• September 27, 2022

কেন একটি সেক‍্যুলার দেশে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ক্লাবকে পাবলিক মানি দেওয়া যায় না?

 কেন একটি সেক‍্যুলার দেশে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ক্লাবকে পাবলিক মানি দেওয়া যায় না?

মৃদুল শ্রীমানী

দুর্গাপূজা সর্বজনীন বলে বিজ্ঞাপন করা হলেও আসলে তা বিভিন্ন পল্লীতে বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্ন পরিবারের আয়োজনে হয়ে থাকে। দুর্গাপূজার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। রাজা কংসনারায়ণ এই দুর্গাপূজা চালু করেন। এরপর বিভিন্ন বর্ধিষ্ণু পরিবারের উদ‍্যোগে মূলতঃ দেখনদারির জন‍্য দুর্গাপূজা চালু হয়। ওই যে দুই কন‍্যা লক্ষ্মী সরস্বতী, পুত্রদ্বয় কার্তিক ও গণেশ, বাহন সিংহসমেত পার্বতী পিতৃগৃহে আসেন এই ঘরোয়া কল্পনাটা কংসনারায়ণ চালু করেন। রাম দুর্গতি থেকে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে অকালবোধন করেছিলেন বটে, এবং তার পৌরোহিত‍্য‌ও রাবণের মতো ফার্স্ট ক্লাস ব্রাহ্মণ করেছিলেন, তথাপি তা ঠিক একেলে দুর্গাপূজার মতো ছিল না। আর মেধামুনির অনুপ্রেরণায় রাজা সুরথ আর সমাধি বৈশ‍্য যে পূজা করেছিলেন, তা বসন্তকালে হয়েছিল। শরৎকালে দেবতাদের ঘুমানোর সময়। রাম নিজ প্রয়োজনে তাঁদের জাগিয়ে দিয়েছিলেন।
কালকেতু ফুল্লরার গল্পে কালকেতুকে দেবী অহৈতুকী কৃপা করেছিলেন, কেননা কালকেতুকে দেবীর প্রয়োজন ছিল। ভবানন্দ মজুমদারের বাড়ি যাবার সময় গাঙ পার হবার প্রয়োজনে দেবী ঈশ্বরী পাটনীর নৌকায় চড়ে তাকে কিঞ্চিৎ কৃপা করেছিলেন। ঈশ্বরীর সুযোগ থাকলেও সে নিজের সন্তানের জন‍্য দুধেভাতে থাকার বেশি কিছু কামনা করে নি। ওর চিন্তার দৌড় ওটুকুই ছিল, সন্তানের দুধে ভাতে থাকা। বাঙালির চিন্তার দৌড়‌ও ওই মাপে। দুধে ভাতে বাঙালিকে নিয়ে সুভাষচন্দ্র বেশি কালক্ষেপ করেন নি। গোমো অবধি সেডান গাড়িতে গিয়ে ট্রেনে উঠলেন মূকবধির জিয়াউদ্দিন সেজে। তারপর উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে দেশত‍্যাগ। বাঙালির প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বিদ‍্যাসাগর। শেষবেলায় তাঁর সময় কাটত কার্মাটাড়ে, গরিব সাঁওতালদের থেকে ভুট্টা কিনে ও গরিবতর সাঁওতালদের ভুট্টা খাইয়ে। বিধবাবিবাহের নাম করে বাঙালি তাঁর থেকে বিস্তর টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। বাঙালি তাঁর লেখা পড়তে চায় না লক্ষ্য করে তীব্র ক্ষোভে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছিলেন বাংলায় আমার লেখা পড়ার লোক না মিললে আমি হিব্রু অথবা ল‍্যাটিন ভাষায় লিখব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাশিয়ানদের কর্মকাণ্ড দেখে নিজের এলাকার লোকজনের অপদার্থতা মোক্ষম ভাবে অনুভব করে বলেছিলেন তারা একটা গোটা মানুষ নয়।
তো বাঙালি জমিদার সাহেবসুবোর নেকনজরে আসতে চেয়ে দোল দুর্গোৎসব করত, আর তার খরচটা উসুল করতে প্রজাদের নির্মম শোষণ করত। বেলোয়ারি ঝাড় বাইনাচ আর বরকন্দাজের দাপটে বরদাসুন্দরী গুটিয়ে থাকতেন।
আজ‌ আর জমিদার নেই। পাড়ায় পাড়ায় তার নয়া সংস্করণ হয়েছেন। রাজ‍্যের মন্ত্রী সান্ত্রীদের প্রত‍্যেকের এক একটি ব‍্যক্তিগত সাম্রাজ্য আছে। সেখানে তাঁদের নামে বিরাট বোলবোলাও। তাঁরা বিপুল বাজেটের থিমের পুজো করেন। এ ওকে টেক্কা দেন। পয়সা যোগান ব‍্যবসায়ীকুল। অর্থনীতির পড়াশুনা যাঁদের আছে, তাঁরা জানেন ওই বোঝা চাপে গিয়ে খুচরো ক্রেতার উপরে।
রাজ‍্যে কলকারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান শূন‍্য, এই অবস্থায় পুজোয় মাতিয়ে রাখার জন‍্য পাবলিক মানির হরির লুঠ আবার আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু কেন এই হরির লুঠ? এতে যেমন স্থায়ী সম্পদ তৈরি হবে না, তেমনি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও নেই। তবে পাবলিক মানি গুঁজে ক্লাবগুলোর দখল নেওয়া হয়েছে। সেই দখল ধরে রাখতে হবে। পাবলিক মানি কিন্তু এভাবে খরচ করার নয়।
অথচ সেক‍্যুলার এই দেশে সরকার কেন দুর্গাপূজার মতো অর্বাচীন পূজায় এত বিনিয়োগ করবে জানা নেই। উমার গল্প, মহিষাসুরমর্দিনীর গল্প এবং এ রকম আরো টুকিটাকি জুড়ে হালফিল দুর্গাপূজার গল্প। একে টিঁকিয়ে রাখার নামে পাবলিক মানির হরির লুঠ।অথচ দরকারি কাজে নাকি টাকা জোটে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Related post