• May 25, 2022

নিজ অনুপ্রেরণায় নিজেই পুরস্কৃত

 নিজ অনুপ্রেরণায় নিজেই পুরস্কৃত

চন্দ্রপ্রকাশ সরকার

   গ্রামবাংলায় প্রচলিত একটি শ্লেষাত্মক লোককথা এইরকম — “আপনি রাঁধি, আপনি খাই, আপন হাতের বলিহারি যাই!” আরো একটি ছোট্ট তির্যক লোককথায় বলা হয় — “আপন হাত জগন্নাথ!” মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদসূত্রে এই দুটি লোককথা চটজলদি মনে পড়ল।
    পুরস্কার সাধারণত প্রাপকের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করে, কিন্তু কখনো কখনো প্রাপকের যোগ্যতার প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠায় পুরস্কারের মান-মর্যাদাও খাটো হয়ে পড়ে। এমনই অনভিপ্রেত ঘটনা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর বাংলা আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্তি। গত ২৫ শে বৈশাখ (৯মে,২০২২) কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথের ১৬২তম জন্মদিনের সরকারি স্মরণানুষ্ঠানে ‘অক্লান্ত সাহিত্যসেবা’র স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই ‘বিশেষ পুরস্কার’টি দেওয়া হয়েছে। তাঁর অনুপ্রেরণা ছাড়া যখন গাছের পাতাটিও নড়ে না, তখন অনুমান করা যায় তাঁর এই পুরস্কার প্রাপ্তিও তাঁরই অনুপ্রেরণায়! তবু তাঁর অন্ত:স্থলের কোথাও কি আপন যোগ্যতা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ কুন্ঠা বা সংকোচ কাজ করেছে? নইলে অনুষ্ঠান-মঞ্চে নিজে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এই পুরস্কারের ঘোষক বাংলা আকাদেমির সভাপতি তথা উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু তাঁর হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে গেলেন কেন! পুরস্কার প্রাপক মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী নিজেই রাজ্যের সংস্কৃতিমন্ত্রীও। ওই দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন পুরস্কৃত করলেন সংস্কৃতিমন্ত্রীকে! সমগ্র ব্যাপারটিতে রাজ্যের সুস্থ সংস্কৃতি বোধসম্পন্ন নাগরিকরা যারপরনাই কৌতুকাবিষ্ট। সমাজমাধ্যমে ব্যাপক রঙ্গ-রসিকতার বন্যা দেখে বোঝা যায়, সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কুনাট্য রঙ্গে মানুষ যথেষ্ট বিস্মিত ও বিরক্ত। সেদিনের ওই অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, আবুল বাশার, শ্রীজাত প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের রথী-মহারথীরা। আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষায়, “পুরস্কারের মঞ্চে এ দিন দেখা যাচ্ছিল, কবি-সাহিত্যিকদের চাঁদের হাট।” সরকারি করুণাধন্য ‘চাঁদের হাট’-এর চাঁদুরা কেউই এই পুরস্কার প্রদান নামক তামাশার প্রতিবাদ করেননি! উল্টে কেউ কেউ মাননীয়ার সাহিত্য কৃতির সাফাই গেয়েছেন সুকৌশলে। তাতে সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকরা আরো বেশি বিস্মিত।  বাংলা আকাদেমির সভাপতি ব্রাত্য বসু জানিয়েছেন, বাংলার ‘শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মতামত’ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।(আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০মে) তা ‘শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের’ অনুমোদিত পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘কবিতা-বিতান’ থেকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ একটি পুরো কবিতা এবং একটি কবিতার এক-তৃতীয়াংশ এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছে।

    কবিতা : হামবা

    হরে কর কমবা
    গরু ডাকে হামবা
    গর্জন করে অম্বা
    মা ডাকেন বুম্বা।।

    হরে কর কমবা
    ডব্বা ডব্বা বব্বা
    হুড়হুড় করে হুম্বা
    তোবা তোবা আব্বা।।

         কবিতা : এপাং ওপাং ঝপাং
        
          এপাং ওপাং ঝপাং
          আমরা সবাই ড্যাং ড্যাং
          চলো দেখি কোলাব্যাঙ
          প্রজাতির আছে কি ঠ্যাং?

    এই ধরনের কাব্যকৃতি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের স্বীকৃতি পেলে সমাজমাধ্যমে, এবং গণমাধ্যমেও, রঙ্গ-রসিকতা বা রগড় হওয়া তো স্বাভাবিক। কিন্তু করুণা হয় সভাকবি বা সভাসদদের জন্য। এই দুঃসময়ে বড়ই অভাব বোধ করি সেই মেরুদন্ডী কবি তথা ‘বুদ্ধিজীবীদের বিবেক’ কবি শঙ্খ ঘোষের। তিনি জীবিত থাকলে এই পুরস্কার তামাশা কি নির্বিবাদে মেনে নিতেন ? যাঁর স্মরণ-অনুষ্ঠানে এই কুনাট্য রঙ্গটি মঞ্চস্থ হলো, সেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে ১৯৪১ সালের ১৮ জানুয়ারি তাঁর কঠোর আত্মসমীক্ষামূলক সুবিখ্যাত ঐকতান কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন —

“সাহিত্যের আনন্দের ভোজে
নিজে যা পারি না দিতে, নিত্য আমি থাকি
                                তারি খোঁজে।
সেটা সত্য হোক;
শুধু ভঙ্গি দিয়ে যেন না ভোলায় চোখ।
সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি
ভালো নয়, ভালো নয় নকল সে শৌখিন মজুদুরি।”

   সাহিত্যের খ্যাতি চুরির এই নির্লজ্জ দহন-দিনে, চাঁদের হাটের চাঁদুদের এই অসহ্য আত্মসমর্পণের দিনেও, দুজন নাতিখ্যাত ব্যক্তিত্ব পুরস্কার তামাশার প্রতিবাদ করে পশ্চিমবাংলার মুখ রক্ষা করেছেন। তাদের মধ্যে একজন লোকসংস্কৃতি গবেষক রত্না রশিদ ব্যানার্জি। ইনি ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি থেকে পাওয়া অন্নদাশঙ্কর রায় স্মারক সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছেন। অপরজন অনাদিরঞ্জন বিশ্বাস সাহিত্য আকাদেমির (পূর্বাঞ্চল) কলকাতা শাখার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এঁদের দুজনকে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানাই।

ফিচার ছবিঃ শিল্পী শুভেন্দু সরকার

 
চন্দ্রপ্রকাশ সরকার : বিশিষ্ট সাংবাদিক

  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post