• August 18, 2022

গুরুদেবের শঙ্কা, অচলায়তনের পথেই বিশ্বভারতী

 গুরুদেবের শঙ্কা, অচলায়তনের পথেই বিশ্বভারতী

অভিষেক দত্ত রায়

যে শঙ্কা ছিল গুরুদেবের মনে, সেই শঙ্কাই যেন অনেক গুলি দশকের পর আস্তে আস্তে শ্যাওলার মত ঘিরে ধরছে ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’কে। শিক্ষার পদ্ধতি, চেতনালোক সংক্রান্ত বিষয়ে কবির চিন্তাধারা, আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ সমসাময়িক সময়ে ও তার পরবর্তী সময়ে বহু জায়গায়, বহু ক্ষেত্রেই হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্র গুলিতে চেতনা আনতে, শিক্ষাধারার অভিমুখ বদলাতে তৎকালীন শিক্ষাবিদ, প্রশাসনিক কর্তা ব্যাক্তিদের চোখের ঠুলি খুলে দিয়ে ১৯১১ সালে গুরুদেব লিখেছিল তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘অচলায়তন’। প্রথম এই নাটকটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়। নাটকটির সারমর্ম রুদ্ধ শিক্ষার অবচেতন দেওয়াল ভেঙে তোলপার করে দিয়েছিল সমগ্র শিক্ষা ব্রহ্মাণ্ডকে। নাড়া দিয়েছিল প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজার কড়ায়। অতপর, ১৯২০ সালে আরও একবার কবির কলমে ধাক্কা খেয়েছিল চিরাচরিত শিক্ষা ব্যাবস্থা, শিক্ষার মান, শিক্ষার পরিকাঠামো। কবি রচনা করেছিলেন অতি তাৎপর্যপূর্ণ লেখনী ‘তোতা কাহিনী’। এই রচনাটিও যথেষ্ট শিক্ষামূলক সমালোচনায় জায়গা করে নিয়েছিল। কবিগুরুর চোখে তৎকালীন ও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দিক ধরা পরেছিল। ধর্মীয় আগ্রাসন মূলক শিক্ষা, এক নায়কতন্ত্রী শিক্ষা প্রভৃতির পাঠ শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে গুরুদেব উন্মূক্ত শিক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন। যে শিক্ষা সমাজ গড়ে, যে শিক্ষা গৃহ বন্দী শিক্ষা নয়, মুক্ত আকাশের নিচে প্রকৃতিকে জানতে জানতে শেখা। বাস্তব ও বইয়ের পৃষ্ঠার পার্থক্য বুঝে পথ চলার শিক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন কবি। এই কথা গুলি কবি বার বার তাঁর বিভিন্ন লেখনীতেও ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, পরিব্রাজকের শিক্ষা, সেখানে জ্ঞানের প্রাচীর থাকবে না। তিনি লিখেও ছিলেন, ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর’। এই চিন্তা চেতনা থেকেই কবিগুরু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আপন মনের মাধুরী মিশ্রিত ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’। যে বিশ্ববিদ্যালয় দেশে-বিদেশের আর পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে সম্পূর্ন ভিন্ন। কবি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, গাছের তলায়, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকেও উচ্চ শিক্ষা লাভ করা সম্ভব। চার দেওয়ালের মাঝে নয়, ছয় ঋতুর মাঝে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম নজির এই ‘বিশ্বভারতী’।
“নতুন সভ্যতার উদয় যার হাত ধরে,
সে সর্ব ক্ষেত্রে কৃষ্টি ধারী আলয়।
পৃথিবীর দুই মেরু জুড়ে দেওয়ার সংস্কৃতির শ্রষ্ঠা,
জ্ঞান গগণের উজ্বল ধ্রুবতারার নাম বিশ্বভারতী”।।
কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন গতিতে যেন বদলে যাচ্ছে এই ‘বিশ্বভারতী’। পাল্টে যাচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সুর, পরিকাঠামো, পদ্ধতি, রীতি, রেওয়াজ। এক কথায় ‘বিশ্বভারতী’ যেন ধীরে ধীরে ‘অচলায়তনে’ পরিণত হচ্ছে। কার্যত এই ভয়টাই বারে বারে কুঁড়ে খেয়েছিল কবির মনে। এক সময়ের এক শোনা গল্প রয়েছে, গুরুদেব তখন জীবিত। বিশ্বভারতীর গুটি কতক আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রীর অভিবাবক পঠন-পাঠন সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে এসেছিলো। গুরুদেব তাদের বলেছিলেন, ‘আমি চাই আপনারাও আপনাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আশ্রমের পঠন-পাঠনে নিজেদের যুক্ত করে মনের মত সাজিয়ে তুলুল আশ্রমটি’। গুরুদেবের সেই কথায় অভিযোগ নিয়ে আসা অভিভাবকেরা মাথা নত করে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁরা এক একজন একটি দিক সামলে ছিলেন আশ্রমের। অর্থাৎ গুরুদেব এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজ নিজ মননে, চেতনায় গেঁথে নেওয়ার কথা তুলে ধরেছিলেন। তাই তো তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দিয়েছিলেন ‘বিশ্বভারতী’।
এক্ষেত্রে কিছু কথা বলাই বাহুল্য, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রুপ’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে প্রাচীন ভারতের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় গুলির ধারাবাহিকতা, শিক্ষা চরিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্বানের আসন চিরপ্রসিদ্ধ। সমস্ত সভ্য দেশ আপন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে জ্ঞানের অবারিত আতিথ্য করে থাকে’। তাঁর মতে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হল একটি সাধনার পীঠস্থান। অর্থাৎ স্বদেশ, বিদেশ সকল জায়গার মানুষজনের জন্য জ্ঞানের সাধনা ক্ষেত্র হল বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে আধুনিক মানুষের কাছে তুলে ধরেন এবং চীনা ও তিব্বতি ভাষায় শিক্ষা দানের কক্ষ শুরু করেন। পরে একে একে বহু ভাষায় শিক্ষা দান শুরু হয়। যেমন- মাদাম, লেভি, ফরাসি ভাষায় শিক্ষা দিতে শুরু করেন। প্রাচ‍্য জ্ঞান জগতে সুপরিচিতদের আগমন বিশ্বভারতীকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল। ‘বিশ্বভারতী’ আন্তর্জাতিক স্তরে সমৃদ্ধ লাভ করেছিল। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের বিশ বতসর এইবার পূর্ণ হইল। এই দীর্ঘকাল বিদ্যায়তনের ব্যায়ের মূলাংশ কবি একাই বহন করিয়া আসিতেছিলেন, কিন্তু, বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর হইতে তাহার একার পক্ষে এ ভার বহন করা সম্ভব নহে। বিশ্বভারতীতে নানা বিষয় অধ্যায়ন, অধ্যাপনার পরিকল্পনা রহিয়াছে, বিদেশ হইতে গুণী জ্ঞানীদের আসিবার সম্ভাবনা। কবির মনে তাহাঁর ‘মিশন’ সম্বন্ধে কোন দ্বিধা নাই; তাহাঁর অন্তরের বিশ্বাস আন্তর্জাতিকতার মনোশিক্ষা না পাইলে ভাবীকালের সভ্যতা টিকিবে না’ (রবীন্দ্র জীবিনী তৃতীয় খন্ড)।
‘বিশ্বভারতী’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শান্তিনিকেতনের নতুন এক অধ্যায়, এক যুগের সূচনা হয়েছিল। নতুন যুগের, নতুন কালের সেই অতিথিশালায় মানুষের সঙ্গে মানুষের হার্দিক মিলন, যোগাযোগ অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল। এমনকী, শান্তিনিকেতন ত্যাগ করে অধ্যাপক বিধুশেখর ভট্টাচার্য সংস্কৃত শিক্ষার প্রসারের জন্য গ্রামে ফিরে গিয়ে টোল প্রতিষ্ঠা করতে ব্যার্থ হলে গুরুদেব পুনঃরায় তাঁকে ফিরিয়ে আনেন বলে শোনা গিয়েছিল। দেশ, বিদেশের গন্যমান্য ব্যাক্তি বর্গের সম্মিলনের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে ‘বিশ্বভারতী’। বিশেষ করে ১৯২২ থেকে ১৯২৩ সালে এই ‘বিশ্বভারতী’ নানা দিক দিয়ে, নানা ভাবে বিশ্বের শিক্ষা দরবারে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। বিদেশি অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সকলের জন্য বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন ধর্মের মানুষজনের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিন গুরুদেব। গুরুদেবের জীবনাবসানের পরে পরেও এই ধারা বজায় ছিল কয়েক দশক। কিন্তু, আশির দশকের শেষের দিক থেকে এই রীতি রেওয়াজে চির ধরতে দেখা যায়। বদলাতে শুরু করে বিশ্বভারতীর পঠন-পাঠন পদ্ধতি, নিয়ম শৃঙ্খলারও বদল ঘটতে থাকে কিছু কিছু করে। সময়ের সাথে সাথে একে একে বিসর্জিত হতে দেখা যাচ্ছে মূল আদর্শ গুলিকে। গুরুদেবের আদর্শের ধারক বাহকেরা আজ লুপ্ত প্রায়। কমে গিয়েছে গাছের তলায় বসে উচ্চ শিক্ষার পঠন-পাঠন। পাঠভবনের পঠন-পাঠন গাছের তলায় হলেও, চীনা ভবনের সামনে, গৌর প্রাঙ্গণের কাছে মুক্ত পরিবেশে ছাতার তলায় পঠন-পাঠন প্রায় বন্ধের মুখে। আশ্চর্য লাগে এই দেখে বা ভেবে, এই সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ কন্ঠে প্রতিবাদ করার, নতুবা হাল ধরার আশ্রমিকেরও আজ বড় অভাব। সকলের কন্ঠ যেন এক সাথে রুদ্ধ আজ। একদিকে গুরুদেবের চিন্তা চেতনা লোপ পাচ্ছে ‘বিশ্বভারতী’ থেকে, অন্যদিকে, আশ্রমিক নামক ব্যক্তিরা নামের তকমা জুড়ে সাহিত্য সভায় যোগ দেন মাত্র। আদর্শগত পার্থক্য তুলে ধরার, হাল ধরার মানুষটির অভাব আজ খুবই বিদ্যমান বিশ্বভারতীতে। যারাই অচলায়তনের পাঠ দান করেন, তাদেরই অচলায়তনের জন্য মিছিলে হাঁটতে দেখা যায়। এখন বিশ্বভারতী অন্যান্য বানিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি থেকে কোন অংশে কম বলে মনে করার কোন রুপ প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে উঠেছে। একই ভাবে, গতানুগতিক শিক্ষা ধারা ব্যহত বর্তমানে, পাশাপাশি ডিগ্রি অর্জন। সম্প্রতিকালের ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতটা আদর্শগত শিক্ষিত হল সেটার থেকেও বড় ‘বিশ্বভারতী থেকে ডিগ্রি পেয়েছি’ এই বলে বিস্তার করার আত্মকেন্দ্রিক আনন্দ।
এক কথায় যদি বলি, কবির ভয়ের জায়গাতেই পৌঁছে যাচ্ছে তাঁর স্বপ্নের ‘বিশ্বভারতী’। পরিণত হচ্ছে শ্যাওলা ধরা এক অচলায়তনে, তোতা কাহিনীর মত পুঁথির পৃষ্ঠা মুখে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে পড়ুয়াদের। যা সত্যিই প্রকৃত রবীন্দ্র অনুরাগী মানুষজনের কাছে মর্মান্তিক কালো দিন ধেয়ে আসার মত যন্ত্রণাদায়ক। বিশ্বভারতীকে মানুষ বিশ্বের দরবার মনে করেন। সেই দরবারে দ্বার আজ সবার জন্য নয় অথবা সীমিত। যেটা কোন সচেতন মানুষের কাম্য নয়। আজ বিশ্বভারতী শেখায় শাসকের হয়ে বিজ্ঞাপন দিতে, আজ বিশ্বভারতী শেখায় শাসকে তোষণ করতে, আজ বিশ্বভারতী শেখায় শাসকের শোষণ সহ্য করতে, আজ বিশ্বভারতী শেখায় শাসকের চাটুকারিতা করতে৷ “প্রতিবাদ” শব্দটি ম্লান থেকে ম্লানতর৷ “আশ্রমিক” শব্দের ব্যবহার থাকলেও বিশ্বভারতীই আজ আশ্রম নয়, এটাই কঠিন বাস্তব৷

এর সমাধান যে নেই তা নয়, সমাধানের এক ও অদ্বিতীয় পথ হল বিশ্বভারতীকে রক্ষা করতে চাই বিরামহীন ভয়াবহ ‘শিক্ষা বিপ্লব’।

অভিষেক দত্ত রায় : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post