• September 27, 2022

পরিযায়ী শ্রমিক – অধিকার প্রশ্নে

 পরিযায়ী শ্রমিক – অধিকার প্রশ্নে

হিমাদ্রিজা চক্রবর্তী

‘পরিযায়ী শ্রমিক’ এই শব্দবন্ধটি অর্থনীতি তথা সমাজবিজ্ঞানের পরিসরে একেবারেই নতুন নয় বরং বহুল চর্চিত এবং গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ২০১১ এর সেনসাস অনুসারে ভারতে পরিযায়ী শ্রমিকের মোট সংখ্যা ৪৫ কোটি। এদের মধ্যে ৬২% পরিযায়ী কিন্তু নিজের জেলার মধ্যেই অন্যত্র বসবাস করেন। ২৬% কর্মী নিজের রাজ্যেরই অন্য জেলায় বা শহরে কাজ করেন এবং ১২% ভিন্‌রাজ্যে শ্রমিক হিসেবে বাস করে।১ ভিন্‌রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া এই শ্রমিকদের (যাদের একটা বড় অংশ নির্মাণ শিল্পে নিযুক্ত) কর্মক্ষেত্রের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, কর্মসুরক্ষাহীন বাস্তবতা, স্থায়ীত্বহীন কাজ আর মজুরির বৈষম্য যেমন গবেষণায় আলোচ্য, অন্যদিকে অর্থনীতির প্রগতির চাকা ঘোরাতে শ্রমের এই অবাধ চলাচলের গুরুত্ব – এহেন বহুবিধ মতামত রয়েছে পরিযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক-অর্থনৈতিক চরিত্রকে ঘিরে। তবে করোনা সংকট এই শব্দবন্ধটিকে অনেক বেশি প্রচলিত এবং নতুন করে আলোচ্য করে তুলেছে।
৮ মে, ২০২০ – রেললাইনের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রুটির টুকরো আর দলা পাকানো ১৬টা লাশ – এদৃশ্য ভুলে গেছেন এমন সংবেদনশীল মানুষ পাওয়া কঠিন। কিংবা মৃত মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে টান মারা সেই শিশুর কান্না। অথবা জঙ্গলের কোলে জলের অভাবে ঢলে পড়া কিশোরীর দেহ। পরিযায়ী শ্রমিকদের এই অমানবিক জীবনযন্ত্রণা আসলে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কঙ্কালসার চেহারাটাই উন্মোচন করে। বাঁচার বাধ্যবাধকতায়, অনিশ্চয়তার ভয় তাদের বাধ্য করেছিল মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরার মত সিদ্ধান্ত নিতে। কারণ কাজ নেই, অর্থ নেই, খাদ্য নেই এমনকী বাসস্থানও হারিয়েছিল অনেকেই। সারা দেশ প্রশ্ন করল সরকারকে, প্রশাসনকে। তারা নিরুত্তর। এই নির্লিপ্ত নীরবতা যে শুধু অমানবিক বা সামাজিক অবক্ষয় তা নয়, পরিযায়ী শ্রমিক-নির্ভর ক্ষেত্রগুলিকেও কিন্তু শ্রমিকদের প্রতি এই অবহেলা, অনাহার আর আশঙ্কার মাশুল গুনতে হবে। যারা ফিরল তারা সবাই কি আবার ভিন্‌রাজ্যে যাওয়ার ঝুঁকি নেবে? সরকারের কাছে এ তথ্যও নেই যে কতজন পরিযায়ী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, কতজনই বা পথে দুর্ঘটনায় বা অন্যান্য কারণে মারা গেছেন। এই তথ্যগুলির গুরুত্ব নিশ্চয়ই সমাজবিজ্ঞানের গবেষকরা অনুধাবন করতে পারবেন যা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকেরা করে উঠতে পারেনি।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিযায়ী শ্রমিকদের বর্ণনা করা হয় তাঁদের কর্মসুরক্ষাহীন, সামাজিক সুরক্ষাহীন, জীবনযাপনের নিম্ন মানের নিরিখেই। ফলে করোনার সময় তাদের অসহায়তা দেখে শিক্ষিত সমাজ প্রশ্ন করলেন সরকারগুলিকে। এই মানুষদের জীবনের দায়ভার নিতে দাবী করলেন সরকারেরই কাছে। যদিও তাতেও বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়েছিল এমন নয়, আর যখন সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ট্রেন চালু করলেন ততদিনে অনেকটা রক্তাক্ত পথ তারা পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সরকারের দয়াভিক্ষা ব্যতিরেকে কি এদের কোনো শ্রম-অধিকারই নেই এদেশে? সরকার তাদের নাগরিকদের দায়িত্ব নিতে বাধ্য এ-ও যেমন সত্য তেমনি যেসব ক্ষেত্রে এই শ্রমিকেরা কাজ করতেন, যে ঠিকাদারদের অধীনে তারা কাজে নিযুক্ত হতেন তাদের দায়িত্ব কোথায় গেল? না মালিক, না ঠিকাদার, না রাজ্য, না কেন্দ্র কেউই কোনো সদর্থক ভূমিকা রাখেনি পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনসংকটের প্রশ্নে, উলটে উদ্যোগপতিরা এই শ্রমিকদের ফিরতে যাতে না দেওয়া হয় তার আবেদন করে সরকারের কাছে।
তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন ব্যতিরেকে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদেই এই নিবন্ধ। আর তা হল আমাদের দেশের শ্রম আইনে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আদেও কি কোনো শ্রম-অধিকার আছে? রয়েছে কোনো সামাজিক সুরক্ষা?

এদেশের শ্রমআইনের সব সুবিধাই পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যদিও তার থেকে তাঁরা বঞ্চিত আছেন বহুদিন। খাতায় কলমে পরিযায়ী শ্রমিকদের আইন রচিত হয়েছে ১৯৭৯ সালে। The Inter-State Migrant Workmen (Regulation of Employment and Conditions of Service) Bill, ১৯৭৯ সালের ১১ জুন রাষ্ট্রপতির দ্বারা বিলে পরিণত হয়। কিন্তু এই আইনকে সুরক্ষিত করতে কোনো ট্রেড ইউনিয়ন সংস্থা, রাজনৈতিক দল সরব হয়নি কখনো। কারণ ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকরা স্থায়ী ভোটার নয় বলেই বোধহয়। সমগ্র বিলটিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলিকে নীচে তুলে ধরলাম –

১. এই বিলের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে পরিযায়ী শ্রমিকদের স্থায়ী শ্রমিকদের মত সমান হারে বেতন এবং সব সুবিধা দিতে হবে এবং ন্যূনতম মজুরি অ্যাক্ট-এ নির্ধারিত মজুরির তুলনায় কম মজুরি কখনোই দেওয়া যাবে না।
(The wage rates, holidays, hours of work and other conditions of service of an inter-State migrant workman shall,-

(a) in a case where such workman performs in any establishment, the same or similar kind of work as is being performed by any other workman in that establishment, be the same as those applicable to such other workman; and

(b) in any other case, be such as may be prescribed by the appropriate Government:

Provided that an inter-State migrant workman shall in no case be paid less than the wages fixed under the Minimum Wages Act, 1948 (41 of 1948).

২. ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী লেখা আছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কাজ করতে আসা শ্রমিকদের কাজে যোগদানের সময় ডিসপ্লেসমেন্ট বাবদ সময় বেতনের অর্ধেক অর্থাৎ ৫০% এককালীন অনুদান পাবেন যা ফেরতযোগ্য নয় এবং তার মজুরির উপর বাড়তি অনুদান।
((1) There shall be paid by the contractor to every inter-State migrant workman at the time of recruitment, a displacement allowance equal to fifty per cent. of the monthly wages payable to him or seventy-five rupees, whichever is higher

(2) The amount paid to a workman as displacement allowance under sub-section (1) shall not be refundable and shall be in addition to the wages or other amount payable to him.)

৪. ১৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে কাজের জন্য তারা ভিন্ন রাজ্যে গেলে, যাতায়াতের ভাড়া ব্যয় করতে হবে ঠিকাদারকে।
(A journey allowance of a sum not less than the fare from the place of residence of the inter-State migrant workman in his State to the place of work in the other State shall be payable by the contractor to the workman both for the outward and return journeys and such workman shall be entitled to payment of wages during the period of such journeys as if he were on duty)
৫. ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে –
ক) বেতন নিয়মিত দিতে হবে।
খ) লিঙ্গবৈষম্যের ভিত্তিতে কোনো বেতন বৈষম্য করা যাবে না।
গ) কাজের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকতে হবে।
ঘ) যতদিন কাজে নিযুক্ত আছেন কোনো শ্রমিক তার উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঙ) বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে।
চ) সুরক্ষা ব্যবস্থা ও কাজ অনুযায়ী সুরক্ষিত পোষাক দিতে হবে।
ছ) প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি আর আঘাতের ক্ষেত্রে সরকারকে দ্রুত অবহিত করতে হবে এবং শ্রমিকদের নিকট-আত্মীয়কে তৎক্ষণাৎ জানাতে হবে।
(It shall be the duty of every contractor employing inter-State migrant workmen in connection with the work of an establishment to which this Act applies,-
(a) to ensure regular payment of wages to such workmen;

(b) to ensure equal pay for equal work irrespective of sex;

(c) to ensure suitable conditions of work to such workmen having regard to the fact that they are required to work in a State different from their own State;

(d) to provide and maintain suitable residential accommodation to such workmen during the period of their employment;

(e) to provide the prescribed medical facilities to the workmen, free of charge;

(f) to provide such protective clothing to the workmen as may be prescribed; and

(g) in case of fatal accident or serious bodily injury to any such workman, to report to the specified authorities of both the States and also the next of kin of the workman.)

৬. ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে ঠিকাদার বেতন না দিলে যে সংস্থায় কর্মীরা কাজ করেন সেখানের মালিককে টাকা শোধ করতে হবে।
(If any allowance required to be paid under section 14 or section 15 to an inter-State migrant workman employed in an establishment to which this Act applies is not paid by the contractor or if any facility specified in section 16 is not provided for the benefit of such workman, such allowance shall be paid, or, as the case may be, the facility shall be provided, by the principal employer within such time as may be prescribed.)

পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে THE INTER-STATE MIGRANT WORKMEN (REGULATION OF EMPLOYMENT. AND CONDITIONS OF SERVICE) CENTRAL RULES, 1980- তে কিছু সংযোজন ও পরিবর্ধন করা হয়। যার মধ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য হল ২২ ও ২৮ নম্বর ধারাটি।

১. ২২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে ঠিকাদারকে পরিযায়ী শ্রমিককে তার কাজের মেয়াদ ফুরোলে কাজের জায়গা থেকে নিজের রাজ্যে ফেরার ভাড়া দিতে হবে এবং শুধু এই ক্ষেত্রেই নয়,

ক) কাজের মেয়াদ ফুরোনোর আগেই যদি তাকে কোনো কারণবশত ফিরতে হয়
খ) শারীরিক অপারগতা ও অসুস্থতার কারণে যদি ফিরতে হয়
গ) নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রটিতে যদি কোনো কারণবশত কাজ শেষ হয়ে যায়
ঘ) কাজের শর্ত ও চুক্তি পূরণ না হওয়ার ফলে কাজ ছেড়ে যদি ফিরতে হয়

  • এই সব ক্ষেত্রেও ফেরার খরচ ব্যয় করতে হবে ঠিকাদারকে।
    (Return fare.- The contractor shall pay to the migrant workman the return fare from the place of employment to the place of residence in the home-state of the migrant workman on the expiry of the period of employment and also on his-

(a) termination of service before the expiry of the period of employment for any reason whatsoever;

(b) being incapacitated for further employment on account of injury or continued ill-health duly certified as such by a registered medical practitioner;

(c) cessation of work in the establishment which is not due to any fault on the part of the migrant workman; and

(d) resignation from service on account of non-fulfilment of terms and conditions of his employment by the contractor.)
২. ২৮নম্বর ধারা অনুযায়ী যেসব ক্ষেত্রে ১০০০ জনের কম শ্রমিক নিয়ে কাজ হয় সেখানে ঠিকাদারকে প্রত্যেক পরিযায়ী শ্রমিকের মজুরি সপ্তাহে এবং অন্য ক্ষেত্রে তা মাসের দশ তারিখের মধ্যে দিতে হবে।
( Payment of wages.- The wages of every migrant workman in an establishment by a contractor where less than 1000 workmen are employed shall be paid before the expiry of the seventh day and in other cases before the expiry of tenth day every month)

কিন্তু বাস্তব এটাই, শ্রম আইনে লিখিত শ্রমিকদের অধিকার এই প্রশ্নটি শ্রমিকশ্রেনীর ঐক্যবদ্ধ লড়াই-নির্ভর ছিল। শ্রম আর পুঁজির স্বাভাবিক দ্বন্দ্বের নিয়মে গড়ে ওঠা শ্রমিক অসন্তোষকে ধামা চাপা দিতেই আসলে শ্রম আইনে বিভিন্ন ধারা যুক্ত হতে থাকে একসময়। অর্থাৎ শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম এই শ্রমিক অধিকারগুলোকে রাখতে বাধ্য করেছে রাষ্ট্রকে। কিন্তু দীর্ঘ শ্রমিক শ্রেনীর রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপস্থিতি, তীব্র সংগ্রামী ঐক্যের ধারাবাহিকতার অভাবের সুযোগে শ্রেনী হিসেবে শ্রমিককে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে। আগামী সম্ভাব্য শ্রমিক আন্দোলন যা কিনা শ্রমিক রাষ্ট্রের বাস্তব ভিত্তি তৈরী করতে পারত তাকেও রোখা সম্ভব আজকের শ্রমিকদের বিভাজনের মধ্যে দিয়ে। তাই সহজ হয় শ্রম আইন সংশোধন করা , এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলি তুলে দেওয়া।
আমাদের দেশের জনসংখ্যার ৪% মানে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি মানুষ আন্তঃরাজ্য পরিযায়ী শ্রমিক।২ তাদের জন্য বিস্তারিত শ্রম আইন লিখিত রয়েছে। অথচ সারা করোনা সংকটকালে তারা শুধুই বঞ্চনা, মৃত্যু, অনাহার, অনিশ্চয়তারই মুখোমুখি হলেন। যারা আইনে শিলমোহর দিলেন আর যাদের সেই আইন মান্য করার কথা ছিল উভয়েই শুধু নির্লজ্জ নীরবতা ছাড়া আর কিছুই করল না। আচমকা করা লকডাউনে পরিযায়ী শ্রমিকরা বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল, সুরাটের রাস্তায় তারা একত্রিত হয়ে দাবী জানিয়েছিল তারা বাড়ি ফিরতে চায় সেটা তাদের অধিকারের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু বদলে যা জুটেছিল তা হল পুলিশের লাঠি, নির্যাতন। দিনের পর দিন ঠিকাদার বা মালিকরা মজুরি দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে এমন দুর্দশার কথাও পরিযায়ী শ্রমিকদের মুখ থেকেই আমরা জেনেছি। ন্যূনতম থাকা খাওয়ার দায়িত্বটুকু নিতেও অস্বীকার করে মালিকপক্ষ। ভিন্‌রাজ্যে থেকে করোনা আক্রান্ত হলে স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা করাও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তাদের কাছে। আইন থাকে আইনেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিযায়ী শ্রমিক তথা অসংগঠিত শ্রমিকেরা শ্রম আইনের আনাচে কানাচে তাদের জন্য যতটুকু অধিকার তারা অর্জন করেছে তার সম্বন্ধে অজ্ঞাত। যে সমস্ত মূলধারার ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনগুলি রয়েছে তারাও এই আইন গুলি তাদের জানায় না। ফলে অধিকারের প্রশ্ন বদলে যায় সরকারের দয়াভিক্ষায়। যে সরকার অক্সিজেন যোগান দিতে পারে না, ভ্যাক্সিন-এর যোগান দিতে পারে না সময়মতো অথচ এই সংকটজনক অবস্থায় বিলাসবহুল সেন্ট্রাল ভিস্তা নির্মাণের ন্যক্করজনক কাজ করে যেতে পারে সে কি এইপরিযায়ী শ্রমিকদের প্রশ্ন শোনবার দায়বদ্ধতা রাখে? মনে রাখতে হবে যে করোনা সংকটের কঠিন সময়ে শ্রমসুরক্ষা লঘু করে কর্পোরেটের শোষনের পথ মসৃণ করা হয়েছে। ৪৪ টি শ্রম আইনকে সংশোধিত করে করা হয়েছে ৪টি কোডে। শ্রমের অবাধ চলাচলকে কোনো রকম দায়িত্ব-কর্তব্য ছাড়াই প্রশস্ত করা হল, স্থায়ী কাজের প্রশ্নকে পাল্টে করা হল ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট, শ্রমিক আন্দোলন- অসন্তোষ প্রদর্শন হল বেআইনি, এমনকি শোষণকে সহজ করতে লিঙ্গবৈষম্যের প্রশ্নটিকেও করা হল লঘু। ভারতের সস্তা শ্রমের বাজারকে আরো উন্মুক্ত করা হল, শ্রম আইনের জটিলতা মুক্ত করা হল। অর্থনীতি তথা দেশের আপামর জনসাধারণের এই চূড়ান্ত সংকটের দিনে যারা শ্রমিক-বিরোধী এরকম একটি বিল পাশ করাতে পারে, তারাই তো পারে পরিযায়ী শ্রমিকদের থেকে বাড়তি ট্রেনের ভাড়া নিতে। এতে আর আশ্চর্যের কি আছে! যেখানে অধিকারের প্রশ্ন খাতায়কলমে দম আটকে মরে। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী হিসেবে আমরা পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার চিত্রটা তুলে ধরতে পারি, সেই দুর্দশা অর্থনীতি কত গভীরে আঘাত করবে তা পরিসংখ্যানে ব্যক্ত করতে পারি, ফেরত যাওয়া শ্রমিকরা কি আর ফিরে যাবে ভিন্‌রাজ্যে সেই আলোচনাও অত্যন্ত জরুরী কিন্তু যে অধিকার তাদের নিজেদের ছিল যা প্রকাশ্য দিবালোকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া হল সেই জিজ্ঞাসা কিন্তু থেকেই যায়। পড়ে থাকে রক্তাক্ত রেললাইন আর অধিকারের কবরে গণতন্ত্রের গোলাপফুল।

তথ্যসাহায্যঃ https://clc.gov.in/clc/acts-rules/inter-state-migrant-workmen
১,২ https://eisamay.indiatimes.com/editorial/post-editorial/problem-of-migrant-workers-and-the-role-of-administration/articleshow/78259147.cms

হিমাদ্রিজা চক্রবর্তী, পিএইচডি স্কলার, বিশ্বভারতী

Leave a Reply

Your email address will not be published.