• June 29, 2022

মুসলমানরা অশান্ত হলেন কেন?

 মুসলমানরা অশান্ত হলেন কেন?

আব্দুল হালিম বিশ্বাস

পয়গম্বর কেবল একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন না। ইসলামিক সমাজের অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধনীতি, মানুষের জীবন ও যাপন নিয়ে সুচিন্তিত অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি একজন সফল সমাজ সংস্কারক, দার্শনিকও। এই অর্থে পয়গম্বর ঐতিহাসিক চরিত্র। ঐতিহাসিক চরিত্র যুগে যুগে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হবে সেটাই স্বাভাবিক।

অবশ্য আলোচনা ও কটুক্তি কখনো এক নয়। দুইয়ে বিস্তর ব্যবধান আছে। আলোচনার উদ্দেশ্য হলো যথার্থ মূল্যায়ন। যেখানে কটুক্তির উৎস হলো মুখ্যত ক্রোধ। কখনো বা ঘৃণা ও বিদ্বেষ। আধিপত্যবাদী স্পর্ধা প্রদর্শণেও অনেকে কটুক্তি করে থাকেন।

খুব ছোট থেকেই মৌলবী মৌলানা সাহেবদের ওয়াজ নসিহতে শুনেছি পয়গম্বর বাহান্ন বছর বয়সে প্রথম খলিফার ছয় বছরের কন্যাকে বিবাহ করেন। আসলে তখন বিবাহের জন্য বয়সের কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না। এগুলো সবই তৎকালীন সমাজে অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতো।

বিজেপি মুখপাত্র নুপুর শর্মার বক্তব্যটি আদতে কটুক্তি। পয়গম্বরের বিবাহ সংক্রান্ত তথ্যটি সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ বহির্ভূত ভাবে ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের মোড়কে ব্যক্ত করেছেন। মুসলিম বিশ্বের আপত্তির জায়গা ঠিক এখানেই। নুপুর শর্মার এই কটুক্তি কি মুসলমান সমাজ মানিয়ে নিতে পারত না?

প্রথমতঃ অতীতের নানা ঘটনায় দেখা গেছে পয়গম্বর সম্পর্কিত যে কোনো বিষয়ে মুসলমান সমাজ অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর। কোনো যুক্তিই গ্রহণ করে না। দ্বিতীয়তঃ কোনো বিষয় লঘু ভাবে গ্রহণ করতে যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের প্রয়োজন, ভারত সমাজে তার লেশ মাত্র নাই।

বর্তমানে মুসলমানদের খুব সহজে অপমান করা যায়। যে কোনো মুসলমানকে পিটিয়ে মারা যায়। রাস্তায় কান ধরে উঠবস করানো যায়। বুলডোজার চালিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। না, আইন কোনো বাধা হয় না, পুলিশ বা প্রশাসন আপত্তি করে না। এমন একটি নির্যাতিত সমাজের কাছ থেকে মহানুভবতা প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।

এবং ঘৃণা ও বিদ্বেষে ভরা এই পরিবেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। লালকৃষ্ণ আদবানীর সময়কাল থেকে, আরও ঠিক ঠিক বলতে গেলে নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ভারতবর্ষের সামাজিক পরিবেশ ঘৃণায় ভরে উঠে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এলে মুসলিম জনমানসে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা গ্রাস করে। গত দুতিন বছরে কি ভয়ঙ্কর নির্মম নিষ্ঠুরতা দেশ জুড়ে বিরাজ করছে, কমবেশি সকলেই অবগত।

প্রশ্ন হলো London School of Economics এর ছাত্রী নুপুর শর্মা কি নিছকই আলটপকা মন্তব্য করেছেন? সকলেই একমত হবেন যে কখনোই না। এটা সুচিন্তিত মেয়াদী পরিকল্পনা বই কিছু নয়।

সমগ্র ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিক্রি করেও যিনি অনিশ্চয়তার অতল অন্ধকারে তলিয়ে আছেন তিনি নরেন্দ্র মোদী। দেশের চল্লিশ শতাংশ মানুষ কর্মহীন। বিশ শতাংশ মানুষ ক্ষুধার্ত শরীরে রাত্রে ঘুমোতে যায়। দেশের সকল উন্নয়ন স্তব্ধ। এমনকি দরিদ্রের একশো দিনের কাজের টাকা বাড়ন্ত। হুড়মুড়িয়ে অর্থনীতি ভেঙে পড়ার প্রহর গুনছে মাত্র।

এদিকে সাভারকারের স্বপ্নতরী ভারত বন্দরে এসে অপেক্ষমান। ভিড়বে কিনা ২০২৪ নির্বাচনেই ঠিক হবে। তাই আসন্ন নির্বাচন নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপি নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

প্রতিটি নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদীকে কোনো না কোনোভাবে মেরুকরণের পসরা সাজাতে হয়। এবার নুপুর শর্মার বাক্যবাণই অসাধারণ উপকরণ। পয়গম্বরের অপমানে আহত মুসলমানরা নিষ্ঠা ভরে বিজেপি ও আর এস এস কর্মীদের মেরুকরণের কাজটি করে দিচ্ছে।

এদিকে প্রতিবাদের নামে দিনভর জাতীয় সড়ক অবরোধ, থানা ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগ, মহল্লায় মহল্লায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি, বাড়িঘর দোকানপাট ভাঙচুর, সহিংস উন্মাদনায় এদেশের আকাশ বাতাস আতঙ্কে ভরে উঠছে। মুসলমানদের এই সকল আচরণে অসভ্যতা ও অমানবিকতার স্বরূপ প্রকাশ পাচ্ছে। প্রতিবাদ মিছিলগুলো কারা বা কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে সুস্পষ্ট নয়। তবে প্রতি ক্ষেত্রেই সমাজবিরোধীদের দাপাদাপি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে, মোদীর অতি বড় শত্রুও আজ দুবার ভাবতে বসেছে। বিজেপি দল ক্রমে ভারি হচ্ছে। অথচ মুসলমানদের উচিত ছিল গ্রহণ যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগত নির্বাচনের আগে বিজেপিকে জনমানব থেকে বিচ্ছিন্ন করা। ফ্যাসিস্ত মোদির স্বরূপ সকলকে চিনিয়ে দেওয়া। ২০২৪ শে বিজেপির পরাজয় নিশ্চিত করা।

লক্ষৌনতে যোগী যেদিন মুসলমান নারীদের কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করার নিদান দেন, আজকের মুসলমান সেদিন চুপ করেছিল। বাবরি মসজিদ যেদিন বেহাত হয়ে যায়, সেদিনও মুসলমান নীরব হয়েছিল। ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গরু সম্পর্কিত মিথ্যাচারে ৩৬ জন মুসলমানকে পিটিয়ে মারা হয়। কোনো মুসলমান কোথাও প্রতিবাদ করেনি। আজ হঠাৎ কোথা থেকে এত শক্তি পেল যাতে সমগ্র ভারতবর্ষে মুসলমান প্রতিবাদের নামে আস্তব্যস্ত হয়ে উঠেছে?

অনুমান হলেও সত্য যে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান রাষ্ট্র গুলির ভারত বিরোধিতা এই শক্তি জুগিয়েছে। অথচ গুজরাট দাঙ্গায় বিশ হাজার মুসলিম নরনারী নৃশংসভাবে হত্যা করা হলেও মধ্যপ্রাচ্য কোনো কথা বলেনি। সারা ভারত জুড়ে মব লিঞ্চিং হয়েছে, না, মধ্যপ্রাচ্য কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। কাশ্মীরে ৩৭০ বিলোপ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য কোনো শব্দ ব্যয় করেনি। সুতরাং সুস্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্য পয়গম্বর নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, পয়গম্বরের উম্মতদের নিয়ে তিলমাত্র নয়।

বরং এই সময়কালে নরেন্দ্র মোদীর হাত ধরে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, ইরাণ প্রভৃতি রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বানিজ্যিক লেন দেন, বৈদেশিক সহযোগিতা, সামরিক সহযোগিতা, তথ্যের আদান প্রদান পরস্পর মজবুত ও গভীর হয়েছে। সহস্র কোটির বানিজ্য চুক্তি চুড়ান্ত হয়েছে। বাবরি মসজিদ নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের রায় দানের বছরেই সৌদি আরব নরেন্দ্র মোদীকে শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্মানিত করে।

আদতে নরেন্দ্র মোদী চেয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সখ্যতা দেখিয়ে আমেরিকার মতো দেশের মানবাধিকার সংস্থা গুলোকে বার্তা দিতে যে, ভারতের মুসলমানদের প্রতি তিনি কতটা যত্নবান। বিপরীত দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য ১৪০ কোটির তেলের বাজার ধরে রাখতে নীরব থেকেছে। ডলারের জন্য ফ্যাসিস্ত মোদির সঙ্গে গলাগলি করতেও তাদের বাঁধেনি।

আজ পয়গম্বরের অপমানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলি ভারতীয় পণ্য বর্জন করলে ও ভারতীয় শ্রমিক মজুরদের বহিস্কার করলে তা ভারতীয় মুসলমানদের বিপক্ষেই যাবে। প্রথমতঃ বানিজ্যিক কারণে ভারতের আর্থিক ক্ষতি হলে মুসলমানরাও প্রত্যক্ষ শিকার হবে। দ্বিতীয়তঃ ভারতীয় শ্রমিক মজুরদের বহিস্কার করলে বহু মুসলমানও কাজ হারাবে। তৃতীয়ত মুসলমান রাষ্ট্র থেকে যে সকল হিন্দু কাজ হারিয়ে বিতাড়িত হয়ে আসবে, প্রত্যেকেই মুসলমানদের বিপক্ষে দাঁড়াবে ও নরেন্দ্র মোদীর হাত শক্ত করবে। সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের আস্ফালনে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নাই। এ অনেকটা মেঘ দেখে পথ চলার মতোই নির্বুদ্ধিতার অনুশীলন মাত্র।

বলতে দ্বিধা নাই, মুসলমানদের কোনো নেতা নাই। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতার নেতৃত্বে পথ চলেছে তাঁরা। নেতাদের অধিকাংশই অসৎ, স্বার্থপর। ফলে বার বার প্রবঞ্চিত হতে হয়েছে। আজ দেখা যায় আদালত চত্বর, ক্রিমিনাল কোর্টে ভিড় করা মানুষদের সত্তর শতাংশই মুসলমান। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার কেহ নাই।

এদেশের মুসলমানদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে শিক্ষা ও বিজ্ঞানের সুতিকাগারে ফিরে আসতে হবে। দ্বিতীয় কোনো পথ আর নাই। একদা ইহুদী জাতি পৃথিবীর পথে পথে ভেসে ছিল। হিটলার ষাট লক্ষ ইহুদীকে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হলোকাস্টের সময়ে হত্যা করে। অনেক নির্যাতন সয়ে ইজ্রায়েলে থিতু হয়। তারপরেই মনোনিবেশ করে জ্ঞান বিজ্ঞানে। আজ একজন মুসলমান সারা দিনে যে সকল সামগ্রী ব্যবহার করে তার চল্লিশ শতাংশ কোনো না কোনো ইহুদীর আবিষ্কার। একজন মুসলমান সারা দিনে যত ঔষধ ব্যবহার করে তার আশি শতাংশ ইহুদীর আবিষ্কার। শিক্ষা জ্ঞান বিজ্ঞান আজ ইহুদী জাতিকে সর্বোচ্চ সম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মুসলমান সমাজকে এই সত্যকে উপলব্ধি ও স্বীকার করতে হবে। সেই মতো মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কেবলমাত্র শিক্ষাই পারে একটা জাতি বা সম্প্রদায়কে সমুন্নত শিখরে পৌঁছে দিতে। সুশৃঙ্খল রুচিশীল মার্জিত সভ্য ভদ্র সমাজের পরিচয় দিতে। তারজন্য আবশ্যক দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা ও নিরবিচ্ছিন্ন সাধনা। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে।

ঢিল ছুড়ে, পাথর ছুড়ে, আগুন লাগিয়ে সম্মান সম্ভ্রম আদায় হয় না। রাশি রাশি ঘৃণাই কেবল ধেয়ে আসে। আসুন আমরা শিক্ষার রাজপথে পা বাড়াই।

  •  
  •  
  •  
  •  

2 Comments

  • ধন্যবাদ। মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতার সঠিক বিশ্লেষণ এবং সঠিক দিক নির্নয়।

  • খুব বাস্তব কথাগুলো তুলে ধরেছেন- সুন্দর বিশ্লেষনের মাধ্যমে। সত্যিই তো-
    ” ……বর্তমানে মুসলমানদের খুব সহজে অপমান করা যায়। যে কোনো মুসলমানকে পিটিয়ে মারা যায়। রাস্তায় কান ধরে উঠবস করানো যায়। বুলডোজার চালিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। না, আইন কোনো বাধা হয় না, পুলিশ বা প্রশাসন আপত্তি করে না। এমন একটি নির্যাতিত সমাজের কাছ থেকে মহানুভবতা প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।”
    এটিই আজকের ভারতবর্ষ !

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post