এম রুহুল আমিন

শিক্ষা যদি জাতির মেরুদন্ড ও সমাজ জীবন দেহ হয়, তবে সাহিত্য সংস্কৃতি তার আত্মা। এই আত্মার মৃত্যু মানে সমগ্র জাতির মৃত্যু। দেশ ভাগের ফলে বাংলার সাহিত্য জগতে একটা বিশাল আঘাত এলেও কিছু দিনের মধ্যে এপার বাংলা অনেকটাই মেরামত করে নেয়। তাতে অবশ্য ওপার বাংলা থেকে আগত একটা বিশাল সংখ্যক হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও উচ্চবিত্তের অবদান ও কম ছিল না। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ওপার বাংলার মুসলিম সমাজ ও সাহিত্য সংস্কৃতির জগৎ যতটাই না সমৃদ্ধ হয়েছে ঠিক উল্টোটা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। যত দিন গেছে শিক্ষা -চাকরির সাথে সাথে সাহিত্য -সংস্কৃতি চর্চার দৈন্যদশা দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা সেটাকে আরও প্রসারিত করেছে ।
পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের সংখ্যা ২৭-৩০ শতাংশ।সংখ্যার নিরিখে 3কোটির কাছাকাছি। এতো বিপুল সংখ্যক মুসলিমদের অধিকাংশ গ্রামে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত শ্রেণির। এদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের হার কি ভয়ঙ্কর ভাবে কম তার আর পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানোর দরকার পড়ে না। সাচার কমিটির রিপোর্ট তো তার যৎসামান্য প্রতিচ্ছবি, বাস্তব চিত্র আরও খারাপ। মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসাবে বুদ্ধিজীবীরা যেসব কারণ গুলি উল্লেখ করে থাকেন তার মধ্যে অন্যতমগুলি হলো –
১)কলকাতা ও অন্যান্য শহর অঞ্চলের উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিজীবীদের দেশত্যাগ।
২)ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বহুদিন যাবৎ মুসলিম সমাজের নেতিবাচক মনোভাব।
৩)ইসলাম ধর্মের সামগ্রিক চিন্তাচেতনাকে রুদ্ধ করে শুধুমাত্র নামাজ -রোজা কে অধিক মাত্রায় গুরুত্ব দান।
৪)উচ্চ মানের আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লোকের অভাব।
৫)পিছিয়ে পড়া এই সমাজের জন্য সংবিধানে সংরক্ষণ সুবিধার অভাব।
৬)মুসলিম সমাজের গড়েতোলা মাদ্রাসা গুলির সঠিক ব্যাবস্থাপনা ও পরিকাঠামোর অভাব।
৭)সরকার পোষিত মাদ্রাসা গুলোর সমস্যার প্রতি সরকারের যথেষ্ট অবহেলা।

৮)সঙ্গীত, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য, অভিনয় ইত্যাদি সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কাজে অংশগ্রহণে সামাজিক বাধা।

৯)এই সমাজের ধর্মীয় প্রতিনিধিদের আধুনিক শিক্ষার প্রতি উৎসাহের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে -যা অনেক ক্ষেত্রে চিন্তাভাবনা ও যুক্তি গুলো বৃহৎ সমাজের কাছে পৌঁছচ্ছে না।
১০)এই সমাজের আধুনিক শিক্ষিতগনের একটা বিশাল অংশ আবার সমাজের মধ্যেকার অসংখ্য সমস্যা গুলো ব্যাতিরেকে ধর্মীয় গুরু ও মাদ্রাসা শিক্ষার উপর সম্পূর্ণ দায় চাপাতে ব্যস্ত।
১১)বহুকাল ধরে পশ্চিমবঙ্গের শহর-শিল্পাঞ্চল গুলিতে বসবাসকারী হিন্দি -উর্দূ ভাষী মুসলিম ফলে বাংলাভাষী মুসলিম সমাজের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অভাব।
১২)এই সমাজের মধ্যে সাহিত্যচর্চা কে সেই ভাবে সমাদর করা হয় না। সাথে পাঠকের সংখ্যা খুবই কম। যদিও বা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ একটু বই পত্র পড়েন তবে তার সিংহভাগই ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কিত।
১৩)এখানকার মুসলিম সমাজের অধিকাংশ গ্রামে বসবাসকারী ফলে সেখান থেকে কি পড়াশুনা, সাহিত্য চর্চা, রাজনীতি, জীবিকা, সংস্কৃতি চর্চা সব কাজেই ভীষণ বাধা রয়েছে|
১৪)শহরে বসবাসকারী মুসলমানদের বেশী বেশী সহযোগিতা পেলে শিক্ষা, জীবিকা,সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা ইত্যাদি ব্যাপক ভাবে প্রসার লাভ করতো কিন্তু বাংলাভাষীদের সঙ্গে তাদের বিশাল দূরত্ব এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ইত্যাদি

ব্যাতিক্রম হিসেবে গৌর কিশোর ঘোষ, অন্নদাশঙ্কর রায়, মিলন দত্ত, এর মতো ব্যক্তিবিশেষর কথা উল্লেখ করা যায়। তবে অন্যান্যদের ক্ষেত্রে দোষারোপ করার ন্যূনতম অভিসন্ধি আমার নেই। কারণ যিনি যে সমাজ থেকে উঠে এসেছেন তিনি সেই গুলোই তার সৃষ্টিতে বেশি ফুটে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তবে পড়শীদের সম্পর্কে আলোকপাত করা উচিত এটাও ঠিক। আবার আলোকপাত করতে হলে ওই সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে হবে তাদের মন মানসিকতাকে বুঝেই লিখতে হবে। ভাসা ভাসা জ্ঞান এ সেটা সম্ভব নয়।অবশ্য স্বাধীনোত্তর পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত বদলে যাওয়া মুসলিম জীবন-জীবিকা ও উচ্চবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শূন্যতা এ ক্ষেত্রে অধিক মাত্রায় দায়ী বলে আমি মনে করি।

দেশভাগ পূর্বে অবিভক্ত বঙ্গের সারা ভারতে বাংলার অবস্থান ছিল অনেক উঁচুতে। শিক্ষা- সাহিত্য- সংস্কৃতি -রাজনীতি সবেতেই তার গরিমা ছিল।দেশভাগজনিত কারণেই কলকাতা তথা বাংলার গরিমা দিন দিন হ্রাস পেয়েছে। সেদিন কয়েকজন মানুষের ভুল সিদ্ধান্তে দিন দিন বাঙালির শক্তি ও সাহস যেমন হ্রাস পেয়েছে সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। একদা বলা হত – “What Bengal thinks today, India thinks tomorrow .”(জি কে গোখলে ) আজ সেই জাতি বহিরাগত গুজরাটি-উত্তর ভারতীয় নেতাদের দ্বারা চালিত| আজ বাঙালি -অসম,মেঘালয়,মিজোরাম,মনিপুর, দিল্লী, মুম্বাই,বিহার, উত্তর প্রদেশ,রাজস্থান সর্বত্রই হিংসা আর অত্যাচারের শিকার| আজ বাংলা ভাষী মুসলমান দেখলেই বাংলাদেশি অথবা রোহিঙ্গা দেগে দেয়া হচ্ছে। আজ আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে হাজার হাজার হিন্দু মুসলিম বাঙালি বন্দী| লাখ লাখ বাঙালি নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।NRC, CAA , NPR এর নামে বিজেপি সরকার ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে। তাতে আসলে বাঙালিদেরকে দাস বানাতে চায় |সেই উপলব্ধিটুকু ভুলে গিয়ে এখন রবীন্দ্র-নজরুল-নেতাজীর বাংলা হিন্দু মুসলিম,জাতপাতের খেলায় মেতেছে।
সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে বাঙালি মুসলিম জনমানসকে।আর ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ার জন্য সবচেয়ে বড় কারণ এদের পাশে দাঁড়ানোর মত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বড়ই অভাব।আজ এই সমাজের না আছে বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী না আছে রাজনৈতিক নেতাকর্মী। দীর্ঘদিন ধরেই এই জাতি একটা ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে।

দেশভাগের ফলে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মতো রাজনৈতিক নেতারা এবং সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের বড় বড় ব্যক্তিত্ব, যেমন- ফজিলাতুন্নেছা,এবিএম হাবিবুল্লাহ, আব্দুল হাই, ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আকরাম খাঁ, আনিসুজ্জামান,আব্দুল হাই প্রমুখরা চলে গেলেন রয়ে গেলেন গুটি কতক ব্যক্তি নির্বাক নজরুল কে সঙ্গী করে।

দেশভাগ এপার বাংলার মুসলিম জনসমাজকে একেবারে নিঃস্ব রিক্ত করে দিল।এদের না রইলো কোন নেতা না রইলো এঁদের দুঃখ দুর্দশা কে তুলে ধরার মতো পত্রপত্রিকা,বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠী। গোটা সমাজটাই একটা করুণার পাত্র হয়ে ভিটে-মাটি ও ধর্ম টুকু সম্বল করে বেঁচে বর্তে রইলেন।

আর মাটির প্রদীপের ন্যায় টিমটিম করে জেগে থাকা সামান্য সাহিত্য -সংস্কৃতি প্রেমীদের উৎসাহ দেওয়ার মতো গোষ্ঠী ও সংগঠনের বড়োই অভাব রয়ে গেলো। সেই সাথে মুসলিম সমাজের একটা অংশ এখনো আছে যাঁরা শিল্প ও সাহিত্য -সংস্কৃতি চর্চাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। তাঁদের প্রভাব এই একবিংশ শতকেও কম নয়। যেকোনো কিছুতেই তারা মাথা গলাতে চায়। কাজী নজরুল ইসলামকেও তারা কম আক্রমণ করেনি । নজরুল স্মৃতি চারণায় উঠেছে আসে – তাঁর সময়ে তাঁকে একদিকে যেমন একটা প্রতিষ্ঠিত বিরুদ্ধ শিল্প – সাহিত্য গোষ্ঠীর লাগাতার ব্যাক্তিগত আক্রমণের মোকাবিলা করতে হচ্ছিলো অন্যদিকে মুসলিম সমাজেরই একটা অংশ লাগাতার ফতোয়া দিয়েছে। এই দুয়ের মোকাবিলা ও সাংসারিক জীবনের ঘাত প্রতিঘাতে আমাদের প্রাণের কবির মনোজগৎ বিষাদময় হয়ে ওঠে। এই সবের সঙ্গে লড়তে লড়তে এক সময় কবি মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলে।
মুসলিম সমাজের নারী শিক্ষা ও সাহিত্য -সংস্কৃতি চর্চার অবস্থা আরও করুণ। এমন একটা সময় ছিল যখন মুসলিম নারীদের শিক্ষা -সংস্কৃতি চর্চা তো দূরের কথা বাড়ির বাইরে পা দেওয়া টাও কঠিন ছিল। তৎকালীন সময়ের সঙ্গে আপোসহীন লড়াই করে বেগম রোকেয়ার মতো দুচারজন নারী সামনের সারিতে উঠেছে আসলেও সামগ্রিক চিত্রটা খুবই খারাপ। এমনকি এই সময়েও দাঁড়িয়ে নারী শিক্ষার কিছুটা অগ্রগতি হলেও সাহিত্য -সংস্কৃতির আঙিনায় তাঁদের দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়।
দীর্ঘ কয়েকদশক ধরে শিক্ষা -সংস্কৃতি -সাহিত্য বঞ্চিত এই সমাজ এক প্রান্তিক সীমায় পৌঁছে গেছে।এখন থেকে দু একজন নেতা উঠে আসলেও তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়ে মেতে থাকলো – মুসলমান সমাজকে টেনে তুলে শিক্ষা -সংস্কৃতির আঙ্গিনায় আনার চেষ্টাই করলেন না। এ বি এ গণিখান, সৈয়দ বদরুদোজা এর মতো দু একজন ব্যাতিক্রমী নেতার কথা বাদই দিলাম। ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এদের কে ভোট ব্যাঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে। সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে|

আর একটা বিষয় উল্লেখ করতেই হয় মুসলিম সমাজকে অন্য সম্প্রদায় বাঙালি মানতে চায় না। আবার অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে মুসলিম মানেই উর্দুভাষী। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দেখি পশ্চিমবঙ্গে উর্দুভাষী মুসলিমদের সংখ্যা ২-৩ শতাংশের আশেপাশে আর বাকি ৯৭% বাংলাভাষী মুসলিম অথচ ক্যাবিনেটে বারবারই তিন-চারজন উর্দুভাষী থাকলেও এক-দুজন থাকেন বাংলাভাষী এক রহস্যময় বিষয়! আবার পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ টার মত বিধানসভা আছে মুসলিম মেজরিটি এবং ৩০-৩৫ টির মত বিধানসভা মুসলিমদের সংখ্যা ভোটের ময়দানে বিশাল ফ্যাক্টর।এখন প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই সমাজ থেকে ৩০-৪০ টার বেশি প্রার্থী দিতে দেখিনি। আবার হিন্দু প্রধান অঞ্চলগুলোতে মুসলিম প্রার্থী দেওয়ার উদারতা দেখাতে কোনো দলকেই দেখি না।সেইসাথে রাজ্যসভাতেও মুসলিম প্রতিনিধি পাঠানোর ইতিহাস খুব একটা ভালো নয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে বন্টিত দপ্তর গুলির গুরুত্বহীন কোনটি গরু ছাগল হাঁস মুরগি দপ্তর কোনটা খাবার দাবার প্রক্রিয়াকরণ। আবার সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করে পদটি অকার্যকর করে রাখা হয়েছিলো দীর্ঘদিন। এবার পূর্ণ সময়ের মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে দেখা যাক কি হয় |তবে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন।থেকে আলিয়া ইউনিভার্সিটি যে অন্ধকারের মধ্যে দিনদিন নিমজ্জিত হচ্ছে সেটা নিয়ে সরকারের হেলদোল খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সরকারি আমলা ও প্রশাসনিক দপ্তরেও এই সমাজের প্রতিনিধি খুবই কম । আইপিএস ডক্টর নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবীর, জাভেদ শামীম এরা ব্যতিক্রম বলা যেতে পারে। সম্প্রতিকালে কিছু ডব্লিউবিসিএস রেঙ্ক এর প্রতিনিধি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ পাঁচদশক পর বিংশ শতকের শেষ ভাগে পচিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে আধুনিক শিক্ষার দিশা নিয়ে কতিপয় মুসলমান সন্তানের উদ্যোগে মিশন স্কুল স্থাপিত হতে থাকে যার অন্যতম পথিকৃৎ নুরুল ইসলাম ও আল আমিন মিশন। সমসাময়িক কালে গড়ে ওঠা শিশু বিকাশ একাডেমী, মওলানা আজাদ একাডেমী, জিডি স্টাডি সার্কল সহ কয়েকশো মিশন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুসলমান সমাজে আধুনিক শিক্ষার জোয়ার এনেছে। ফলে প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ার, সরকারি আমলা, প্রফেসর, শিক্ষক সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা অবদান রাখছে। কিন্তু এই সব শিক্ষিত শ্রেণির একটা বিশাল অংশ সাহিত্য -সংস্কৃতি রাজনীতি বিমুখ। প্রতিষ্ঠিত হবার পর এইসব ছেলে মেয়েদের একটা বিশাল অংশ নিজের ও পরিবারের হোক সুখ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন এবং শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজকর্ম এরা মাথা ঘামাতে চান না।ফলে সাহিত্য – সংস্কৃতি ও রাজনীতির জগতে সেই শূন্যতাই রয়ে গেছে।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অবিভক্ত বঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মুস্তাফা, মীর মোশারফ হোসেন, সৈয়দ মুজতবা আলী, জসিম উদ্দীন, কাজী আব্দুল ওদুদ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সুফিয়া কামাল, বন্দে আলী মিয়া, এস. ওয়াজেদ আলী প্রমুখ স্বনামধন্য সাহিত্যিকদের হাত ধরে মুসলিম সমাজ সাহিত্য জগতে যে স্বর্ণযুগ রচনা করেছিল সেই ঐতিহ্য আজ কোথায়? অবশ্য ওই সময় বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকা, ধূমকেতু, সওগাত, নবযুগ, সেবক ইত্যাদি পত্র পত্রিকা অনুঘটকের কাজ করেছিলো।
পরবর্তীকালে দুচারজন কবি সাহিত্যিক কঠোর পরিশ্রম করে কিছুটা দুর্ভেদ্য সাহিত্য সমাজে বিশেষ স্থান করে নিলেও সংখ্যাটা হাতেগোনা। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আবদুল আজিজ আল আমান,আফসার আহমেদ,আবুল বাশার, আব্দুর রাকিব, খাইরুল বাশার, এ মান্নাফ,সোহরাব হোসেন, আব্দুল জব্বার প্রমুখ।

স্বাধীনোত্তর কালে রাহেলা,কাফেলা,চতুরঙ্গ ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা গুলো কিছুটা আলো দেখালেও এখন আর প্রকাশিত হয় না।
সম্প্রতি কলম,দিন দর্পন, বাংলার রেনেসাঁ, মীযান,আপনজন, নতুন গতি,লালপরী নীলপরী, পুনশ্চ,আলিয়া প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে চলেছে বটে তবে এদের সংখ্যা খুবই কম।

সমসাময়িক কালে মুসলিম সমাজের সাহিত্যিকগণকে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে কেন? অথচ এই সময়ে নারায়ণ দেবনাথ, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, প্রচেত গুপ্ত,সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী,তিলোত্তমা মজুমদার,শ্রীজাত,সুবোধ সরকার, সহ অসংখ্য কবি সাহিত্যিকগণ সগর্বে উপস্থিত।শুধু তাই নয় সমসাময়িককালে অলীক মানুষ,ফুল বউ, মেটিয়াবুরুজ কিসসা, বাংলার চালচিত্র, ইলিশ মারির চর, কর্নেল সমগ্র,এর মতো দু-চারটি গ্রন্থ ছাড়া মুসলিম সাহিত্যিকের লেখা বহুল প্রচারিত গ্রন্থ কই?

ইদানিংকালে মুসলিম মানসের হাতে গোনা কয়েকজন সাহিত্য চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তা বিশাল জনসমষ্টির তুলনায় নগন্য মাত্র। বাংলায় বহুল প্রচলিত সাহিত্যের ইয়ারবুক বা উইকিপেডিয়াতে উঁকিমেরে দেখলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সাহিত্য চর্চার কঙ্কালসার চেহারাই ফুটে ওঠে। বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য সম্পাদিত জহিরুল হাসান প্রতিষ্ঠা ও সাহিত্যের ইয়ারবুক ২০২০তে প্রকাশিত প্রায় ২০১০ জন সাহিত্যিক এর মধ্যে মাত্র ১৭৮জন মুসলিম নাম এবং প্রকাশিত ১৭০০ টির মত সাহিত্য পত্র পত্রিকার মধ্যে মাত্র ৭৮ টি মুসলিম নামের সম্পাদক।

সংস্কৃতি জগতের দৈন্যদশা আরো প্রকট। আলো বলতে মীর( আফসার আলী), কবীর সুমন, গাজেলা ইয়াসমিন,রফিউদ্দিন,হাসমত জালাল,রূপম ইসলামের মতো গুটিকতক ব্যক্তি।

মনে রাখতে হবে একজন সংখ্যালঘু মুসলিম বাঙালির বাড়িতে একটি দুটি হলেও বই পাবেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – কোরআন, হাদিস, নামাজ শিক্ষা, নবিকাহিনি ইত্যাদি সম্পর্কিত। আর আশার আলো এখানেই। এখন আমাদের এটাকেই দিশা ধরে এগিয়ে যেতে হবে। ধর্মীয় গ্রন্থ চর্চার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া জগৎ জীবন সম্পর্কে জানার ও একাত্ম হওয়ার জন্য সমাজ-সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চা ও যে জরুরি তা তাদের বোঝাতে পারলে এই সমাজে একটা একটা বলিষ্ঠ পাঠক সমাজ তৈরি হতে পারে। সাথে সাথে লেখক গোষ্ঠীর উদ্ভব তখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র হয়ে উঠবে।

আর একটা কথা বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব আকাশ থেকে পড়েনা। তার জন্য চাই সুশিক্ষা, গভীর পড়াশুনা, চিন্তা ভাবনা, সামাজিক সংগঠন ও কিছু আইকন। দুঃখের বিষয় আমাদের সামনে এই মুহূর্তে আইকন নেই বললেই চলে। বরং অবাঙালি মুসলিমদের সামনে বিজনেস, চলচ্চিত্র, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সঙ্গীত, খেলোয়াড়, সাহিত্যিক, কবি, ধর্মীয় নেতৃত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু আইকন দেখতে পাবো।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজের এই ভয়ংকর সাহিত্য -সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকটের মুহূর্তে আমাদের ভাবতে হবে এর থেকে উত্তরণের পথ কী? সমসাময়িককালে পচিমবঙ্গের মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে যে উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে, সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাহিত্য থেকে রাজনীতিতে কীভাবে নবজাগরণ ঘটানো যায় তারজন্য সকল মুসলিম সাহিত্য -সংস্কৃতিপ্রেমী ও শিক্ষিত সচেতন জনসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।


এম রুহুল আমিন : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক,সাহিত্য সংগঠক, শিশুর বিজ্ঞান অভিমুখীকরণ ও আঞ্চলিক ইতিহাস অনুসন্ধানী।