• January 17, 2022

দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্প ও সংগ্রামী জনগণের প্রতিরোধ, পর্ব-৩

 দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্প ও সংগ্রামী জনগণের প্রতিরোধ, পর্ব-৩

অচিন্ত্য রায়

বীরভূমের মহম্মদ বাজার কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ব্লকের অন্তর্গত দেউচা-পাচামি-দেওয়ানগঞ্জ-হরিণশিঙা (ডিপিডিএইচ)- এর প্রস্তাবিত কোল ব্লক মোট ১২.৩১ বর্গ কিলোমিটার (প্রায় ৩৪০০ একর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। যার মধ্যে দেওয়ানগঞ্জ-হরিণশিঙা ও দেউচা-পাচামি কোল ব্লকের মধ্যে অন্তর্গত যথাক্রমে ২.৬১ বর্গ কিলোমিটার ও ৯.৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। গত ১৬ ই নভেম্বর তারিখে রাজ্য সরকারের এক অর্ডার থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী কয়লা খনির কাজ শুরু করতে হলে নাকি এর মধ্যে ৩২৯৪ একর জায়গার প্রয়োজন। এই ৩২৯৪ একর জমির মধ্যে সরকারের জমির পরিমাণ মাত্র ৭০০ একর, অর্থাৎ মোট জমির মাত্র ২১ শতাংশ। বাকি ৭৯ শতাংশ জমি জুড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী হাজার-হাজার পরিবার, তাদের চাষের জমি ও বিস্তীর্ণ বনভূমি এলাকা। ডিপিডিএইচ কোল ব্লক অন্তর্গত মোট ১৯ টি গ্রামের প্রায় ২১ হাজার মানুষের ভিটেমাটি, চাষের জমি এবং বনাঞ্চল কে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে WBPDCL -এর “পাওয়ার টু প্রস্পার”- ক্যাপশনের আড়ালে। কয়লা খনির কাজ শুরু হলে মোট ১০ টি মৌজার অন্তর্গত প্রায় পাঁচ হাজার পরিবারের ওপর প্রভাব পড়বে। প্রভাব পড়বে তাদের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ওপর। অসংখ্য মানুষ ইতিমধ্যেই তাদের বাসস্থান এবং কাজ দুইই হারানোর আশঙ্কাতে দিন কাটাচ্ছেন। হাজার-হাজার বছরের পূর্বপুরুষদের মাটি ছেড়ে অন্য কোথাও স্হানান্তরিত হয়ে আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত এর কথা ভেবে তাঁরা রীতিমতো চিন্তিত।

ইতিমধ্যেই ১০ টি মৌজায় জমি-কেনাবেচা বন্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। অর্থাৎ, রাজ্য সরকারের খনি তৎপরতা যে ক্রমাগত বাড়ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কয়লা উত্তোলনের বরাত পাওয়া পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড বা পিডিসিএল এর চেয়ারম্যান তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর পিবি সেলিম এর নেতৃত্বে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও পিডিসিএল এর ত্রিপাক্ষিক বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে যে, বেশ কিছুদিনের মধ্যেই নাকি দেওয়ানগঞ্জ-হরিণশিঙার ১৬ টি সরকারী জায়গায় খননের কাজ শুরু হবে। তাই, দেওয়ানগঞ্জ-হরিণশিঙা কোল ব্লক অন্তর্গত এলাকা কাঁটাতার দিয়ে ঘেরার কাজও শুরু করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এখন সরকারী জায়গায় খননের কাজ শুরু হলেই কোপ পড়বে আদিবাসী মানুষের জমি-জঙ্গলে। তাই, জীবন-জীবিকা, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জল-জঙ্গল-জমি ধ্বংসকারী এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে মানুষও সংগঠিত হচ্ছেন ক্রমশ।

হাজারও আশঙ্কা আর চিন্তা সত্ত্বেও তাঁরা বুকে বল নিয়ে লড়াই করছেন। কয়লা খনির বিরুদ্ধে হরিণশিঙা, দেওয়ানগঞ্জের জনগণ রুখে দাঁড়াচ্ছেন। গ্রামের দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠছে বিদ্রোহগাথা। ” গাঁ ছাড়বো না, কয়লা খুনি মানবো না” লিখছে মথুরাপাহাড়ি গ্রামের দেওয়াল। “এই জমি জঙ্গলে জন্মেছি। এখানেই মুরব, কোথাও যাব না”- সোচ্চারে জানিয়ে দিচ্ছে দেউচা-পাচামি কয়লাখনি প্রকল্পের অন্যতম ভরকেন্দ্র হরিণশিঙার জমায়েত। কেন্দ্রপাহাড়ি, দেওয়ানগঞ্জ, শালডাঙা প্রভৃতি গ্রাম থেকে আসা সেদিনকার হাজার-হাজার মানুষের জমায়েতে গ্রামের এক যুবক বলছেন, ” দেখুন, এই যে জঙ্গলে আমি দাঁড়িয়ে আছি তার সাথে আমার জীবন জীবিকা জড়িত। আমাদের তুলে নিয়ে গিয়ে কোথায় এক গোয়ালঘরে বন্দি করবে, আদিবাসীরা তা মানবে না। কারণ, জমি-জঙ্গলের সাথে লেপ্টে থেকেই আদিবাসীরা বেঁচে আছে।” এ কথা এক-দুজনের নয়, বরং জমায়েতে যতজন উপস্থিত ছিলেন তাঁরা কেউই ভিটেমাটি ছাড়তে চান না, কয়লা খনি চান না এবং কোনো প্যাকেজও চান না। কয়লা খনির বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন কে আরও শক্তিশালী করে তোলার জন্য, তাঁরা গ্রামে গ্রামে মিটিং, জমায়েত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংগ্রামী জনগণ আশায় বুক বাঁধছেন, লড়াই করছেন মানুষ ও পরিবেশ হত্যাকারী কয়লা খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে।

ক্রমশ…

অচিন্ত্য রায় : ছাত্র এবং গৃহশিক্ষক

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post