• January 17, 2022

“আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হতে দেবো না”

 “আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হতে দেবো না”

নাতাশা বিশ্বাস

সম্প্রতি আমরা পেরিয়ে এলাম ৯ ই ডিসেম্বর, বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিবস। সেদিনও খোদ কোলকাতার বুকে খোলা আকাশের নীচে বসে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা। হ্যাঁ ঠিকই বুঝেছেন, কথা বলছি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের, যে বিশ্ববিদ্যালয় ভোটের আগে হয়ে ওঠে সংখ্যালঘু ভোট আদায়ের তুরুপের তাস।

কিছু বছর পিছিয়ে যাওয়া যাক।
সালটা ছিল ১৭৮১, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি তদানীন্তন গভর্নর মি. ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মহামেডান কলেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলেন। উদ্দেশ্য ক্রমশ পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে শিক্ষার ছায়ায় নিয়ে আসা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে প্রথম দেড় বছর প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব খরচেই চালান হেস্টিংস। তারপর কলকাতার বউবাজার অঞ্চলের বৈঠকখানায় এই কলেজের প্রথম ক্লাস শুরু হয়, পরে তালতলার বর্তমান ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটি স্থানান্তরিত হয়। প্রথমদিকে এই কলেজে আইন, জ্যোতির্বিদ্যা, ব্যাকরণ, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি পড়ানো হতো। ১৮২৭ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধ্যাপক পি ব্রেটন এই কলেজে একটি মেডিকেলের ক্লাস শুরু করেন। ১৮৩৬ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত এই ক্লাস কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসাতেই চলত। ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার একটি বিল পাসের মাধ্যমে রাজ্য সরকার এই কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে উন্নীত করে। নাম হয় আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকের মনে প্রথমেই যে প্রশ্ন টা জাগে “আলিয়াতে এত আন্দোলন কেন হয়?” এবারও সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে বসেছে। নয় নয় করে পার হয়েছে ৭১ টা দিন। “আন্দোলন কেন হয়?” -এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দেওয়ার থেকে ছাত্রছাত্রীদের দাবিগুলোকে সামনে তুলে ধরে আন্দোলনের ন্যায় সঙ্গতির বিচার পাঠকের হাতেই তুলে দিলাম।

ছাত্রছাত্রীদের দাবীঃ-

১. সংবাদপত্রে প্রকাশিত আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অন্য প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের খবর আশা করি আপনারা দেখেছেন। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্ত থেকে সংখ্যালঘু ঘরের ছেলেমেয়েরা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তে পড়তে আসে। পড়তে আসা এমন অনেক ছেলে মেয়ে আছে যাদের বাড়ির তারাই হয়তো প্রথম গ্র্যাজুয়েট। তাদের পক্ষে কলকাতার মতো শহরে ঘর নিয়ে থাকা অসম্ভব। আবার উল্টোদিকে, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের দেওয়ার মতো হোস্টেলও নেই।

যে জমি হস্তান্তরের কথা হয়েছে সেই জমিতে আগে থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল, স্টাফ কোয়ার্টার এবং খেলার মাঠ করার কথা প্রস্তাবিত হয়ে আছে। তাহলে সেই জমি কিভাবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তর করা সম্ভব?

এই প্রেক্ষিতে ছাত্রছাত্রীদের দাবি কোনো অবস্থাতেই জমি হস্তান্তর করা যাবে না। জমি হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানাতে হবে। সংখ্যালঘু দপ্তর কেও জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ফেরাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই জমিতে অবিলম্বে হোস্টেল, স্টাফ কোয়ার্টার এবং খেলার মাঠ নির্মাণের কাজ শুরু করতে হবে।

২. একটি ছবি হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে দেখে থাকবেন, যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে বাঁধা রয়েছে গরু। ওটা আসলে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী তালতলা ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি!

ছাত্র-ছাত্রীরা দাবি করেছে তালতলা ক্যাম্পাসকে অবিলম্বে হেরিটেজ ঘোষণা করতে হবে। তালতলা ও AP বিভাগের সম্পত্তি উল্লেখ করে প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে। থিওলজি সহ সমস্ত বিভাগে উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তালতলা ক্যাম্পাসে উপযুক্ত লাইব্রেরী, অন্যান্য সমস্ত ক্যাম্পাসে শিক্ষার সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।

৩. বাজেটে নির্ধারিত অর্থ না দেওয়ায় সঠিক শিক্ষার পরিকাঠামো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। থমকে গেছে প্রস্তাবিত হোস্টেল ও খেলার মাঠ নির্মাণের কাজ। সংখ্যালঘু দপ্তরের উদাসীনতায় বন্ধ হয়ে গেছে WBCS কোচিং।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বর্তমানে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের বিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের বেতনও দিতে পারছে না (পরে অবশ্য, এই ছাত্র আন্দোলনের চাপে নিরাপত্তারক্ষীদের আংশিক বেতন দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ)। আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধ হয়ে গেছে ইন্টারনেট পরিষেবাও।

এই প্রেক্ষিতে ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি যে, সংখ্যালঘু দপ্তরকে অবিলম্বে বাজেটে বরাদ্দ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়কে দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডে থাকা টাকা ছাত্র-ছাত্রীদের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে NAAC মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

৪. অবিলম্বে সংখ্যালঘু দপ্তরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা স্টাডি সেন্টারগুলোর উপযুক্ত পরিকাঠামোর উন্নয়ন করে সে গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজে রূপান্তরিত করতে হবে।

৫. করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের আর্থিক সংকটের কথা মাথায় রেখে নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ কে করতে হবে। তালতলা ও পার্কসার্কাস ক্যাম্পাসে আলাদাভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য চিপ ক্যান্টিন সহ হোস্টেল নির্মাণ করতে হবে। যতদিন না প্রস্তাবিত হোস্টেল নির্মাণ হচ্ছে ততদিন ভাড়াবাড়িতে ছাত্র-ছাত্রীদের রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. কোনো অজুহাতেই ছাত্র-ছাত্রীদের কে স্কলারশিপ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, আবেদনকারী সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কে প্রাপ্য স্কলারশিপ দিতে হবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় পর্যাপ্ত ফেলোশিপ দিতে হবে। k3 স্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নথিভুক্ত করতে হবে।

৭. আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় যুক্ত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

৮. অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাওয়া WBCS কোচিং পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শুরু করতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি মেনে NET, SET, GATE কোচিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৯. দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি মতো রোকেয়া ভবনকে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নিবাস হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আলিয়া মাদ্রাসার সমস্ত সম্পত্তি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে দ্রুত হস্তান্তর করতে হবে।

১০. ২০১৭ সালের ১১ ই আগষ্ট, পুলিশ ও বহিরাগতদের যৌথবাহিনী আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকে ৪৪ দিন ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৯ জন ছাত্রের ৯ দিনের জেল হেফাজত হয়। ২০১৬-২০১৭ সালে দুদফায় ৮৬ দিনের ছাত্র আন্দোলনের পরে নিয়োগ দুর্নীতি, আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট সামনে আসে। কিন্তু সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আজও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা তা ছাত্র-ছাত্রীদের অজানা।

ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি, পূর্বের দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলনের চাপে হওয়া ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট আর বর্তমানে সরকারী স্তরে চলমান তদন্তের রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এই গুলোই ছাত্রছাত্রীদের মূল দাবি। এছাড়াও বেশি নম্বর, সম মানের যোগ্যতা সত্ত্বেও প্রাপ্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে আলিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্ররা। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা চলছে।

কিন্তু উপরিউক্ত দাবিগুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন-নিবেদন জানানো হলেও সংখ্যালঘু দপ্তর কর্ণপাত না করায়, বাধ্য হয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষ থেকে দাবি পূরণের লক্ষ্যে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে গত ৪ঠা অক্টোবর, বেলা ১২ টা থেকে। ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন ইতিমধ্যেই ৭১ দিন অতিক্রম করেছে। একাধিক ছাত্র-ছাত্রী অবস্থান চলাকালীন অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে নিয়ে ছুটতে হয়েছে রাত বিরেতে। কিন্তু তারপরও ছাত্র ছাত্রীদের দিকে ফিরে তাকাইনি সংখ্যালঘু দপ্তর। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও একইভাবে উদাসীন।

তবুও ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের দাবিতে অনড়। ইতিমধ্যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চাপে করোনা পরিস্থিতিতে সেমিস্টার ফি মুকুব করতে বাধ্য হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আংশিক নয়, বরং পূর্ণ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীরা অবিচল।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫০ বছরের ঐতিহ্য, হাজার হাজার মানুষের আবেগ, বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের আশা-ভরসা-ভালোবাসার এই প্রতিষ্ঠান আজ চরম অবহেলা এবং বঞ্চনার শিকার। সংখ্যালঘু দপ্তরের উদাসীনতায় প্রশ্নের মুখে হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ। আলিয়া ঘিরে থাকা ঐতিহ্যকে কালিমালিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

নাতাশা বিশ্বাস: প্রাক্তনী, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *