• June 29, 2022

ছোট ছোট প্রতিবাদের প্রতিস্পর্ধা ছড়িয়ে দিতে ঐক‍্যবদ্ধ হতে হবে

 ছোট ছোট প্রতিবাদের প্রতিস্পর্ধা ছড়িয়ে দিতে ঐক‍্যবদ্ধ হতে হবে

সম্প্রীতি মুখার্জী

নরেন্দ্রপুর থানা যে ধারাগুলিতে দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তার আইসার ছাত্রছাত্রীদের ওপর মামলা দিয়েছে তার মধ‍্যে আছে ৩৩৩ ধারা: “পুলিশকে তার ডিউটিতে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ‍্যে স্বতপ্রণোদিত হয়ে হামলা চালিয়ে মারাত্মক জখম করা”। পুলিশ সকলকে রাস্তায় ফেলে পেটালো, থানার ভেতরে নিয়ে মারল, মহিলাদের রেপথ্রেট দিল, তারপর অভিযোগ আনল পুলিশেরই ওপর হামলা চালিয়ে মারাত্মক জখম করার! পুলিশ মারাত্মক জখম হওয়ার মেডিক‍্যাল সার্টিফিকেটও জমা দিয়েছে নিশ্চয়। গভীর রাতে দুজন কমরেডকে থানা লকাপ থেকে বারুইপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বডি ফিটনেস সার্টিফিকেট আনতে; হলুদ রঙের স্লিপে আগে থেকেই ফিটনেস সার্টিফিকেট লেখা ছিল, সেখানে নাম ও বয়স বসিয়ে নিলেন ইমার্জেন্সিতে বসে থাকা ডাক্তার! একই পদ্ধতিতে পুলিশের ‘মারাত্মক জখম’ হওয়ার সার্টিফিকেটও ডাক্তারবাবুরা বানিয়ে রেখেছিলেন নিশ্চয়।

৭ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা নাগাদ নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ উন্মত্তের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্রছাত্রীদের ওপর, থানার সামনের রাস্তায়। থানার ভেতরে নেগোশিয়েশন চলছিল, ছাত্রছাত্রীরা রেলিঙের ধারে বসে ছিল তাঁদের কমরেডদের ছাড়া পাওয়ার অপেক্ষায়। গান গাইছিল তারা মৃদু স্বরে ডাফলি বাজিয়ে। থানার বারান্দা থেকে কমরেডদের নেমে আসতে দেখে শ্লোগান দিতে শুরু করে তারা। নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ এই শ্লোগান তোলাকে তাদের কর্তৃত্ত্বকে চ‍্যালেঞ্জ করা হিসেবে নেয় এবং তৎক্ষনাৎ ছাত্রছাত্রীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুহুর্তে ওপর থেকে নেমে আসে আরও কয়েকজন। অধিকাংশই সাধারণ পোশাকে, তারা পুলিশ না ভাড়াটে গুণ্ডা বোঝার উপায় নেই। রাস্তায় ফেলে মারা শুরু হয় এবং তারপর চ‍্যাংদোলা করে থানার ভেতর নিয়ে যায় ওরা। সেখানে আরেক পর্ব অত‍্যাচার চলে। ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পাসওয়ার্ড দিতে না চাওয়ায় বুকে লাথি মারে পুলিশ। লকাপে ঢুকিয়ে নেওয়ার পরেও ক্রমাগত হেনস্থা করে চলে কমরেড সৌমি জানা ও বর্ষা বড়ালকে।

পুলিশ প্রথম দফার গ্রেপ্তার করেছিল বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। মতপ্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার ঊর্ধে তুলে ধরে একটা ছোট প্রতিবাদ ছিল। থানা থেকে অনেকটা দূরে বিশ বাইশ জনের একটা ছোট সাধারণ প্রতিবাদকেও সহ‍্য করতে নারাজ পুলিশ। প্রথমেই কমরেড রুদ্র প্রভাকর দাসের চুলের মুঠি ধরে মারে এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নিতে চায় পুলিশ, সে ফেসবুকে লাইভ করছিল প্রতিবাদী কর্মসূচীটি। অন‍্য কমরেডরা প্রতিবাদ করলে তাঁদের টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম পর্বে গ্রেপ্তার করে আইসার তিনজন, এপিডিআরের দুজন ও আইপোয়ার একজন কমরেডকে। খবর পেয়ে অনেকে আসতে শুরু করেন। গ্রেপ্তার হওয়া কমরেডদের ছাড়ার ব‍িষয়ে কথা বলতে যারা ভেতরে যান তাঁদের সাথেও দুর্ব‍্যবহার করে পুলিশ। শেষে দশটা নাগাদ ছাড়া পাওয়ার পর শ্লোগান তোলায় আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ।

“বারুইপুর পুলিশ জেলা”-র অন্তর্গত এই থানা। প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের পেটানোর সময় যে আক্রোশ ও জিঘাংসা প্রকাশ করছিল তার ধরণ খানিকটা আরএসএস অনুপ্রাণিত মবলিঞ্চিঙগুলির মত। সঙ্ঘীদের মতই যাদবপুর বিশ্ববিদ‍্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও মহিলাদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব‍্য এবং “হিন্দু ভাবাবেগ” আহত করার অভিযোগ তুলছিল ওরা। ছাত্রছাত্রীদের কোমরে দড়ি বেঁধে অবমানিত করতে করতে আদালতে নিয়ে যাওয়ার মধ‍্যেও পুলিশের এই মনোভাব ব‍্যক্ত হয়েছে। কিছুদিন আগে এই পুলিশ জেলারই সোনারপুর থানা সোহরাব হোসেন ও তাঁর পরিবারের ওপর নির্মম সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছিল। এই মামলাটি এখন নরেন্দ্রপুর থানার আওতায় চলছে এবং সখানে তাদের সাম্প্রদায়িক অবস্থান প্রকট হয়েছে। বৃহত্তর কলকাতার মধ‍্যেই, কামালগাজি মোড়ে অবস্থিত, এই থানার বাড়িটিও উদ্ভট। ছয় তলা বিশাল বিল্ডিং জুড়ে একই সাথে থানা ও বিয়েবাড়ি। বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল, আলোকমালায় সাজানো ছিল থানা। থানার ভেতর শাসানোর সময় পুলিশ আক্ষেপ করছিল যে এইসব ঝামেলার ফলে আর বিয়েবাড়ি ভাড়া নিতে চাইবে না কেউ!

ভারতীয় সমাজের পুরানেতিহাস নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা দলিত আন্দোলনের অবিচ্ছেদ‍্য অঙ্গ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে কি হবে না সে প্রশ্ন তোলার অধিকারও সকলের আছে। এই অধিকারের পক্ষে না দাঁড়ালে তা ব্রাহ্মণ‍্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ। ছোট ছোট প্রতিবাদগুলি স্পর্ধা তৈরি করে। বিকট শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে একলা মানুষের রুখে দাঁড়ানো যে কত বড় হয়ে উঠতে পারে তা বারবার দেখছি আমরা। সেই কারণে এই ছোট প্রতিবাদকে নৃশংস প্রতিহিংসা নামিয়ে সন্ত্রস্ত ও স্তব্ধ করে দিতে চায়ছে পুলিশ প্রশাসন। এ ধরণের প্রতিটি হামলার ঘটনাকে বৃহত্তর ঐক‍্যের সমাবেশমঞ্চ বানিয়ে আমাদের এগোতে হবে এবং ছড়িয়ে দিতে হবে প্রতিটি অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে তৎক্ষণাৎ ছোট ও দৃঢ় প্রতিবাদের প্রতিস্পর্ধা

সম্প্রীতি মুখার্জী : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post