়সীদের খেলাধূলা বা স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকদের বিশুদ্ধ বাতাস – এই সবটুকুকে একাই ধরে রেখেছে ডুমুরজলা৷

আজ পৃথিবাব্যাপী উন্নয়নের জোয়ারের মুখে পড়েছে এই জীববৈচিত্র্যে ভরপুর মাঠটি৷ তৈরী হবে রাজ্য সরকার অনুমোদিত ‘খেলনগরী’৷ সূত্রপাত তবে এখানে নয়, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে ষাটের দশকে সমগ্র এলাকাটি ছিল কৃষিজমি৷ তৎকালীন রাজ্যসরকার কৃষকদের থেকে এই মর্মার্থে জমিগুলি অধিগ্রহণ করে যে এইস্থানটি শুধুমাত্র খেলাধূলার জন্যই ব্যবহৃত হবে এবং ধীরে ধীরে ফাঁকা জমিটি হয়ে ওঠে স্থানীয়দের খেলার মাঠ৷

কয়েকদশক আগে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার হঠাৎ করেই ঘোষণা করে, ডুমুরজলায় তৈরী হবে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং এই জমির একধারে কিছুটা স্থান নিয়ে গড়ে ওঠে ‘হাওড়া ইন্ডোর স্টেডিয়াম’৷

পরবর্তীতে ২০১৩ সালে এই জমিটি Howrah Improvement Trust (HIT)-এর থেকে হস্তান্তরিত হয় Urban Development Corporation-এর হাতে এবং ২০১৭ তে পুনরায় হস্তান্তরিত হয় ‘WBHIDCO’ র কাছে, যারা বর্তমান খেলনগরীর রূপদানের দায়িত্বে রয়েছে৷

‘খেলনগরী’ প্রকল্পটি ঠিক কি? প্ল্যান অনুযায়ী, ৫৫ একরের মাঠটিতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে তৈরী হবে ২০০ কোটি টাকার একটি মাল্টিপ্লেক্স, যার মধ্যে শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামই নয়; থাকবে জিমন্যাসিয়াম, সুইমিং পুল,শপিং কমপ্লেক্স, ১২ তলা পার্কিংলট সহ ৬০ তলা হাউসিং কমপ্লেক্স৷

অলরেডি ২০১৯ সালে এই মাঠের অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকটি নষ্ট করে রাজ্য সরকার নিজেদের ব্যবহারের জন্য একটি হেলিপ্যাড বানায় এবং সৌন্দর্যায়নের নামে পুরো মাঠটির স্বাভাবিকত্ব ধ্বংস করে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চারপাশ বাঁধিয়ে দেয়৷

সরকারের যে কোনো উন্নয়নপ্রকল্প নিঃসন্দেহে সকলেরই কাম্য৷ তাহলে এক্ষেত্রে বিরোধিতা কিসের? একটি ঘনজনবসতিপূর্ণ শহরের মধ্যে বেঁচে থাকা সামান্য একটুকরো সবুজ নিধন কাম্য নয়,একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ বাস্ততন্ত্র নষ্ট করে উন্নয়ন কাম্য নয়, জনসাধারণের ব্যস্তজীবন থেকে একটুকরো খোলা বাতাস কেড়ে নিয়ে কংক্রিটের জঙ্গল কখনই কাম্য নয়৷

ডুমুরজলা মাঠটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাস্ততন্ত্রের ধারক; ৫০০-র অধিক বিভিন্ন প্রজাতির পরিপূর্ণ গাছ (বট, পলাশ, সোনাঝুরি, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কামিনী, আম, জারুল, ছাতিম), পাখি (বেনে বৌ, বাজ, কূবো, ঘুঘু, মাছরাঙা, টিয়া, বক, ফিঙে, চড়াই), জীবজন্তু (সাপ, বেজি), প্রজাপতি, মৌমাছি, অন্যান্য কীটপতঙ্গ, জলজ জীব (জুপ্ল্যাঙ্কটন, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, মাছ,শামুক, জলজ গাছ) – এই বাস্তুতন্ত্রের উপাদানসমূহ৷ এছাড়াও এখানে শীতকালীন যাযাবরপাখিদের (তাইগা ফ্লাই ক্যাচার, অ্যামার ফ্যালকম) আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়৷ উদবেড়াল ও ভাম এর বিচরণক্ষেত্র এটি, যারা বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির অন্তর্গত৷ বস্তুত এলাকাটিকে জীববৈচিত্র্যের আধার বলা-ই যায়৷

বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব ছাড়াও এইরকম স্থানের অন্যান্য পরিবেশগত গুরুত্ব অসীম৷ এতগুলো গাছ প্রত্যহ কতটা পরিমাণ গ্রীণহাউস গ্যাস ( CO², NO, NO², SO²) গ্রহণ করে এবং আমাদের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান অক্সিজেন দেয়, তা বলার অবকাশ রাখে না৷ গাছের পাতা ধূলোকণা, কলয়েড, বিষাক্তকণাসমূহকে পাতার উপরস্তরে ধরে রেখে অনেকাংশে বায়ুদূষণ রোধ করে৷ তাছাড়া এতটা খোলামাঠ প্রাকৃতিক ভৌম জলস্তরের ভারসাম্য রক্ষা করে অতিরিক্ত বৃষ্টির জল শুষে নিয়ে৷ ডুমুর জলার এরূপ পরিবেশগত গুরুত্ব সত্ত্বেও এই মাঠ, জলাভূমি, গাছ, বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করে খেল‘নগরী’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হয়ে চলেছে, যা যথেষ্টই নিন্দনীয়৷

এক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী,যে পরিমাণ গাছ এবং জলাভূমি ধ্বংস করা হবে,তা অন্য কোথাও নতুন করে তৈরী করা হয়৷ তাহলেও এই প্রশ্ন থেকেই যায়, অতগুলো পরিপূর্ণ গাছের বদলে নতুন গাছ বসালেও তারা কি সমপরিমাণ কর্মক্ষম হবে? গাছগুলি বহু পাখি-কীটপতঙ্গের বাসস্থান, গাছ কেটে ফেললে এরাও মারা পড়বে৷ জলাভূমি বুজিয়ে ফেললে সেখানের normal flora & fauna এবং microorganisms দের কি ফিরে পাওয়া সম্ভব? এর প্রত্যেকটির উত্তর ‘না’৷ And this is the preplanned murder of our ‘Mother Nature’৷

শুধু পরিবেশগতভাবে নয়, সামাজিক দিক দিয়েও এই মাঠের গুরুত্ব অপরিসীম৷ দুইবেলা প্রচর মানুষ হাঁটতে আসেন নিজেদের সুস্থ রাখতে, অনেক কমবয়সীরা এখানে খেলাধূলা করে, ব্যস্তজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিতেও প্রচুর মানুষের আনাগোনা হয় ডুমুরজলায়৷

ডুমুরজলা এই বৃহৎ পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র৷ কিন্তু ছোট ছোট বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের মাধ্যমে ‘আমরা, মনুষ্যজাতি’ ধীরে ধীরে সমগ্র পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি৷ জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব উষ্ণায়ণ, হিমবাহের গলন, প্রাকৃতিক সম্পদের বিলুপ্তি – সবই মানুষের কর্মের ফল৷

মনে রাখতে হবে, ডুমুরজলার অবলুপ্তির সাথে সাথে হাওড়ার ইতিহাস, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশ, সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস, মনুষ্যত্ব – এসব কিছু প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে৷

আজ এই উন্নাসিক মানসিকতার বিরোধে এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করতে স্থানীয় মানুষ ও মাঠের নিয়মিত সদস্যদের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে ‘সেভ ডুমুরজলা জয়েন্ট ফোরাম’৷ এই ফোরাম বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার পক্ষ এবং সর্বসাধারণের কাছে প্রকৃতিকে বাঁচানোর আর্তি রাখছে৷ কনভেনশন, মানববন্ধন, পথসভা এবং অন্যান্য পন্থায় ডুমুরজলাকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চলছে৷ মুখে মুখে ঘুরছে একটাই কথা, “ডুমুরজলা থাক, ডুমুরজলাতেই”৷

তৃষিতা মান্না : ডুমুরজলা আন্দোলনের কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post