• December 8, 2022

মানভূমের বিবাহ গীতি

 মানভূমের বিবাহ গীতি

তপন পাত্র

আমাদের সামাজিক জীবনে বিবাহ একটি অপরিমেয় গুরুত্বপূর্ণ মানবিক অনুষ্ঠান । নাগরিক জীবনযাত্রায় বিবাহ অনুষ্ঠান ব্যক্তিবিশেষ , পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন-কুটুম্বাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্ত বাংলা তথা মানভূম- পুরুলিয়ার লৌকিক জীবনযাত্রায় এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সমাজের ভূমিকা বিশেষ মর্যাদার সঙ্গেই স্বীকৃত । এই অংশের তপশিলি জাতি , উপজাতি সহ লোকায়ত জীবনে বিবাহ অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণের দরকার হয় না , প্রয়োজন হয় না যাগ-যজ্ঞাদি ক্রিয়াকর্মের ।

বিবাহ উপলক্ষে এক ধরনের গীতির ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য , যা মূলত সমবেত নারীদের কন্ঠে গেয় । এই যৌথ সংগীতের এমন এক বিশেষ লৌকিক রূপ আছে যে কারণে তা খাঁটি লোকসঙ্গীতের অভিধায় অভিধিত । প্রকৃতপক্ষে খাঁটি বা জাত লোকসংগীত বলতে যা বোঝায় তার সবক’টি বৈশিষ্ট্য এই সংগীতের মধ্য বিদ্যমান । লোকসঙ্গীতের অন্যান্য শাখায় আমরা ইদানীং যে সমস্ত সংগীত গুলি লক্ষ‍্য করি সেগুলি কোন না কোন ব্যক্তিবিশেষের রচনা, সমষ্টির মুখে মুখে ফিরে একটি বিশেষ রুপপ্রাপ্ত নয় । কাজেই সেগুলি খাঁটি লোকসংগীতও নয়, সেগুলিকে কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা রচিত সাহিত্যিক লোকসংগীত বলা যেতে পারে । কিন্তু এই লোকসঙ্গীত ধারাবাহিকভাবে রচিত হয় না, কবে কোন্ আদ্দিকালে মানুষের মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে সৃষ্টি হয়েছিল, আজও সে ক’টাই তদ্রুপে বা আংশিক রূপান্তরিত হয়ে মহাকালের পথ ধরে অনেকটাই মন্ত্রের মতো চলে আসছে । কেউ কখনো সাধ করে এই সংগীত রচনা করতে বসেনি । এই গীতির নাম “বিবাহ গীতি”, “বিবাহ সংগীত” বা “বিয়ের গান” ; স্থানীয় ভাষায় “বিহার গীত”, “বিয়া গীত”, “বেহা গীত” ইত্যাদি ।

সাধারণত যে কোন লোকগানে দেব-দেবীর বন্দনা , আঁখড়ার বন্দনা ইত্যাদি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কিন্তু এই গানে দেব-দেবী বন্দনা নেই ,পুরাণকথার তেমন কোনো ঠাঁই নেই ; পরিবেশ-প্রতিবেশ , আর্থ-সামাজিক চিন্তা-ভাবনা , সাধারণ ঘরোয়া কথা-বার্তা , মান – অভিমান , লৌকিক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও শ্রমচর্যা এই গানের বিষয়বস্তু । এগুলি যে সমাজের গান সেই সমাজে শ্রমচর্যায় যেহেতু আজও অনেকটাই নারী-পুরুষের সমানাধিকার, তাই এটি ঘটে থাকা স্বাভাবিক । কিছু কিছু রামায়ণ ও মহাভারত কথা হয়তো এসেছে এই গানে ,তবে তা নিতান্তই পারিবারিক বিষয় কে জড়িয়ে নিয়ে ।

বিভিন্ন জাতি , উপজাতি , জনজাতি সম্প্রদায়ের বিবাহ পদ্ধতি মূলত ব্রাহ্মণ্য বর্জিত । বর্তমানে কোন কোন জাতির মধ্যে পুরোহিত নিয়োগের প্রথা প্রচলিত হয়েছে । কারণ সংরক্ষণ , অনুকরণপ্রিয়তা, সমাজের শিকড় থেকে নিজেদের পৃথক করে মাহুর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার মানসিকতা , সমাজের স্বাভাবিক বিবর্তন । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লৌকিক আচার আচরণের মধ্য দিয়েই বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় । আজও বিবাহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তে স্ত্রী আচারের সাথে সাথে নানারকম গীত পরিবেশিত হয় । যদিও তা দিন দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে ।

বিবাহ বহু প্রাচীনকাল থেকেই সর্বাধিক অর্থনৈতিক সমস্যা জর্জরিত সামাজিক অনুষ্ঠান । বড়ো কারণ একটাই –পণপ্রথা ; তা কখনো কন্যাপণ কখনো বরপণ। আর তারই পাশাপাশি রয়েছে অগণিত মানুষকে অনুষ্ঠান উপলক্ষে বারবার ভুরিভোজনের ব্যবস্থা করা । এছাড়া সীমান্ত বাংলার পশ্চিম প্রান্তের অগণিত মানুষ ভূমিহীন দুঃস্থ ঋণ ভারে জর্জরিত । তাই দিনমজুর ক্ষেতমজুর শ্রমজীবী মানুষের বিয়ের গানে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং সামাজিক জটিলতার প্রতিচ্ছবি তো আছেই কিন্তু সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে রয়েছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিবাহ সংক্রান্ত প্রত্যেকটি ঘটনার সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ।

বিয়ের গান বিবাহ অনুষ্ঠান শুরু হবার পূর্বে নবসম্বন্ধ পাকাপাকি হওয়ার সময় আরম্ভ হয়ে যায় । এই গান বিবাহ অনুষ্ঠান ছাড়া আর কখনোই গাওয়া হয় না । নিষ্প্রাণ আচারানুষ্ঠানসর্বস্ব বিষয়টিও গানে গানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে । গান গাওয়া হয় দেনা-পাওনাকে নিয়ে । এই সমাজে একসময় কন্যাপণের প্রচলন ছিল । তার পরিচয় মেলে একটি গানে —

” উঁচু উঁচু ঘর গিলান গম্ভীর গম্ভীর পিঁড়া
তার ভিতর ভমরা গুজরে ,
আজাকে যে দিবে ভমর আঁজলা ভরা টাকা ,
তবে ভমর হইব তোমারি ।”

বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য শুধু আজার হাতে টাকা তুলে দিলেই হবে না । ভাই , জ‍্যাঠা সকলকেই তাদের নিজের নিজের পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে ।

“ভাইকে যে দিবে ভমর এঢ়ি ঢাকা ধুতি
তবে ভমর হইব তোমারি।
জ‍্যাঠাকে যে দিবে ভমর
আঁজলা ভরা টাকা তবে ভমর হইব তোমারি।”

বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর প্রথম অনুষ্ঠানে বর-কনের সুদ‌ঢ় হৃদয় বন্ধনের প্রসঙ্গ ফুটে ওঠে গানে । আমরা সাধারণত সাত পাকে বাঁধা’র কথা শুনি , কিন্তু এই লোকগানে এসেছে দড়ি দিয়ে হৃদয় বাঁধার কথা, তবে সে দড়ি অবশ্যই শনের দড়ি নয়, সোনার দড়ি ।

“আজ বালাকে বাঁধব
আজ বালাকে বাঁধব
সোনার জোতে ।
এমন কার শক্তি আছে,
ওগো, বলি, বাঁধন ঘুচাতে ।”

এরপর বিয়ের লগ্ন এগিয়ে আসে । তার আগে গাত্রহরিদ্রা । কন্যা পক্ষের দুশ্চিন্তা কাঁসাই নদীতে তো শিলনোড়া পাওয়া যাবে হলুদ বাটার জন্য ; হয়তো বাজার থেকে হলুদও জুটে যাবে কোন রকমে । কিন্তু যদি তেল ফুরিয়ে যায়, তেল পাওয়া না যায় , তাহলে কী হবে ?

“কাঁসায়ে’রি শিল-নড়া নগরের ই হলুদ গো ,
ভাল ক’রে হলুদ বাটবি যেমন কন্যার অঙ্গে সাজে গো ।
তেলের ভাঁড়ে তেল্অ নাই মা, তেল ফুরাঁইয়ে গেছে গো
তখন বাছা কাঁদিতে লাগিল গো।
বাপু গেল বুঝাইতে না ন কাঁদ গো ।
তখন বাছা কাঁদিতে লাগিল গো ।”

কিন্তু যখন যামাইদাদা বুঝাতে গেল , তখন হয়তো এক ভিন্ ধরনের সোহাগবশত কান্না থেমে গেল

“বহনাই গেল বুঝাইতে না ন বাছা কাঁদ গো,
তখন বাছা হাঁসিতে লাগিল।”

বরের ক্ষেত্রে বিয়ে করতে যাবার আগে এবং কনের ক্ষেত্রে বিয়ে শুরু হবার পূর্বে বৃক্ষবন্দনা করা বিবাহের অন্যতম অনুষ্ঠান । এই অনুষ্ঠানের পর বর গাছতল থেকেই বিয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন কনের বাড়ি অভিমুখে । বরের মা তখন গান ধরেন

“তুমি যে যাবে পুতা শ্বশুরেরই বাড়ি

দিঁয়ে রাখ দুধকেরই ধার …”

পুত্র মাতৃঋণ , মাতৃ দুগ্ধের ঋণ কখনো শোধ করতে পারে না । কোন মাও তা চান না । এ নিছক সমাজ-পারিবারিক সংস্কার মাত্র । তাই পুত্র কিংবা পুত্রের পক্ষ নিয়ে অন্য কোন নারী গায় —

“কী অ যে দিব মাগো দুধকেরই ধার গো
মা গো আ’নে দিব জনমের কামিনী …”

আজীবন সেবার জন্য দাসী আনবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছেলে যায় বিয়ে করতে । মেয়েরা গায় গান —

“ঝালিদার শহরে কীসের বাজনা বাজিছে ,
আন রে বিরাটের অলি চিনব বরের আজাকে ,
দেখলি বরের আজাকে, চিনলি বরের আজাকে ,
কত সনার গয়না আ’নেছ
সাধের লাতির বিহা দিতে ।”

সবই দেওয়া হয় । বিবাহও হয়ে যায় । এ সময় অনেক অনেক গান গীত হয় । বিবাহিতা মেয়েটির মায়ের চোখে অশ্রু ঝর্ণা । তাই দেখে কন্যা বলে —

“এতদিন যে মার্-অ মাইগ, আদাড় পিঁদাড় ভাঙ্গে
আজ ক‍্যানে কাঁদ মা চ’খে আঁচল দিয়ে ।
সেই যে মা গা’ল দিঁয়েছ খালভরি ব’লে ,
আজ ক‍্যানে কাঁদ মাগ ছামড়া খুঁটা ধ’রে । “

বিয়ের রাত্রিকালীন অনুষ্ঠান শেষ । সকাল হলেই মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাবার পালা । বর বলে —

“আজিকা রাতিয়া সোনার মিরগি ডাকে ,
উঠ লো কন‍্যা ভাঙল বিহান ,
বার বছর কন্যা মা-বাপেরই ঘরে
তবু কন্যা সাধ না মিটিল ?

অনেক কান্নাকাটি পর কন্যা শ্বশুর বাড়িতে যাবার জন্য পা বাড়ায় । মনের গভীর দুঃখে গান গায় না, কিন্তু দুঃখ গান হয়ে ফুটে ওঠে ।

” বার টাকা পন লিল্ হ
বিহা দিল দুরাম দ‍্যাশে
আরঅ কি রহিব মাই ঘরে,
আরঅ কি রহিব বাপ ঘরে
বু’ঝে লিহ গো মাই এই ভব সংসারে ।”

নববধূ শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছে গেছে । তাকে দেখার জন্য ননদিনীদের ভীড় । তারা কনে বউয়ের চেহারা নিয়ে বিদ্রুপ করে

(১) আম ধরে থঁকা থঁকা তেতুল ফলে বাঁকা ,
কী দে’খে বিহা করলি দাদা,ঠ‍্যাং দুটাই পেঁকা ।”

(২) ছুটু মুটু ডিহালি
ক‍্যানে লো তুই বিহালি
জনহা’র ঘাঁটা খাঁইয়‍্যা দিদি
ক‍্যানে এত শুকালি ।”

বৌদি কে লক্ষ্য করে, রোগা পাতলা চেহারা দেখে এই গান ।

এদিকে মেয়েরও পছন্দ হয়নি বর । সে কথা এখন মনের ভিতর গুমরে উঠছে ।

” একশ’ টাকা লিলি বাবা দিলি বুঢ়া বরে হে ,
বরের সঙ্গে যাতে হ’ল পুরু’ল‍্যা শহরে হে ,
পুরু’ল‍্যার ল’কে বলে ইটা তুমার কে বঠে ?
লজ্জাকে কারণ বলি ঠাকুদ্দাদা বেঠে হে ।”

তবুও বিবাহিতা বধূর স্বামীই ভরসা ।

” থালা-বাটি মাজিব ,
শিকায় তু’লে রাখিব,
ভা’ঙ্গে গেলে
আমার শ্যামের গলা ধরে কাঁদিব ।”

শত দুঃখেও স্বামীর ঘর করতেই হয় মেয়েদের । দৈনন্দিন জীবনে কষ্টের অন্ত থাকে না ।

“কাঠ নাই, পাৎ নাই ,
জনহা’র খাড়ায় রাঁধি গো
জলঘটি লিয়ে শ্যামকে
আ’স আ’স ডাকি গো ।”

প্রতিদিনের খাবার তৈরি হয় শুকনো জুনহার (ভুট্টা) গাছকে জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করে । খাবার সাজিয়ে দিয়ে স্ত্রী তার স্বামীকে ডাকে । হাত-পা ধোয়ার জন‍্য ঘটি ভর্তি জল বাড়িয়ে দেয় । এইভাবে দুখে সুখে দিন কাটে বেশ । দিন যায় , ক্ষণ যায়, কনে বউ মা হয় । তারপর একদিন তার ছেলে কেঁদে কেঁদে মাকে খুঁজে বেড়ায় —

” ছে’লা খুঁজে মাই মাই
ছে’লার মা ত ঘরে নাই —
ছে’লার মা গেল দাদনে
ছে’লা কাঁদে ধাদিকার বনে।”

ধাদিকা পুরুলিয়া জেলার বান্দোয়ান থানার অন্তর্গত একটি ছায়া সুনিবিড় বনাঞ্চল বেষ্টিত গ্রাম । ধাদিকার বনে কাঁদছে এক শিশু । মা নেই তার ঘরে । “দাদন” অর্থাৎ “ঋণ”এর দায়ে আজ সে যেন সর্বংসহা ধরিত্রী। পরিবারের ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে একসময় মহাজনেরা সেই পরিবারের স্ত্রীলোককে গ্রহণ করতেন সাময়িকভাবে ভোগ্য দ্রব্য হিসেবে । সীমান্ত বাংলার পল্লী অঞ্চলের লোকায়ত জীবনের করুণ মর্মন্তুদ আর্থ-সামাজিক অবস্থার বাস্তব প্রতিচ্ছবি এটি । মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ অনুষ্ঠানেও আমরা শুনতে পাই নিরানন্দ ধ্বনি । ভাবতে অবাক লাগে , পার্থিব জীবনের এমন একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠানের গান যদি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শোনা যায় , ঘটনা পরম্পরায় যা গীত হয়, তাহলে দেখা যাবে সর্বত্রই জড়িয়ে রয়েছে, ছড়িয়ে রয়েছে একটি ধীর স্থির বিষন্নতার সুর , কিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম শুধু রঙ্গ রসিকতার দু’একটি গানে ।

তপন পাত্র : অধ্যাপক ও লোকসংস্কৃতি গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post