• December 4, 2022

হারিয়ে যাচ্ছে জলঙ্গি নদী- পথে নেমেছে কচি কাঁচারাও

 হারিয়ে যাচ্ছে জলঙ্গি নদী- পথে নেমেছে কচি কাঁচারাও

সন্তোষ সেন

নদীয়া জেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর মধ্যে জলঙ্গি বা খড়ে অন্যতম। এই নদীর উৎসমুখ মুর্শিদাবাদ সংলগ্ন ভগবানগোলার গঙ্গা তথা পদ্মা। উৎসমুখ থেকে কৃষ্ণনগর- তেহট্ট- নবদ্বীপ পর্যন্ত ২২০ কিলোমিটারের বেশি পথ বেয়ে শেষ পর্যন্ত জলঙ্গি মিশেছে হুগলি বা ভাগীরথী নদীতে। যাত্রাপথের বিস্তৃর্ণ অঞ্চল জুড়ে যা এক নৈসর্গিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। নদীর দুই পাড়ে এক বড় এলাকায় কৃষিকার্যে সেচের পাশাপাশি জলপথে পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। দুই পাড়ে পলি সমৃদ্ধ উর্বর কৃষিজমি, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালির আবাসস্থল উপহার দেওয়ার পাশাপাশি এলাকার কয়েক হাজার মৎস্যজীবীর জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে জলঙ্গি তার সুস্বাদু মাছের ডালি সাজিয়ে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য, নদী-বাস্তুতন্ত্ৰ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থাও সমৃদ্ধ করে এসেছে নদীয়া জেলার নদীগুলি
(যা অবশ্য সকল নদীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য)। কৃষ্ণনগরের উপকণ্ঠে মাটির পুতুলের জন্য বিখ্যাত ‘ঘূর্ণি শিল্পগ্রাম’ এই জলঙ্গির তীরে অবস্থিত। চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান নবদ্বীপ ও মায়াপুরকেও আলোকিত করেছে জলঙ্গি ও ভাগীরথীর মিলিত প্রবাহ। জলঙ্গির রূপ ও গুণে মুগ্ধ হয়ে লোকশিল্পী বাবলু হালদার গান বেঁধেছেন–” ও আমার জলঙ্গি নদী, তোর কোলেতে রইলাম আমি জনমো অবধি। আর প্রকৃতি প্রেমিক কবি জীবনানন্দ উপহার দিয়েছেন–
” আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে জলঙ্গীর দুঃখে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়”।

বিপর্যস্ত প্রকৃতি-পরিবেশ মেরামতি ও পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রয়োজন এইসব নদীগুলির সংস্কার ও বহমানতা বজায় রাখা। অথচ বাস্তবে ঠিক এর বিপরীত কর্মকাণ্ডই রূপায়িত হয়ে চলেছে। সভ্যতার (!) রথের চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে জলঙ্গীর উপর গড়ে উঠেছে দুটি রেল ব্রিজ সহ মোট পাঁচটি ব্রিজ, আরো তিনটি সেতু নির্মাণের কাজ চলছে জোর গতিতে। নদীগর্ভের অনেকাংশ বুজিয়ে নদীর বুক চিরে বেশ কয়েকটি অস্থায়ী বাঁশ ও কাঠের সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক
প্রবাহমানতাকে কাজে লাগিয়ে নৌকা না চালিয়ে জনগণের পারাপার হচ্ছে এইসব সাঁকোর উপর দিয়ে ইজারাদারদের স্বার্থে। আবার অনেক জায়গায় মাটি-ইঁট-ঘাস-খড় দিয়ে নদীর বুকের উপর দিয়ে গড়ে উঠেছে গাড়ি যাতায়াতের রাস্তা। ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, বাড়ছে জলের দূষণ। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় বিপন্ন হচ্ছে মাছ সহ সমস্ত জলজ প্রাণ।
নদীপ্রেমী ও পরিবেশ কর্মীদের দাবি– নদীর উৎসমুখ অনেকদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। উৎসমুখ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদী পুরোপুরি প্রবাহহীন হয়ে আজ মৃতপ্রায়। বাকি অংশেও চলছে নদী বুজিয়ে ফেলার কাজ। নদীখাত দখল করে ক্রমশ সেতু, রাস্তা তৈরি হয়ে চলেছে।
বর্ষার জলে পুষ্ট গ্রাম বাংলার নদীখাত অনেক সময়ই শুকিয়ে যায় প্রাকৃতিক কারণে বৃষ্টির অভাবে। আজকের সময়ের দাবি– এইধরণের নদীগুলোকে পরিকল্পনা মাফিক সংস্কার করে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্ৰকে রক্ষা করা। প্রয়োজন নতুন নতুন দীঘি পুস্করিনী জলাশয় খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। অথচ হাঁটা হচ্ছে উল্টোপথে উজান বেয়ে। বর্তমানে তথাকথিত ছিন্নমূল উন্নয়নকে অজুহাত করে এইসব নদীগুলোকে শুকিয়ে মারা হচ্ছে পরিকল্পিত চক্রান্ত করে। মুষ্টিমেয় মানুষের লোভের করালগ্রাসে বলিপ্রদত্ত হচ্ছে নদী-নালা-খাল-বিল, জল-জঙ্গল-জমিন সব। ক্রমশ চুরি হয়ে যাচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী জলাশয়গুলি। ইতিহাসের সরণি বেয়ে বছর কুড়ি পিছিয়ে গেলে প্রচুর মানুষের স্মৃতিপটে ভেসে উঠবে কল্লোলিনী এইসব নদীর জলে অবগাহন, সাঁতার কাটা, মাছ ধরার অকৃত্রিম আনন্দের কথা। উঠে আসবে নানান আবেগ অনুভূতি, ভালোলাগা ও সুখ-দুঃখের কাহিনী।

সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে একটু একটু করে জলঙ্গির স্বাভাবিক প্রবাহকে রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ায় হারিয়ে যাচ্ছে জলজ প্রাণ –জীবিকাচ্যুত হচ্ছেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। কমে যাচ্ছে নদীর নাব্যতা, নানা জায়গায় দেখা দিচ্ছে ভাঙ্গন। চূর্ণী, জলঙ্গি দেখে পুকুরের থেকে আজ এদের ফারাক করাই দুঃসাধ্য। অর্থাৎ নেতা- বাবু- ঠিকাদারের লোভ-লালসার ত্রহ‍্যস্পর্শে অদূর ভবিষ্যতে জলঙ্গি ফিরিয়ে আনবে শুকিয়ে যাওয়া মৃত অঞ্জনা নদীর স্মৃতিকে।

কিন্তু এলাকার মানুষ চান না এইভাবে চোখের সামনে নদীগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হোক। তাই সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে জলঙ্গিকে শুকিয়ে মারার চক্রান্তের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই কোমর বেঁধেছেন, গড়ে উঠেছে “জলঙ্গি বাঁচাও কমিটি”। দাবি উঠেছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথকে বিঘ্নিত না করে অবিলম্বে সংস্কার করে জলঙ্গিকে তার আগের যৌবন ফিরিয়ে দেওয়া হোক। “জলঙ্গি বাঁচাও” সাথীদের সুরে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই– নদীর প্রবাহমানতা বজায় রাখতে মুক্ত করা হোক সব ধরনের বাধা বিপত্তিকে। বাঁচুক জলঙ্গি, চূর্ণী, সরস্বতী। অঞ্জনা ফিরে পাক তার শৈশবের স্মৃতি। বাঁচুক পরিবেশ– রক্ষা পাক নদীর সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র, বেঁচে থাকুক নদীর উপর নির্ভরশীল এলাকার প্রান্তিক মানুষজন।

নদী বাঁচানোর উদ্যোগে সামিল হয়েছে কচিকাঁচারাও। নদীয়া জেলার বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দশ হাজার পড়ুয়া এগিয়ে এসেছে নদী-নিসর্গ-প্রকৃতির টানে তাদের আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসার উজাড় করে। “HELLO D.M.” নাম দিয়ে জেলাশাসকের কাছে তারা একের পর এক চিঠি পাঠাতে শুরু করেছে। ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্র শুভম মৈত্র’ র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-আকুতি ভরা চিঠি এই নিবন্ধের শুরুতেই নিশ্চয় পাঠকদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। শুভম ,মনিদীপা, শবনম, আয়েশা, – – – – তোমাদের লেখনী গর্জে উঠুক এই ভাবেই। তোমরাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। বড়দের- প্রাজ্ঞদের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা- সমর্থন নিয়ে তোমাদেরই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ও মেরামতের কাজে। পড়াশোনার পাশাপাশি এইসব “বলাই” দের প্রকৃতিপ্রেমই রক্ষা করতে পারে চুরি হয়ে যাওয়া নদী-বিল-খাল-সরোবর। রক্ষা করতে পারে জল জঙ্গল জমিসহ তামাম বাস্তুতন্ত্ৰ। চিরকালের মতো কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে অণুজীব থেকে বৃহৎ প্রাণ সহ মানব সভ্যতাকে। এসো জীবনের জয়গান গাই।

সন্তোষ সেন : বিজ্ঞান শিক্ষক, বিজ্ঞান ও পরিবেশ কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post