• January 17, 2022

কাজের প্রকৃতি এবং অবসরের পরিবর্তন

 কাজের প্রকৃতি এবং অবসরের পরিবর্তন

একটা কর্মদিবসের একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা প্রায় অপরিচিতই তাই হল অবসর সময়। কাজের ক্ষমতা শুধুমাত্র শ্রমিকদের কায়িক পরিশ্রমের ওপরই নির্ভর করে না বরং এটি তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আবেগের পরিপূরক হিসেবেও কাজ করে। এই পর্যায় গুলির জন্য অবসর সময় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই কারণেই বিশ্বব্যাপী সমস্ত শ্রমিক শ্রেণী এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো কর্মদিবসকে ৮ ঘন্টা কাজের সময়, ৮ ঘন্টা অবসর সময় এবং ৮ ঘন্টা ঘুম অথবা বিশ্রামের সময় হিসেবে ঘোষণা করার জন্য সংগ্রাম চালিয়েছে।
অর্থনীতির মূলধারায় একটা কর্মদিবসের অবসর সময়কে বোঝানোর জন্য ‘Labour-Leisure’ – মডেলটি ব্যবহার করা হয়। সেখানে দেখানো হয়, মজুরেরা তাদের আত্মসন্তুষ্টির জন্য সর্বাধিকভাবে কাজের এবং অবসরের সময় বেছে নেয়। প্রথমে এই ধারণা ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে এই অবসর সময়কেও সন্তুষ্টি হিসাবে দেখা হয়। যখন শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন শ্রমিকদের কাজের সময় এবং অবসর সময়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে তারা কাজকেই বেছে নেয়, কারণ বেশি কাজ করলে তাদের আয় বাড়বে।
দেখা যায়, বাস্তব কর্মজীবনের বহু জটিল সমস্যার সমাধান করতেই ব্যর্থ এই মডেল। প্রথমত, মানুষকে তার নিজের কাজের সময় ‘বেছে’ নেওয়ার সুযোগটাই দেওয়া হয় না। এমনকি, লিখিত চুক্তি এবং সুযোগ-সুবিধাসহ প্রাক্তন শ্রমিক অথবা কর্মীদের সংঘর্ষ এবং সম্ভাবনাসূচক চাকরির হারানো এড়াতে, কাজের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের দুর্দশা আরো অনেক বেশি। যেখানে অপর্যাপ্ত আয় শ্রমিকদের বাধ্য করে তাদের বেঁচে থাকার জন্য মাত্রাতিরিক্ত শ্রম দিতে। কাজেই, কাজের সময় বাছাই করা, যা এই মডেলের একটি মৌলিক দিক,তা আদতেই একটি ভ্রম বা ‘Illusion’ বলা যায়।
দ্বিতীয়ত এটা ধরেই নেওয়া হয় যে কাজের সময় ব্যতীত সময়টাই হল অবসর সময়ে কাজের সময় ছাড়া কাজের উদ্দেশ্যে শ্রমিকরা যে আনুষঙ্গিক সময় ব্যয় করে তার হিসেবে করা হয় না। The Indian Human Development Survey (2011-12) দেখায়, মজুরিভুক্ত এবং বেতনভুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে ৬১.৭১ শতাংশ শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে সমগ্র কাজের সময়ের চেয়েও ১ ঘন্টা বেশি সময় ব্যয় করে। দৈনিক মজুরিপ্রাপ্ত শ্রমিকদের একটা বৃহৎ অংশ কাজের খোঁজে নিয়মিত শহরে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই এর জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় সস্তা এবং ভিড়যুক্ত পরিবহন মাধ্যমের ওপরই। কাজ ব্যতীত কাজের উদ্দেশ্যে এই অতিরিক্ত সময়ের আর্থিক ব্যয় ও সুযোগ ব্যয় দুই-ই রয়েছে এবং এই সময়কে শ্রমিকের কাজের সময় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায় এই মডেল মহিলাদের অবস্থা বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০১৯ সালের Times Use Survey বলছে, গড়ে একজন মহিলা দৈনিক ৩৩৮ মিনিট সময় ব্যয় করে বিনা পারিশ্রমিকে গৃহস্থলীর কাজ করে যেখানে একজন পুরুষের ক্ষেত্রে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১০৭ মিনিটে। মহিলাদের এই শ্রমকে কোনো কাজের সময় অথবা অবসর সময় হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না। গৃহস্থলীর কাজের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যই মূলত মহিলাদের এই ধরনের কাজ করতে বাধ্য করে, যা তাদের অবসর সময়কে কমিয়ে দেয়। পরিবর্তনশীল অর্থনীতিও এই ধরনের অবসর সময়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভারতের ঠিকা শ্রমিক অথবা নিয়মিত শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময়ে কাজের প্রকৃতি সময়ের সাথে সাথে গতি পেয়েছে। সাম্প্রতিক শ্রম আইনের উদ্দেশ্য হলো, শ্রমিকদের কাজের সময় ৯ ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘন্টা করা।
সাম্প্রতিক কয়েকটা ঘটনা লক্ষ্য করে দেখা গেছে, কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে টুকরো টুকরো করে, যার ফলে শ্রমিকের মজুরি এবং হিসেব নির্ধারণ করা হয়েছে একজন শ্রমিক কতগুলো খাবারের অর্ডার এনেছে বা কতজন যাত্রী কে সে পরিষেবা দিয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। এই সামান্য পারিশ্রমিকই কাজের সময় বাড়িয়ে তাদের আরও বেশি মনোযোগী হয়ে কাজ করতে এবং বেঁচে থাকার জন্য বা উপার্জনের জন্য অন্যান্য কাজের খোঁজ করতে বাধ্য করে। এতে তাদের অবসর সময়তো কমে যায়ই বরং তাদের খাওয়া-ঘুমের জন্য অপরিহার্য সময় থেকেও সময় কমে যায়।
একইভাবে, স্বল্প বেতন, ঠিকা শিক্ষক, আপাতকালীন বা সাময়িক অধ্যাপকদের বাধ্য করে অবসর সময়ে উপার্জনের জন্য প্রাইভেট টিউশন করতে। আরো বলা যায়, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদির আগমনের ফলে শ্রমিকদের মধ্যে, বিশেষত মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদের মধ্যে অবসরের সময় আরও অনেক কমে গিয়েছে। কারণ, অধিকাংশই সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন শপিং ওয়েবসাইট, শপিংমলে ব্যস্ত, যেখানে জনসংযোগ প্রায় নগণ্যই বলা চলে। বাড়ি থেকে কাজ (Work From Home) আবার কর্মস্থান ও বাসস্থানের মধ্যের ব্যবধান দূর করে। বর্তমানে গোটা সপ্তাহ জুড়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে শ্রমিকরা তাদের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই ক্রমশই অবসর সময় হয়ে উঠছে গোষ্ঠী পরিত্যাগ করে ব্যক্তিগত পরিসর। জনসমাগম, যেমন চায়ের দোকানে আড্ডা, স্থানীয় মুদি দোকানে জমায়েত এখন আর বড় একটা দেখা যায় না। এইভাবেই মানুষ সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক। শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যের জন্য সম্প্রদায়ভুক্ত আদর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অবসরের এই পরিবর্তন শ্রমিকদের মধ্যে একটা ধারণা তৈরি করেছে যে, তারা নিজস্ব বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে স্বতন্ত্র এবং কোনোভাবেই একটা বড় পরিকাঠামোগত সমস্যার অঙ্গ নয়। সম্প্রদায়ের চেতনায় আঘাত হানা, সমাজের যৌথ পদক্ষেপগুলোর সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয় বা ম্লান করে দেয় বলা যায়, যা শ্রমিক শ্রেণীর উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এইভাবে ক্রমাগত কাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে অবসরের প্রকৃতির পরিবর্তন শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হচ্ছে। অবসর সময় নষ্ট করা, সমাজের সাধারণ পরিকাঠামোর ওপরও একটা উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। একটা সমাজ অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক (Informal Relationship)-গুলির ওপর কাজ করে, তাই তাদের মধ্যে একটা পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গা গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কগুলোর একটা অংশই স্থানীয় কোনো মুদি দোকানের চারপাশে কেন্দ্রীভূত, ক্রমেই যা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং শপিং মলের দ্বারা পরিবর্তিত হচ্ছে। এই অবস্থা দ্রুতই স্থানীয় মুদি দোকান গুলিকে বন্ধ করে দিয়ে দৈত্যাকার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলিকে একচেটিয়া ক্ষমতা লাভের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে, একটা সম্প্রদায়ের মধ্যে কেবল অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের অবনতিই ঘটছে না, বরং স্বনির্ভর মুদি দোকানের মালিকেরা উচ্ছেদ হয়ে অনিয়মিত শ্রমে যোগদান করতে বাধ্য হচ্ছে। অবসর সময়ের অভাবকে জনপ্রিয় সংস্কৃতি কোনো ধনী ব্যক্তির সমস্যা হিসেবে দেখায়। অথচ, সাদা কালারের কর্মচারীরা সারাদিনব্যাপী কঠোর পরিশ্রম করে, যার ফলস্বরূপ তাদের প্রিয়জনকে দেওয়ার মতো কোনো অবসর সময় তারা পায় না।
যাইহোক, অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ দেখিয়েছেন, কিভাবে ‘সময়-দারিদ্র’ সাধারণভাবে শ্রমিক শ্রেণীর জন্য এবং বিশেষত শ্রমিকশ্রেণীর মহিলাদের জন্য আরও গুরুতর সমস্যা। রোমাঞ্চকর নস্টালজিয়ার ফাঁদে না পড়ে, আমাদের যুক্তি জোর দিয়ে দেখায় যে, অবসরের প্রকৃতির পরিবর্তন এবং অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কগুলির ভাঙন শুধুমাত্র সামাজিক পরিকাঠামোকেই ধ্বংস করে না, শ্রমিকদের জীবনেও বিরূপ প্রভাব ফেলে।

সাত্যকি দাশগুপ্ত : Colorado University-তে গবেষণারত।
অন্বেষা মুখার্জী : Centre for Development Studies, (JNU), Kerala-তে গবেষণারত।
মূল লেখা ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন অঙ্কিতা চক্রবর্তী

  •  
  •  
  •  
  •  

1 Comments

  • লেখাটা ভালো হয়েছে কিন্তু আরও কতগুলো বিষয় আনা উচিত। শ্রমিকরা অবসর সময়ে আদায় করতে পেরেছিল,তাদের বড় বড় সংগঠনের জোরে। আর শিল্প পুজির সময় তারাই বড় বড় সংগঠন গড়ে তুলতে পেরেছিল। তাদের এই অবসর সময় আদায়ের সাথে পুঁজিবাদেরও বিকাশ হয়েছিল। তার কারণ 16 ঘণ্টা শ্রমকে এখন 8 ঘণ্টায় করাতে গেলে তাদের প্রযুক্তি বিকাশের দরকার হয়েছিল। এই কারণেই 1994 থেকে 1996 সালের মধ্যে X ray,রেডিও একটিভিটি ও ইলেকট্রনের আবিষ্কার হয়েছিল। যার হাত ধরে আবার নিউটনিয়ান যান্ত্রিক বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠলো। থিওরি অফ রিলেটিভিটি ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স এর জন্ম হল। দর্শনের জগতেও নতুন প্রশ্ন সামনে এলো। তাই শ্রমিকশ্রেণীর অবসর সময় বৃদ্ধির সাথে এতগুলো উন্নয়ন জড়িত। এরপরে শিল্প পুঁজিবাদ ফিন্যান্স পুজিতে রূপান্তরিত হয়। যেহেতু শিল্পপুজির ও ব্যাংকিং পুঁজির মিলনে তখনকার ফিনান্স পুজির স্ট্রাকচার গঠন হয়েছিল তাই তারা শিল্প পুজিকে সেদিন ভেঙে দেয় নি। কিন্তু আবার বাজার দখলের লড়াইয়ে বিশ্বযুদ্ধ চলে এলো। আশির দশকের পর শিল্প পুঁজির কাঠামোকে ভাঙ্গা হলো। বড় বড় শিল্পকে আউটসোর্স করে টুকরো করা হল। ডেট্রয়েটের মতন বড় বড় শিল্প শহর কে শ্মশানে পরিণত করা হলো। বাজার ও ব্যাংকের মিলনে নতুন ফাইন্যান্স পুঁজির কাঠামো গঠন হলো । ইউনিয়নাইস শ্রমিক এই বাজারে এসে ব্যক্তি শ্রমিকে পরিণত হলো, তার পরিচয় হলো পরিযায়ী শ্রমিক। এখন কাজ খোঁজার জন্য তাকে একটা সময় ব্যয় করতে হয়। তারপর আবার কাজ পেয়ে গেলে যেহেতু কাজ চলে যাওয়ার ভয় থাকে, তাই সে তার সমস্ত সময়টা বিক্রি করে যতটা পারা যায় অর্থ উপার্জন করে নিতে চায়। আর এর হাত ধরেই আটঘন্টার কাজ করার যে অধিকার তাকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে 12 ঘন্টায় কাজ করানোর মধ্য দিয়ে। এই বাজারই আবার আজ পুঁজিবাদের সর্বনাশের কারণ। শ্রমিক শ্রেণীর জীবনের উপরে নেমে আসছে প্রচন্ড আক্রমণ, উল্টোদিকে শেয়ার বাজারে নিত্যনতুন আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে (যেমন ডেরিভেটিভ )ফাটকা পুঁজির বেড়ে চলেছে। তাই শ্রমিকশ্রেণীর কনজামশন বাড়ার ভেতর দিয়ে যে প্রকৃত পুঁজি বেড়ে চলত সেতো বাড়ছেনা,উল্টোদিকে ফিকটিসাস ক্যাপিটাল বেড়ে চলেছে হুড়মুড়িয়ে। এটাই আজ পুঁজিবাদের বিরাট সংকটের কারণ। পাশাপাশি প্রযুক্তির বিকাশকে বাজারের বিকাশের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে 24 ঘন্টা বাজারের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে mentallyও physically , ফলে মানুষের দর্শন চিন্তা-চেতনার জগত আজ অবরুদ্ধ হয়ে গেছে, মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশ আজ অবরুদ্ধ। অবসর সময় টাকেও বাজার কেড়ে নিয়েছে। এই বাজারি ভোগবাদী চিন্তাই, পরিবেশ দূষণ কে বাড়িয়ে তুলছে। ফলে নিজেরা যে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছি সেটাও মানুষ বুঝতে পারছে না। এটাই এক সভ্যতার সংকট এর জন্ম দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related post