• August 18, 2022

৫ জুলাই : বার্ণপুরের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ষরে লেখা একটি দিন

 ৫ জুলাই : বার্ণপুরের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তাক্ষরে লেখা একটি দিন

পার্থপ্রতিম আচার্য

বার্ণপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের সবিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একদা এই বৃহৎ শিল্পাঞ্চলের শ্রম-আন্দোলনের প্রবাহে সমগ্র ভারতবর্ষ আলোড়িত হয়েছিল আর ওই সকল গৌরবোজ্জ্বল শ্রম আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল অ্যাকশন কমিটির মাধ্যমে।বর্তমানে সুভাষপল্লীতে যে ছন্দভঙ্গ, নিষ্প্রভ অ্যাকশন কমিটির অফিস ( সময়ের তাড়নায় যা AITUC অফিসে পরিনত) প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করি, তা একদিন, এইরূপ অবিন্যস্ত, মনুষ্যশূন্য, মুক ও বধির তুল্য ইমারত ছিল না, বরং বলাভালো অজস্র শ্রমিকের উপস্থিতিতে তা ছিল প্রাণবন্ত, গতিশীল এক প্রগতিশীল শ্রমিকদের বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান।
আজ ৫ জুলাই। বার্ণপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রম- আন্দোলনের ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। আমরা ভুলে গেছি, প্রায় ৬৯ বছর পূর্বে নূন্যতম মজুরি, বোনাস, আর একটু ভদ্রভাবে জীবন অতিবাহিত করবার বাসনায় আন্দোলনরত আট জন নিরপরাধ শ্রমিকের হত্যায় রক্তাত্ব হয়েছিল এই অঞ্চলের মৃত্তিকা।অতীতের দিকে সামান্য দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে, ঘনঘটাপূর্ণ ওই দিনটির প্রেক্ষিত আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়, যা আমাদের বেদনা ভারাক্রান্ত করে।
আন্তর্জাতিক বাজারের কারণ দেখিয়ে, ১৯৫২ সালের ১৪ অক্টোবর, স্টিল কর্পোরেশন অফ বেঙ্গল (SCOB) এবং ইণ্ডিয়ান আয়রণ এ্যাণ্ড স্টিল কোম্পানী (IISCO) কে একীকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং ১৯৫২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে দুটি কোম্পানী একত্রে IISCO নামেই পথচলা শুরু করে। তবে সংযুক্তি করণের বহু পূর্ব থেকেই অবহেলিত শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরী, কাজের পরিমান এবং বোনাস সংক্রান্ত বিষয়ে ছোট ছোট আন্দোলন প্রবহমান
ছিল।
সংযুক্তি করণের আগে দুটি কারখানায় দুটি ওয়ার্কস কমিটি ক্রিয়াশীল ছিল, বলা বাহুল্য, শ্রমিকদের সামনে রেখে এই ওয়ার্কস কমিটিই শ্রমিকদের দাবিদাওয়া গুলির বিচার করতো ও প্রয়োজনে ম্যানেজমেণ্টের কাছে দরবার করত। কারখানা দুটি এক হয়ে যাওয়ার ফলে, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট অপরিবর্তীত থাকলেও, ওয়ার্কস কমিটি কিন্তু এক হয়ে যায়। আই এন টি ইউ সি — ই ছিল সেই সময়ে একমাত্র মান্যতা প্রাপ্ত শ্রমিক ইউনিয়ন, এবং তারা প্রায়শই ম্যানেজমেণ্টের স্বার্থ রক্ষার্থেই উদগ্রীব থাকতো। কোনও স্বীকৃত বামপন্থী ইউনিয়ন সেই সময়ে বার্ণপুর কারখানায় ছিল না। কারখানার লেবার ওয়েল ফেয়ার ডিপার্টমেন্ট, , শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা করা তো দূরস্থান, বরং কিছু বিপথগামী নেতার সহযোগিতায় শ্রমিকস্বার্থ বিঘ্নিত করার চেষ্টায় তৎপর থাকতো।কারখানা দুটি সংযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের দাবিদাওয়া নিয়ে অসন্তোষ ক্রমশ উর্ধ্বগামী হল, বিশেষ করে শিটমিলের শ্রমিক কর্মচারীদের অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছাল।৪ঠা জানুয়ারি, ১৯৫৩, স্টিল সেকশনের ‘ইলেকট্রিক ডিপার্টমেন্ট’ এর তিনজন শ্রমিক কে বে-আইনি ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল।এদিকে বোনাস পুনর্মুল্যায়ণের জন্য ব্রিক ডিপার্টমেন্ট এ ওভারটাইম ধর্মঘট করা হয়েছিল।
জনৈক ইঞ্জিনীয়ারের অশোভন অয়াচরণের কারনে পি ডাব্লু আই ( স্টিল) শ্রমিকরা দু’ দিনের অবস্থান ধর্মঘটে বাধ্য হয়েছিল।
এই একই সময়ে শিটমিল ও হটমিলের ৬৮ জন শ্রমিক, বেলা ২টা থেকে রাত্রি দশটা পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘট করেছিলেন।
প্রকৃতপ্রস্তাবে কারখানা পরিচালনে প্রভূত পরিমান ভারসাম্যহীনতার দরুন সেই-সময়কালে কারখানা সহ সমগ্র শিল্পাঞ্চলে চরম ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল(বা পরিকল্পিত ভাবে করা হয়েছিল) যা শ্রমিকদের শঙ্কিত ও বেদনাগ্রস্ত করে তুলেছিল।১৯৫৩ খ্রীষ্টাব্দের ৫ জুলাই —বার্ণপুরে দুশ্চিন্তালগ্ন ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছিল রাজ্য প্রশাসন ও কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ মদতে। কারখানা কর্তৃপক্ষের প্ররোচনায় বিস্তীর্ণ বার্ণপুর শিল্পাঞ্চলের প্রায় সকল স্থানে অনর্থক পুলিশের অভিযানে, বহু শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অ্যাকশন কমিটির পাঁচজন নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাকে পি.ডি এ্যাক্টে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছিল। অকস্মাৎ নেতৃস্থানীয় মানুষের গ্রপ্তারের খবর দাবানলের মতন সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং গোটা বার্ণপুর অশান্ত ও উত্তাল হয়ে পড়েছিল। হাজার হাজার শ্রমিক কারখানায় না ঢুকে, অ্যাকশন কমিটির অফিসে এসে একত্রিত হয়েছিল । নেতাবিহীন, বিশৃঙখল অজস্র শ্রমিক তেরঙা ঝাণ্ডা নিয়ে মিছিল করতে করতে পোলো গ্রাউণ্ডের সন্নিকটে, মহকুমা শাসকের অফিসের সামনে উপস্থিত হয়ে সম্মিলিত স্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত করেছিল। তখন তাদের একমাত্র আওয়াজ ছিল নেতাদের মুক্তি। ‘ নেতায়ৌ কো রিহা করো ‘।
আশ্চর্যের দিক হল, সেই সময়ে হিরাপুর থানা এলাকায় ১৪৪ ধারা লাগু থাকলেও আসানসোল থানা এলাকায় ওই ধারা লাগু ছিল না।
মহকুমা শাসক শ্রমিকদের সাথে তো কথা বললেনই না, বরং বেশি কর্মপরায়ণ হয়ে আসানসোল থানা এলাকাতেও ১৪৪ ধারা জারি করে দিলেন।
পরিকল্পনাহীন, নেতৃত্বহীন ওই মিছিল বার্ণপুরের ১৪৪ ধারা অতিক্রম করে কীভাবে আসানসোলে মহকুমা শাসকের অফিসে পৌঁছেছিল, তা আজও রহস্যলিপ্ত এবং অনধিগম্য।
অকস্মাৎ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতন মহকুমা শাসকের অফিস থেকে অবস্থানরত, মলিন, উদ্বিগ্ন, অসহায় অপেক্ষমান শ্রমিকদের ওপরে গুলিবর্ষণ হয়েছিল এবং তৎক্ষণাৎ বহু শ্রমিক আহত এবং আট জন শ্রমিকের শরীর বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।
বলাবাহুল্য সচেতন ভাবে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড করা হয়েছিল, শুধুমাত্র শ্রমিকদের আন্দোলন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়ার নিষ্ঠুর অভিপ্রায়ে ।

আজ সেই ৫ জুলাই। বার্ণপুরের কোথাও ওই হতভাগ্য শ্রমিকদের স্মরণে কোনও শোকসভা হচ্ছে কিনা, আমার জানা নেই, তবে বার্ণপুর তথা ভারতবর্ষের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এই ভয়ংকর দিনটি রক্তাক্ষরে লেখা রয়েছে।

তথ্য ঋণ : চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত উদয়াচল সাহিত্য পত্রিকা।স্মৃতি স্মৃতি আর স্মৃতি, চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়

পার্থপ্রতিম আচার্য : প্রাবন্ধিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.