• December 2, 2022

অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও পুঁজিপতিদের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে সভ্যতার ধারক-বাহক কোপাই

 অবৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও পুঁজিপতিদের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে সভ্যতার ধারক-বাহক কোপাই

✍️ অভিষেক দত্ত রায়

আজ উন্নয়ের শিকার সভ্যতা। এরই একটি অঙ্গ হিসাবে এক প্রকার সমাধিস্থ হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী কোপাই নদী। যা শাল, কুয়ে প্রভৃতি নদী নামেও পরিচিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যাযয়ের কোপাই আজ প্রশাসনের মদত পুষ্ট মাটি-বালি মাফিয়া ও শাসক দল তৃণমূলের ক্ষমতায়নের উন্নয়নের খপ্পরে পড়েছে৷ একটি সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, এভাবে চলছে থাকলে আর মাত্র কয়েক বছর। তারপর কোপাই নদী কেবল বইয়ের পাতাতেই দেখা যাবে মাত্র। “কোপাই” নিছকই একটি নদী নয়, কোপাই একটি সভ্যতার নাম, একটি সংস্কৃতির নাম, একটি ইতিহাসের ধারক। এই কথাগুলি তুলে ধরার মেরুদণ্ডের বড়ই অভাব আজ৷

ঐতিহ্যবাহী কোপাই নদী৷ তার কিছুটা সেই বর্ণনায় আসা যাক৷ ময়ূরাক্ষী নদীর একটি উপনদী হল কোপাই৷ এই কোপাই নদীর উৎস অন্যান্য নদ-নদীর থেকে বেশকিছুটা ভিন্ন৷ ঝড়খণ্ড রাজ্যের একটি বিস্তীর্ণ এলাকার মাঠঘাটের জল এসে জমা হয় একটি বৃহৎ দীঘিতে৷ সেই দীঘি বা বড় জলাশয় থেকেই প্রবাহিত হচ্ছে কোপাই। তাই এটিকেই কোপাই নদীর উৎপত্তিস্থল হিসাবে ধরা হয়৷ ক্রিটেসিয়াস যুগে ছোট নাগপুর মালভূমি অঞ্চলে বিপুল ভূ-আন্দোলন হয়েছিল৷ এর ফলে এদত অঞ্চলে বদলে গিয়েছিল ভূমিরূপ। অনুমান করা হয় এই সময়েই কোপাই নদীর সৃষ্টি। এমনটাই সাধারণত মনে করে থাকেন ভূ-বিজ্ঞানীরা। উৎসস্থল থেকে এই কোপাই নদী ‘শাল’ নামে বয়ে আসছে। এই পর্যন্ত নদীর নাব্যতা অতি কম৷ ইলামবাজারের গোলটে সেতুর পর থেকে ‘কোপাই’ নাম নিয়ে বল্লভপুর, শান্তিনিকেতন হয়ে বয়ে চলেছে৷ এখানে কোপাইয়ের নাব্যতা কিছুটা বাড়ছে। লাভপুরের হাঁসুলি বাঁক পর্যন্ত কোপাই নামই থাকছে৷ এরপর ‘কুয়ে’ নদী নামে বয়ে চলেছে৷ কুয়ে নদীর নাব্যতা যথেষ্ট বেশি। মুর্শিদাবাদ জেলার দক্ষিণ হিজল বিলে গিয়ে মিলিত হচ্ছে এই কুয়ে নদী। এখানেই তারাপীঠ হয়ে এসে মিলিত হচ্ছে দ্বারকা নদ। পরে এই হিজল বিল থেকে এই নদীটি ‘দ্বারকা-বাবলা’ যৌথ নাম নিয়ে একেবারে কানা ময়ূরাক্ষী নদীতে গিয়ে মিলিত হচ্ছে। উৎস থেকে হাঁসুলি বাঁক পর্যন্ত এই কোপাই নদীর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১১২ কিলোমিটার। যদি একেবারে কানা ময়ূরাক্ষী নদীতে মিলিত হওয়া পর্যন্ত ধরা হয়, তাহলে কোপাই নদীর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১৯০ কিলোমিটার। এই হল কোপাই নদীর প্রাথমিক একটি ধারনা।

যে কোন নদীই সভ্যতার ধারক ও বাহক। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহু সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। কোপাই নদীও যুগ যুগ ধরে সভ্যতা, স্থানীয় সংস্কৃতি লালন করে এসেছে ও করে চলেছে৷ একদা এই নদীতে নৌকা, বজরা প্রভৃতি চলাচল করত৷ এ অঞ্চলে অজয় ও ময়ূরাক্ষী নদী ছিল অন্যতম বাণিজ্যের জলপথ। এই দুটি নদী ছাড়াও, ছোট ছোট মাল বহনকারী জলপথ হিসাবে ব্যবহৃত হত কোপাই। এছাড়া, বীরভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাষ নির্ভর করত এই নদীর উপর৷ স্থানীয় মানুষজন এই নদীর উপর কতটা নির্ভরশীল, তার বর্ণনা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়ে গিয়েছেন “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে” কবিতায়। তিনি লিখছেন, “সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।
বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।”

এমনকি, কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “হাঁসুলি বাঁকের উপকথা” উপন্যাসের কোপাই নদীর বিস্তর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই নদী বিলীন হতে চলেছে। আর কয়েক বছর পর হারিয়ে যাবে কয়েক যুগের ইতিহাস, আত্মকথা, সভ্যতা। এর বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারন আছে। তা হল –
১) কমছে কোপাই নদীর ব্যবহার। সে চাষের জন্যই হোক, বা গবাদিপশুকে স্নান করানোর জন্য, বা স্নানের জন্য। সবক্ষেত্রেই কমছে নদীর ব্যবহার৷ নদী তার তীরবর্তী গ্রামগুলি থেকে সরেও যাচ্ছে। তাই নদীর উপর নির্ভরশীলতা কমে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষজনের। স্বাভাবিক ভাবেই ব্যবহার কমায় নিত্যপ্রয়োজনে গুরুত্ব কমছে নদীর।
২) সরকারি ভাবে সংস্কারের অভাব রয়েছে। কোপাই নদী সংস্কারের জন্য আজ পর্যন্ত কোন সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়নি৷
৩) নদীর দুই ধারে গড়ে উঠেছে একাধিক ইট ভাটা৷ বর্তমানে শাসক দল তৃণমূলের মদত পুষ্ট ইটভাটার মালিকেরা নদীর পাড় কেটে মাটি তুলে ট্রাক্টরে করে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, এক একটি জায়গায় একটি মাটি মাফিয়াদের সক্রিয় চক্র রয়েছে। তারা নদীর পাড় কেটে বিশালবহুল কৃত্রিম বাগান বাড়ির জন্য মাটি সরবরাহ করে থাকে। এর ফলে চাষ জমির সঙ্গে নদী গর্ভ সমতল ভূমিতে পরিণত হচ্ছে৷


৪) বীরভূম জেলার অন্যান্য নদী থেকে বালি তোলার সরকারি ভাবে অনুমতি রয়েছে৷ ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর এই অনুমতি দিয়ে থাকে রাজস্বের বিনিময়ে। কিন্তু, কোপাই নদীতে থেকে বালি তোলায় ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে৷ এই নিষেধাজ্ঞা কার্যত উপেক্ষা করে রমরমিয়ে চলে বালির কারবার৷ প্রসঙ্গত, নদী থেকে বালি তোলা হলে নদীর নাব্যতা বজায় থাকে৷ কিন্তু, অবৈজ্ঞানিক ভাবে বালি তুললে নদীর ক্ষতি হয়৷ গতিপথ বদলায় নদীর। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসতি এলাকা ও চাষযোগ্য জমি৷
৫) সম্প্রতি “কবিগুরুর লেখনীর কোপাই নদী”, এই নামটি একটি ব্রাণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ এর ফলে পুঁজিপতিদের নজির পড়েছে শান্ত কোপাইয়ে৷ কোপাইয়ের তীরে হোটেল, রিসর্ট, রেস্টুরেন্ট, বাগান বাড়ি তৈরি করলেই নাকি আভিজাত্য বজায় থাকে ও রবীন্দ্র আদর্শে দীক্ষিত মনে হয়৷ তার উপর আছে স্যোসাল নেটওয়ার্ক সাইট৷ কোপাই নদীর তীরে বিশালবহুল রিসর্ট, হোটেল থেকে ছবি-ভিডিও পোস্ট করাই হল রবীন্দ্র অনুরাগী প্রমাণ করার উপযুক্ত নথি৷ এই সকল অনুন্নয়নশীল চিন্তার জন্যই বর্তমানে প্রশাসন ও শাসক দল তৃণমূলের নেতা, জনপ্রতিনিধিদের মদতে দখল হচ্ছে যাচ্ছে কোপাইয়ের পাড়৷ কোথাও কাঁটা তারের বেড়া, কোথাও পিলার, কোথাও বা কংক্রিটের দেওয়াল তৈরি হচ্ছে৷ আর এতেই বিপদগ্রস্ত অসহায় কোপাই৷
৬) কোপাই বাঁচানোর তাগিদ কম৷ প্রতিবাদ করার, রুখে দাঁড়ানোর মেরুদণ্ড যুক্ত মানুষ আজ নেই৷ কারন কোপাই তাদের কাছে নিছকই কয়েকটি কবিতার লাইন বা গল্প কথার লাইন মাত্র৷ কোপাই শুধুই নদী নয়, কোপাই একটি সভ্যতার নাম, কোপাই একটি সংস্কৃতির নাম কোপাই তার স্রোতে ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে। বোঝার মত আজ কেউ নেই৷

প্রসঙ্গত, নদী সাধারণত নিন্মগতিতে তার পথ পরিবর্তন করে৷ কিন্তু, কোপাইয়ের ক্ষেত্রে যেটা স্পষ্ট, সেটা হল মধ্যগতিতে কোপাই পথ পরিবর্তন করছে৷ এর কারনই হল যত্রতত্র পাড় কেটে নেওয়া ও অবৈজ্ঞানিক ভাবে বালি তুলে নেওয়ার জন্য৷ অন্যদিকে, বাড়ছে প্লাবনের আশঙ্কাও। আগে কুয়ে নদীতে প্লাবন বেশি হত। অর্থাৎ, হাঁসুলি বাঁকের পর থেকে। এখন কোপাই নদীতে ঘোর প্লাবনে আশঙ্কা রয়েছে৷ বহু জায়গায় নদীবক্ষ ও চাষ জমি সমান্তরাল। খুবই উল্লেখযোগ্য, আর মাত্র কয়েক বছর পর সসম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে এই কোপাই৷ প্রশাসনের মদত, শাসক দল তৃণমূলের লালসা, মাটি ও বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যে ধ্বংস হচ্ছে ” আমাদের ছোট নদী” কোপাই।

এখনও সময় আছে। ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস রক্ষায় বৃহৎ স্বার্থে এগিয়ে আসুন৷
শেষ লাইনে বলি – “বিলাসিতায় মোড়ানো সভ্যতা, অসভ্যতার মোড়ক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসুক”।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post